Home গল্প অনুবাদ গল্প বরফ ঝড় -মূল : তারা স্ট্রল, অনুবাদ : হোসেন মাহমুদ

বরফ ঝড় -মূল : তারা স্ট্রল, অনুবাদ : হোসেন মাহমুদ

বাইরের তাপমাত্রা শূন্যের দশ ডিগ্রি নিচে। এ সময় তাপমাত্রা এ রকমই হয়। শীতকাল বলে ঠান্ডা আরো বাড়বে। ঘরের বাইরে এসে দাঁড়াল পিটার। ঠান্ডাকে মোটেই পাত্তা দিল না সে। এ আবহাওয়াতেই বড় হয়েছে সতেরো বছরের পিটার। জঙ্গলের মধ্যে এক কেবিনে জন্ম হয়েছিল তার। সুতরাং শীত তার জন্মসঙ্গী। এই কঠিন আবহাওয়ার মধ্যে বিগত বছরগুলোতে সে দীর্ঘদেহ, বলিষ্ঠ, কষ্টসহিষ্ণু শিকারে পটু এক তরুণ হিসেবে গড়ে উঠেছে। একটু দূরে একটি র‌্যাকে তার স্নো শু জোড়া রাখা। প্রায় তিন ফুট ঘন বরফের ভেতর দিয়ে পা টেনে টেনে সেদিকে এগিয়ে যায় সে। স্নো শুর কাঠামো কাঠের, পশুর চামড়া দিয়ে মোড়ানো। গোটা শীতকালটা এগুলোকে বাইরে রেখে দিতে হয়। কারণ, এ সময় ঘরের মধ্যকার আবহাওয়া স্নো শুর জন্য অনুকূল নয়। স্নো শু পায়ে সহজেই সে ররফ পেরিয়ে কাছের কুকুর থাকার ঘরের দিকে এগিয়ে যায়। সেখানে ঠান্ডায় কুঁকড়ে শুয়েছিল একটি অল্পবয়সী তবে আকারে বেশ বড় একটা ম্যালামিউট। ধূসর ও বাদামি রঙ মেশানো কুকুরটার কান দু’টি বড়, মুখের ওপর সাদা দাগ। পিটার ডাকল-
: উঠে পড় চকোলেট, আমরা এখন ট্র্যাপলাইনটা দেখতে যাব।
তার ডাক শুনে উঠে দাঁড়ায় কুকুরটি।
এ প্রচন্ড ঠান্ডায় শরীর গরম রাখার জন্য কয়েক প্রস্থ কাপড় গায়ে জড়িয়েছে পিটার। পিঠে রয়েছে নানা জরুরি জিনিসে ঠাসা ব্যাকপ্যাক। কিন্তু চকোলেটের এ সবের বালাই নেই। তার গায়ের ঘন পশমই ঠান্ডা থেকে রক্ষা করে তাকে। আবহাওয়া খারাপ-ভালো যাই হোক, তার কোনো অসুবিধা হয় না। প্রকৃতিই এ ব্যবস্থা করেছে। পিটার চকোলেটের পিঠে আরেকটি প্যাক বেঁধে দেয়। বলে- চল, এবার রওনা হই আমরা।
বনের ভেতর পিটারকে অনুসরণ করে চলে চকোলেট। পিটারের ট্র্যাপলাইন পনেরো মাইল দীর্ঘ। ট্র্যাপলাইনের শেষ মাথায় বনের মধ্যে কাঠের একটি কেবিন আছে। সেখানে পৌঁছে সে ঘুমাবে। বাড়ি ফিরবে পরদিন। পথের দূরত্ব নিয়ে ভাবছে না সে। তার আর চকোলেটের জন্য দিনে পনেরো মাইল পথ পাড়ি দেয়া কোনো ব্যাপারই নয়। পাইন বনের ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলে দু’জন। চকোলেট দৌড়ে আগে চলে যাচ্ছে, তারপর আবার পিছনে পড়ে যাওয়া পিটারের কাছে ফিরে আসছে। পিটার ও চকোলেট কেউই সামনের দিকে সোজাসুজি তাকাতে পারছে না। বরফের ওপর সূর্যের আলোর প্রতিফলনের কারণে তাদের চোখ ব্যথা করছে। এর মধ্যেই চকোলেট কোনো কাঠবিড়ালির দেখা পেলেই তাকে ধাওয়া করে ট্র্যাপলাইন থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। তার এই কান্ডকারখানা দেখে বেশ মজা পাচ্ছিল পিটার। একবার চকোলেট কি যেন একটি প্রাণীকে দেখতে পেয়ে বিদ্যুৎগতিতে তার পিছু ধাওয়া করল। কিন্তু বহু দৌড়াদৌড়ি করেও সেটাকে ধরতে পারল না সে। নিষ্ফল আক্রোশে বেশ কিছুক্ষণ ডাকাডাকি করে অবশেষে হার মেনে ফিরে এল পিটারের কাছে।

২.
