Home তোমাদের গল্প বিবেকের দুয়ার -ওমার আল ফারুক

বিবেকের দুয়ার -ওমার আল ফারুক

আবির এবং সায়েম চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। আবির একটি নামকরা বেসরকারি বিদ্যালয়ে পড়ে আর সায়েম পড়ে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। আবিরের আব্বু বড় ব্যবসায়ী আর সায়েমের আব্বু রিকশা চালক। সায়েমরা তাদের বাড়িতে ভাড়া থাকে। আবিরদের দালান বাড়িতে ভাড়া থাকার মত সামর্থ্য তাদের নেই বরং গেটের পাশে টিনের ছাওয়া ছোট ঘরটিতে তারা থাকে। তবে আবির আর সায়েমের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্ক। দু’জন রাতে একত্রে পড়তে বসে প্রাইভেট স্যারের কাছে। তাদের স্যারের নাম সাদিক। সাদিক স্যার-ই একসাথে পড়ার ব্যবস্থা করেছে। প্রথমে আবির একাই পড়তো। মাঝে মাঝে সায়েম এসে তার পড়া দেখতো। সে যেটা বুঝতো না আবিরের স্যারের থেকে জেনে নিতো। সাদিক সায়েমদের অভাবের কথা জানতো। সে ভাবতো যদি সায়েমকেও আবিরের সাথে পড়ানো যেত তবে ছেলেটা উপকৃত হতো। এ ছাড়া সায়েমের মেধা আবিরের থেকে অনেক ভালো সে অনুভব করে। কিন্তু গরিবদের প্রতি ধনীদের মানসিকতা সাধারণত ভালো হয় না এই ভাবনা তাকে দ্বিধান্বিত করে। হয়ত আবিরের বাবা-মা এটি পছন্দ করবেন না। তারপরও সাদিক একদিন আবিরের আব্বুর সাথে বিষয়টি উল্লেখ করে এবং বলে, ‘সায়েম আবিরের সাথে পড়লে আবিরের জন্য লাভ হবে, পড়ার ক্ষেত্রে দুজনের মধ্যে প্রতিযোগী মানসিকতা তৈরি হবে।’ আবির পড়ার প্রতি বরাবর অমনোযোগী। ফলে আবিরের আব্বু সম্মতি দেন। সেই থেকে দু’জন একত্রে পড়ছে। নোংরা, ছেঁড়া পোশাক পরা সায়েমের সাথে সুন্দর সুসজ্জিত পোশাক পরিহিত আবির পড়ার ক্ষেত্রে পিছিয়ে থাকে। তবে সে আগের থেকে এখন পড়ালেখায় বেশ মনোযোগী হয়েছে। এতেই তার আব্বু আম্মু খুশি।
সাদিক আবির সায়েমদের মতই একজন ছাত্র। সে একাদশ শ্রেণীতে পড়ে। এসএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন এ+ পেয়ে একটি বেসরকারি ব্যাংকের বৃত্তি নিয়ে শহরের নামকরা কলেজে ভর্তি হয়েছে। শৈশবে আব্বুকে হারানোর ফলে কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে তাকে এ পর্যন্ত আসতে হয়েছে। বৃত্তির টাকায় তার সম্পূর্ণ খরচ চলে না তাই প্রাইভেট পড়ায়। আবিরের সাথে সায়েমকে পড়ালেও এজন্য একটি টাকাও নেয় না। সেও গরিব তাই গরিবের ব্যথা বুঝতে কষ্ট হয় না।
রমজান মাস। সরকারি ছুটিতে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হলেও সাদিকের টিউশনি বন্ধ নেই। টিউশনির কারণে তাকে বাধ্য হয়ে শহরে থাকতে হচ্ছে। অথচ তার অধিকাংশ সহপাঠী গ্রামে ছুটি কাটাতে ফিরে গেছে। দিন গুনতে গুনতে ঈদ সমাগত হয়। তিন অথবা চারদিন পর ঈদ। সাদিকের ছটফটানি আরো বৃদ্ধি পায়। খাঁচাবন্দি পাখি যেমন বের হওয়ার জন্য ছটফট করে। কখন সে মায়ের কাছে ফিরে যাবে, গাঁয়ের বন্ধুদের সাথে কখন মিলিত হতে পারবে সেই চিন্তা তাকে বিভোর করে রাখে। গ্রামের সবুজ প্রকৃতি তাকে হাতছানি দিয়ে ডাকতে থাকে।
