Home নিবন্ধ মাহে রমজান আমাদের করণীয় -ইকবাল কবীর মোহন

মাহে রমজান আমাদের করণীয় -ইকবাল কবীর মোহন

ঠিক ঘড়ির কাঁটার মতো বছর ঘুরে আসে মাহে রমজান। অনাবিল শান্তি ও মাগফেরাতের বার্তা নিয়ে এভাবেই মুসলমানের জীবনে প্রতি বছর মাহে রমজান ঘুরে ঘুরে আসে। আরবি ‘রমজ’ মূল ধাতু থেকে রমজান শব্দটি এসেছে। এর অর্থ দহন বা পোড়ানো। আগুন যেমনি কোনো জিনিসকে পুড়িয়ে ফেলে, রোজাও তেমনি মানুষের অসৎ কাজকে পুড়িয়ে ছাই করে দেয়। অর্থাৎ রমজানের রোজা মানুষের ভেতর থেকে লোভ-লালসা, পাপ-পঙ্কিলতা ও হিংসা-দ্বেষ দূরীভূত করে তাকে পাক-সাফ হওয়ার সুযোগ এনে দেয়।
আমরা অহরহ যে রোজার কথা বলি এটি কিন্তু ফারসি শব্দ। এর অর্থ উপবাস। আরবিতে রোজাকে বলে ‘সওম’। সওমের বহুবচন সিয়াম। এর অর্থ বিরত থাকা। তাই শরিয়ার পরিভাষায় রোজা বলতে বোঝায় সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহারসহ আল্লাহর নিষিদ্ধ কাজ থেকে বিরত থাকা। রোজা শুধু হজরত মুহাম্মদ (সা)-এর উম্মতের ওপরই ফরজ হয়নি। এর আগে অন্য ধর্মের অনুসারীদের ওপরও রোজা পালন করার বিধান জারি ছিল। পৃথিবীর প্রথম মানুষ ও নবী হজরত আদম (আ) রোজা পালন করতেন। দ্বিতীয় আদম বলে পরিচিত হজরত নূহ (আ)-এর সময় প্রতি মাসে তিনটি রোজা রাখার বিধান চালু ছিল। হজরত দাউদ (আ) তাঁর শিশুপুত্রের অসুস্থতার সময় সাত দিন রোজা পালন করেছেন বলে জানা যায়। হজরত মুসা (আ) ও হজরত ঈসা (আ) ৪০ দিন করে রোজা রেখেছেন। আমাদের প্রিয়নবী হজরত মুহাম্মদ (সা) রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার আগে মহররমের নবম ও দশম তারিখে রোজা রাখতেন।
মহানবী (সা)-এর হিজরতের পর অর্থাৎ হিজরি দ্বিতীয় সালে মাহে রমজানের রোজা অবশ্য পালনীয় বা ফরজ হিসেবে ঘোষিত হয়। আল কুরআনে সূরা আল-বাকারার ১৮৩ নম্বর আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেন, ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে, যেমনিভাবে ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যাতে তোমরা তাকওয়া অর্জন করতে পার।’
তা হলে সহজেই অনুধাবন করা যায়, মাহে রমজানের রোজা পালন কতটা গুরুত্বপূর্ণ। কেউ কোনো কারণ ছাড়া রোজা না রাখলে সে ‘ফাসিক’ বলে গণ্য হবে। আর রোজাকে অস্বীকার করলে সে কাফের (অস্বীকারকারী) হিসেবে বিবেচিত হবে। মাহে রমজানের পুরো মাস তিনটি পর্বে বিভক্ত। প্রথম ১০ দিন রহমত, দ্বিতীয় ১০ দিন মাগফেরাত এবং তৃতীয় ১০ দিন নাজাতের সময়। এই মাস মুসলমানদের জন্য আল্লাহর কাছ থেকে অশেষ রহমত ও করুণা লাভের সুবর্ণ সুযোগ এনে দেয়। অতীতের সব গুনাহ মাফ করে দেয়ার সুযোগ আসে রমজান মাসে। এ কথাই মহানবী (সা) বলেছেন এভাবে, ‘যে ব্যক্তি ঈমান সহকারে ও সওয়াবের আশায় রমজানের রোজা রাখে এবং এমনিভাবে রাতে ইবাদত করে, তার আগের সব গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে।’ ফলে এ সময় একজন রোজাদার রোজা পালনের মাধ্যমে একটি পরিচ্ছন্ন ও নির্মল জীবন গড়ার সুযোগ পায়। এ কথাই আল্লাহর রাসূল (সা) তাঁর এক হাদিসে বলেছেন, ‘মাতৃগর্ভ থেকে শিশু যেমন নিষ্পাপ হয়ে ভূমিষ্ঠ হয়, রমজানের রোজা পালন করলে মানুষ ঠিক তেমনি নিষ্পাপ হয়ে যায়।’
ওপরে বর্ণিত কুরআন ও হাদিসের আলোকে এ কথা স্পষ্ট বোঝা যায়, আমাদের সবাইকে রমজানের রোজা অবশ্য অবশ্যই পালন করতে হবে। ওপরে বর্ণিত কুরআনের আয়াত ও রাসূল (সা)-এর হাদিসে রোজা পালনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে স্পষ্ট বলা হয়েছে। রোজার প্রধান উদ্দেশ্য হলো তাকওয়া বা খোদাভীতি অর্জন করা। অর্থাৎ নিজের মধ্যে আল্লাহর ভয় তৈরি করা। এই ভয় এ জন্য দরকার যে, আল্লাহর ভয় বা তাঁর কাছে জবাবদিহি করার ভীতি মানুষকে সকল প্রকার গুনাহ তথা পাপ ও অন্যায় থেকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে। যারা আল্লাহ তায়ালাকে ও তাঁর শাস্তির ভয় করে, তারা কখনো খারাপ কাজ করতে পারে না। আল্লাহর ভয়ে যারা কম্পিত হয়, তারা যাবতীয় খারাপ কাজ থেকে বেঁচে থাকার প্রয়াস পায়। আর মাহে রমজানের ত্রিশ দিনের রোজা মানুষের মধ্যে পাপাচার থেকে বেঁচে থাকার প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে। কেউ সঠিকভাবে রোজা পালন করলে এবং খারাপ কাজ ত্যাগ করলে সে শিশুর মতো পাকসাফ হওয়ার সুযোগ লাভ করে। এ কথাই মহানবী (সা) বলেছেন এভাবে, ‘মাতৃগর্ভ থেকে শিশু যেমন নিষ্পাপ হয়ে ভূমিষ্ঠ হয়, রমজানের রোজা পালন করলে মানুষ ঠিক তেমনি নিষ্পাপ হয়ে যায়।’
তা ছাড়া রোজা সবার মধ্যে যাবতীয় ভালো কাজের অভ্যাস গড়ে তুলতে ভূমিকা পালন করে। রোজার সময় সারাদিন উপবাস থাকতে হয়। ফলে রোজাদারের মধ্যে অভাবী ও দরিদ্র মানুষের অভাব ও কষ্ট বোঝার ক্ষমতা তৈরি হয়। রোজার দিনে সত্য কথা বলার চেষ্টা করে সবাই। রোজা রেখে কেউ সহজে মিথ্যা কথা বলতে চায় না। কেননা যে মিথ্যাকে ছাড়তে পারলো না, তার রোজা পালন করার কোনো মানে হয় না। তেমনি রোজার দিন কোনো অন্যায় কাজ করতে রোজাদার ভয় পায়। রোজা রেখে কারো ওপর জুলুম করা অনেকের জন্য সহজ হয় না। আর যারা এসব কাজ ত্যাগ করতে পারে না তাদের জন্য রোজা কোনো কল্যাণ বয়ে আনে না। এ ব্যাপারে আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মদ (সা) সুন্দর কথা বলেছেন। এক হাদিসে তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা ও কাজ পরিত্যাগ করে না, তার শুধু শুধু খানাপিনা ছেড়ে রোজা থাকার কোনো মানে হয় না।’