ট্র্যাপলাইনের পুরোটা জুুড়ে নির্দিষ্ট দূরত্বে একেকটি ফাঁদ পাতা। সব মিলিয়ে অনেকগুলো ফাঁদ। প্রতিটি ফাঁদের কাছে পৌঁছে টোপ বদলে দিল পিটার। কোথাও নতুন করে ফাঁদ পাতল। কোনো ফাঁদে কিছু পাওয়া গেলে সেগুলো তুলে নিয়ে রেখে দিল ঠিকমত। ফাঁদের টোপ রাখা চকোলেটের পিঠের প্যাকে। কাজ করতে করতে খুশি মনে শিস দিয়ে এগোতে থাকে পিটার। তার ও চকোলেটের এ পথ খুব ভালো করেই চেনা। তার পাতা ফাঁদের প্রথম তিনটিই ছিল শূন্য। চার নম্বরটায় একটি বড় খরগোশ মিলল। পাগুলো ভালো করে বেঁধে নিজের ব্যাকপ্যাকের সাথে সে ঝুলিয়ে দিল শিকারটাকে। আরো যদি কিছু শিকার মেলে তাহলে সবগুলো এক সাথে করে বাড়ি নিয়ে যাবে। তারপর সে আর তার মা শিকারগুলোর চামড়া ছাড়িয়ে নিয়ে মাংস বিক্রি করে দেবে। গোটা শীতকাল ধরেই এ কাজ চলবে। পিটারের বাবা নেই। সংসারে দু’জন মাত্র মানুষ তারা- সে আর তার মা। মা শহরে ছোট একটা কাজ করে কিছু টাকা পায়। তা দিয়ে সংসারের পুরো খরচ মেটে না। শীতের সময় পিটারের ট্র্যাপ লাইনটা তাদের আয়ের একটা বড় উৎস। এ সময় অনেক শিকার মেলে। শিকারের মাংস ও চামড়া বিক্রি করে যে টাকা আসে তা অনেক কাজে লাগে তাদের ।
পাঁচ নম্বর ফাঁদটা শূন্য দেখে খুব হতাশ হয় পিটার। তবে ছয় নম্বরটাতে একটি মেরু শিয়াল মেলে। খুশিতে শিস বাজাতে বাজাতে এগোয় পিটার। হঠাৎ পিটার লক্ষ করে- আবহাওয়ার পরিবর্তন ঘটছে। ঠান্ডা বাড়তে শুরু করেছে। আকাশও ঢাকা পড়েছে ঘন মেঘে। প্রবল হচ্ছে বাতাসের বেগ। নাকের ডগায় ঠা-ার তীব্র কামড় অনুভব করে পিটার। হালকা তুষার ঝরতে শুরু করে। তবু থামল না সে। নয় নম্বর ফাঁদে পেল একটা এরমাইন। এর পশমের ভীষণ চাহিদা, দামও অনেক। খুশি মনে প্রাণীটাকে ফাঁদ থেকে ছাড়িয়ে নেয় সে।
দশ নম্বর ফাঁদের দিকে এগোয় তারা। এ সময় বাতাস আরো জোরালো হয়ে ওঠে। ঘন চাদরের মত বরফ পড়ছে। দু’হাত দূরের কিছুও আর চোখে দেখা যাচ্ছে না। চকোলেটের উদ্দেশে বলে পিটার-
: বরফ ঝড় শুরু হয়ে গেছে রে! থামতে হবে আমাদের। চল দেখি, কোনো আশ্রয় পাওয়া যায় কিনা।
চকোলেট ভোউ ভোউ ডাক ছেড়ে তার কথায় সমর্থন জানায়।
একটা আশ্রয়স্থল পাওয়া যায়। অনেক পুরনো একটা কাঠের ছোট ঘর। হঠাৎ বরফ ঝড়ের কবলে পড়া মানুষের বিপদের আশ্রয়। এ বনে এ রকম কয়েকটি ঘর আছে। পিটার চকোলেটকে বলে-
: তুই এখানে থাক। আগুন জ¦ালতে হবে। আমি যাচ্ছি, কিছু শুকনো কাঠ যোগাড় করে আনি।
চকোলেটকে রেখে বেরিয়ে পড়ে পিটার। ঘন বরফ ভেঙে এগোয়। কোন দিকে যাচ্ছে – জানে না। তার মাথায় একটিই চিন্তা, কিছু শুকনো কাঠ যোগাড় করতে হবে। অবশেষে ঝড়ে উড়ে আসা একটি গাছ পেয়ে যায় সে। যতটা পরিমাণ সম্ভব ডালপালা কুড়িয়ে নিয়ে আশ্রয়স্থলে ফেরার পথ ধরে পিটার।
কয়েক পা এগিয়েই থেমে যায় সে। ভয়ের একটা শিহরণ বয়ে যায় তার মেরুদন্ড দিয়ে। হায়! কোনদিকে যাবে সে? কিছুই তো দেখা যাচ্ছে না। আশ্রয়স্থলটা কোথায়?