আজ পড়াতে গেলে আবিরের আব্বু মাসের বেতনসহ কিছু বাড়তি টাকা হাতে ধরিয়ে দেন আর বলেন, ‘কাল আবিরকে সাথে নিয়ে ঈদের বাজার করে তারপর বাড়িতে যেয়ো। এর মধ্যে তোমার বেতন আর ঈদের পোশাক কেনার জন্য সামান্য কিছু টাকা দিয়েছি।’ আবির বিনা বাক্যব্যয়ে টাকাগুলো পকেটে ভরলেও সামনে বসা সায়েমের দিকে দৃষ্টি চলে যায়। সেইসাথে মনে বেদনার একখণ্ড বাদল জমা হয়। তার ভাবনায় উঁকি দেয়, আবির নতুন পোশাক পরবে, তারও ব্যবস্থা হলো কিন্তু সায়েমের কী হবে? ওর আব্বু কি পারবে নতুন পোশাক কিনে দিতে? এমন হাজারো চিন্তা নিয়ে সাদিক বাসায় ফেরে। রাতে ঘুমাতে গেলেও সায়েমের কথা মনে হতে থাকে।
সায়েমদের অবস্থা একসময় এমন ছিলো না। গ্রামে তাদের কৃষি জমি, বাড়িঘর ছিল। ভালোভাবে চলার মত একটা অবস্থা ছিল। নদী ভাঙনের ফলে তাদের বাড়িঘর, ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। সেই থেকে তারা নিঃস্ব হয়ে শহরে পাড়ি জামায়।
পরদিন সকালে আবিরকে সাথে নিয়ে সাদিক বাজারে যায়। আবিরের পছন্দমত দামি পোশাক কিনে দেয়। এ জন্য তার আব্বু পরিমাণ মতই টাকা দিয়েছে। দোকানদারকে আবিরের মাপে অপেক্ষাকৃত কম দামের আরেক সেট পোশাক দেখাতে বলে। পছন্দ হলে কিনে নেয় সাদিক। আবির প্রশ্ন করে, ‘স্যার, এটি কার জন্য নিলেন?’ ‘বাসায় গিয়ে জানতে পারবে।’ জবাব দেয় সাদিক। আবির সাতপাঁচ ভাবতে থাকে। স্যার নিজের জন্য না কিনে কার জন্য কিনলেন ইত্যাদি প্রশ্ন তার কচিমনে জমা হয়।
বাসায় ফিরে সায়েমের হাতে পোশাক তুলে দেয় সাদিক। সবাই অবাক হয়ে যায়। নিজের পোশাক না কিনে সেই টাকা দিয়ে সায়েমের জন্য পোশাক কিনেছে সাদিক। আবিরের আব্বু আম্মু সাদিকের মহানুভবতা দেখে মুগ্ধ এবং লজ্জিত হয়। আবিরের সাথে একত্রে পড়ে, খেলে সায়েম। আবির নতুন পোশাক পরবে অথচ সায়েম পারবে না। কত কষ্ট হবে ছেলেটির; বিষয়টি তারা কেন চিন্তা করেনি? আত্মজিজ্ঞাসায় জর্জরিত হতে থাকেন তারা। এদিকে সায়েম নতুন পোশাক পেয়ে মহাখুশি। দুই বন্ধুর মাঝে যেন আজই ঈদ নেমে এসেছে। তাদের খুশি দেখে সাদিকের মনে আনন্দের ঢেউ খেলে যায়।
‘সাদিক, দেখ বাবা তোমার মত করে আমরা ভাবতে পারিনি। তুমি আমাদের বিবেকের দুয়ার খুলে দিয়েছ। আমরা বড্ড লজ্জিত। এই টাকাগুলো রাখো। বাড়ি যাওয়ার আগে তোমার আর তোমার আম্মুর জন্য নতুন পোশাক কিনে নিয়ো। আবিরের আব্বু বলেন।
না না আঙ্কেল, তার দরকার নেই। সাদিক বলে ওঠে। কিন্তু তার কোন কথাই কাজে আসে না। বাধ্য হয় নিতে। পরদিন সাদিক তার মায়ের জন্য আর নিজের জন্য নতুন পোশাক নিয়ে আনন্দচিত্তে বাড়ি ফেরে।

SHARE

Leave a Reply