Home প্রচ্ছদ রচনা ভয়ঙ্কর অরণ্যের নাম আমাজন রেইন ফরেস্ট -মঈনুল হক চৌধুরী

ভয়ঙ্কর অরণ্যের নাম আমাজন রেইন ফরেস্ট -মঈনুল হক চৌধুরী

আমাজন রেইন ফরেস্ট। পৃথিবীর আকর্ষণীয় স্থানগুলোর মধ্যে অন্যতম। এমন সমৃদ্ধ সবুজ পৃথিবী আর কোথাও দেখা যায় না। নিস্তব্ধতা আর জঙ্গলের অদ্ভুত কিছু শব্দের অপূর্ব সমন্বয় ঘটে আমাজনে। তাই আমাজন বিশ্বের বৃহত্তম জঙ্গলগুলোর একটি। এ জঙ্গলের এমনও অনেক স্থান আছে, যেখানে হয়তো কখনও মানুষের পদচিহ্ন পড়েনি। জঙ্গলে ভয়ঙ্কর প্রাণীদের বাস। এর ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে আমাজন নদী। সে নদীতেও রয়েছে প্রাণঘাতী মাছ ও অন্যান্য প্রাণী। এ বনের অনেক স্থান নতুন করে আবিষ্কৃত হচ্ছে। সম্প্রতি আমাজনের ব্রাজিল অংশে জঙ্গলের ভেতরে কয়েক শ’ রহস্যময় বৃত্তের সন্ধান পাওয়া গেছে। গবেষকদের ধারণা, এ বৃত্তগুলো অন্তত দু’ হাজার বছর পুরনো। আমাজন জঙ্গলের মধ্যভাগে ওই বৃত্তগুলো পাথরের মধ্যে খোদাই করা। ঠিক কী কারণে এ বৃত্তগুলো করা হয়েছিল, তা তারা বলতে পারছেন না। জঙ্গলের ভেতরে প্রায় আট হাজার স্কয়ার মাইল এলাকাজুড়ে অন্তত চারশত পঞ্চাশটি বৃত্ত রয়েছে। কারা এ বৃত্তগুলো করেছে, সেটাও রহস্য হয়ে আছে গবেষকদের কাছে। তাই শত শত বছর ধরেও ভ্রমণপিপাসুরা আমাজনে অ্যাডভেঞ্চার উপভোগের জন্য আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষায় থাকেন। তাছাড়া সারাবিশ্বের প্রায় অর্ধেক অক্সিজেনের ব্যবস্থা করে এই বন। আর এই বিশাল বনে রয়েছে পৃথিবীর সবচেয়ে বিচিত্র, ভয়ঙ্কর আর সুন্দর অসংখ্য প্রাণী। যাদের মধ্যে এমন কিছু প্রাণী আছে, যাদের রয়েছে বেশ কিছু বিশেষত্ব, যা কিনা তাদের করে তোলে আরও ভয়ঙ্কর সুন্দর।
উল্লেখ্য, পৃথিবীর একাধিক গহিন অরণ্যের মধ্যে গবেষকরা, পর্যটকরা, বিভিন্ন টিভি চ্যানেল, আলোকচিত্র সাংবাদিকরা পৌঁছাতে পারলেও এখনো এমন কিছু গহিন অরণ্য রয়েছে যেখানে সবার পক্ষে আজও যাওয়া সম্ভব হয়নি। যেমন কঙ্গো রেইন ফরেস্ট, বর্নিও রেইন ফরেস্ট ও আমাজন রেইন ফরেস্ট। এর মধ্যে আমাজন রেইন ফরেস্ট সবার জন্য অত্যন্ত কঠিন প্রবেশ করা। যারাই প্রবেশ করেছেন সবাই জীবন নিয়ে ফিরে আসতে পারেননি। এমন কিছু অঞ্চল রয়েছে আমাজনে যেখানে সূর্যের আলো পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে না। মাথার ওপর দিয়ে যখন বিভিন্ন টিভি চ্যানেলের হেলিকপ্টার আমাজনে প্রবেশ করে তখন আমাজনের গহিন অরণ্যের আদিবাসীরা হেলিকপ্টার লক্ষ্য করে তীর ছুড়তে থাকেন। তারা হয়ত জানেন না তাদের তীর