একটুক্ষণ থেমে নিজেকে আশ্বাস দেয়ার চেষ্টা করে সে- ভয় পাওয়ার কিছু নেই। আমি তো আশ্রয়স্থল থেকে পঞ্চাশ ফুটের বেশি পথ আসিনি। চকোলেটকে ডাকলেই সে সাড়া দেবে। আর তার ডাক শুনে এগোলেই আশ্রয়স্থলটা খুঁজে পাব।
: চকোলেট! চকোলেট!!
চিৎকার করে ডাকে পিটার। কিন্তু বাতাসের গর্জনে তার ডাক চাপা পড়ে যায়। তারপরও চকোলেটকে ডাকতে ডাকতে আন্দাজের ওপর নির্ভর করে ফেলে আসা আশ্রয়স্থলের দিকে এগোতে থাকে সে। কিন্তু চকোলেটের কোনো সাড়া পাওয়া যায় না।
হঠাৎ সামনে অস্পষ্ট কিছু দেখতে পায় পিটার। ঠিক বোঝা যায় না সেটা কি। তবে তার দিকেই এগিয়ে আসছে সেটা। বরফে মোড়া কোনো প্রাণী, নেকড়ের আকার। পিটার পিছিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু প্রাণীটি আরো কাছে এসে পড়ে তার। শান্ত থাকার চেষ্টা করে পিটার। নেকড়েরা সাধারণত মানুষকে আক্রমণ করে না। প্রাণীটি তার আরো কাছে চলে এসেছে। পিটার তখনো বুঝতে পারে না প্রাণীটি আসলে কী। এ সময় অচেনা জন্তুটি তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
বিস্ময়ের ধাক্কাটা কাটিয়ে ওঠার পর প্রাণীটিকে চিনতে পেরে ভীষণ খুশি হয়ে ওঠে পিটার- চকোলেট। মনিবের কাছে দাঁড়িয়ে ডাক ছাড়ে কুকুরটি- ভোউ! ভোউ!!
চকোলেট পথ দেখিয়ে আশ্রয়স্থলে নিয়ে আসে তাকে। ঘরে ঢুকেই কাজ শুরু করে পিটার। তার হাত ও পা ততক্ষণে অসাড় হয়ে গেছে। কানেও অনুভূতি নেই। গায়ের পোশাকের ওপরের প্রস্থটা বরফে ভিজে উঠেছে। ভেজা কাঠ কেটে স্তূপ করে সে। পাতাগুলো তার নিচে রাখে যাতে আগুন ধরানো সহজ হয়। চকোলেটের দিকে তাকিয়ে বলে-
: এবার আগুন জে¦লে গা গরম করে নেই- কি বলিস!
পকেটে হাত ঢুকিয়ে বরফের মূর্তি হয়ে যায় পিটার। বেশ কয়েক মুহূর্ত এভাবে কেটে যায়। তারপর তার গলা থেকে আর্তনাদ বেরিয়ে আসে-
: চকোলেট! ম্যাচ আনতে ভুলে গেছি রে।
চকোলেট যেন তার কথা বুঝতে পারে। করুণ স্বরে ডাকতে থাকে সে।
: আরে, কি করছিস তুই? এতে ভেঙে পড়লে চলবে কি করে?
