Home সম্পূর্ণ কিশোর উপন্যাস মিতুলির স্মৃতিকথা -দেলোয়ার হোসেন

মিতুলির স্মৃতিকথা -দেলোয়ার হোসেন

[গত সংখ্যার পর]

এইসব পিছে ফেলা স্মৃতিগুলো মনের অজান্তেই ভেসে উঠছে মনের কোণে। মনটা নিসার হয়ে ঘুমে ডুবেছিলো মিতু। বিকেলে ঘুম থেকে উঠে চটজলদি তৈরি হয়ে মাকে বললো, মা, আমি হাসপাতালে যাচ্ছি। মা অবাক চোখে তাকিয়ে থেকে বললো, এক্ষুনি যাচ্ছি মানে? তুই তো সন্ধ্যার দিকে যাস।
মায়ের কথায় সহসা উত্তর না দিয়ে চুপ করে গেলো মিতু। মা মেয়ের মনের দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখে বললো, কাজ থাকলে অবশ্যই যেতে হয়। বলছিলাম আগে বললে সকাল সকাল রান্না করতাম, খেয়ে যেতে পারতি। একবার কাজে আটকে গেলে খেয়ে যাওয়ার সময় পাবি?
মা একজন পরিচিত রোগী এসেছে। আজই অপারেশন হয়েছে। খবর পেয়েছি অপারেশন ভালো হয়েছে। তাকে দেখতে যাবো।
– কে সে? আমাদের গ্রামের কেউ?
– হ্যাঁ, গ্রামের লোকই।
– নাম কী?
– একাব্বর চাচা! সে আমার আন্ডারেই ভর্তি আছে।
– একাব্বর চাচা! সে কি তোকে চিনেছে?
– আমি এখনো তার সামনে যাইনি। তবে খালেক চাচা আর একাব্বর চাচার ছোট ছেলে আমাকে দেখেছে। চিনেছে, ওদের সাথে কথাও বলেছি।
মিতুর মা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো, যে তোকে পড়তে না দেয়ার জন্য এতো অত্যাচার করেছে, টিনের চালে ঢিল ফেলেছে, সেই আজ এসেছে তোর হাতে চিকিৎসা নেয়ার জন্য। আল্লাহর বিচার দুনিয়ার বাইর। তাহলে আর দেরি করিস না। ভালো ঔষধপত্র দিয়ে ভালো করে দে। এই লোকটার জন্য তোর বাবার মনে একটুও শান্তি ছিলো না। তিনি তো অশান্তি পছন্দ করতেন না। বেশি চিন্তা ছিলো তোকে নিয়ে। আমাকে প্রায়ই বলতেন মিতুর মা, আমার মিতুকে দশজনের একজন করে যেতে পারলে মরণেও আমার শান্তি। খুব ভোরে দেখতাম নামাজে বসে কেবল তোর জন্যই দোয়া করতেন। শত্রুর অমঙ্গলও সে চাইতেন না।
মিতু চুপ করে চেয়ারে বসে আছে। সে একটি কথাও বলছে না। মা এগিয়ে এসে দেখে মেয়ের দুচোখ বেয়ে ঝর ঝর করে অশ্রু ঝরছে।
– তুই কাঁদছিস কেনো? আল্লাহ যা করেন তা মানুষের ভালোর জন্যই করেন। মন খারাপ করিসনে, তুই যা। একাব্বর জোয়ারদার বেঁচে থাক আর দেখে যাক আল্লাহ না চাইলে কেউ কারো কোনোই ক্ষতি করতে পারে না।
নাকে ম্যাস্ক বেঁধে ডাক্তার মিতু গেলো ৩ নং ওয়ার্ডে ১০ নং সিটের পাশে। চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে একাব্বর জোয়ারদার। স্যালাইন চলছে। অনেক বুড়িয়ে গেছে জোয়ারদার। শরীরও আর আগের মতো নেই। বেডের পাশে ঝুলানো রিপোর্ট দেখলো মিতু। একটু পরই চোখ মেললো জোয়ারদার। ডাক্তারের সাথে রোগীর কোনো কথা হলো না। তবু রোগীর পাল্স দেখলো মিতু। ওপাশের ৩ নং বেডের রোগীর লোক এসে বললো, ডাক্তার আপা আমার ছেলের হাতের ব্যান্ডেজটা কবে খুলবেন?
