Home গল্প একটি কান্নার গল্প -আহমদ বাসির

একটি কান্নার গল্প -আহমদ বাসির

বাড়ির জোড়াতালি দেয়া টিনের গেটটার ওপর জোরে জোরে থাপ্পড় পড়ছে। এত জোরে গেট থাপড়াচ্ছে কে? হারিস মিয়া ভিতরে ভিতরে চমকে ওঠে। একটু আগেই গোসলখানায় ঢুকেছে সে। বালতি থেকে এইমাত্র একবাটি পানি মাথায় ঢেলেছে। এ অবস্থায় ভেজা শরীর নিয়ে গেটের দিকে যেতে ইচ্ছে হলো না তার। কাপড়ের ঘেরা দেয়া গোসলখানা থেকে মুখ বাড়িয়ে চিৎকার করে স্ত্রীকে ডাকলো- ‘কইরে সানু, গেটে কে আইলো দেখতো তাড়াতাড়ি।’ খুব দ্রুতই রান্নাঘর থেকে সাড়া দিলো হারিস মিয়ার স্ত্রী- ‘ভাতের মাড় গালতেছিলাম, তুমি গোসল সাইরা লও, আমি দেখতাছি। কেডা আবার এত জোরে জোরে গেট থাপড়াইতাছে।’ বলতে বলতে গেটের দিকে এগিয়ে যায় সানু।
হারিস মিয়ার পরিবারটি মোটামুটি সচ্ছল। এক ছেলে দুই মেয়ে নিয়ে পাঁচ সদস্যের সংসার। হারিস মিয়া ও তার বড় ছেলে পেশায় ড্রাইভার। দু’জন ভাড়ায় অটোরিক্সা চালায়। খাওয়া-পরার অসুবিধা তেমন কিছু নেই। যা একটু অসুবিধা থাকার। অনেক চেষ্টা করে বস্তির এই ডোবা জায়গাটি ব্যবহারের অনুমতি পেয়েছে হারিস মিয়া। তারপর এটি ভরাট করতে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে তাকে। অবশেষে এখানে তৈরি হয়েছে চারটি থাকার ঘর, একটি রান্নাঘর, একটি গোসলখানা, একটি টয়লেট আর একটু খোলা জায়গায় ছোটখাটো একটি সবজি ক্ষেত। সমস্যা হচ্ছে বর্ষাকালে পানি ঠেকানো যায় না কিছুতেই। ঘরের ভিতরেই ঢুকে পড়ে পানি। তখন নানাভাবে ঠেক-ঠুক দিয়ে চলতে হয়। হারিস মিয়া মাঝে মাঝে ভাবে, থাকার এটুকু আশ্রয় না মিললে তার সংসারে খাওয়া-পরার সচ্ছলতা থাকতো না, হোক তা যতই অসুবিধাজনক। শুধু বর্ষার পানি বলে কথা নয়, এ বস্তিতে আরও নানারকম অসুবিধার আশঙ্কা থেকেই যায়।
হারিস মিয়া ও তার স্ত্রী সে রকমই কোন অসুবিধার আশঙ্কা করেছিলো। গেটের কাছাকাছি গিয়ে সানু উচ্চস্বরে জানতে চাইলো- ‘কে রে এত জোরে জোরে গেট থাপড়াইতেছে।’ সহসাই জবাব এলো- ‘আমি আম্মু, তাড়াতাড়ি গেট খুলে দাও, এত দেরি করছ কেন।’ ছোট মেয়ে তিন্নির কণ্ঠ শুনে চমকে ওঠে সানু। গোসলখানা থেকে হারিস মিয়াও শুনতে পায় মেয়ের গলা। সেও চমকে ওঠে। কী হলো মেয়েটার। মেয়ে তো এভাবে গেট থাপড়ায় না, এভাবে কথা বলে না। সানু খুব দ্রুত গেট খুলে দেয়। কম্পিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে- ‘কী রে মা কী হইছে।’ তিন্নি কোন জবাব না দিয়েই মাকে পাশ কটিয়ে একছুটে ঢুকে পড়ে ঘরে। সানুর বুকের ভিতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। কী হলো মেয়েটার? টিনের গেটটা ভিতর থেকে আটকে দিয়ে মেয়ের মতোই একছুটে ঘরে ঢুকে পড়ে মা। মেয়েটা বিছানার উপুড় হয়ে বালিশে মুখগুঁজে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। বুকটা আরেকবার মোচড় দিয়ে ওঠে মায়ের। মেয়ের পাশে বসে পড়ে সানু। পিঠের ওপর মায়ের হাত টের পায় তিন্নি। ওর কান্নার গতি বেড়ে যায়। হাহাকার করে ওঠে সানু- ‘কী হইছেরে মা আমারে কও।’ মেয়ের কান্নার গতি এবার আরও বেড়ে যায়। সানু চিৎকার করে স্বামীকে ডাকে- ‘কইগো তিন্নির আব্বু, তোমার এখনও গোসল শেষ হইলো না। এদিকে আমার মেয়েটা যে এমন করতেছে… কী হইছে গো ওর।’ বলতে বলতে তিন্নির আম্মুও এবার কান্না জুড়ে দেয়। হারিস মিয়া দ্বিতীয় বাটি পানি এখনও মাথায় ঢালেনি। এতক্ষণ তার খেয়াল মেয়ের দিকেই ছিলো। হাতে নেয়া পানির বাটিটি তখনও তার হাতেই ধরা। বাটিটি দ্রুত বালতির দিকে ছুঁড়ে মেরে ভেজা কাপড়েই ঘরের দিকে ছুটল সে। ততক্ষণে মা আর মেয়ের কান্না করুণ হাহাকার হয়ে ছাড়িয়ে পড়েছে আশপাশের ঘরগুলোতে। যে যেখানে বসে এ আওয়াজ শুনেছে সে-ই ছুটে আসতে শুরু করেছে। তিন্নিদের টিনের গেটটার ওপর এবার অনেক হাতের ধাক্কা ও থাপ্পড় পড়ছে একসঙ্গে। প্রতিবেশীরা তিন্নির আব্বু-আম্মুকে ডাকছে খুব জোরে জোরে- ‘ও হারিস মিয়া, ও সানু, কী হইছে তোমাগো, গেটটা খুইলা দাও না।’ গেটের দিকে নজর দেয়ার সুযোগ নেই হারিস মিয়া কিংবা সানুর। মেয়েকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে তারা।
তিন্নিদের গেটে যারা ভিড় জমিয়েছে তাদের মধ্য থেকে একটি ছেলে দ্রুতই বাঁশের খুঁটি বেয়ে গেট ডিঙিয়ে বাড়ির ভিতরে ঢুকে পড়ে। ছেলেটি গেট খুলে দিলে সবাই হুড়মুড় করে ভেতরে চলে আসে। সবার মুখে একটাই জিজ্ঞাসা- ‘হয়েছেটা কী।’ জবাব মিলছে না কারো কাছেই। কয়েকজন নারী-পুরুষ ওই ঘরটাতে ঢুকে পড়ে। তারা তিন্নির আব্বু-আম্মুর কাছে ঘটনা জানতে চায়। হারিস মিয়া ও সানু প্রতিবেশীদের প্রশ্নের জবাব দেয়ার প্রয়োজন মনে করে না। তারা বরং মেয়ের কাছ থেকে আসল কথাটি জানার কোশেশ করতে থাকে।
প্রতিবেশীদের ব্যাপক আগমন ঘটতে থাকায় দৃশ্যপট কিছুটা পরিবর্তন হয়। সানুর কান্না থেমে যায়। তিন্নির কান্নার গমকও কিছুটা কমে আসে। হারিস মিয়া সানুকে একপাশে ঠেলে দিয়ে মেয়ের মাথাটি কোলে নিয়ে বসে আছে। উৎসুক মানুষের ভিড় ক্রমাগত বাড়ছে। মানুষের জিজ্ঞাসার একটা জবাব না মিললে তারা যেন এখান থেকে এক পাও নড়বে না। হারিস মিয়া চিন্তিত হয়ে পড়ে। মেয়ের মাথার চুলে যত্নের সঙ্গে হাত বুলাতে বুলাতে জিজ্ঞেস করে- ‘তিন্নি মা, এবার আব্বুর কাছে কওতো মা, কী হইছে তোমার। কতো লোক আইসা জড়ো হইছে দেখো। তোমার লগে কেউ খারাপ ব্যবহার করলে আমরা সবাই মিলে তারে সাজা দিমু। তুমি শুধু আমাগোরে কও কী হইছে।’
