Home প্রচ্ছদ রচনা ফলবাহারি মধুমাস -রবিউল ইসলাম

ফলবাহারি মধুমাস -রবিউল ইসলাম

বন্ধুরা, কেমন আছো তোমরা? অনেকের তো স্কুল ছুটি হয়ে গেছে। নিশ্চয়ই মামা বা অন্য আত্মীয়দের বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছ। অনেক মজা করছ। আর গ্রীষ্মের পাকা ফল খেয়ে মুখ রাঙাচ্ছ। কিন্তু মনে রেখো প্রকৃতির এসব মজার মজার ফল কিন্তু মহান আল্লাহর দান। তাই আল্লাহর দেয়া রিজিক খেয়ে অবশ্যই তার শোকর আদায় করতে হবে।
এবার এসো তোমাদের মধুমাসের কথা বলি। মধুমাস নিয়ে বলতে গেলেই তো আগে চলে আসে ফলের কথা। তাহলে না হয় সেসব ফলের কথাই বলি আজকে। জ্যৈষ্ঠ মাস। সুস্বাদু ফলের অধিক সরবরাহ থাকায় সবার কাছে মাসটি মধুমাস নামেই পরিচিত। বছরজুড়ে কমবেশি ফল পাওয়া গেলেও সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় এ জ্যৈষ্ঠ মাসে। রঙবাহারি বিভিন্ন ফলের মৌ মৌ গন্ধে ভরিয়ে তোলে চারপাশ। ষড়ঋতুর এ দেশে রোদে তেতে ওঠা জ্যৈষ্ঠে তৃষ্ণার্ত মানুষ পিপাসা মেটায় বিভিন্ন প্রজাতির রসালো ফল দিয়ে।
বাংলাদেশের বৈচিত্র্যময় পরিবেশ ব্যবস্থা ও গাছপালার কারণে মধুমাসে বিভিন্ন প্রজাতির ফল পাওয়া যায়। গাছে গাছে সবুজ পাতার ফাঁকে দোল খায় কাঁচা-পাকা আম। দাবদাহের তৃষ্ণার্ত প্রাণকে শীতলতার পরশ বুলিয়ে দেয় গ্রীষ্মের ফুটি, বাঙ্গি, তরমুজ। পাওয়া যায় জাতীয় ফল কাঁঠাল। এ ছাড়া লিচু, কালো জাম, ক্ষুদিজামে বাজার এখন সরগরম। বাজারে আরও পাওয়া যায় রসে ভরা আনারস, আমলকী, আতা, করমচা, জামরুল, বেল, গাব ইত্যাদি ফল। পাকা তাল না পাওয়া গেলেও বাজার ভরে যায় কাঁচা তালে। অনেকেরই প্রিয় খাবারের তালিকাতে রয়েছে কাঁচা তালের শাঁস। বিভিন্ন প্রজাতির এসব ফলের স্বাদে রয়েছে ভিন্নতা। কোনোটা টক, কোনোটা মিষ্টি, কোনোটা নোনতা আবার কোনোটা পানসে।
বাংলাদেশে চাষকৃত ফলের ৯০ ভাগই আম, কাঁঠাল ও নারকেল। আমের কথাই ধরা যাক। প্রায় ৬ হাজার বছর ধরে আমের চাষ শুরু হলেও বাণিজ্যিকভাবে শুরু হয় আঠারো শতকের দিকে। বর্তমানে সুস্বাদু ও পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ আমের প্রায় ৩ হাজার বুনো ও চাষকৃত প্রজাতি। আম বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ফল হওয়ায় আমকে বলা হয় ফলের রাজা। রাজশাহী অঞ্চল আম উৎপাদনে অন্য জেলাগুলোর চেয়ে অনেক এগিয়ে। গুণগত মানের কারণেও আমের রয়েছে বিভিন্ন নাম, যেমন- মোহনভোগ, ল্যাংড়া, ক্ষীরসাপাত, রসগোল্লা, রাজভোগ, মিশ্রিদানা, কালোপাহাড়, হাজারি, গুটুলে, বুলবুলি, রসখাজা, মনোহরা, বিশ্বনাথ, গৌরজিত, হাঁড়িভাঙা, কুয়াপাহাড়ি, সাটিয়ারপরা, সিঁদুরে, বউভুলানি ইত্যাদি। এসব আম ছাড়াও নতুন উদ্ভাবিত আম্রুপালি, মল্লিকা, সিন্ধু, রত্না, পুপিতো, মহানন্দা, আলফানসো, চৌষা ইত্যাদি আম মধুমাসে দেশের সব জায়গাতে পাওয়া যায়।