চকোলেটকে নয়, নিজেকেই বুঝি সাহস দিতে চাইল পিটার। হঠাৎ করেই উজ্জ্বল হয়ে উঠল তার ম্লান চেহারা। কথা ফুটল আবার তার মুখে-
: আরে চকোলেট, তুই তোর করুণ ডাকাডাকি থামা। দেখি, কোনো উপায় বের করা যায় কিনা। আচ্ছা, এবার না হয় ম্যাচের প্যাকেটটা আনিনি। কিন্তু আগের বারের ম্যাচ তো ব্যাকপ্যাকে থাকার কথা, নয় কি?
ব্যাকপ্যাক সামনে নিয়ে এসে স্ট্র্যাপ খোলে পিটার। ভেতরে খোঁজাখুঁজি করে একটা পুরনো ব্যবহৃত ম্যাচ পেয়ে যায়। খুশিতে ম্যাচবাক্সের গায়ে চুমু খায় সে।
: ভাগ্য খুব ভালোরে চকোলেট, ম্যাচ পেয়ে গেছি দেখ। কয়েকটা কাঠি আছে। আর চিন্তা নেই।
কাঠগুলো ভেজা। এই ভেজা কাঠ ম্যাচের কাঠি দিয়ে জ¦ালানো কঠিন হবে। একবার আগুন ধরানো গেলে তা আর নিভতে দেয়া যাবে না। বাইরে যেভাবে বরফ ঝড় বাইছে তাতে আজ আর কেবিনে পৌঁছনো যাবে বলে মনে হয় না। তার মানে রাতটা এখানেই কাটাতে হবে। তা যদি হয় তাহলে ঘুমানো চলবে না। ঘুমালে আগুন নিভে যাবে, তার ফল হবে ঠান্ডায় জমে মৃত্যু। কিন্তু কথা হচ্ছে, যে কাঠ যোগাড় হয়েছে তাতে সারা রাত আগুন জ্বলবে না। অতএব আরো কাঠ যোগাড় করতে হবে। এ সময় বার্চ গাছের ছাল পাওয়া গেলে খুব ভালো হতো- ভাবে পিটার। তাতে আগুন ধরাতে সুবিধা। চকোলেটের দিকে তাকায় পিটার। বলে-
: তুই তো জানিস এখনি মরতে চাই না আমি। এখন আরো কাঠ সংগ্রহ করতে আবার বাইরে যাচ্ছি। যদি আজকের রাতটা বেঁচে থাকতে পারি তাহলে কালকে কেবিনে পৌঁছতে পারব। সেখানে খাবার, আগুন, রান্না করার স্টোভ ও রেডিও আছে। কিন্তু তার জন্য সবার আগে আগুন চাই।
কাঠ সংগ্রহের জন্য আশ্রয় ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে পিটার।
পিটার ফিরে আসে এক বোঝা কাঠ, বার্চের ছাল ও পাতা নিয়ে। সব এক সাথে জড়ো করে ম্যাচের কাঠি জ্বালায়। কিন্তু বার্চের ছালে আগুন ধরে না। সেগুলো ছিল বেশি ভেজা। প্রথমবার আগুন একটুখানি জ¦লে উঠে নিভে গেল। আবার চেষ্টা করে পিটার। এবার অন্য একটি ছালে আগুন ধরাতে চাইল সে, কিন্তু লাভ হলো না। তৃতীয় দফায় চেষ্টা চালায় পিটার। এবার সফল হয়। একটু একটু করে বড় হতে থাকে আগুন।
সারা রাত না ঘুমিয়ে কাঠের টুকরো ও বার্চের ছাল দিয়ে আগুন জ¦ালিয়ে রাখল পিটার। কিন্তু ভোরের দিকে আর পারল না। কখন যে সে ঘুমিয়ে পড়েছে তা নিজেও জানে না। যখন জাগল, তখন সকাল সাতটা বেজে গেছে। জিনিসপত্র গুছিয়ে নেয় সে। আগুনের শেষটুকু নেভায়। চকোলেটকে বলে-
: চলরে চকোলেট, আমাদের যাবার সময় হয়েছে।
বাইরে তখন প্রকৃতির অন্য চেহারা। প্রচন্ড বরফ ঝড়, অন্ধকার রাত, হাড় কাঁপানো ঠান্ডা- এ সবের কিছুই আর এখন নেই। সূর্যের উজ্জ্বল আলোয় চারদিক ঝলমল করছে। আবহাওয়া উষ্ণ। বরফ ঝড় রাতেই থেমে গিয়েছিল। বনের গাছগুলোর ডাল থেকে ঝুলছিল বরফের ঝালর। চারপাশে সবখানে পুরু হয়ে জমে আছে বরফ। সবকিছুই ধবধবে সাদা। এ সময় কাছের একটি গাছের ডাল থেকে বরফের একটি বড় টুকরো খসে পড়ে চকোলেটের মাথার ওপর। চমকে উঠে মাথা ঝাড়া দিয়ে বরফের টুকরোটা ফেলে দেয় সে। এটা দেখে হেসে ফেলে পিটার। তারপর ট্র্যাপলাইনটা খোঁজে। পায় না। বরফে ঢাকা পড়ে গেছে। হাঁটতে হাঁটতে এক সময় অস্পষ্ট ভাবে ট্র্যাপ লাইনের আভাস পায়। দু’জন এগিয়ে চলে। চকোলেটকে বলে পিটার-
