Home খেলার চমক ফুটবলের মহারাজা -আবু আবদুল্লাহ

ফুটবলের মহারাজা -আবু আবদুল্লাহ

ফুটবল বললে সবার আগে এখন যার মুখটি চোখের সামনে ভেসে ওঠে তিনি লিওনেল মেসি। আর্জেন্টাইন এই ফুটবল জাদুকর যেন খেলাটিকেই দিয়েছেন নতুন রূপ। রেকর্ড বইয়ের সব পাতা ওলট পালট করে, একের পর এক ইতিহাস সৃষ্টি করে নিজেকে নিয়ে গেছেন সকল ধরাছোঁয়ার বাইরে। যাকে ‘অন্য গ্রহের খেলোয়াড়’ বলে সম্বোধন করেন অনেকে। প্রতিটি ম্যাচের আগে প্রতিপক্ষের ঘুম হারাম করেন মেসি। অবশ্য অনেকে তো মেসিকে নিয়ে চিন্তা করে সময় নষ্ট করতে রাজিই নন। এর কারণ কি জানো! কারণ লিওনেল মেসিকে নিয়ে কোন পরিকল্পনা করে তাকে আটকানো সম্ভব হয় না। চিলির সাবেক কোচ ক্লোদিও বোর্গে একবার বলেছিলেন, ‘মেসিকে আটকানোর ফর্মুলা কারও জানা নেই। তাই তাকে নিয়ে চিন্তা করে লাভ নেই।’
ফুটবলে মেসির উত্থান পুরোপুরি রূপকথার মতো। আর্জেন্টিনার মধ্যাঞ্চলীয় এলাকা রোজারিওতে জন্ম ১৯৮৭ সালের ২৪ জুন। নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেয়া শিশুটির বাবা ছিলেন শখের ফুটবল কোচ। আর্জেন্টাইনদের রক্তে জন্মগতভাবেই যে ফুটবলের প্রতি ভালোবাসা সেটি ছিলো মেসির মধ্যেও। সেই সাথে পেয়েছিলেন বাবার উৎসাহ। পাঁচ বছর বয়সেই বাবার ক্লাব গ্রান্দোলিতে শুরু করেন ফুটবল প্র্যাকটিস। ৭ বছর বয়সে যোগ দেন নিউওয়েলস ওল্ড বয়েজ ক্লাবে। এই ক্লাবটির একটি দল ছিলো ১৯৮৭ সালে যারা জন্ম নিয়েছে তাদের নিয়ে। টানা চার বছর এই দলটির হয়ে খেলেন মেসি। দলটির নাম ছিলো ‘দ্য মেশিন অব ৮৭’। দলটির হয়ে পাঁচশোর বেশি গোল করেন মেসি। তবে গোলের চেয়েও বল নিয়ে মেসির কারিকুরি দেখতে মাঠের পাশে ভিড় করতেন দর্শকরা। রীতিমতো শিশু তারকায় পরিণত হন মেসি।
এ সময় মেসির শরীরে একটি অসুখ দেখা দেয়। বয়স ১১ বছর হয়ে গেলেও শরীর সেই ৭-৮ বছরের শিশুদের মতো ছিলো। ডাক্তাররা পরীক্ষা করে জানান, শরীর বৃদ্ধির যে উপাদান (গ্রোথ হরমোন) তাতে ঘাটতি আছে মেসির; কিন্তু এই রোগের চিকিৎসা ব্যয়বহুল। স্বল্প আয়ের সংসারে মেসির বাবার পক্ষে সেটি সম্ভব নয়। বুয়েন্স আইরেসের বিখ্যাত ক্লাব রিভার প্লেট মেসিকে দলের নেয়ার কথা জানালেও চিকিৎসা খরচ দিতে রাজি হয়নি। স্পেন প্রবাসী মেসির এক আত্মীয় বন্দরনগরী বার্সেলোনার ‘বার্সেলোনা এফসি’ ক্লাব কর্তৃপক্ষকে জানান মেসির ফুটবল প্রতিভার কথা। ট্রায়ালের আমন্ত্রণ জানায় তারা। একবুক স্বপ্ন আর ছোট্ট মেসিকে নিয়ে আটলান্টিক পাড়ি দেন তার বাবা। জহুরি যেমন খাঁটি হীরা চিনতে ভুল করে না, বার্সেলোনা ক্লাবের কর্মকর্তারা ট্রায়ালে মাত্র কয়েক মিনিট দেখেই মেসিকে পছন্দ করে ফেলেন। সেই সাথে তার চিকিৎসার সব খরচ বহন করারও ঘোষণা দেন। ক্লাব পরিচালক কার্লোস রেক্সাস মেসিতে এতই মুগ্ধ হন যে তখনই চুক্তি করতে চান। হাতের কাছে কোন কাগজ না পেয়ে একটি ন্যাপকিন টিস্যুতে লিখে ফেলেন চুক্তিনামা। তারপর মেসির বাবার স্বাক্ষর নিয়ে সর্বকালের সেরা সম্পদটি নিজেদের করে নেয় ক্লাবটি। বার্সেলোনা ক্লাবের ফুটবল অ্যাকাডেমি লা মাসিয়াতে ভর্তি হন মেসি। স্পেনে চলতে থাকে তার চিকিৎসাও।
