Home চিত্র-বিচিত্র বিশাল ডানার উটপাখি -নুসাইবা মুমতাহিন

বিশাল ডানার উটপাখি -নুসাইবা মুমতাহিন

বলতো বন্ধুরা সবচেয়ে বড় পাখি কোনটি! নিশ্চয় একটি পাখির কথাই মনে হচ্ছে। আর সেই পাখিটি হলো উটপাখি। এই পাখিটির সাথে মরুভূমির জাহাজ উটের বেশ মিল রয়েছে। উটপাখি প্রচণ্ড গরম সইতে পারে এবং পানি ছাড়া কয়েক দিন টিকে থাকতে পারে। এজন্য অস্ট্রিচকে উট পাখি নামে ডাকা হয়। উটপাখিই একমাত্র পাখি যার পায়ে দুটি মাত্র আঙুল রয়েছে।
তবে পাখি হলেও উড়তে পারে না উট পাখি। তবে দারুণ জোরে ছুটতে পারে এরা। উটপাখিরা ঘন্টায় ৭০ কিলোমিটার গতিতে ছুটতে পারে। তবে বোঝোই এদের ছোটার ক্ষমতা! উটপাখিদের এত জোরে ছুটতে পারার ক্ষমতার জন্য এদের দৌড় প্রতিযোগিতা হয়। এই প্রতিযোগিতা নিয়ে মানুষ আবার অনেক আনন্দ করে থাকে।
দেখতে অনেক বড়সড় হলেও উট পাখিরা কিন্তু মোটেও হিংস্র নয়। এদের প্রধান খাদ্য হলো বিভিন্ন শস্যদানা। কোনো কোনো সময় অবশ্য এরা পোকামাকড়ও খেয়ে থাকে। এদের তো দাঁত নেই। সে জন্য খাবার খাওয়ার সময় উট পাখিরা কিছু পাথর খেয়ে নেয়। এই পাথর এদের পাকস্থলীতে খাদ্যদানা হজম করতে পেষার কাজটি করে। একটি পূর্ণাঙ্গ উট পাখি এদের পাকস্থলীতে ১ কেজি পাথর খেয়ে ঘুরে বেড়াতে পারে।
এদের উচ্চতা প্রায় ৩ মিটার আর ওজন ১৫০ কেজিরও বেশি হতে পারে। ভাবো একবার, কী পরিমাণ ওজন! এদের রয়েছে বিশাল বিশাল পাখা। কত বিশাল বলো তো, পুরোটা মেলে ধরলে প্রায় ৭ ফুট হবে এর দৈর্ঘ্য। এই বড়ো বড়ো পাখার জন্যই তো এরা উড়তে না পারলেও পাখি। পুরুষ উটপাখিগুলোর পাখার রঙ হয় কালো। এর সঙ্গে থাকে সাদা লেজ। মেয়েগুলোর পাখার রঙ হয় ধূসর বাদামি।
উটপাখি দলবদ্ধ জীব। ৫ থেকে ৫০টি সদস্যের যাযাবর দলে এরা ঘুরে বেড়ায়। হরিণ, জেব্রা প্রভৃতির সাথেও দল বেঁধে বিচরণ করে। বিপদে পড়লে উটপাখি সাধারণত শুয়ে লুকিয়ে পড়ে অথবা দৌড়ে পালিয়ে যায়। কোণঠাসা হয়ে পড়লে শক্তিশালী পা দিয়ে লাথি দেয় বা শক্ত ঠোঁট দিয়ে ঠোকর দেয়।
উটপাখির মতই এর ডিমও অনেক বড়ো হয়ে থাকে। পৃথিবীতে সবচেয়ে বড় ডিম এই উটপাখিরই। অন্য কোনো প্রাণী আর এত বড় ডিম পাড়ে না। এদের একেকটা ডিমের ওজন হয়ে থাকে ১.৫ কেজি। আর এই ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয় ৩৫ থেকে ৪০ দিনে।