দ্বারা হেলিকপ্টারকে নামানো সম্ভব নয়। পুরোপুরি বুনো জীবনে অভ্যস্ত আমাজনের আদিবাসীরা তাদের অঞ্চলে কাউকে প্রবেশ করতে দিতে চান না। তারা চান নিজেদের অরণ্যের মধ্যে লুকিয়ে রাখতে। আর ব্রাজিলসহ আমাজন অঞ্চলের নৃতাত্ত্বিক গবেষকরাও চান আমাজনের গহিনে যেন সবাই যেতে না পারেন। এই আমাজনকে নিয়ে একাধিক হলিউডের ব্লক বাস্টার ছায়াছবি নির্মিত হয়েছে। যেমন- ‘অ্যানাকোন্ডা।’ এই ছায়াছবিটি দেখার পর সারা পৃথিবী থেকে লাখ লাখ পর্যটক-গবেষক আমাজনের গহিনে ছুটে যাচ্ছেন।
উল্লেখ্য, অ্যানাকোন্ডা হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহৎ আকারের সাপ। এই সাপ ছোট হরিণসহ ছোট আকারের সব ধরনের প্রাণীকে গিলে খেয়ে ফেলে। যে কারণে অ্যানাকোন্ডাকে আমাজন জঙ্গলের প্রহরী বলা হয়। এ ছাড়া রয়েছে বিশাল আকৃতির কুমির, যাদের ভয়ে বনের পশুরা নদীতে পানি পান করতে ভয় পায়। ব্রাজিল সরকার আমাজন জঙ্গল ভ্রমণকারীর কাছ থেকে কোটি কোটি ডলার আয় করছে। আমাজনের মোট আয়তন হচ্ছে পঞ্চান্ন লাখ বর্গকিলোমিটার। এই গহিন অরণ্যে প্রায় দশ মিলিয়ন অর্থাৎ এক শ’ কোটি নানা শ্রেণির প্রাণী ও উদ্ভিদের অস্তিত্ব রয়েছে, যা আর পৃথিবীর কোথাও তাদের খুঁজে পাওয়া যাবে না। পাওয়া যাবে শুধু আমাজনের চির নির্জন বনে। আমাজনে রয়েছে একশত কুড়ি ফিট উচ্চতার গাছ, এই গাছটি কতদিনের পুরনো গবেষকরাও সে তথ্য বের করতে পারেননি। কলম্বাস যখন আমেরিকা আবিষ্কার করেন তার আগে থেকেই আমাজনের গহিনে আদিবাসীদের অস্তিত্ব ছিল। এখানে আরো রয়েছে চল্লিশ হাজার প্রজাতির উদ্ভিদ, দুই দশমিক পাঁচ মিলিয়ন প্রজাতির কীটপতঙ্গ, এক হাজার দুইশত চুরানব্বই প্রজাতির পাখি। এমন কিছু পাখি যা আজ পর্যন্ত পাখি বিশেষজ্ঞরা যাদের ছবি তুলে নিতে পারেননি। তিনশত আটাত্তর প্রজাতির সরীসৃপ, চারশত আটাশ প্রজাতির উভচর এবং চারশত সাতাশ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী।
এ ছাড়া এমন সব ভয়ঙ্কর মাছ আমাজনের নদীতে বসবাস করে যাদের কারণে কোনো প্রাণী আমাজনের পানি পান করতেও ভয় পায়। যেমন পিরানহা মাছ। এই মাছ এক সঙ্গে ঝাঁকে ঝাঁকে ঘুরে বেড়ায়। এক একটি ঝাঁকে কমপক্ষে পাঁচ হাজার পিরানহা মাছ থাকে। যেকোনো প্রাণী যেমন বিশাল আকৃতির শূকর, টাপির, বুনো বাঘ যদি ভুলক্রমে আমাজনের পানিতে নেমে আসে আর যদি তখন পিরানহাদের চোখে পড়ে যায় তাহলে সেই প্রাণী আর পাঁচ মিনিটও বেঁচে থাকতে পারবে না। আমরা ন্যাশনাল জিওগ্রাফি চ্যানেলে দেখেছি পিরানহা মাছের ভয়াবহতা। এ ছাড়া এখানে রয়েছে পিয়ারুকু মাছ। এই মাছের ওজন