বার্সেলোনা ক্লাবের যুব দল, বি দল হয়ে ২০০৪ সালে মূল দলে অভিষেক, বয়স তখন ১৬ বছর। স্পেনের আলো বাতাস আর ফুটবলের পরিবেশে বড় হতে থাকলেও দেশের প্রতি টান এতটুকু কমেনি তার। তাই আন্তর্জাতিক পর্যায়ে খেলার জন্য আর্জেন্টিনা দলকেই বেছে নেন। ২০০৫ সালে দেশের হয়ে অনূর্ধ্ব-২০ বিশ্বকাপ জেতেন। সে আসরের সেরা খেলোয়াড় ও সর্বোচ্চ গোলদাতা হন। সেই সময় থেকেই তার নামের সাথে যুক্ত হয় ‘নতুন ম্যারাডোনা’ উপাধি। ম্যারাডোনাও বলেন, ‘এই ছেলেটা আমার মতো হবে’। যুব বিশ্বকাপের নৈপুণ্যে মুগ্ধ হয়ে তাকে জাতীয় দলে ডাকেন কোচ হোসে পেকারম্যান। ১৮ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক অভিষেক হয় হাঙ্গেরির বিপক্ষে। তবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যাত্রা শুভ ছিলো না মেসির। অভিষেক ম্যাচে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নেমে মাত্র দুই মিনিটের মাথায় লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় তাকে। জার্সি টেনে ধরায় প্রতিপক্ষ দলের এক ডিফেন্ডারকে ধাক্কা দিয়েছিলেন মেসি।
২০০৫-০৬ মৌসুমে মূলত শুরু হয় ইউরোপের ক্লাব ফুটবলের মেসি যুগ। একের পর এক ম্যাচ জিতিয়ে নিজের জাত চেনাতে শুরু করেন। ডাক মেলে ২০০৬ সালে আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ দলেও। ইনজুরির কারণে বিশ্বকাপে ঠিক মতো খেলতে পারেননি। কয়েকটি ম্যাচে শেষ দিকে বদলি খেলোয়াড় হিসেবে নামতে হয়েছে। তবে সেটুকুতেই বিশ্বব্যাপী ফুটবল সমর্থকরা পেয়ে যায় নতুন তারকার আগমনী বার্তা।
এরপর মেসি একে একে শুধু এগিয়েই চলেছেন, পায়ের ছোঁয়ায় লিখেছেন ফুটবলের নিত্য নতুন মহাকাব্য। ফুটবলে একটি ক্লাবের পক্ষে যা জেতা সম্ভবই তার সবই জিতিয়েছেন বার্সেলোনাকে। ২০০৯ সালে বার্সেলোনাকে এনে দিয়েছেন ঐতিহাসিক ট্রেবল অর্থাৎ ইউরোপের ঘরোয়া ফুটবলের তিনটির আসরের সব কটির শিরোপা (লা লিগা, কোপা ডেল রে ও উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ)। অবশ্য সে বছর দলটি স্প্যানিশ সুপার কাপ, উয়েফা সুপার কাপ ও ক্লাব বিশ্বকাপও জেতে। ২০১১ সালে বার্সা জিতেছে ৫টি শিরোপা। মেসি আসার পর ক্লাবটি সব মিলে ৮ বার স্প্যানিশ লা লিগা, ৭ বার স্প্যাটিশ সুপার কাপ, ৫ বার কোপা দেল রে, ৩ বার ইউরোপিয়ান সুপার কাপ, ৪ বার উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ ও ৩ বার ক্লাব বিশ্বকাপ জিতেছে।
ব্যক্তিগত অর্জনেও মেসি প্রতিনিয়ত নিজেকে ছাড়িয়ে গেছেন। টানা ২০০৯ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত জিতেছেন ফিফা ব্যালন ডি’অর পুরস্কার, আরেকবার ২০১৫ সালে। (পর্তুগাল ও রিয়াল মাদ্রিদের ফরোয়ার্ড ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোও ব্যালন ডি’অর জিতেছেন ৫ বার)। চলতি বছরে স্পেনের ঘরোয়া আসরেও ক্লাবকে রেখেছেন শীর্ষে। ক্লাব ক্যারিয়ারে ৫৪২টি গোল করেছেন এখন পর্যন্ত। বার্সেলোনা ক্লাব ও স্প্যানিশ লিগের সর্বোচ্চ গোলদাতাও তিনি। এক মৌসুমের সর্বোচ্চ গোলও মেসির।