: ট্র্যাপ লাইনের ট্রেইল তো এটাই মনে হচ্ছে রে। তাড়াতাড়ি চল, কেবিনে গিয়ে দুপুরের খাবার খাব আমরা।
কিছুটা এগিয়ে হঠাৎ খেয়াল করে পিটার- চকোলেট তাকে অনুসরণ করছে না। ঘুরে পিছনে তাকায় সে। চকোলেট ডেকে ওঠে। আয় চকোলেট, দেরি করিস না- বলে মাথা ঘুরিয়ে ট্রেইল ধরে চলতে থাকে পিটার। কিন্তু চকোলেট পেছনে ডাকতেই থাকে।
পিটার বিরক্ত হয়। ডাকে- চলে আয় চকোলেট, দেরি হয়ে যাচ্ছে।
এবার তার দিকে দৌড়ে আসে চকোলেট, প্যান্ট কামড়ে ধরে তাকে অন্যদিকে টেনে নিয়ে যেতে থাকে।
: কী হয়েছে চকোলেট? ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করে পিটার। তারপর নিজের পথে ফিরে আসে সে। চকোলেট অনুসরণ করে তাকে। সন্তুষ্ট হয় পিটার। তবে চকোলেটের আচরণ তার মনে প্রশ্ন জাগিয়ে তোলে।
দিনটা আরো উষ্ণ হয়ে ওঠে। বরফ গলে যাচ্ছিল। প্রায় দু’ঘন্টা ধরে হেঁটে চলে দু’জন। হঠাৎ থেমে যায় পিটার। বলে-

৩.
: চকোলেট, কোনো ফাঁদ দেখছি না। তার মানে আমরা ট্র্যাপলাইনে নেই। সর্বনাশ, আমরা বোধ হয় পথ হারিয়ে ফেলেছি। তুই ভালো কাজই করেছিলি রে। এখন বুঝতে পারছি, তখন আমার প্যান্ট কামড়ে ধরে ঠিক পথে নিয়ে যেতে চেয়েছিলি। কি আর করা! হতাশ হলে তো চলবে না। চল দেখি ট্র্যাপলাইনটা খুঁজে বের করা যায় কিনা। তবে আমার মনে হচ্ছে আমরা ট্র্যাপলাইনের সাথে সমান্তরাল ভাবে এগোচ্ছি। এখন আমাদের শর্টকাট একটা পথ বের করতে হবে বনের ভেতর দিয়ে। চল।
পথ ছাড়া হাঁটছিল তারা, ফলে গতি মন্থর হয়ে পড়েছিল। গাছের ডাল সরিয়ে কিংবা বিভিন্ন বাধা পেরিয়ে যেতে হচ্ছিল। পিটার আগে, পেছনে চকোলেট। কিছুক্ষণ হেঁটে চলে তারা। তারপর থেমে পড়ে পিটার। চকোলেটকে বলে-
: আমার মনে হয় আমাদের ফেলে আসা আশ্রয়ে ফিরে যাওয়া উচিত। সেখানে গিয়ে ট্র্যাপলাইনটা খুঁজে বের করতে হবে। এই শর্টকাট পথ ধরে যাওয়াটা বোধ হয় বোকামি হচ্ছে। এতে দেরি হয়ে যাবে। তাহলে মা আমাদের জন্য চিন্তিত হয়ে পড়বে। শিগগিরই একটা সার্চ পার্টিও পাঠাবে হয়ত। কিন্তু ভয় হচ্ছে, আমাদের ফিরতে দেরি দেখে মা নিজেই না আবার বেরিয়ে পড়ে।
হঠাৎ পিটার বরফে ফাটল ধরার শব্দ শুনতে পায়। তাকিয়ে দেখে, তার পায়ের নিচে বরফ দু’ভাগ হয়ে গেছে। সতর্ক হওয়ার আগেই নিজেকে হিমশীতল পানির এক পুকুরের মধ্যে আবিষ্কার করে সে। তার চারপাশে বরফের চাঁই ভাসছে। ইতোমধ্যেই ভয়ঙ্কর ঠা-ায় শরীর অবশ হতে শুরু করেছে। পিটার বুঝতে পারে, দ্রুত এখান থেকে উঠতে না পারলে ঠা-ায় জমে মারা যাবে। কিন্তু হাত-পা নাড়াতেই তো পারছে না সে!