একশত পঞ্চাশ কেজি পর্যন্ত হয়। এদের সামনে যারাই পড়ে যায় তারাই তাদের পেটে চলে যায়। আমাজন গহিনের বন্য প্রাণীর উল্লেখযোগ্য কিছু অংশ হলো জাগুয়ার, দেখতে অনেকটা বাঘের মতো, কিন্তু হিংস্রতায় বাঘের চেয়ে ভয়ঙ্কর। এ ছাড়া রয়েছে জলের বানর, ওল বানর, এরো ব্যাঙ। এই এরো ব্যাঙ মুখে বিষ বহন করে থাকে। যেই তাকে হামলা করতে আসে তখন মুখের বিষ তার ওপর সে নিক্ষেপ করে। মাকড়সা বানর। এই বানরটি দেখতে মাকড়সার মতো বলেই এই নাম। চরিত্রটা অনেকটা মাকড়সার মতো। সেই সঙ্গে এই বনে রয়েছে টাপির, টারানটুলা, টাউকান, টাকুসি ডলফিন, বোটো ডলফিন। এই বনে এমন কিছু বানর রয়েছে যাদের ব্যাপারে প্রাণী বিশেষজ্ঞরা এখনো অজ্ঞাত রয়েছেন। আমাজনকে নিয়ে যেসব তথ্য ন্যাশনাল জিওগ্রাফিতে পাওয়া গেছে তার উল্লেখযোগ্য হচ্ছে, নিউইয়র্ক শহরে বারো বছর যত পানি ব্যবহার হয় আমাজন নদীতে তার চেয়েও বেশি পানি প্রবাহিত হয় প্রতিদিন। গোটা পৃথিবীর কুড়ি ভাগ পানি বয়ে চলে এই নদীতে। এখানে রয়েছে দুশো প্রকার খাওয়ার উপযোগী ফল। আর দু’হাজার আটশত ধরনের ফল রয়েছে যা শুধু বনের পশুপাখিরা খেয়ে থাকে। পৃথিবীর অক্সিজেনের কুড়ি ভাগ আসে আমাজন বন থেকে। এই বনের জলে রয়েছে তিনশত পাউন্ড ওজনের আরাপাইমাম মাছ। বিশাল আকৃতির এই মাছকে দেখলে বনের সবাই কেঁপে ওঠে। এর গায়ের চামড়া অত্যন্ত শক্ত। যার কারণে শত শত পিরানহা মাছ হামলা করেও এই মাছকে কাবু করতে পারে না। এই বনে রয়েছে রঙবেরঙের নানা প্রজাতির পাখি, যা পৃথিবীর আর কোথাও দেখা যায় না। যে কারণে পাখিপ্রেমীরা আমাজনের গহিনে ছুটে যান। আমাজন বনের ভেতর দিয়ে বয়ে যাওয়া নদীতে কয়েক প্রজাতির চিংড়ি মাছ, বিশাল আকৃতির কাছিম, কয়েক প্রজাতির কাঁকড়া পাওয়া যায়।
এসব জলজ প্রাণীর ওপর আমাজনের আদিবাসী সমাজ ও প্রাণিজগৎ নির্ভরশীল। সেই সঙ্গে সেখানকার বিশুদ্ধ জল মানুষ ও জীবজন্তুকে সুস্থ রাখে। হঠাৎ করে যদি বিশাল আকৃতির গাছের দিক তাকান তাহলে দেখতে পাবেন নানা শ্রেণির পাখি। এমন সব পাখি যা আর পৃথিবীর কোনো বনে পাওয়া যায় না। চড়–ই আকৃতির পাখি যেমন এই বনে দেখতে পাওয়া যায়, তেমনি বিশাল আকৃতির শকুনের সাক্ষাৎ পেয়ে যায় অনেকে। এই শকুনগুলো হরিণ ও শূকর ছানাদের ধরে নিয়ে যায় ও গাছের মধ্যে ছিঁড়ে খেয়ে ফেলে। ভাগ্য ভালো থাকলে সেই দৃশ্যও দেখতে পাবেন। তবে পর্যটকদের অত্যাধুনিক অস্ত্র সজ্জিত নিরাপত্তারক্ষী দ্বারা সর্বাত্মক নিরাপত্তা দেওয়া হয়। আমাজনের গহিনে এমন সব আদিবাসী রয়েছে যারা এখনো আদিম জীবনযাপনে অভ্যস্ত। এদের মধ্যে