Home দেশ-মহাদেশ তুর্কমেনিস্তান মধ্য এশিয়ার সবচেয়ে কম জনসংখ্যার দেশ -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

তুর্কমেনিস্তান মধ্য এশিয়ার সবচেয়ে কম জনসংখ্যার দেশ -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

তুর্কমেনিস্তান মধ্য এশিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিম অংশের একটি সার্বভৌম, প্রজাতান্ত্রিক ও স্থলবেষ্টিত দেশ। তুর্কমেনিস্তান বহু শতাব্দী ধরে একাধিক সভ্যতার সংযোগস্থল হয়ে রয়েছে। মধ্য যুগে মারভ ছিল ইসলামী বিশ্বের অন্যতম বড় নগরী এবং সিল্ক রোডের একটি গুরুত্বপূর্ণ যাত্রাবিরতিস্থল। উল্লেখ্য, মধ্য-পঞ্চদশ শতাব্দী পর্যন্ত সিল্ক রোড ছিল ব্যবসা-বাণিজ্যের কাফেলার পথ। রুশ সাম্রাজ্য ১৮৮১ সালে তুর্কমেনিস্তানকে কুক্ষিগত করে। তুর্কমেনিস্তান পরে মধ্য এশিয়ায় বলশেভিক বিরোধী আন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে। ১৯২৫ সালে তুর্কমেনিস্তান তুর্কমেন সোভিয়েত সোস্যালিস্ট রিপাবলিক (তুর্কমেন এসএসআর) নামে সোভিয়েত ইউনিয়নের একটি সংবিধিবদ্ধ প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে গেলে তুর্কমেনিস্তান স্বাধীন হয়ে যায় এবং ১৯৯২ সালে নতুন সংবিধান কার্যকর করে। এ দেশের উত্তরে কাজাকিস্তান ও উজবেকিস্তান, পূর্বে উজবেকিস্তান ও আফগানিস্তান, দক্ষিণে আফগানিস্তান ও ইরান এবং পশ্চিমে কাস্পিয়ান সাগর। আশগাবাত তুর্কমেনিস্তানের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর।
তুর্কমেনিস্তানের আয়তন ৪ লাখ ৯১ হাজার ২১০ বর্গ কিলোমিটার (১ লাখ ৮৯ হাজার ৬৬০ বর্গ মাইল) এবং জনসংখ্যা ৫৬ লাখ ৬২ হাজার ৫৪৪ জন। মধ্য এশিয়ার প্রজাতন্ত্রগুলোর মধ্যে তুর্কমেনিস্তানের জনসংখ্যা সবচেয়ে কম। তুর্কমেনিস্তানে জাতিগত গ্রুপের মধ্যে রয়েছে তুর্কমেন ৮৫ শতাংশ, উজবেক ৫ শতাংশ, রুশ ৪ শতাংশ এবং অন্যান্য ৬ শতাংশ। প্রধান ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে রয়েছে মুসলিম ৮৯ শতাংশ, খ্রিষ্টান ৯ শতাংশ এবং অন্যান্য ২ শতাংশ।
তুর্কমেনিস্তানের রাজনীতি রাষ্ট্রপতিশাসিত প্রজাতন্ত্র কাঠামোয় পরিচালিত হয়। রাষ্ট্রপতি হলেন একাধারে রাষ্ট্রের প্রধান ও সরকার প্রধান। তুর্কমেনিস্তানে বর্তমানে একদলীয় শাসনব্যবস্থা বিদ্যমান, কিন্তু সম্প্রতি দেশটি বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ২০০৭ সালে গুর্বাংগুলি বের্দিমুহামেদভ রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন, তবে নির্বাচনটি বিদেশী পর্যবেক্ষকেরা ভুয়া আখ্যা দেন। তুর্কমেনিস্তান পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে ১৯৯১ সাল থেকে গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং পানির সেবা বিনামূল্যে প্রদান করা হয়।
তুর্কমেনিস্তানের প্রশাসনিক এলাকা পাঁচটি প্রদেশ (উইলেইয়াতলার) এবং একটি রাজধানী নগরী জেলায় বিভক্ত। সেগুলো হলো আশগাবাত নগরী, আহাল প্রদেশ, বলকান প্রদেশ, দাসোগুজ প্রদেশ, লেবাপ প্রদেশ ও মেরি প্রদেশ। প্রদেশগুলো আবার জেলায় বিভক্ত। এক্ষেত্রে গ্রাম বা নগরী জেলা হতে পারে।