ঠিক তখনি বরফের চাঁইয়ের ওপর লাফিয়ে পড়ে চকোলেট। একটি থেকে আরেকটি। তারপর পানিতে নেমে পড়ে। সাঁতরে পিটারের কাছে পৌঁছে জ্যাকেটের ওপর দিয়ে তার বাহু কামড়ে ধারে সে। নিজের সবটুকু শক্তিতে তাকে টানতে থাকে ওপরের দিকে। পিটারও তাকে সাহায্য করে। কিছুক্ষণ পর সে উঠে আসে ওপরে।
বরফের ওপর শুয়ে পড়ে পিটার। জ্ঞান হারায়। পাগলের মত তার মুখ চাটতে থাকে চকোলেট। তার জিভের উষ্ণতায় পিটার জ্ঞান ফিরে পায়। পরম বন্ধুর দিকে চেয়ে বলে-
: তুই আমার প্রাণ বাঁচিয়েছিস চকোলেট। চকোলেট খুব গর্বিত ভঙ্গিতে তার দিকে তাকায়, লেজ নাড়াতে থাকে খুশিতে।
উঠে বসার চেষ্টা করে পিটার। পারে না। বাহুতে প্রচন্ড ব্যথা পেয়ে চিৎকার করে ওঠে সে। বুঝতে পারে, চকোলেট বাহু কামড়ে ধরে তার অসাড় দেহটা টেনে তোলার সময় বেকায়দা টান লেগে কাঁধের হাড় সরে গেছে। তার কথা যেন কুকুরটা বুঝতে পারে। করুণ হয়ে ওঠে তার চাহনিটা। তা লক্ষ করে পিটার। সান্ত¡না দিতে বলে-
: তোর তো কোনো দোষ নেইরে চকোলেট। আমি তোর ওপর রাগ করিনি। তুই আমার প্রাণ বাঁচিয়েছিস- এটাই বড় কথা। এখন কি করা যায় ভেবে দেখি।
পিটার বরফের মধ্যে পড়ে থাকা একটা পাথর তুলে নেয় ডান হাতে। ডান দিকের কাঁধের হাড়ই সরে গেছে। পাথর ধরা হাত উঁচু করে এদিক ওদিক ঘোরায়, যদি হাড়টা এভাবে সরে ঠিক জায়গায় চলে আসে। কয়েকবার চেষ্টা করে। হঠাৎ হাড়টা ঠিকমত বসতেই ব্যথা পেয়ে সে আর্তনাদ করে ওঠে। তারপর স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। যাক, সমস্যাটা ঠিক হয়ে গেছে।
হাতের ব্যবস্থা তো হলো। এখন ভেজাকাপড় দ্রুত পাল্টানো দরকার, পিটার ভাবে। কিন্তু তার সাথে অতিরিক্ত কোনো কাপড় নেই। এখন গায়ের কাপড় আগুনে শুকানোই একমাত্র উপায়। কিন্তু তখনি মনে পড়ে যে তার কাছে যে ম্যাচ ছিল, ভেজা কাঠ জ¦ালাতে গিয়ে কাল রাতেই তার সবগুলো কাঠি শেষ হয়ে গেছে। আগুন পরে দেখা যাবে, আগে কিছু পেটে দিয়ে নেয়া যাক- ভাবে সে। ব্যাকপ্যাকে শুকনো মাংসের টিকিয়া আছে। তা বের করে কিছু নিজে নেয় ও চকোলেটকে দেয়। খাওয়া শেষে উঠে দাঁড়ায়। চকোলেটকে বলে-