– এখন কি আগের মতো ব্যথা আছে?
– না। কিন্তু নড়াচড়া করলে বেশ ব্যথা লাগে।
– বেশি নড়াচড়া করা যাবে না। ক’টা দিন বেশ সাবধানেই থাকতে হবে। আর ঔষধগুলো সময় মতো খাইয়ে দিবেন। কোনো অসুবিধা মনে করলে যে সিস্টার ডিউটিতে থাকে তাকে বলবেন। ভয় পাওয়ার কিছু নেই।
ডাক্তার মিতু ফিরে এলো তার রুমে। ডাক্তার সেলিমও তখন ওয়ার্ড ঘুরে ফিরে এসে বসতে বসতে মিতুকে বললেন, এখনি এলেন যে! ওয়ার্ডে গিয়েছিলেন?
– হ্যাঁ, দেখে এলাম। তবে কথা হয়নি।
– আপনি কি কোয়ার্টারে ফিরে যাবেন-না কি ডিউটিতে থেকে যাবেন।
– যাবো, তবে একটু পর।
তখনই খালেক জোয়ারদার রুমের সামনে এসে দাঁড়ালো। মিতুর চোখে চোখ পড়তেই মিতু বললো, আসুন। অন্য ডাক্তারের সামনে সহজ করে কথা বলতে বাধা ছিলো খালেক জোয়ারদারকে। মিতু বললো, আমি চাচাকে দেখে এসেছি। একটুপর চলে যাবো। তবে রাত নয়টার দিকে ডিউটিতে আসবো। তখন কথা হবে।
ডাক্তারি পড়ার সময় সহপাঠী শানেয়াজের সাথে মিতুর আলাপ পরিচয়। শানেয়াজ মেডিক্যাল কলেজের সেবা ছাত্র। ভদ্র এবং মার্জিত তার ব্যবহার। বড়লোক বনেদি পরিবারের ছেলে সে। সুন্দর মুখখানা ভরা কালো রেশমের মতো দাড়ি। নিয়মিত নামাজ পড়ে শানেয়াজ। ছেলেটির ব্যবহার আচার আচরণ মিতুর ভালো লাগে। ভালো রেজাল্ট করার জন্য সহপাঠীদের সাথে নোট নিয়ে আলোচনা করতে হয়। যে কারণে শানেয়াজের সাথে মিতুর ঘনিষ্ঠতা। শানেয়াজও মিতুর কথাবার্তা চালচলনে মুগ্ধ। হিজাব পরিহিতা মিতুর মধ্যে নেই দৃষ্টিকটু আচরণ। তার ওপর সেও ভালো ছাত্রী।
খুব পরিচ্ছন্ন মন নিয়েই শানেয়াজ মিতুর সাথে শিক্ষার আলাপে জড়ায়। যেমন, ভালোর সঙ্গে ভালো মিশলে সেখানে লাজ ভয়ের বালাই থাকে না। ওদের সরল মনের স্নিগ্ধতায় ওরা উজ্জ্বল। যা অন্যের মনে জ্বালা ধরায় না বরং সবার মনের মধ্যে প্রভাতের কোমল সূর্যের আলোর মতো শান্তির সুর ছড়ায় ওদের দেখে।