সাফল্যের সিঁড়িতে মেসি এমন সব ধাপ অতিক্রম করে চলেছেন যে, অনেকেই তাকে সর্বকালের সেরা ফুটবলার হিসেবে আখ্যায়িত করেন। এক যুগেরও বেশি সময় ধরে টানা ফুটবল বিশ্বে একই রকম ফর্ম ধরে রাখার ঘটনাও ইতিহাসে আর নেই। শুধু ফরোয়ার্ড বা স্ট্রাইকারের ভুমিকাতে আটকে থাকেন না মেসি কখনো। একজন নিখুঁত প্লেমেকার হিসেবে দলের হয়ে সতীর্থদের নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েন প্রতিপক্ষের ডি বক্সে। তার রানিং, ড্রিবলিং, পাসিং, ফিনিশিং, দলীয় সমন্বয় সব কিছুই বিশ্বসেরা। নিজে গোল করার পাশাপাশি সহযোগী খেলোয়াড়র দিয়ে প্রচুর গোল করান, যে সামর্থ্য বর্তমানে আর কোনো ফুটবলারের নেই। যেমন আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে ভালো কোনো মিডফিল্ডার না থাকার কারণে মেসিকেই খেলতে হয় অ্যাটাকিং মিড ফিল্ডার হিসেবে। মাঝমাঠ থেকে স্ট্রাইকারদের কাছে বল জোগান দিয়ে আক্রমণের সুযোগ সৃষ্টি করেন। সে কারণেই জাতীয় দলের হয়ে মেসির গোলসংখ্যা কম।
তবে এতসব অর্জনের পরেও একটি শূন্যতা রয়ে গেছে মেসির নামের পাশে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে জাতীয় দলের হয়ে কোনো শিরোপা জিততে পারেননি এই সুপারস্টার। ২০১৫ বিশ্বকাপ ফাইনাল ও তিনবার কোপা আমেরিকা কাপের (২০০৭, ২০১৫ ও ২০১৬) ফাইনাল খেলেও একবারও শিরোপা ছুঁতে পারেননি এই জাদুকর। সর্বশেষ বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড়ও নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। আসলে খেলোয়াড়ি দক্ষতা নয়, মেসি ব্যর্থ হয়েছেন ভাগ্যের কাছে। নইলে প্রতিবার কেন এত কাছে এসেও শিরোপার দেখা পাবে না। এই একটি জায়গা ছাড়া ফুটবল সব কিছুই দিয়েছে মেসিকে; মেসিও কি কম দিয়েছেন ফুটবলকে!
আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের হয়ে মেসির গোলসংখ্যা সবচেয়ে বেশি। ১২৩ ম্যাচে ৬১ গোল করেছেন। প্রায় একক প্রচেষ্টায় এবারের বিশ্বকাপে তুলেছেন দলকে। বয়স এখন ৩০, তাই এবারের বিশ্বকাপটিই হতে পারে মেসির শেষ বিশ্বকাপ। তাই শুধু দল নয়, পুরো বিশ্বের আর্জেন্টাইন সমর্থকরাই চেয়ে থাকবে মেসির দিকে। মেসিও হয়তো চাইবেন জীবনের এই অপূর্ণতাকে মুছে দিতে, বা পায়ের জাদুতে দেশের শিরোপা খরা ঘোচাতে চাইবেন রাশিয়ার মাটিতে। জাদুকর যেমন তার সেরা জাদুটি শোর একেবারে শেষে দেখান, কে জানে মেসিও হয়তো তার জীবনরে সবচেয়ে বড় অর্জনটি জমিয়ে রেখেছেন এবারের বিশ্বকাপের জন্য। বিশ্বকাপ জিততে পারলে মেসির সর্বকালের সেরা ফুটবলার হওয়া নিয়ে আর কোনো তর্কের অবকাশ থাকবে না।
ব্যক্তিগত জীবনে অত্যন্ত বিনয়ী ও চুপচাপ স্বভাবের মানুষ মেসি। বিয়ে করেছেন আর্জেন্টিনায় নিজ গ্রামের মেয়ে রোকুজ্জোকে। থিয়াগো, মাতেও ও কায়রো নামের তিন পুত্রসন্তানের জনক মেসি। থাকেন স্পেনের বার্সেলোনায়।

SHARE

Leave a Reply