: ট্র্যাপলাইনটা খুঁজে বের করতে হবে। আর দেরি করা যায় না। চল।
পেটে কিছু খাবার পড়ার ফলে দু’জনের দেহেই নতুন করে শক্তি ফিরে এসেছিল। একটানা দু’ঘন্টা এগিয়ে চলে তারা। এবার চকোলেট পিটারের প্রায় পনেরো ফুট আগে আগে থাকছিল। হঠাৎ সে কোথাও পড়ে গেল বলে মনে হল পিটারের। তাকে আর দেখা যাচ্ছিল না। কি হলো তা বোঝার জন্য দৌড়ে যায় পিটার। দেখে, প্রায় দশ ফুট মত গভীর এক গর্তের মধ্যে পড়ে গেছে চকোলেট।
মুহূর্তেই করণীয় স্থির করে ফেলে পিটার। গর্তটার পাড় এমন খাড়া যে তা বেয়ে নিচে নামা সম্ভব নয়। নামতে হলে লাফ দিয়ে পড়তে হবে। সেক্ষেত্রে নিজে আঘাত পেতে পারে বা চকোলেটও আহত হতে পারে। পিটার দ্রুত ব্যাকপ্যাক থেকে রোল করা দড়ি বের করে। তার এক মাথা কাছের একটি গাছের সাথে গিঁট দিতে দিতে চকোলেটকে সাহস জোগায়-
: ভয় পাস নে চকোলেট। একটু ধৈর্য ধর। আমি আসছি। তোকে এখনি ওপরে তুলে আনব। কোনো চিন্তা করিস না।
দড়ি বাঁধা হয়ে গেলে সেটা ধরে গর্তের মধ্যে নামে পিটার। মাটিতে পা ভাঁজ করে বসে থাকা চকোলেট তাকে দেখে খুশিতে বার কয়েক ডাকে। তাকে অনেকক্ষণ জড়িয়ে ধরে রাখে পিটার। একটু পর চকোলেট উঠে দাঁড়ায়। পিটার লক্ষ করে, তিন পায়ের উপর দাঁড়িয়েছে সে। পেছনের বাম পাটা ভাঁজ করা, মনে হয় ভেঙে গেছে। তার গায়ে ভালো করে দড়ি জড়িয়ে দেয় সে। এবার দড়ি ধরে আগে নিজে ওপরে ওঠে, তারপর চকোলেটকে টেনে তোলে। নিজের শার্টের একটি অংশ ছিঁড়ে গাছের একটি ডাল কেটে তার ভাঙা পায়ে স্পিøন্টার বেঁধে দেয়। আবার ধীর গতিতে চলতে শুরু করে দু’জন ।

৪.