তখন দু’জনই শেষ বর্ষের পরীক্ষার্থী। সূর্যটা ঢলে পড়েছে মাথার ওপর থেকে। ঝির ঝির পাতা ঝরা, মন ব্যাকুল করা শব্দের মধ্যে কোকিলের কুহুতান। ক্লাস শেষে হলরুমে শানেয়াজ ও মিতু পরীক্ষার প্রস্তুতি পর্বের নোটের ওপর আলোচনা আর রদবদল নিয়ে ব্যস্ত। একজন ভদ্র মহিলা ও একজন ভদ্র লোক ছাত্রদের কাছে শানেয়াজের কথা জানতে চাইলে ওরা বলে দিল সে কোথায় আছে। তারপর তারা খুঁজতে খুঁজতে চলে গেলো দোতলায়। দরজায় দাঁড়িয়ে দেখলেন শানেয়াজ আর মিতুকে। শুধু দেখলেন না গভীর দৃষ্টি মেলে দেখতে লাগলেন। একসময় তাদের ক্লান্ত মুখে প্রশান্তির ঢেউ খেলে গেলো।
হঠাৎ মিতুর চোখ চলে গেলো দরজার দিকে। মিতু উঠে দাঁড়ালো। মিষ্টি হেসে সালাম দিয়ে বললো, আপনারা কাউকে খুঁজছেন? ভদ্র মহিলা হৃদয় খুলে তৃপ্তির হাসি হেসে বললেন, হ্যাঁ। তবে একজনকে খুঁজতে এসে দু’জনকে পেয়ে গেলাম। এর মধ্যে শানেয়াজও উঠে তাকিয়েছে।
– আব্বা-আম্মা, আপনারা হঠাৎ! কিন্তু আমাকে তো কিছুই জানান নাই।
বাবা বললেন, বলে এলে তো আমার ছেলের অকৃত্রিম এই ছবিটা দেখতেও পেতাম না আর লুকিয়ে ছবিও তুলতে পারতাম না। শানেয়াজ হাসতে হাসতে বললো, আপনাদের খুশিই আমার খুশি। তারপর মিতুর দিকে তাকিয়ে বললো, মিতু-আমার আব্বা-আম্মা। মিতু এগিয়ে এলো। দু’জনের পায়ে হাত দিয়ে কদমবুসি করলো। শানেয়াজের বাবা-মিতুর মাথায় হাত রেখে বললো, মা- আল্লাহ তোমাদের মঙ্গল করুন।
তখন মিতুর দুচোখে অশ্রু টলমল।
হঠাৎ আমার কেনো এমন হলো! উনারা কি ভাববেন। এ কথা ভেবেই মিতু নিজেকে আড়াল করলো ঠিকই কিন্তু সে অশ্রু ভদ্র মহিলাকে কৌতূহলী করে তুললো। তিনি বললেন,
– এই মেয়ে এদিকে আসোতো।
– চোখে পানি কেন?
মিতু চুপ করে গেলো। লজ্জায় যেনো ওর মাথা কাটা যাচ্ছে, ভদ্র মহিলা মিতুর মুখটা তুলে ধরে বললেন, বললে না চোখে পানি কেনো?
– হঠাৎ বাবার কথা মনে পড়ে গেলো। এতো দিন কেউ আমাকে মা বলে ডাকেনি। বাবা সব সময় আমাকে মা বলে ডাকতেন।
– ঠিক আছে আর কাঁদতে হবে না।
– তোমার নাম কী?
– মিতু।
বেশতো আমরাও তোমাকে মা বলে ডাকবো।
শানেয়াজ বললো, আম্মা-মিতু খুব ভালো ছাত্রী আর অন্যদের মতো নয়। তাই পড়ালেখা নিয়ে ওর সাথে শেয়ার করি। ওর মা ছাড়া আপন বলতে আর কেউ নেই। আমরা খুব ভালো বন্ধু।
মা-বাবাকে হোস্টেল রুমে নিয়ে যায় শানেয়াজ। বাবা বললেন, তোমার পরীক্ষার আর কত দেরি?
