Home ক্যারিয়ার গাইড লাইন ক্যারিয়ার গঠনের কৌশল -ড. মুহা. রফিকুল ইসলাম

ক্যারিয়ার গঠনের কৌশল -ড. মুহা. রফিকুল ইসলাম

কিশোর ভাই ও বোনেরা আসসালামু আলাইকুম। দেখতে দেখতে ২০১৮ খ্রিস্টাব্দের চতুর্থ মাস এসে গেল। শীতের মিষ্টি মধুর স্মৃতিগুলো এক বছরের জন্য চলে গেল তাই না? আবার এক বছর অপেক্ষা করতে হবে। এখন বসন্তের মনোরম পরিবেশ ও পত্র-পল্লবের সমারোহ দেখছো। মহান আল্লাহ যেন বাংলাদেশকে সুন্দর করে সাজিয়েছেন। কবির বর্ণনায় সে বিবরণ এসেছে ‘এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে না তো তুমি… এ জন্য বলা হয় – God made the country and man made the town. যাই হোক বাংলাদেশের বৈচিত্র্য নিঃসন্দেহে মহান আল্লাহর অশেষ দান। বসন্তের সুন্দর আবহাওয়া তোমাদের মন-প্রাণকে সতেজ করুক এ প্রত্যাশা করছি।
প্রিয় বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয় অনেক কিছু কল্পনা কর, অনেক সুন্দর কিছু ভাবতে পারো, আবার অনেক কিছু তা বাস্তবে চিত্রায়ণ করতে পারো তাই না? অবচেতন মনে সবসময় যা উঁকি দেয় তা কি সবসময় বাস্তবে রূপ দেওয়া সম্ভব? হয়ত না। তবে সবটাই যে অসম্ভব তা কিন্তু না। এ ব্যাপারে তোমরা একমত হবে নিশ্চয়ই। আচ্ছা পড়ার টেবিলে, আয়নার সামনে অথবা ক্লাসের বেঞ্চে যখন একা বসে থাক, তখন তোমাদের মনে কত কল্পনা চলে আসে তাই না? কখনও কোন গল্পের নায়ক-নায়িকার মত, এলাকার বড় কোন ব্যক্তির মত অথবা সহপাঠীদের সফল কোন ভাই-বোনের জীবন সামনে চলে আসে। সেটা হতে ইচ্ছা করে। যেই ভাবনার ক্ষণ চলে যায়, বাস্তবে ফিরে আসো তখন সব অসম্ভব মনে হয়। আমার সাথে নিশ্চয় তোমরা একমত। এটা সবার হয়। বিশেষ করে যারা বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখে তাদের হয়। একই সময় অনেক সমস্যার পাহাড় সামনে চলে আসে, যা পার হওয়ার কোন উপায় থাকে না, আর স্বপ্নও কোন দিন বাস্তব হবে না বলে সবার বিশ্বাস জন্মে যায়।
আচ্ছা তোমাদের ছোট ভাই-বোন আছে যাদের বয়স দুই থেকে তিন বছর। তাদের কচি হাতে-পায়ের প্রচেষ্টাগুলো লক্ষ করেছো? কোন কিছু যখন তার থেকে দূরে বা উঁচুতে রাখ, সেটা পাওয়ার জন্য কতভাবে সে চেষ্টা করে। অথবা যখন তাকে চৌকাঠের মাঝে রাখা হয়, সেখান থেকে বের হওয়ার জন্য কতভাবে চেষ্টা করে। আমরা দেখে খুব মজা করি, ভিডিও করি, ফেসবুক টুইটারে আপলোড করি, আরো কত কি! আমরা সবাই শিশু বয়সে তা করেছি। তখন তো কোন বাধা মনে হয়নি। সর্বোচ্চ চেষ্টা করে হয়ত সে নিজে সফল হয়েছে অথবা তার চেষ্টা দেখে খুশি হয়ে তোমরা তাকে সেটা দিয়েছ। রাইট!