আয়তনের দিক দিয়ে তুর্কমেনিস্তান বিশ্বের ৫২তম বৃহত্তম দেশ। দেশটি স্পেনের চেয়ে সামান্য ছোট এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া অঙ্গরাজ্যের চেয়ে কিছুটা বড়। তুর্কমেনিস্তানের অধিকাংশ এলাকা সমতল বা ঢেউখেলানো বালুকাময় মরুভূমি, যার মধ্যে স্থলে স্থলে বালিয়াড়ি দেখতে পাওয়া যায়। দক্ষিণে ইরানের সাথে সীমান্তে রয়েছে পর্বতমালা। দেশটির ৮০ শতাংশ জুড়ে রয়েছে কারাকুম মরুভূমি। তুর্কমেনিস্তানের মধ্যভাগে তুরান অবনমিত ভূমি ও কারাকুম মরুভূমির প্রাধান্য রয়েছে। দক্ষিণ-পশ্চিম সীমান্ত বরাবর কোপেত ডাগ রেঞ্জের উচ্চতা কুহ-য়ে-রিজ পর্বত পর্যায়ে উচ্চতা প্রায় ২ হাজার ৯শ’ ১২ মিটার। দেশের পশ্চিমে গ্রেট বলকান রেঞ্জ এবং উজবেকিস্তানের সাথে দক্ষিণ-পূর্ব সীমান্তে কৈতেনডাগ রেঞ্জ হলো অপর তাৎপর্যপূর্ণ উচ্চভূমি। গ্রেট বলকান রেঞ্জের উচ্চতা মাউন্ট আরিয়ান পর্যায়ে ১ হাজার ৮৮০ মিটার। তুর্কমেনিস্তানের সর্বোচ্চ শৃঙ্গের উচ্চতা কুগিতাংতাউ রেঞ্জের আইরিবাকায় ৩ হাজার ১৩৭ মিটার। তুর্কমেনিস্তান ও ইরানের মধ্যবর্তী সীমান্তের বেশির ভাগ জুড়ে আছে কোপেত ডাগ পার্বত্য রেঞ্জ। তুর্কমেনিস্তানের নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে আমু দরিয়া, মুরঘাব ও তেজেন। কাস্পিয়ান সাগরের সাথে তুর্কমেনিস্তানের ১ হাজার ৭৪৮ কিলোমিটার লম্বা সৈকত রয়েছে। উল্লেখ্য, কাস্পিয়ান সাগর সম্পূর্ণ ভূমি পরিবেষ্টিত এবং মহাসাগরের সাথে এর কোন সংযোগ নেই, তবে ভলগা-ডন খালের মাধ্যমে কিছু জাহাজ কৃষ্ণ সাগরে আসা-যাওয়া করে।
তুর্কমেনিস্তানে প্রায় গ্রীষ্মমন্ডলীয় আবহাওয়া বিরাজ করে। তুর্কমেনিস্তানের কারাকুম মরুভূমি বিশ্বের সবচেয়ে শুষ্ক মরুভূমিগুলোর মধ্যে অন্যতম। এখানে কিছু কিছু স্থানের গড় বার্ষিক বৃষ্টিপাত মাত্র ১২ মিলিমিটার। মার্চ ও মে মাসের মধ্যবর্তী সময়ে বেশিরভাগ বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। শীতকাল মৃদু ও শুষ্ক। দেশটির একমাত্র কোপেত ডাগ রেঞ্জে সবচেয়ে ভারি বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রাজধানী আশগাবাতে ৪৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস এবং আমু দরিয়া নদীর তীরবর্তী কারকি নগরীতে ৫১.৭ ডিগ্রি পর্যন্ত রেকর্ড করা হয়েছে। গোটা সোভিয়েত ইউনিয়নে এক সময় এটাই ছিলো সর্বোচ্চ তাপমাত্রা।
তুর্কমেন ভাষা এবং রুশ ভাষা তুর্কমেনিস্তানের সরকারি ভাষা। তুর্কমেন ভাষায় এখানকার জনগণের প্রায় ৮০% এবং রুশ ভাষায় প্রায় ৮% কথা বলে। এখানে প্রচলিত অন্যান্য ভাষার মধ্যে আছে বেলুচি ভাষা ও উজবেক ভাষা। তুর্কমেনিস্তান বিশে^র ষষ্ঠ বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস সম্পদ মজুদের অধিকারী। দেশটির বেশিরভাগ কারাকাম বা কালো বালির মরুভূমিতে আবৃত।
তুর্কমেনিস্তান মরুভূমির দেশ হওয়ায় মরূদ্যানগুলোতে সেচের মাধ্যমে চাষাবাদ হয়। তুলা ও গম প্রধান ফসল। তুলা রফতানি করা হয় এবং দেশের মানুষ প্রধান খাদ্য হিসেবে গম খেয়ে থাকে। তবে অনেক গবাদি পশুও এদেশে পালন করা হয়। তা ছাড়া এদেশে আছে পর্যাপ্ত প্রাকৃতিক গ্যাস ও জ্বালানি তেলের মজুদ। তুর্কমেনিস্তান গ্যাস, অপরিশোধিত তেল, পেট্রোকেমিকেল, বস্তু ও তুলা রফতানি করে এবং যন্ত্রপাতি, কেমিক্যাল ও খাদ্যদ্রব্য আমদানি করে। চীন, তুরস্ক, ইতালি, আফগানিস্তান, রাশিয়া, জাপান, জার্মানি ও দক্ষিণ কোরিয়ার সাথে এদেশের বাণিজ্যিক লেনদেন হয়ে থাকে। এদেশের মুদ্রার নাম তুর্কমেন নিউ মানাত।