– দু’মাস।
– এই দু’মাস খুব মন দিয়ে পড়ো। যেনো পরীক্ষার হলে সব প্রশ্নের উত্তরই তোমার জানার মধ্যে থাকে। শানেয়াজ হাসতে হাসতে বললো, আমার পরীক্ষা নিয়ে আপনারা চিন্তা করবেন না। জানা বিষয়গুলো নিয়ে এখন ভাবনা যে, কিভাবে সেগুলো আরো ভালো করে পরীক্ষার খাতায় লিখতে পারি।
ওই দিন উত্তরা আত্মীয়ের বাসায় যাওয়ার পূর্বে মা বললেন, মেয়েটিকে কিছু না বলে চলে যাওয়াটা কেমন অশোভন হবে না! শানেয়াজ, ওকে একবার ডাকো তো।
– কিচ্ছু হবে না আম্মা। ও কিছু মনে করবে না। মনে করার কিইবা থাকতে পারে।
– একবার দেখ না। ওর তেমন কেউ নেই বলে, কেউ একটু চোখের দেখাও দেখতে আসে না হয়তো। মনটা ছোট হয়ে থাকে।
শানেয়াজ ফোন করলো। মিতু বললো, উনারা চলে যাচ্ছেন কেন! আমি রাতের খাবারের আয়োজন করছি। রাতে আমার এখানে খাবে। আমি আসছি।
মা বললেন, কি বললো?
– বললো, সে তোমাদের রাতে খাওয়ার জন্য আয়োজনে ব্যস্ত। তবে ও আসছে।
মিতু এলো। মা বললেন, তুমি নাকি আমাদের খাবারের জন্য আয়োজন করছো, কিন্তু আজ থাকতে পারছি না। পরীক্ষার পর আবার আসবো। তোমরা ভালো পরীক্ষা দাও-দোয়া করি।
দেখতে দেখতে দু’মাস কেটে গেলো, পরীক্ষা হলো-তারপর রেজাল্ট হলো। দু’জনই স্ট্যান্ড করেছে। সরকারি খরচে বাইরের দেশে ডিগ্রি আনতে যেতে পারবে। শানেয়াজ অ্যাপ্লিকেশন করলো বিদেশে পড়ালেখা করার জন্য। আর মিতুর চাকরি হয়ে গেলো মাগুরা হসপিটালে।
মাগুরা বাসা নেয়ার পর মিতু ওর মাকে নিয়ে এসেছিল নিজের কাছে। হঠাৎ একদিন খোঁজ-খবর নিয়ে হসপিটালে এসে উপস্থিত হলো-শানেয়াজের বাবা-মা। মিতু তো তাদের দেখে অবাক। কি ব্যাপার! আমি যে এখানে আছি এ খবর নিশ্চয়ই শানেয়াজ দিয়েছে।
– ঠিক ধরেছো। আমি আবার কথা দিয়ে কথার বরখেলাফ করতে পারি না। তাইতো চলে এলাম।
– কী কথা খালাম্মা? আমার তো কিছু মনে পড়ছে না।
– ঐ যে বলেছিলাম অন্য একদিন এসে তোমার হাতের রান্না খেয়ে যাবো। তাই চলে এলাম।
– বেশ করেছেন। চলুন, ছোট একটা বাসা নিয়েছি। এখনো কোয়ার্টার পাইনি। একটু অপেক্ষা করুন। আমি এক্ষুনি আসছি।
মিতু এদিকে এসে ওর মা কে ফোনে সব কথা বললো। ভালো কিছু রান্নার ব্যবস্থাও করতে বললো।
দোতলায় দু’রুমের বাসা, সঙ্গে ডাইনিং ড্রইং। দরজায় হাতল ঘুরাতেই খুলে গেলো দরজা। মেহমানদ্বয় ভেতরে ঢুকেই ঝাল মশলার একটা লোভনীয় গন্ধ পেলেন।
– শানেয়াজের বাবা বললেন, ছোট মাছ চড়চড়ির গন্ধ পাচ্ছি, রান্নার লোক আছে বুঝি?
