Home উপন্যাস মিতুলির স্মৃতিকথা -দেলোয়ার হোসেন

মিতুলির স্মৃতিকথা -দেলোয়ার হোসেন

হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেলো মিতুলির। চোখ মেলে কাউকে দেখতে না পেয়ে অভিমানে ঠোঁট জোড়া একটু ফুলে উঠলো। কেননা বাড়িতে পাঁচ-ছয় বছরের মিতুলি আর ওর মা ছাড়া কেউ নেই। বাবা সিরাজ মোল্যা রেলওয়ের ৪র্থ শ্রেণীর কর্মচারী। দুদিন আগেই সে ফিরে গেছে তার কর্মস্থল জামালপুর।
ঘাড় উঁচু করতেই মিতুলির চোখে পড়লো সুন্দর একটা প্রজাপতি। অমনি কান্না ভুলে দারুণ খুশি খুশি চিত্তে চোখ মেলে দেখতে লাগলো বাহারি রঙের প্রজাপতিটিকে। প্রজাপতিটা ওর পাখা দুটো একবার মেলে দিচ্ছে আবার ওপরের দিকে তুলে পাখার সাথে পাখা মিলাচ্ছে। হলুদ কালো আর কমলা রঙে অদ্ভুত নকশা আঁকা দু’টি পাখায়। লম্বা লম্বা চিকন পা।
মিতুলির বিছানায় পাতা নতুন একটা চাদর। যেখানে ছোট বড় নানান ধরনের ফুলে ফুলে ছাওয়া। প্রজাপতি উড়ে উড়ে একবার এ ফুলে বসছে আবার অন্য ফুলে। কিন্তু সে কোনো ফুলেই মধু খুঁজে পাচ্ছে না। প্রজাপতির পাখার দুদিকে বড় বড় চোখের মতো। মিতুলি সেই চোখের দিকে তাকিয়ে বললো, ও প্রজাপতি তুমি কী খাইতে চাও, মধু? এইটা ফুলের বাগান না ভাই, এইটা হলো আমার ফুলের চাদর।
তারপর কি ভেবে মিষ্টি হেসে সে বললো, প্রজাপতি তুমি কি আমার বন্ধু? তোমাকে আমি সত্যি সত্যি মধু খাওয়াবো। আমাদের ঘরে মধু আছে। তুমি উড়ে যেয়ো না। আমি তোমাকে ধরবো না। তারপর মিতুলির মনে পড়লো টিভিতে শোনা নজরুল ইসলামের সেই প্রজাপতির গানটি। তখনই সে ভাঙা ভাঙা সুরে এলোমেলো গেয়ে উঠলো-
প্রজাপতি, ও প্রজাপতি
তুমি কোথায় পেলে ভাই এমন রঙিন পাখা ॥
মিতুলি ঘুমিয়েছে অনেকক্ষণ। ওর মা সংসারের কাজ করতে করতে এক সময় তার মনে হলো মেয়েটাতো অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছে। এখন পর্যন্ত তার কোনো সাড়া পাচ্ছি না কেন! ফুলের চাদরটা ওর খুব পছন্দ হয়েছে। কিন্তু … মেয়ের তো এতক্ষণ ঘুমিয়ে থাকার কথা নয়। মা এগিয়ে এসে দরজায় দাঁড়ালো। চুপি চুপি মেয়ের কান্ড দেখে আপন মনে হাসলো। মিতুলি প্রজাপতির সঙ্গে হেসে হেসে কথা বলছে।
ও প্রজাপতি তুমি কোন বনে থাকো? তোমার পাখা দুটো কী সুন্দর। প্রজাপতি উড়ে গিয়ে আর একটি বড় লাল ফুলের ওপর বসলো। মিতুলি বললো, তুমি উড়ে যেয়ো না কিন্তু, আমি তোমার জন্য মধু নিয়ে আসি।
এই বলেই মিতুলি উঠে দরজার দিকে তাকালো। মাকে দেখে বললো, মা, প্রজাপতি মধু খাবে। একটু মধু দাও তো। ও ভেবেছে আমার চাদরের ফুলেও বুঝি মধু আছে। মা বললো, তুমি ঠিক বলেছো। দাঁড়াও আমি তোমার বন্ধুর জন্য মধু নিয়ে আসি। ঠিক তখনই প্রজাপতিটা উড়তে উড়তে জানালা পথে চলে গেলো বাইরে। মিতুলি কেমন হায় হায় করে চেঁচিয়ে উঠলো-ও প্রজাপতি তুমি যেয়ো না। বলতে বলতে মিতুলির চোখ দুটো ভরে উঠলো পানিতে। মা মেয়েকে সান্ত¡না দিয়ে বললো, তুমি কাঁদছো কেন? ও আবার আসবে। ও তো অনেকক্ষণ হয় এসেছে; হয়তো ওর মায়ের কথা মনে পড়েছে। তুমি মুখ হাত ধুয়ে নাও। পরে আমি আর তুমি ঘরের পিছনে যে শিউলি ফুলের গাছ আছে ওখানে গিয়ে দেখে আসবো।
– প্রজাপতিটা কি আবার আসবে মা?