এবার আসি তোমাদের কথায়। তোমরা যারা কিশোরকণ্ঠের পাঠক, তারা নিশ্চয় এ ধরনের অনেক ধাপ পার হয়ে স্কুল বা মাদরাসায় পড়ালেখা করছো। তাহলে এখন তোমার কাছে কিছু বিষয় বাধা মনে হচ্ছে কেন? তোমরা তোমাদের চেষ্টার এবং পড়ালেখার বাধা হিসেবে কয়টি সমস্যা বের করতে পারবে? যা সমাধান হলে তোমার পড়ালেখার আর কোন অসুবিধা থাকবে না? এখনই একটা তালিকা করো। সে তালিকা থেকে প্রতিটি সমস্যা সমাধানের পথ নিজে বের করার চেষ্টা করো, দেখবে অধিকাংশ সমস্যা সমাধান করার জন্য তুমিই যথেষ্ট। বন্ধুরা আগামীতে আমরা ক্যারিয়ার গঠনের নানা ধরনের বাধা নিয়ে আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ। কিন্তু এখন যা বলতে চাই তা হলো তোমার জীবনকে কায়েকটি ভাগে ভাগ করো। যেমন-
১. শিশু শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি
২. পঞ্চম শ্রেণি থেকে অষ্টম শ্রেণি
৩. অষ্টম শ্রেণি থেকে এসএসসি
৪. এসএসসি থেকে এইচএসসি
৫. এরপর বিশ^বিদ্যালয় পর্ব
তোমরা যারা যে পর্যায়ে আছো সে পর্যায়ের সমস্যাগুলো খুঁজে বের করো, এরপর তা সমাধানের জন্য বাবা-মা, শিক্ষক-শিক্ষিকা, এলাকার বড় ভাইয়া বা আপুদের সাহায্য নাও। দেখবে সব সমস্যা সমাধান হয়ে যাবে।
যখন বড় হবে তখন সব সুবিধা কিন্তু তুমিই গ্রহণ করবে। অন্যদের ভাগ দেওয়া লাগবে না। তোমরা তোমাদের সময়ের কাজ যথাসময়ে করলে ফলাফলটা যথাযথভাবে তুমিই লাভ করবে। অন্যকে দেখে আর স্বপ্ন খুঁজতে হবে না, বরং তুমিই অন্যের স্বপ্নের আইকন বা মডেল হয়ে যাবে। ইচ্ছা করে না সে রকম একজন হতে? নিশ্চয় করে সে জন্য একটু কাঠ-খড় পোড়াতে হবে, কারণ তোমাদের কাছে অসাধ্য কিছুই নেই। একটা গল্প বলি-
এক অফিসের কর্মচারী তার বসকে বলছে, বস আমি সারাদিন পঞ্চাশ পৃষ্ঠার বেশি লিখি এবং মাস শেষে মাত্র বিশ হাজার টাকা বেতন গ্রহণ করি। আর আপনি সারাদিন কিছু স্বাক্ষর করেন আর মাস শেষে পঞ্চাশ হাজার টাকা বেতন গ্রহণ করেন এটা কি হয় বলেন? বস কিছুক্ষণ কর্মচারীর দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন ‘কী করবো বলো? আমি তো ছাত্রজীবনে ঐসব পৃষ্ঠাগুলো লিখে শেষ করে এসেছি, এখন আর লিখতে হয় না। আর তুমি যে ছাত্রজীবনে না লিখে ফাঁকি দিয়েছিলে সে জন্য সেই লেখাগুলো এখন লিখতে হচ্ছে!’ কর্মচারী অতীতের ফাঁকিবাজির কথা চিন্তা করে চুপ হয়ে গেল।
বন্ধুরা আসলেই কী এমন হচ্ছে না? সহপাঠীর একজন অফিস প্রধান, আরেকজন সে অফিসের দারোয়ান; একজন অফিসার, আরেকজন কেরানি; একজন ডাক্তার, আরেকজন রোগীর সিরিয়াল লেখক। কেন এমন হয়? একবার চিন্তা করো। নিশ্চয় চেষ্টা, পরিশ্রম এবং হার না মানা মানসিকতার জন্য একজন সফল আরেকজন বিফল হয়। মহান আল্লাহ সূরা আন নাজমের ৩৯ এবং ৪০ নং আয়াতে বলেছেন, ‘মানুষ যে চেষ্টা সাধনা করে তা ছাড়া আর কিছুই অর্জন করতে পারে না এবং তার চেষ্টা সাধনা অচিরেই মূল্যায়ন করা হবে।’ তিনি সূরা রাদের ১১ নং আয়াতে আরো বলেন : ‘আল্লাহ ততক্ষণ পর্যন্ত কোন জাতির অবস্থান বদলান না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের বদলে ফেলে। আর যখন কোন জাতিকে দুর্ভাগ্যে নিপতিত করার ফয়সালা করে ফেলেন, তখন কারো রদ করায় তা রদ হতে পারে না।’ এ ব্যাপারে আলবার্ট আইনস্টাইন বলেছেন (১৮৭৯-১৯৫৫ খ্রি.) You never fail until you stop trying ‘তুুমি কখনও ব্যর্থ হবে না, যতক্ষণ না তুমি চেষ্টা বন্ধ করছো । এ ছাড়া টি বেনেট বলেন, Do not fear failure but rather fear not trying. ‘পরাজয়ের ভয় করো না বরং চেষ্টা না করার ভয় করো।’ আরবি একটি প্রবাদ বাক্যে বলা হয়েছে ‘আস সায়্যু মিন্না, ওয়াল ইতমামু মিনাল্লাহ’ চেষ্টা আমাদের পক্ষ থেকে আর পূর্ণতা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে।
অতএব, বন্ধুরা ক্যারিয়ার গঠনের অনেক বয়ান অনেক স্থানে পাওয়া যাবে। কয়জন তা গ্রহণ করে এবং সে আলোকে চেষ্টা করে সেটাই বিবেচ্য। আমি তোমাদের সামনে কিছু ধারণা উপস্থাপন করি-
১.তুমি ক্লাসের পাঠের ব্যাপারে অমনোযোগী
২.কখনও তোমার শরীর ক্লাসে থাকে, মন বাইরে থাকে
৩.মায়ের অনেক আদেশ নিষেধ ইচ্ছা করে অমান্য করো
৪.অনেক সময় মিথ্যা কথা বলো
৫.অনেক কিছু করো, যা তুমি নিজেই বুঝতে পারো তা অন্যায়
৬.ইচ্ছা করে হাতের লেখা সুন্দর করো না
৭.ক্লাসের কাজ অসমাপ্ত রেখে ফেসবুকে যখন তখন সময় ব্যয় করো
৮.মা-বাবাকে না জানিয়ে রাতে জেগে থাক
৯.যে সময় ঘুমানো উচিত তার অনেক পরে ঘুমাও এবং দেরি করে ওঠ
১০.সালাত আদায়ের ব্যাপারে খুব অলসতা করো
১১.নিজের পরিপাটি এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে অমনোযোগী
১২.ফেসবুক বা ইন্টারনেটে নানারকম বন্ধু-বান্ধবী তালাশ করো
১৩.কোন পাঠ বুঝতে না পারলে তা ফেলে রাখ
১৪.টিভিতে নানা ধরনের সিরিয়াল, ক্রিকেট বা ফুটবল খেলা দেখে সময় অপচয় করো
১৫.তোমার বয়স সীমার বাইরে অন্য কাজ করো
১৬.দুষ্ট বন্ধু-বান্ধবীদের সাথে আড্ডা দাও
আচ্ছা, এসব কারণে তোমার অধ্যয়নের সমস্যা হয় না? এ ছাড়া আরো আছে যা আমি জানি না। এগুলো তো তোমরা নিমিষেই ব্যক্তিগতভাবে সিদ্ধান্ত নিয়ে বাদ দিতে পারো এবং সুন্দর ভবিষ্যৎ এবং উজ্জ্বল ক্যারিয়ার গঠন করতে পারো। আমরা আশা করি তোমার ক্যারিয়ার গঠনে তোমার ভালো লাগা কিন্তু মারাত্মক ক্ষতিকর বাধাগুলো দৃঢ় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ত্যাগ করবে। তোমাকে উচ্চতার শীর্ষে নিয়ে যাবে, সৎ, নৈতিক ও ধার্মিক হওয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে, মানবতার সেবা করবে, তাহলে তোমার সফলতা আসবেই ইনশাআল্লাহ।

SHARE

Leave a Reply