– না, আমার মা। মিতু হাসতে হাসতে বললো।
শানেয়াজের মা বললেন, কাজের অনেকটাতো তুমি এগিয়েই রেখেছো। কবে এসেছেন উনি। মিতু বললো, বাসা পাওয়ার পরেই আমার এক মামা মা কে রেখে গেছেন।
শানেয়াজের মা-তখনই সোফা থেকে উঠে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়ালেন। আপনি বসুন না, কিন্তু মিতুর সে কথায় কান না দিয়ে তিনি চলে গেলেন রান্নাঘরে। সালাম বাদ বললেন-আমি মিতু মা’র ক্লাস ফ্রেন্ড শানেয়াজের মা।
– আপনাদের স্নেহের কথা ও আমাকে বলেছে। আপনারা মুখ হাত ধুয়ে বসুন-আমি এক্ষুনি আসছি।
ওই দিন রাতেই মিতুর বিবাহের কথা পাকাপাকি করে ফেললেন-শানেয়াজের বাবা-মা। সেও অনেক কথা কাটিকাটির পর। মিতু বলেছিলো-খালাম্মা আমাদের বন্ধুত্ব ছিলো পড়ালেখা নিয়ে-এসব কথা আমরা কেউ কখনো ভাবিনি।
শানেয়াজের মা বললেন, খুব ভালো করেছো। আমরা মুরব্বিরা থাকতে সে কথা তোমরা ভাবতে যাবে কেনো। এ বিষয়টা ভাববো আমরা।
মিতুর মাও বললেন, দেখুন আমরা খুব গরিব। এই মেয়েটি ছাড়া আমার আর কিছু নেই। ওর নিজের ইচ্ছাশক্তি কাজে লাগিয়েই ও আজ এ পর্যন্ত এসেছে। পিছনে ছিলো-আমাদের উৎসাহ এবং দোয়া। ভদ্র মহিলাও বললেন, আপনার কী আছে না আছে সে সব নিয়ে আমাদের ভাবনা নেই। আমরা মেয়েটিকে চাই। প্রথম যেদিন মেডিক্যাল কলেজে ওকে দেখেছিলাম, কথা বলেছিলাম সেদিনই আমি মনে মনে ঠিক করে রেখেছি-এই মেয়েটিকেই আমি শানেয়াজের বৌ করবো। আমার ছেলেটা স্কলারশিপ নিয়ে বিদেশ যাচ্ছে। আমি চাই তার আগেই ওর বিয়ে দিতে। তা না হলে কখন কী হয় সে কথা কি আর বলা যায়!
শেষ পর্যন্ত শানেয়াজের বাবা ছেলেকে ফোনে বললেন, তুমি আগামী কালই মাগুরা চলে আসো। আমরা মাগুরা মিতুর বাসায় আছি।
তারপর বিয়ের দু’মাস পর শানেয়াজ চলে যায় লন্ডন। প্রতিদিন ওদের কথা হয় ফোনে। মিতুর মা সেই থেকে মেয়ের কাছেই আছে।
সে যাই হোক, মিতু যখনই ওয়ার্ডে যায় তখনই মুখে ম্যাস্ক পরে নেয়। এই ম্যাস্ক পূর্বে কখনো সে পরেনি। এখন পরছে শুধুই একাব্বর জোয়ারদারের কারণে। সে যেনো কোনো ভাবেই বুঝতে বা চিন্তে না পারে-আমি সেই মিতু। এ নিয়ে একদিন সহকর্মীদের প্রশ্নের সম্মুখীন হলো সে। মিতু তাদের বুঝিয়েও বললো কারণটা।
আন্তরিক সেবায় আর নিয়মিত ঔষধ সেবনের জন্য বেশ সুস্থ হয়ে উঠলো একাব্বর জোয়ারদার। তাকে চলে যেতে হবে। কিন্তু সে আরো দু’একদিন হাসপাতালেই থাকতে চায়। শেষে মিতুকে সরাসরি একাব্বর বললো, ডাক্তার, বাড়িতে গেলে সব তালগোল পাকায়ে যাবে। তাড়াতাড়ি সুস্থ হতে পারবো না। আমি আরো কয়েকদিন এখানে থাকতে চাই।