– আসবে। তুমি ওর সাথে গল্প করেছো, গান গেয়ে শুনিয়েছো, ও খুব খুশি হয়েছে।
– আমি প্রজাপতির পাখা ধরিনি মা। বলেছি তুমি ভয় পেয়ো না। আমি তোমাকে কিছু বলবো না।
– ঠিক বলেছো। ও কথা বলতে না পারলেও তোমার কথা সব শুনেছে। ওদের পাখা খুব নরম, ধরলেই ছিঁড়ে যায়। আমগাছটার পাশে লতাপাতার মধ্যে পলাশ ফুলের গাছটা আছে ওখানেও থাকতে পারে। পলাশের লাল ফুল থেকে ওরা ওদের লম্বা শুঁড় দিয়ে ফুলের মধু চুষে খায়। হয়তো ওখানেই ওর জন্ম হয়েছে। জন্মভূমি ছেড়ে ও কোথাও যাবে না। যেমন আমরাও মাতৃভূমি ছেড়ে অন্য কোথাও যেতে চাই না।
মিতুলি আর কোনো প্রশ্ন না করে মায়ের সঙ্গে উঠোনে নামলো। কলতলা বালতি ভরা পানি দিয়ে মুখ হাত পা ধুয়ে ঘরের বারান্দায় রাখা ছোট্ট চৌকিটাতে বসলো। মা বাটিতে দুধের মধ্যে পাটালি গুড় আর মুড়ি দিলো। একটা চামচ এনে বললো-চামচ দিয়ে তুলে খাও। পরে চুমুক দিয়ে দুধটুকু খেয়ে নিবে। আমি শুকনা কাপড়গুলো তুলে ঘরে রেখে আসি।
মিতুলি মায়ের হাত ধরে ঘরের পিছনে গেলো।
– মা! সুন্দর প্রজাপতির এই জঙ্গলে জন্ম হয় কেন?
– ওরা দেখতে সুন্দর কিন্তু ওদের জন্মের কাহিনী বড় বিচিত্র। একবার একটা গাছে অনেক বিছা দেখেছিলে না! দেড় ইঞ্চি দুই ইঞ্চি লম্বা সারা শরীরে হুল আর হুল থাকে। সেই বিছা পাট ক্ষেতের সবুজ ঘোড়া পোকার মতো হেঁটে হেঁটে নির্জন কোনো গাছের পাতায় চলে যায়। সেখানে পাতা খেতে খেতে একসময় মুখের লালা দ্বারা ছোট্ট গুটির মতো তৈরি করে। সেই শক্ত আর লম্বা গুটির মধ্যেও পড়ে থাকে। তারপর একদিন প্রজাপতি হয়ে গুটি থেকে বের হয়ে আসে। প্রজাপতি সবাই ভালোবাসে। কারণ ওরা দেখতে সুন্দর। বিচিত্র সব সৃষ্টি দিয়ে সৃষ্টিকর্তা আমাদের এই পৃথিবী এই প্রকৃতিকে সুন্দর করে সাজিয়ে দিয়েছেন। পৃথিবীতে কতো রকম কতো বিচিত্র রঙের পাখি আছে তারা আকাশে উড়ে বেড়ায়। দেখতে কতো সুন্দর লাগে। শুধু আকাশ কি ভালো লাগতো! আকাশে কতো রঙের মেঘ ভেসে বেড়ায়।
– মা, পানির মধ্যে যে মাছ থাকে ওরাও সুন্দর। আমি স্কুলে টিভিতে দেখেছি।
– হ্যাঁ সমুদ্রের তলদেশে কত রকম মাছের বাস। সেগুলোর শরীরের রঙও সুন্দর। সবই আল্লাহর দান।
মিতুলি গ্রামের প্রাইমারিতে পড়ছে। পড়ালেখা এবং অজানাকে জানার প্রতি ওর প্রচন্ড আগ্রহ। কোনো কিছু মাথায় এলে মিতুলি ওর শিক্ষকদের কাছে প্রশ্ন করে, এটা হলো কেনো-এটা হয় না কেনো। শিক্ষকগণ ওর প্রশ্ন করার জন্য বিরক্ত হন না; বরং খুশি হয়। এভাবেই প্রতিটি ক্লাসে সে ফার্স্ট হতে থাকে।