নরকের দরজা : নরকের দরজা তুর্কমেনিস্তানের দরওয়াজা শহরের একটি প্রাকৃতিক গ্যাস ক্ষেত্র। দীর্ঘদিন ধরে অগ্নিমুখটি অনবরত জ্বলছে বলে একে নরকের দরজা বলা হয়। কারাকুম মরুভূমিতে অবস্থিত অগ্নিমুখটির ব্যাস ৬৯ মিটার (২২৬ ফুট) ও গর্ত ৩০ মিটার (৯৮ ফুট) গভীর। ভূতত্ত্ববিদগণ মিথেন গ্যাসের বিস্তার প্রতিরোধ করার জন্য জ্বলামুখটিতে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিলেন এবং এটি ১৯৭১ সাল থেকে ক্রমাগত জ্বলছে।
নরকের দরজার উত্তাপ এত বেশি যে হাজার চেষ্টা করেও কেউ ওটার কাছাকাছি পাঁচ মিনিটের বেশি সময় থাকতে পারে না। রাতে ভয়ঙ্কর সুন্দর লাগে এ নরকের দরজাকে। অন্ধকারে অনেক দূর থেকেও জায়গাটা দেখা যায়। তখন এর শিখার উজ্জ্বলতাও বোঝা যায় ভালোমতো।
অগ্নিমুখটি দেখতে প্রতি বছরই পর্যটকরা দরওয়াজা শহরে আসেন। ২০০৯ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ৫০ হাজার পর্যটক স্থানটি পরিদর্শন করেছেন। গ্যাস ক্ষেত্রেটি ৫,৩৫০ বর্গ মিটার স্থান পরিবেষ্টিত এবং আশপাশের স্থানও বন্য মরুভূমি ক্যাম্পিংয়ের জন্য বিখ্যাত।
এটি কোনো প্রাকৃতিক গর্ত নয়। ১৯৭১ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নে ভূতত্ত্ববিদগণ প্রাকৃতিক গ্যাসসমৃদ্ধ দারউয়িজি এলাকায় অনুসন্ধানের সময় ক্ষেত্রটি আবিষ্কার করেন। প্রথমে তারা মনে করেছিলেন এটি একটি তেল ক্ষেত্র তাই ড্রিলিং মেশিন দিয়ে তেল উত্তোলনের জন্য সেখানে ক্যাম্প স্থাপন করেন। কিন্তু পরে তারা সেখান থেকে বিষাক্ত গ্যাস বের হতে দেখেন।
গ্যাস অনুসন্ধানের সময় অনুসন্ধানকারীরা গ্যাসবহুল গুহার মধ্যে মৃদু স্পর্শ করলে দুর্ঘটনাক্রমে মাটি ধসে পুরো ড্রিলিং রিগসহ পড়ে যায়। যদিও এই দুর্ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি। প্রাথমিকভাবে গবেষণা করে বিষাক্ত মিথেন গ্যাসের ব্যাপারে গবেষকরা নিশ্চিত হন। পরিবেশে বিষাক্ত গ্যাস প্রতিরোধ করার জন্য ভূতত্ত্ববিদরা তখন গ্যাস উদগিরণ মুখটি জ্বালিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নেন। তাদের ধারণা ছিল এখানে সীমিত পরিমাণ গ্যাস থাকতে পারে। কিন্তু তাদের ধারণা ভুল প্রমাণ করে এটি ১৯৭১ সাল থেকে অনবরত জ্বলছে।
২০১০ সালের এপ্রিলে তুর্কমেনিস্তানের প্রেসিডেন্ট গ্যাসক্ষেত্রটি পরিদর্শন করে এটি বন্ধের কথা বলেন। তিনি বলেন, তা না হলে ওই এলাকার অন্যান্য প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলনের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে। বর্তমানে তুর্কমেনিস্তান তার প্রাকৃতিক গ্যাস উত্তোলন বৃদ্ধি করার পরিকল্পনা করছে।
বর্তমান ৭৫ মিলিয়ন কিউবিক মিটার থেকে গ্যাস উত্তোলন করে ভারত, রাশিয়া, চীন, ইরান ও পশ্চিম ইউরোপে পরবর্তী ২০ বছর তারা রফতানি করার চিন্তা করছে।

SHARE

Leave a Reply