– হাসপাতালের একটা নিয়ম আছে। দু’দিন পর আপনাকে চলে যেতেই হবে।
– আমি আরও দু’দিন থাকতে চাই। আপনি একটু ব্যবস্থা করে দেন।
ডাক্তার মিতু আরো দু’দিন থাকার ব্যবস্থা করে দিলো। দেখতে দেখতে দু’দিন কেটে গেলো। একাব্বর জোয়ারদারের যাবার সময় এলো। জিনিসপত্র গোছগাছ চলছে। মিতু রাউন্ডে গেলে একাব্বর জোয়ারদার বললো, মা, তুমি খুব ভালো ডাক্তার। আমি আবার আসবো। তোমার জন্য কী নিয়ে আসবো?
– কিছু লাগবে না। আমার কর্তব্য আমি করেছি। আপনি ভালো থাকলেই আমার ভালো লাগবে।
– আচ্ছা মা, তোমাকে তুমি বলছি বলে কিছু মনে করো না। আমি তো বুড়ো মানুষ। তবে মা তোমার মুখটা দেখতে বড় ইচ্ছে করছে। তুমি মুখের কাপড়টা খুলে ফেলো।
একাব্বর জোয়ারদার জানতো না যে, ডাক্তার মিতুলির সুচিকিৎসায় এবারের মতো সে মরণের হাত থেকে ছুটে আসতে পেরেছে। পেটের পিড়ায় ভুগছিলো দীর্ঘদিন। স্বভাবে গোঁয়াড়-হেলাফেলা করে কোনো ভালো ডাক্তারের কাছে যায়নি। বাজারের ফার্মেসি থেকে এ বড়ি সে বড়ি খেয়ে সাময়িক আরামবোধ করেছে। আজ সুস্থ হওয়ার পর ডাক্তারের প্রতি কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠেছে তার মন।
পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলো-খালেক জোয়ারদার। তখন সেও বললো, মা, মিয়া ভাই তোমাকে দেখতে চাচ্ছে-তুমি মুখের কাপড়টা খুলে মুখটা দেখাও। তখন বার বার অনুরোধে মিতুর মনটা কেমন ভারী হয়ে উঠলো। চোখ দু’টোও ছলছল করছে। নিজেকে সামলে নিয়ে মিতু ধীরে ধীরে মুখ থেকে ম্যাস্কটা খুলে ফেললো।
মিতুর মুখের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো একাব্বর জোয়ারদার। কেমন যেনো চেনা চেনা মনে হয়, কিন্তু কিছুতেই মিলাতে পারছে না।
হঠাৎ খালেক জোয়ারদার হাসতে হাসতে বললো, মিয়া ভাই চিনতে পারছেন না? এ হলো আমাদের মিতু। সিরাজ ভাই এর মেয়ে। দেখেন আজ সে কতো বড় ডাক্তার হয়েছে। আপনাকে সে অনেক যতœ করে চিকিৎসা করেছে।
পরিচয় পেয়ে একাব্বর জোয়ারদার পাথরের মূর্তির মতো চেয়ে থাকলো-ডাক্তার মিতুর মুখের দিকে। অনেকক্ষণ পর তার দু’চোখ ভরে উঠলো পানিতে। কিছু বলার জন্য ঠোঁট দুটো কাঁপছিলো তার। কিন্তু মিতু দ্রুত ফিরে গেলো তার চেম্বারে।
[সমাপ্ত]

SHARE

Leave a Reply