মিতুলি পঞ্চম শ্রেণি থেকে বৃত্তি পেয়ে হাইস্কুলে ভর্তি হয়। পথ বেশি না হলেও খেয়া পারাপার। কথায় আছে এক নদী বিশ ক্রুশ। তবে ঘাটে খেয়া নৌকা ছাড়াও ছোট ছোট ডিঙি নৌকা থাকে-যাত্রী পারাপারের জন্য।
নদীর ধারে গাছপালা ঘেরা সবুজ গ্রাম। গ্রামের মধ্যে একাব্বর জোয়ারদার বিত্তবান এবং দাঙাবাজ একজন মানুষ। লোকটা নিজের নাম সই করা ছাড়া আর কোনো বিদ্যা নেই ঘটে। তার ছেলেমেয়েরা প্রাইমারি স্কুলে কিছুকাল ঘোরাফেরা করলেও নদী পার হয়ে হাইস্কুলে পা রাখেনি। গ্রামের মেয়েদের হাইস্কুলে পড়ার ব্যাপারে ঘোর বিরোধী সে। তাতে নাকি গ্রামের ইজ্জত থাকে না। আসলে একাব্বর জোয়ারদার চায় কেউ যেনো তার চেয়ে বড় না হয়। শুধু অর্থের দিক দিয়েই নয়, অন্য কোনো দিক দিয়েও। গায়ের জোরে পরের জমি দখল, গ্রাম্য শালিস দরবারে ঘুষ খেয়ে উল্টা বিচার করা তার অভ্যাস।
বাড়ির সামনে দিয়ে রাস্তা। রাস্তার ওপাশে সিরাজ মোল্যার ছোট্ট বাড়ি। বাড়ির পুবে খানা-ডোবা। খানা-ডোবার পাড়েই নানান জাতের গাছপালা। সিরাজ মোল্যার মনে হিংসা নেই, লোভ নেই-সে যেনো এক সৌরভ মাখা ভোরের আলো। মিতুলির আর কোনো ভাই-বোন নেই বলে কোনো দুঃখ নেই সিরাজ মোল্যার। মিতুলি গ্রামের মসজিদের ইমামের কাছে খতম দিয়েছে পবিত্র কুরআন।
মিতুলি পশু-পাখিদের খুব ভালোবাসে। ওদের কষ্ট তার মনে বড় বাজে। একদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে-রাস্তার পাশে বাবলা গাছের ছায়ায় দাঁড়াতেই মিতুলি শুনতে পেলো-ছোট্ট বিড়ালের ডাক-মিউ মিউ। ছোট ছোট গাছ গাছড়ার ভিতর থেকে সাদা কালো একটি বিড়ালের বাচ্চা উঠে এলো মিতুলের পায়ের কাছে। কেমন অসহায় দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে মিউ মিউ ডাকতে শুরু করলো। ক্ষুধায় কাতর, পেটের কাছে গর্ত হয়ে আছে। মিতুলের মনটা মায়ায় ভরে উঠলো। ও বললো, ও মিউ, তুই কি আমার সঙ্গে যাবি? ক্ষুধা পেয়েছে?
বিড়াল ছানা প্রতিটি কথার উত্তর দিলো-মিউ মিউ। তার অর্থ হ্যাঁ আমি যাবো। তুমি আমাকে নিয়ে চলো। আমার খুব ক্ষুধা পেয়েছে। মিতুলি বাচ্চাটিকে কোলে তুলে নিয়ে এলো বাড়িতে। মা বললো, এটাকে কোথা থেকে আনলি?