এবার বলবো রসে ভরা জামের কথা। থোকায় থোকায় গাছের শাখায় কী সুন্দর দোল খায় কালো জাম। দেখে মন ভরে যায়। খেয়েও মন ভরে। আমাদের দেশে দুই জাতের জাম পাওয়া যায়। ক্ষুদিজাম ও মহিষে জাম।
বাংলাদেশের জাতীয় ফল হিসেবে পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ কাঁঠাল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফল। বাংলাদেশ ও তার আশপাশের দেশ যেমন- আসাম, পশ্চিমবঙ্গ, দক্ষিণ ভারত, বিহার, মিয়ানমার, মালয়, শ্রীলংকা প্রভৃতি দেশ ছাড়া বিশ্বের আর কোনো দেশে কাঁঠালের ব্যাপক চাষ দেখা যায় না। কাঁঠালের গালা ও খাজা এ দু’টি জাত ছাড়াও মাঝামাঝি বৈশিষ্ট্যের রয়েছে ‘রসখাজা’।
মধুমাসের ফলগুলোর মধ্যে অন্যতম স্থান দখল করে আছে লিচু। ফলটি গন্ধ ও স্বাদের জন্য সবার কাছে খুবই জনপ্রিয়। বাংলাদেশে বৃহত্তর রাজশাহী, দিনাজপুর, কুষ্টিয়া, যশোর, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রাম জেলায় সবচেয়ে বেশি লিচু উৎপাদন হয়। দেশের পুরনো উচ্চফলনশীল লিচু হলো বোম্বাই। এ ছাড়া রাজশাহী, মাদ্রাজি, মঙ্গলবাড়িয়া, কদমী, কালীপুরী, মুজাফফরপুরী, বেদানা এবং চায়না-৩ উল্লেখযোগ্য। তবে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট বারি লিচু-১, ২ ও ৩ নামে তিনটি লিচুর জাত অবমুক্ত করেছে।
মধুমাসের ছোট ও মাঝারি আকারের পেয়ারা সবার কাছেই বেশ জনপ্রিয়। পেয়ারা সাধারণত সবুজ রঙের হলেও অন্য রঙের পেয়ারাও দেখা যায়। বর্তমানে দেশী-বিদেশী বিভিন্ন প্রজাতির পেয়ারা চাষ হচ্ছে আমাদের দেশে। প্রাচ্যের আপেল বলে খ্যাত পুষ্টিগুণসমৃদ্ধ পেয়ারা মধুমাসের শেষের দিকে বাজার দখল করে রাখে।
সাদা, লালচে সাদা দেশী জাতের জামরুল জ্যৈষ্ঠের তৃষ্ণা মেটায়। গাঢ় সবুজ পাতার ফাঁক দিয়ে বাতাসে দোল খাওয়া থোকায় থোকায় জামরুল দেখলেই মনটা ভরে যায়। দেশী জাতের জামরুল কিছুটা পানসে হলেও বিদেশী উন্নত জাতের জামরুল বেশ সুস্বাদু। আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির কল্যাণে বর্তমানে আমাদের দেশে প্রচুর পরিমাণে বিদেশী জাতের জামরুলের চাষ হচ্ছে।
বাঙালির চিরায়ত রীতি অনুযায়ী জ্যৈষ্ঠ মাসেই মেয়ে-জামাই, নাতি-নাতনিকে ফল দিয়ে আদর-আপ্যায়নের ব্যবস্থা করে থাকেন গ্রামে বাস করা বাবা-মায়েরা। লেখাপড়া, চাকরি কিংবা ব্যবসার কারণে যারা শহরে থাকেন; তারাও গ্রামে ফেরেন মধুমাসের মধুর রসে মুখকে রাঙিয়ে তুলতে। আবার অনেক সময় দেখা যায় মেয়ে-জামাই, নাতি-নাতনি না আসতে পারলেও তাদের জন্য ফল পাঠিয়ে দেয়া হয়।
অনেক ফলের কথায় তো বললাম। এবার তোমাদের কিছু টিপস দেবো। যেগুলো এই সময়ে জেনে রাখা খুব জরুরি। ফল শুধু খেলেই হবে না, সেগুলো তো নিরাপদ হতে হবে। সে জন্য ফল ও সবজিকে ব্যাকটেরিয়ামুক্ত করতে এবং এতে ব্যবহৃত পেস্টিসাইড দূর করতে কিছু টিপস জেনে নাও-