আব্বুুর কোলে মাথা রেখে চোখ বুজে তখনও ফোঁপাচ্ছিল তিন্নি। সবেমাত্র আট বছরে পা দিয়েছে সে। দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে তৃতীয় শ্রেণিতে উঠেছে। লেখাপড়ায় ভালো হওয়ায় আব্বু ওকে বস্তির বাইরে একটি ভালো স্কুলে ভর্তি করিয়েছে। নতুন স্কুলে ভর্তি হওয়ায় তার অনেক নতুন বান্ধবী হয়েছে। মাঝে মাঝেই ওদের কেউ কেউ তিন্নির বাসা পর্যন্ত আসে। তবে বেশি সময় থাকে না। তিন্নির আব্বু-আম্মু ওদেরকে যতœ করে বসতে বলে। কিন্তু ওরা দ্রুতই কেটে পড়ে। প্রায় সবার একই কথা, ওদের আব্বু-আম্মু যদি জানতে পারে বস্তিতে ওদের কোন বন্ধু আছে তাহলে তিন্নির সঙ্গে ওদের আর মিশতেই দিবে না। শুনে তিন্নির আব্বু-আম্মু মনে একটু কষ্ট পেলেও ওদেরকে কিছ্ইু বলেন না।
চোখ দুটি দু’হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে কচলাতে কচলাতে চোখ খোলে তিন্নি। আশপাশে অনেক উৎসুক মুখ দেখতে পেয়ে আবারও চোখ বন্ধ করে। সবাই দেখতে পায়, কাঁদতে কাঁদতে তিন্নির চোখ দু’টি টকটকে জবা ফুলের রঙ ধরেছে। চোখ বন্ধ রেখেই তিন্নি এবার কথা বলে- ‘আব্বু তুমি সবাইকে চলে যেতে বলো। আমার সাথে কেউ কোন খারাপ ব্যবহার করেনি।’
কান্না থেমে যাওয়ার উৎসুক মানুষের ভিড় কিছুটা কমে আসে। এ অবস্থায় তিন্নির আব্বু উচ্চস্বরে সবাইকে চলে যাওয়ার অনুরোধ করেন। মানুষজন আরও কমে যায়। আশপাশের ঘরের কয়েকজন মহিলাই তখনও অপেক্ষা করছিল, তিন্নির কান্নার বৃত্তান্ত জানতে। এসব মহিলার একজনকে তিন্নি খালা বলে ডাকে। সেই রানু খালাই এবার তিন্নির কাছে জানতে চায়- ‘তিন্নি সোনা, সবাই তো চলে গেছে। এবার তুমি আমাগোরে কও তো হইছেটা কী?’
আব্বুর কোল থেকে মাথা তুলে বসে পড়ে তিন্নি। চোখ দু’টোকে আরেকবার কচলে নেয় দু’হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে। তারপর বেশ নাটকীয় ভঙ্গিতে কথা বলতে শুরু করে- ‘আব্বু, তুমি তো আমাদেরকে অনেক কিছু কিনে দাও। যা খেতে চাই এনো দাও। তাই না?’ সহসাই জবাব দেয় তিন্নির আব্বু- ‘হ্যাঁ, তাইতো, সব বাবা-মা-ই তাদের ছেলে-মেয়েদের জন্য এরকম করে।’- ‘না আব্বু করে না।’ বলেই তিন্নি আবার ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। হারিস মিয়া মেয়েকে জড়িয়ে ধরেন- ‘কী হইছে, আগে তো খুইলা ক, তুই এত্ত কাঁদলে কইবি ক্যামনে।’ তিন্নি কান্না থামোনোর চেষ্টা করে। কিন্তু তার সে চেষ্টা পুরোপুরি সফল হয় না। অবশেষে কাঁদতে কাঁদতে ফোঁপাতে ফোঁপাতে সে পুরো ঘটনাটা বর্ণনা করে। যদিও আবেগে, উত্তেজনায় তার বর্ণনা হয়ে ওঠে বেশ অগোছালো। গুছিয়ে বলতে গেলে ঘটনাটা ছিল এরকম-
প্রতিদিনের মতো এদিনও বেলা দুপুর ১২টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে স্কুল ছুটি হয়ে যায় তিন্নিদের। তিন্নি বান্ধবীদের সঙ্গে নিয়ে বেলপুরি খেয়ে টিফিনের টাকাটা উজাড় করে দেয়। স্কুল ব্যাগটি পিঠের ওপর ঠিকমতো সেট করে এবার সে রওয়ানা করে বস্তির দিকে। কিছুদূর এগুনোর পর সামনের মোড়ে একটি দৃশ্য দেখে চোখ আটকে যায় তিন্নির। দৃশ্যটি দেখতে দেখতেই সে এগোতে থাকে।