– পথে কাঁদছিলো।
– যাদের অন্তরে দয়া-মায়া বেশি, তারা ডাক্তার হলে ভালো হয়, তুই কি ডাক্তার হবি?
– আমি তাই হবো মা। দুঃখী জনের সেবার মধ্যে কী যে শান্তি তা সবাই বুঝতে পারে না।
এই কথাগুলো-মিতুলির মনের মধ্যে প্রতিনিয়ত ধুমের মতো জ্বলতো আর ও পড়ালেখার প্রতি আর যত্নবান হতো। এভাবেই ক্লাসগুলো ডিঙিয়ে একদিন মেডিক্যালে ভর্তি হয়ে গেলো মিতুলি। বন্ধুত্ব হলো শানেয়াজের সঙ্গে।
তারপর অনেক চড়াই উতরাই পার হয়ে মিতুলি হয়ে গেলো ডাক্তার মিতু। বাড়তে লাগলো তার নাম-যশ। হসপিটালের আউট ডোরে ডাক্তার মিতুর কাছে ভিড় জমে গরিব-দুঃখীদের। মিতুর মমতা মাখা ব্যবহারই যেনো রোগীর রোগ কমিয়ে দেয় অনেকখানি।
একদিন রাত দুপুরে বেসামাল চিৎকার। একাব্বর জোয়ারদার বুঝি আর বাঁচে না। সেই রাতে তাকে ভ্যানে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় উপজেলা হাসপাতালে। ডিউটিরত ডাক্তার রোগী দেখেশুনে কিছু ঔষধ দিয়ে বললেন, জেলা সদরে নিয়ে যান। এখানে কাজ হবে না। অপারেশন করা জরুরি, তা না হলে রোগী বাঁচানো যাবে না।
কি আর করা, তখনই উপজেলা থেকে সিএনজি করে রোগীকে নিয়ে যাওয়া হয় সদর হাসপাতালে। তখন তার জ্ঞান নেই। ইমার্জেন্সিতে ভর্তি করা হলো একাব্বর জোয়ারদারকে। সেদিন নাইট ডিউটি ছিলো ডাক্তার মিতুর। রোগীকে স্যালাইন দিয়ে রুমে ফিরে এলো মিতু। তখন ভোরের আলো ফুটেছে। একটু পরই মিতু চলে যাবে তার কোয়ার্টারে। কিন্তু রোগীকে ফেলে রেখে এক্ষুনি তার চলে যেতে মন সায় দিচ্ছিলো না। কেননা, রোগী তার বিশেষ পরিচিত একজন। রোগীর সঙ্গে আসা লোকদের ডেকে আনা হলো চেম্বারে। এরা একজন একাব্বর জোয়ারদারের ভাই অন্যজন তার ছেলে। দু’জনই ভয়ে ভয়ে চিনি চিনি করে শেষে চিনতে পেরে জড়োসড়ো হয়ে বললো, আমাদের ডাকছেন?
ডাক্তার মিতু ক্ষণিকের জন্য একটু অন্যমনস্ক হয়ে পড়লেও নিজেকে সামলে স্বাভাবিক হয়ে বললো, চাচা আমাকে আপনি বলছেন কেনো! আমিতো আপনাদের স্নেহের সেই মিতুলি। আজ ডাক্তার মিতু। একাব্বর চাচার এ অবস্থা হয়েছে কতো দিন?
– অনেক দিন ধরেই ভুগছে।
– আমার কাছে আসেনি কেন? যাই হোক হাতে সময় নেই। আজই তাকে অপারেশন করতে হবে। অপারেশনের প্রয়োজনীয় ঔষধ লিখে দিচ্ছি, এগুলো বাইরে থেকে নিয়ে আসেন। আর আমার ডিউটি শেষ। আমি ভালো দু’জন ডাক্তারকে বলে যাচ্ছি তারা অপারেশন করবেন। তবে সন্ধ্যায় এসে আমি ভালো মন্দ দেখবো। চিন্তার কোনো কারণ নেই। আর একটি কথা, একাব্বর চাচাকে কোনোভাবেই বলবেন না যে, সে আমার আন্ডারে আছে। অথবা আমি এই হাসপাতালের একজন ডাক্তার।
– কেনো মা, তুমি আপন মানুষ- তোমার কথা বলবো না কেন?