একটানা সাড়ে তিন ঘন্টা হাঁটে তারা। ততক্ষণে সন্ধ্যা নেমে এসেছে। বেড়েছে ঠান্ডা। শীতকালে সূর্য তাড়াতাড়ি ডোবে। তখন পর্যন্ত কেবিনের দেখা মেলেনি। চকোলেট পিটারের আগে ছিল। হঠাৎ ঘুরে পিটারের কাছে ছুটে আসে সে। ডাকতে থাকে অবিরাম। যেন সে বলতে চাইছে পিটার তার সাথে আসুক। পিটার ব্যাপারটি বুঝতে পেরে তার সাথে চলতে শুরু করে। চকোলেট যেখানে থামে তার সামনেই পিটারের পাতা একটি ফাঁদ দেখা যায়। শূন্য। তা হোক, ট্র্যাপলাইনটার হদিস তো পাওয়া গেল। এটা ধরে এগোলেই কেবিনের হদিস মিলবে। চকোলেটের মাথা নেড়ে আদর করে দেয় থাকে। পিটার হিসেব করে দেখে, কেবিনটা এখান থেকে আরো মাইল চারেক দূরে রয়েছে। তার মানে সেখানে পৌঁছতে বেশ রাত হয়ে যাবে। এদিকে দীর্ঘক্ষণ ভেজা কাপড়ে থাকার ফলে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল সে। অন্যদিকে কুকুরটিরও একটি পা ভেঙে গেছে। ফলে দ্রুত এগোনোর উপায় নেই। আবার এ খোলা জায়গায় রাত কাটাতে হলে ঠান্ডায় জমে মারা যেতে হবে। সুতরাং এগোনো ছাড়া বিকল্প নেই। চকোলেটকে বলে পিটার-
: চল এগোই, থামা চলবে না আমাদের।
আরো ঘন্টাখানেক হাঁটার পর একটু বিশ্রাম নেয়ার জন্য থামে পিটার। ভীষণ ক্ষুধা পেয়েছে। ব্যাকপ্যাক থেকে আরেক দফা শুকনো মাংসের টিকিয়া বের করে দু’জন খেয়ে নেয়। আবার চলতে শুরু করে তারা। বেশ কয়েকবার থামে, স্বল্পক্ষণের জন্য বিশ্রাম নেয়। তখনো কেবিন অনেক দূরে বলেই মনে হয় পিটারের। তবে যত সময়ই লাগুক, যখনি হোক, কেবিনে পৌঁছতেই হবে- নিজেকে মনে করিয়ে দেয় সে। অন্যথায় ঠান্ডায় জমে করুণ মৃত্যুই হবে তাদের নিয়তি।
রাত যত গভীর হতে থাকে আঁধারও যেন পাল্লা দিয়ে তত ঘন হতে থাকে। পিটার ফ্ল্যাশলাইট বের করে জ্বালায়। আলো খুব জোরালো না হলেও ট্র্যাপলাইনটা অনুসরণ করার ক্ষেত্রে সেটা বেশ কাজে আসে। একটুখানি আলো জ্বেলেই পিটার ফ্ল্যাশ লাইট অফ করে দেয় যাতে ব্যাটারি বেশি খরচ না হয়। তাদের চলার গতি ক্রমেই ধীর হয়ে আসতে থাকে। পিটারের মনে হয়, তার পা দু’টি যেন পাথরের তৈরি। কিছুতেই আর সেগুলো নড়তে চাইছে না। হাঁটার মধ্যেই ঘুমিয়ে পড়তে শুরু করে সে।
অবশেষে রাত এগারোটায় কেবিনে পৌঁছে পিটার ও চকোলেট। কেবিনটা দেখে পিটার এত খুশি হয় যে জীবনে আর কোনো কিছুতেই এত খুশি হয়নি সে। বাইরের চেয়ে কেবিনের ভেতরের উষ্ণতাটুকু ভীষণ ভালো লাগে তার। প্রথমেই সে রেডিও অন করে মায়ের সাথে কথা বলে। জানায়, পরদিন বাড়ি ফিরবে। কেবিনে খাবার, কম্বল, স্কি, মোমবাতি, ম্যাচ, তাঁবু, কাপড়- চোপড় সবই আছে। আগুন জ্বালিয়ে ঘর গরম করে পিটার। ভেজা কাপড় খুলে শুকনো পোশাক পরে। তারপর খাবার তৈরি করে নিজে নেয় ও চকোলেটকে দেয়। ফার্স্ট এইড বক্স বের করে চকোলেটের পায়ে নতুন করে ব্যান্ডেজ বাঁধে। বুঝতে পারে, তার পায়ের আঘাত তেমন গুরুতর নয়। রাত পোহালে চকোলেট প্রায় ঠিক হয়ে যাবে বলে আশা করল সে।
আগুনের তাপে সারা শরীর উষ্ণ হয়ে উঠেছে। সারাদিন প্রচন্ড ধকল গেছে। এখন তার একটা নিবিড় ঘুম দরকার। বিছানায় ঝাঁপিয়ে পড়ে পিটার।

* তারা স্ট্রল মার্কিন তরুণ প্রজন্মের লেখিকা। যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের রোজলিন হাইটসে বাস করেন। কিশোরদের জন্য প্রেরণামূলক বেশ কিছু গল্প লিখেছেন। তার এ গল্পটি ইন্টারনেট থেকে নেয়া। গল্পের মূল নাম ‘দি আল্টিমেট চ্যালেঞ্জ টু কাম হোম অ্যালাইভ।’

SHARE

Leave a Reply