মাহে রমজানের মাস আমাদের কাছে প্রশিক্ষণ ও কল্যাণের মাস। রোজার দিনে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের পরও রাতে ২০ রাকাত তারাবির নামাজ পড়তে হয়। এটা আমাদের জন্য রোজার মাসে বাড়তি ও বরকতময় ইবাদত। এ মাসে দিনে নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতে পড়লে অনেক বেশি সওয়াব পাওয়া যায়। কেননা, রোজার দিনে যেকোনো ভালো কাজের সওয়াব অন্য সময়ের তুলনায় ৭০ থেকে ৭০০ গুণ বেশি বলে ঘোষণা করেছে ইসলাম। তাই সবাই পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সঙ্গে নিয়মিত পড়ার চেষ্টা করবো। এভাবে রোজার এক মাস নিয়মিত জামাতে নামাজ পড়লে এবং ভালো কাজ করলে বছরের বাকি মাসগুলোতে আমরা অনায়াসেই সে নিয়মে নামাজ আদায় করতে পারবো। সব সময় ভালো কাজ করে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ করার সুযোগ পাবো।
মহাগ্রন্থ আল কুরআন আমাদের জীবন পরিচালনার নির্দেশিকা। রাসূল (সা)-এর মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে এ কিতাব আমরা লাভ করেছি। কুরআন নাজিল হয়েছে মাহে রমজানে। আর এ কারণে রোজার গুরুত্ব অনেক বেশি। তেমনি কুরআনের মর্যাদাও সীমাহীন। এ মাসে বেশি বেশি কুরআন পড়লে অফুরন্ত সওয়াব লাভ করা যায়। তাই রোজার দিন আমরা প্রত্যহ বুঝেশুনে কুরআন পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারি। এর মাধ্যমে আমরা জীবনে চলার আসল পথ ও মুক্তির দিশা লাভ করতে পারি। পবিত্র রোজার দিনে আমরা সারাদিন উপবাস থাকি। ইফতারের সময় ভালো ভালো ইফতার করি। শেষ রাতে উঠে সেহরি খাই। আমাদের অনেকেই ভালো সেহরি খেতে চেষ্টা করি। অথচ আমরা একটু খেয়াল করলে দেখবো সমাজের অগণিত গরিব ও অভাবী মানুষ রোজার দিনেও অনেক কষ্ট করে জীবনযাপন করে। তারা ভালো সেহরি কিংবা ইফতার খেতে পায় না। আমরা তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল হতে পারি। অভাব-অনটনে তাদের প্রতি সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে পারি। এতে তারা যেমন খুশি হবেন, তেমনি স্রষ্টাও আমাদের প্রতি সন্তুষ্ট হবেন। রোজার মাসে আমরা ইচ্ছা করলেই বেশি বেশি দান-খয়রাত করার চেষ্টা করতে পারি। এ সময়ের দানকে অন্য সময়ের চেয়ে অনেক বেশি বরকতময় বলা হয়েছে। সবাই মিলে আমরা এ কাজটি করতে পারলে সমাজে অভাবী মানুষের সংখ্যা কমে যাবে। সমাজ থেকে দূর হবে অভাব-অনটন। এভাবে মাসব্যাপী অন্য মানুষের দুঃখ লাঘবের যে চেষ্টা আমরা করবো, তাতে আমাদের মধ্যে ভ্রাতৃত্ববোধ, মমত্ববোধ এবং সহানুভূতির গুণ তৈরি হবে। এ গুণ আমাদের আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে। ফলে সমাজ হয়ে উঠবে সুন্দর ও শান্তিময়।

SHARE

Leave a Reply