– বললে তার ক্ষতি হবে। আপনারা বুঝবেন না। পরে আমিই তাকে যা বলার বলবো। কথাটা দু’জনই মনে রাখবেন।
ডাক্তার মিতু চলে গেলো। খালেক জোয়ারদার তার ভাতিজা জামালকে নিয়ে বাইরে এসে দাঁড়ালো। জামাল বললো, চাচা এই ডাক্তার মিতু? সিরাজ চাচার মেয়ে না!
– হ্যাঁ।
– ডাক্তার যদি আব্বার কোনো ক্ষতি করে!
সঙ্গে সঙ্গে ঠাস করে একটা থাপ্পড় পড়লো জামালের গালে। হারামির বাচ্চা হারামি-মিতু ডাক্তার। ডাক্তারের কাজই হলো রোগীর সেবা করা। সে সেবাও হয় মন-প্রাণ ঢেলে। ও ভদ্র শিক্ষিত। জোয়ারদারদের মতো শয়তানি রক্ত ওর শরীরে নেই, বুঝলি। তুইও তো দেখেছিস ওই মেয়ের পড়ালেখা আটকাবার জন্য তোর বাপে কত অত্যাচারই না করেছে ওদের ওপর। অতো সুন্দর মেয়েকে তোর বাপ বিয়ে দিতে চেয়েছিলো-তোর ‘ব’ কলম গুন্ডাভাই মজনুর সাথে। টাকা আর লাঠির শক্তি দিয়ে অন্ধকারে নামা যায় কিন্তু আলোর জগতে যাওয়া যায় না। আমিও অনেক দোষ করেছি। ওদের সাহায্যে এগিয়ে যেতে পারিনি। তবে ভাইকে অনেক বুঝিয়েও কোনো সুফল আসেনি।
পুরনো কথা মনের আগলে এসে খানিকটা ব্যথিত করে তুললো তার হৃদয়। যে কষ্ট অসহায়ের মতো পড়ে ছিলো বুকের মধ্যে-তা যেনো আজ সুযোগ পেয়ে বরফের মতো গলে যেতে চাইছে। কথা বলতে বলতে ভিজে উঠলো খালেক জোয়ারদারের চোখের পাতা। চোখের পানি মুছে ভাতিজার দিকে তাকিয়ে বললো, মিতুর কথা কোনোভাবেই-ভাইয়ের কানে দিবি না। হয়তো তার মনের মধ্যে অন্যরকম প্রতিক্রিয়া হতে পারে। অতসব আমরা বুঝবো না। চল ফার্মেসি থেকে ঔষধ নিয়ে আসি। ডাক্তার হঠাৎ ডেকে বসতে পারে।
দুপুর বারোটার দিকে মিতু তার ডাক্তার বন্ধুদের ফোন করে বললো, রোগী একাব্বর জোয়ারদার আমার রিলেটিভ। পাশাপাশি বাড়ি আমাদের। একটু খেয়াল রাখবেন। অপারেশনের পর বিকেলের দিকে একবার গিয়ে দেখে আসবো।
একটার দিকে খালেক জোয়ারদারকে ডেকে ডাক্তার বললেন, এখন রোগীর অপারেশনে যাবো। একটা বন্ড সই করে দেন। উনি ডাক্তার মিতুর রিলেটিভ। চিন্তার কোনো কারণ নেই আপনাদের।
মিতু পুরনো দিনের কথা ভাবতে চায় না। কিন্তু মনের প্রান্তর জুড়ে ছড়ানো ছিটানো স্মৃতিগুলো গর্ত থেকে বেরিয়ে আসা সাপের মতো এক যোগে মাথা তুলে দাঁড়ালো।
মিতুর বাবা সিরাজ মোল্যা রেলওয়ের চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী ছিলেন। মিতু যে বার মেডিকেলে ভর্তি হয় সে বারই তার বাবা মারা যায়। অল্প জমিজমা। কষ্টে সংসার চলেছে কিন্তু মিতুর পড়ালেখা বন্ধ হয়নি কখনো। মিতুর আর কোনো ভাই বোন নেই। সে ক্লাসের ফার্স্ট গার্ল এবং পড়ালেখায় ভালো হওয়ার কারণে তার সবরকম সাহায্য সহযোগিতা করেছে স্কুল কর্তৃপক্ষ এবং শিক্ষকগণ। তবে কোনো প্রকার সহযোগিতা সে পায়নি বাড়ির পাশের অশিক্ষিত দাঙাবাজ জোয়ারদারদের কাছ থেকে। পেয়েছে বাধা, শুনেছে কটুকথা।