কয়েকটি হলো- আইকানা, আইমোরে, আজুরু, আনাক, আনাম্বি, অ্যাপারাই, আরারা, আরুরা, বাকাইরি, বানাওয়া, বারা, বারাসানা, বারে, বারোরা, কানেলা, দেনী, দেসানো, দাও, ফুলনিও, গুয়াজা, হুপদা, ইরানজে, জাবুতি, জারুয়ারা, জুমা, জারুনা, কাপড়, কাম্বা, কামবেবা, কানামারি, কারাজা। উল্লিখিত বিবরণ অতি ক্ষুদ্র বিবরণ। কারণ আমাজনের গহিনে এমন সব আদিবাসী বসবাস করছেন যাদের কাছে সভ্য জগতের বাসিন্দারা কোনো দিনই যেতে পারেনি। বাংলাদেশ থেকে যারা আমাজন গিয়েছেন তাদের সংখ্যা খুবই কম। ঢাকা থেকে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজযোগে ব্রাজিলের রাজধানী রিওডি জেনেরিওতে প্রথমে গিয়ে নামতে হবে। তারপর সেখান থেকে একাধিক ভ্রমণ সংস্থা পর্যটকদের আমাজনের গহিনে নিয়ে যাবে।
যারা পেরুর ভিতর দিয়ে আমাজনের গহিনে যাবে তারা প্রথমেই বুনো জীবনযাপনে অভ্যস্ত আদিবাসীদের সাক্ষাৎ পেয়ে যাবে। প্রথমেই পর্যটকদের স্বাগত জানাবে বিশাল আকৃতির নতুন প্রজাতির বিষাক্ত ব্যাঙ। এদের আকৃতি দেখে অনেক পর্যটকই ভয় পেয়ে যান। স্থানীয় আদিবাসীরাও এদের এড়িয়ে চলে। বলা হয় এখানে প্রাচীন যুগের গুপ্তধন লুকিয়ে আছে। আর একদল পর্যটক বলিভিয়ার ভেতর দিয়ে আমাজনের গহিনে প্রবেশ করেন। বলিভিয়ার ভেতর দিয়ে যারা আমাজন যাবেন তাদের প্রথমেই স্বাগত জানাবে চার মিটার লম্বা ভয়ঙ্কর সুন্দর অ্যানাকোন্ডা সাপ। এই সাপকে নিয়ে অনেক ধরনের আজগুবি গল্প রয়েছে। প্রকৃত অর্থে অ্যানাকোন্ডা সাপ অত্যন্ত নিরীহ প্রকৃতির। খুব সহজেই কাউকে আক্রমণ করে না। শুধু ক্ষুধার্ত অবস্থায় জলের বা স্থলের প্রাণীর ওপর আক্রমণ চালিয়ে থাকে। কিন্তু তার আকৃতি দেখে পর্যটকরা ভয় পেয়ে যান। সেই সঙ্গে বলিভিয়া থেকে আমাজনে প্রবেশকারী পর্যটকরা পিংক ডলফিন দেখতে পাবেন। এক একটি ঝাঁকে কুড়ি থেকে পঁচিশটি পিংক ডলফিন ঘুরে বেড়ায়। আমাজন রেইন ফরেস্ট ও নদী প্রবাহিত জল স্থানীয় আদিবাসী ও লক্ষ কোটি জীবজন্তুকে বিশুদ্ধ অক্সিজেন ও জল দিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ করে নদীতে দেখা যায় ছোট আকৃতির কুমির, ডলফিন, পিরানহা ও অ্যানাকোন্ডা। আর চার পাশের বুনো জঙ্গলে দেখতে পাওয়া যায় বিশাল আকৃতির জাগুয়ার, শূকর, টাপির, হরিণসহ ভয়ঙ্কর সুন্দর নানা প্রজাতির জীবজন্তু ও শত শত নাম না জানা পাখি। উল্লেখ্য, দক্ষিণ আমেরিকার ব্রাজিল, পেরু, কলাম্বিয়া, ইকুয়েডর, ভেনিজুয়েলা, বলিভিয়া, সুরিনাম, গায়ানা এবং ফ্রেঞ্চ গায়ানা এই নয়টি দেশজুড়ে রয়েছে এর বিস্তৃতি।

SHARE

Leave a Reply