সংরক্ষণ
ফল ও সবজি ফ্রিজে বা ঝুড়িতে সংরক্ষণ করার আগে ধোয়া যাবে না। এতে এসব খাবার দ্রুত পচে ও ব্যাকটেরিয়া দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। শুধুমাত্র ব্যবহারের আগে ধুয়ে নিতে হবে।

বহিরাবরণ ফেলে দিতে হবে
বাঁধাকপি, সেলারি, লেটুস, গাজর, নাশপাতি, আপেল ইত্যাদি ফল ও সবজির বাইরের আবরণ ও খোসা ফেলে দেবে। কারণ, বাইরের স্তরেই বেশি ব্যাকটেরিয়া থাকে।

ভিনেগার
ফল ধোয়ার সময় পানিতে ভিনেগার ব্যবহার করতে পার। ভিনেগার মেশানো পানিতে সাত থেকে আট মিনিট ফল ভিজিয়ে রেখে দাও। ভিনেগার ৯৫ শতাংশ ভাইরাস ও ৯০ শতাংশ ব্যাকটেরিয়া মেরে ফেলে। বিশেষ করে আপেল খাওয়ার আগে এভাবে ধুয়ে নিবে। ফলমূলে চকচকে ভাব আনতে অনেক সময় ওয়াক্স লাগানো হয়। ভিনেগার ব্যবহারের ফলে ওয়াক্স গলে যায়। একই উপায়ে লবণও ব্যবহার করতে পার।

ব্রাশিং
আলু, আপেল, গাজর, শসা ধোয়ার সময় নরম ব্রাশ ব্যবহার করুন। এতে খাবারের গায়ে লাগানো ওয়াক্স ও ক্ষতিকারক ব্যাকটেরিয়া দূর হবে।

টিপস
আঙুর ধোয়ার সময় পানি ও ভিনেগার ১:১/২ অনুপাতে নিতে হবে। এক চা-চামচ বেকিং সোডা ও দুই চা চামচ লেবুর রস ব্যবহার করবে। এতে ভাইরাস মরে যায়।
অথবা এই উপকরণগুলো একসঙ্গে মিশিয়ে স্প্রে বোতলে রেখে দিও। ফল বা সবজি ধোয়ার সময় স্প্রে করে ব্রাশ করে নিলেই হবে।

অনেক কথা বলা হলো। এবার একটা গুরুত্বপূর্ণ কথা বলি। মধুমাসের মধু ফল একা খাবে না। যাদের ফল কেনার সামর্থ্য নেই, তাদেরকেও ফল খেতে দিও। তাহলে তাদের মুখেও হাসি ফুটবে। আর কারো মুখে হাসি ফোটাতে পারলে তবেই তো মানুষ হিসেবে আমাদের জীবন সার্থক।

SHARE

Leave a Reply