এই মোড়ে একটি চা ও কনফেকশনারি দোকান আছে। দোকানের কাউন্টারের সামনেই একটি মোটরসাইকেল দাঁড়ানো। মোটরসাইকেলে হেলান দিয়ে একটি লোক কোকাকোলা জাতীয় কোন কোমলপানীয় পান করছে। তার ঠিক সামনেই দাঁড়িয়ে আছে তিন্নির সমবয়সী একটি টোকাই ছেলে। ছেলেটির পিঠে একটি বড় বস্তা ঝুলানো। ডান হাত দিয়ে ঘাড়ের ওপর সে বস্তাটি ধরে রেখেছে। নজর তার লোকটার হাতে ধরা বোতলটির দিকে। লোকটা কিছুক্ষণ পরপর বোতলটি উপুড় করে ঢকঢক করে পান করছে। আরও কিছুদূর এগিয়ে তিন্নি দেখলো লোকটার এক হাতে একটা সিগারেটও জ্বলছে। সে একবার বোতলটি থেকে পান করছে, আবার সিগারেট থেকে।
খুবই ছোট ছোট পা ফেলে ধীরে ধীরে এগুচ্ছিল তিন্নি। তার নজরে পড়ল, লোকটা বোতল থেকে ঢকঢক করে পান করে তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলছে। সঙ্গে সঙ্গেই তিন্নি তাকালো টোকাই ছেলেটার দিকে। ছেলেটা জিব দিয়ে ঠোঁট ভেজাচ্ছে। এ দৃশ্য দেখে তিন্নির বুকের ভেতরটা কেমন জানি করে ওঠে। সে এগিয়ে যায় মোড়ের আরও কাছে। লোকটি এবার সোজা হয়ে দাঁড়ায়। সিগারেটে একটা টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে দেয় টোকাই ছেলেটার মুখের ওপর। ছেলেটা মাথা এদিক-ওদিক করে ধোঁয়া থেকে বাঁচার চেষ্টা করে। লোকটা আরও একবার সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে দেয় ছেলেটার মুখের ওপর। ছেলেটা এবার একটু সরে দাঁড়ায়। লোকটা বোতল উপুড় করে শেষ পানীয়টুকু ঢকঢক করে গলায় ঢেলে দেয়। তারপর বোতলটি ছুঁড়ে মারে টোকাই ছেলেটির গায়ের ওপর। ছেলেটি খুব দ্রুতই বোতলটি লুফে নিয়ে দৌড়ে খানিকটা এগিয়ে যায়। তিন্নিও ততক্ষণে মোড়ে চলে আসে। লোকটা দোকারদারকে টাকা দেয়ার জন্য মানিব্যাগ বের করে। টাকা বের করতে করতে খুব নোংরাভঙ্গিতে বলে ওঠে- ‘টোকাইর বাচ্চা টোকাই একটা বোতলের জন্য কতক্ষণ ধইরা পশুর মতো জিহ্বা বাইর কইরা খাড়াইয়া আছে।’ দোকানদার লোকটার হাত থেকে টাকা নিতে নিতে হাসিমুখে জবাব দেয়- ‘ওরা ওই রকমই, পশুরও জাত আছে, ওগোর কোনো জাত নাই।’
কথাগুলো তিন্নির কচি কলিজাটাকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেয়। সামনে তাকিয়ে সে টোকাই ছেলেটাকে খোঁজে। ছেলেটা রাস্তার ওপারে নির্বিকার দাঁড়িয়ে ওই বোতলটি উপুড় করে দু-এক ফোটা কোমলপানীয় জিহ্বায় ঢালার চেষ্টা করে যাচ্ছে। তিন্নি মোড় ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে দোকানটি পিছনে পড়ে যায়। তার সামনে এখন ওই টোকাই ছেলেটি। সে এক ফোঁটাও পানীয়ের স্বাদ নিতে পারেনি। তাই বোতলের মুখের ভিতর জিহ্বা লাগিয়ে চাটছে। এ দৃশ্য তিন্নি কিছুতেই সহ্য করতে পারছে না। ছেলেটাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যায় সে। চোখ দু’টি তার ঝাপসা হয়ে আসে। হতবিহবল হয়ে পড়ে সে। কোন মতে পা দু’টিকে টেনে নিয়ে বাড়ির গেটে এসে হাজির হয় তিন্নি। তারপর দুদ্দাড় শব্দে থাপড়াতে থাকে গেটটার ওপর।

SHARE

Leave a Reply