স্কুল ছিলো নদী পারাপার। একবার পরীক্ষার সময় নৌকায় নদী পার হওয়ার সময় একাব্বরের ছেলে নৌকায় উঠে ওপারের কাছাকাছি পৌঁছাতেই ইচ্ছে করে নৌকা ডুবিয়ে দেয়। মিতুসহ অনেক যাত্রীই পানিতে পড়ে যায়। একমাজা পানিতে পড়ে অনেকের অনেক কিছু নষ্ট হয়ে যায়। মিতুর মাথা না ডুবলেও সব কিছু ভিজে হয় একাকার। হারিয়ে যায় পরীক্ষা দেয়ার কলম, হারিয়ে যায় পায়ের স্যান্ডেল। শয়তান ছেলে পাড়ে উঠে দৌড়ে চলে যায় দৃষ্টির আড়ালে।
সবার সামনে মিতু লজ্জা পেলেও ভেতরে ভেতরে প্রচন্ড জেদি হয়ে উঠে। এদিকে পরীক্ষার এক ঘণ্টা পার হয়ে গেছে। সেদিন ছিলো এসএসসি টেস্ট পরীক্ষার শুরু। ওর দেরি দেখে শিক্ষকেরাও ছিলেন উৎকণ্ঠায়। সবার একই ভাবনা-মিতুর কি কোনো বিপদ হলো? শরীর খারাপ না অন্যকিছু। কেননা, মিতুকে নিয়ে শিক্ষকদের গর্বের শেষ নেই। সবার স্বপ্ন মিতু ভালো রেজাল্ট করবে। স্কুলের সুনাম হবে।
এর মধ্যেই মিতু সরাসরি কমন রুমে গিয়ে ঢুকলো। ওড়না চিপে হাত পা মুছে নিলো। স্যালোয়ার কামিজ থেকেও যথাসম্ভব পানি ঝরায়ে হেড স্যারের রুমে ঢুকলো। সমস্ত ঘটনা বর্ণনা করলো। জোয়ারদারের ছেলে কিভাবে নৌকা দুলিয়ে এদিক সেদিক করে সময় অতিবাহিত করেছে সেটাও বললো মিতু।
স্যার বললেন, তুমি কি এভাবেই পরীক্ষা দিতে চাও? মিতু বললো, জি স্যার। আমাকে আলাদা একটা জায়গা দিন আমি সেখানে বসে পরীক্ষা দিব। আর একটা কলম চাই। কলম, স্যান্ডেল সব নদীতে হারিয়ে গেছে। স্যার বললেন, আমি ব্যবস্থা করছি। তুমি পুরো তিন ঘণ্টা সময়ই পাবে। চিন্তা না করে মন দিয়ে পরীক্ষা দাও।
সেদিন মিতুর তিন ঘণ্টা সময় লাগেনি। অনেক আগেই সে লেখা শেষ করতে পেরেছিলো। এ নিয়ে একাব্বর জোয়ারদারকে যা বলার শিক্ষকেরাই বলেছেন। এরপর এমন কোনো ঘটনা কেউ ঘটালে থানা এবং শিক্ষা বোর্ড থেকে এর অ্যাকশন নেয়া হবে। তবে একাব্বর জোয়ারদারের এক কথা, নদীতে নৌকা ডুবতেই পারে। সে দোষ আমার ছেলের ঘাড়ে আসবে কেনো? সে যাই হোক, সে বছর মিতু বোর্ডের মধ্যে সেকেন্ড স্ট্যান্ড করে। যখন গাঁয়ের প্রাইমারি স্কুল থেকে মিতু বৃত্তি পেয়ে হাইস্কুলে ভর্তি হয় তখন থেকেই নানান রকম কথার সৃষ্টি হতে থাকে। এ গাঁয়ের কোনো মেয়ে বেহায়ার মতো নদী পার হয়ে স্কুলে যায় না। সিরাজের মেয়েও হাইস্কুলে যেতে পারবে না। মেয়েদের এতো পড়ে হবেটা কি? ও কি জজ ব্যারিস্টার হবে? মোল্যাদের দৌড় মসজিদ পর্যন্ত আর মেয়েদের দৌড় রান্নাঘর পর্যন্ত।
সিরাজ মোল্যাও বলেছে, আমার মেয়ে হাইস্কুল কেনো, কলেজে পড়বে, ভার্সিটিতে পড়বে। আল্লাহর ইচ্ছায় আমি যদি বেঁচে থাকি। আর সে জজ ব্যারিস্টার না হলেও একদিন এই গাঁয়ের সুনাম সে বয়ে আনবে। আপনি গাঁয়ের ছেলেমেয়েদের পড়ালেখার জন্য উৎসাহ দেবেন অথচ তা না করে তাদের ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। এটা ঠিক না।