কিন্তু অস্ট্রিচের ঘাড়ে এমন দোষ কে চাপাল যে বিপদ দেখলে বালিতে মাথা লুকায়? এমনকি এ বিষয়ে সুধীন্দ্রনাথ দত্তের একটা বিখ্যাত লাইনও আছে, ‘অন্ধ হলে কি প্রলয় বন্ধ থাকে?’ এসব কথার মোদ্দা অর্থটা হলো, অস্ট্রিচ এতই বোকা, ভাবে নিজে না দেখলে শত্রু তাকে দেখবে না। এখন এক মানুষ আরেক জনকে বোকা বোঝাতেও এ কথা বলে থাকে অহরহ। অথচ অস্ট্রিচ এ কাজটি করে না। তাহলে ছড়াল কে? প্লিনি দ্য এল্ডার (২৩-৭৯ খ্রিস্টাব্দ)। বন্য প্রাণী পর্যবেক্ষণে অনেক সময় ব্যয় করেছেন এই রোমান পণ্ডিত। প্রকৃতি বিষয়ে অনেক তথ্য সরবরাহ করেছেন। তিনিই অস্ট্রিচের বালিতে মাথা লুকানোর বিষয়টি লিখে গেছেন। তাকে এনসাইক্লোপিডিয়ার জনক বলা হয়; কিন্তু এ খবরটি তিনি ভুল দিয়েছেন।
আসলে ঘটনাটা কী? শত্রু দেখলে প্রথমে অস্ট্রিচ যতটা সম্ভব বালির সঙ্গে টান টান হয়ে শুয়ে পড়ে। তার গলার রং বালির কাছাকাছি বলে দূর থেকে শুধু শরীরটাই দেখা যায়, মনে হয় সে বালিতে মাথা লুকিয়েছে। কিন্তু নিতান্ত শত্রুর মুখোমুখি হয়ে গেলে অস্ট্রিচ কিন্তু ঝেড়ে দৌড় দেয়। অস্ট্রিচ কৌশলীও। পাখা মেলে দিয়ে সহজেই গতিপথ বদলাতে পারে। ভালো লাথিও মারতে পারে অস্ট্রিচ। লাথি মেরে পূর্ণবয়স্ক সিংহকে ঘায়েল করার রেকর্ডও আছে। পাখিটির দৃষ্টি ও শ্রবণশক্তি ভালো। শত্রু তাকে দেখতে পাওয়ার আগেই সে শত্রুকে দেখে ফেলে।
ওই ধারণার পেছনে আরো কারণ দেখানো যেতে পারে। যেমনÑ অস্ট্রিচ যখন খাবার খোঁজে বালিতে, মনে হয় মাথা গুঁজে দিয়েছে বালিতে। যা-ই হোক, মূলকথা বিপদ দেখলে অস্ট্রিচ বালিতে মাথা লুকায় না। এমনটি হলে অস্ট্রিচ টিকে থাকত কি না সন্দেহ, কারণ এতে দম বন্ধ হয়ে মারা যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তবে একটা প্রশ্ন কিন্তু থেকেই গেল। উটপাখি উড়তে পারে না কেন! এখন পর্যন্ত পৃথিবীর বুকে যতো পাখি টিকে আছে তাদের মধ্যে প্রায় চল্লিশ প্রজাতির পাখি আছে যারা উড়তে পারে না। নাম করতে গেলে এদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি পরিচিত পাখিগুলো হলো : উটপাখি, কিউই, পেঙ্গুইন, ইমু, মুরগি ইত্যাদি। যেসব পাখি উড়তে পারে না এবং যারা পারে তাদের মধ্যে দু’টি মৌলিক পার্থক্য আছে : প্রথমত: উড়তে অক্ষম পাখিদের ডানার হাড়গুলো অপেক্ষাকৃত ছোট এবং দ্বিতীয়ত: উড়তে সক্ষম পাখিদের বুকের ঠিক মাঝের লম্বা হাড়ের ওপরটা জাহাজের পাটাতনের মতো। ওই পাটাতনের সাথেই আটকে থাকে শক্তিশালী পেশি, ওগুলো ওড়ার সময় পাখির ডানা নাড়াতে সাহায্য করে। আর যারা উড়তে পারে না তাদের বুকের ওই হাড়টি হয় চ্যাপ্টা বা খুব সামান্য বাঁকানো। উড়তে না পারার ব্যাপারটিতে পাখিরা অভ্যস্ত হয় সাধারণত সেই সব দ্বীপাঞ্চলে যেখানে কোন ধরনের শিকারির উৎপাত নেই। তাই বলে ভেবো না, সব জাতের উড়তে অক্ষম পাখিদের দ্বীপাঞ্চলেই পাওয়া যায়।
বিশ্বে উটপাখি পালন একটি লাভজনক ব্যবসা। বিশ্ববাজারে এর চামড়া, গোশত, পালক ইত্যাদির ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

SHARE

Leave a Reply