একাব্বর জোয়ারদারের গায়ে এতো সব ভালো কথা সয় না। সে বলেছে, এই মোল্যার পো মোল্যা, দুই পয়সার চাকরি করে ভাবছো আমি লাটের বাট হয়ে গেছি। তোমারে আমি ভিটে ছাড়া না করি তো আমি একাব্বর জোয়ারদার না।
– মিয়া ভাই, শুধু ভিটে ছাড়া নয়, দুদিনের এই দুনিয়া ছেড়ে সবাইকেই চলে যেতে হবে। তবে কে আগে যাবে আর কে পরে যাবে সে কথা একমাত্র আল্লাহই জানেন। আজ একটা কথা আপনাকে বলি, আল্লাহ পাক এতো যে মানুষ সৃষ্টি করেছেন তা শুধু একে অন্যের মঙ্গলের জন্যই। গোলমাল আর অশান্তির জন্য নয়। আমি গরিব মানুষ, আমার মতো আমাকে একটু শান্তিতে থাকতে দিন। আর আমার মেয়েটাকে উপকার করতে না পারেন ক্ষতি করবেন না।
বাবার সেই কথাগুলো আজ আবার নতুন করে মনে পড়ছে মিতুর। বাবার মৃত্যু সংবাদ শোনার পর মিতুর এমনই মনে হয়েছিলো যে, সমস্ত আকাশ যেনো কাচের দেয়ালের মতো মুহূর্তের মধ্যে ভেঙে তার মাথার ওপর পড়লো। চারদিকের অন্ধকার ছুটে আসছে তার দিকে। মিতু একটা চিৎকার দিয়ে জ্ঞান হারিয়ে ছিলো সেই দিন। সেদিন সে ছিলো মেডিক্যাল কলেজের হোস্টেলে।
এদিকে রেল কর্তৃপক্ষের সহায়তায় সিরাজ মোল্যার মরদেহ এসেছিলো তার গ্রামের বাড়িতে। মোল্যা পাকশি রেলওয়ে হাসপাতালে থাকা অবস্থায় কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করেছিলো যে, আমার একমাত্র মেয়ে ভিন্ন আর স্ত্রী ছাড়া বিশেষ আপনজন বলতে আর কেউ নেই। তাই মৃত্যুর পর তার লাশটা যেনো তার গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে দেয়া হয়।
মেডিক্যালের ডাক্তার আর বান্ধবীদের সেবা যত্নে মিতুর জ্ঞান ফিরেছিলো ভোরের দিকে। তার পূর্বেই ফোন এসেছিলো যে, সিরাজ মোল্যার লাশ তার গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়ে গেছে। অতএব পাকশিতে আসার প্রয়োজন নেই কারো। মিতুও চোখের পানি মুছতে মুছতে ঢাকা থেকে রওনা হলো-মাগুরার পথে। সঙ্গে এসেছিলো ওর দু’জন বান্ধবী।
সেদিন মানুষের ঢল নেমেছিলো মিতুদের ছোট্ট বাড়িতে। গাঁয়ের মানুষ ছাড়াও এসেছিলেন মিতুর স্কুলের শিক্ষকগণ এবং ছাত্র ছাত্রী। মিতুকে সান্তনা দেয়ার ভাষা ছিলো না কারো। তবে এই আশিস করেছিল যে, মিতুর দুঃখ-কষ্ট যেনো শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। সেদিন জোয়ারদার তেমন কোনো ভূমিকাই রাখেননি সেখানে। বরং একাব্বর জোয়ারদার খুশিই হয়েছিলো। মিতুর মা স্বামীর কবর আঁকড়ে ধরে একাই পড়ে থাকলো বাড়িতে। মিতু ফিরে গেলো তার মেডিক্যাল হোস্টেলে।

[বাকি অংশ আগামী সংখ্যায়]

SHARE

Leave a Reply