Home ফিচার বৈশাখ আমাদের সংস্কৃতি -মুহাম্মদ নূরুল হুদা

বৈশাখ আমাদের সংস্কৃতি -মুহাম্মদ নূরুল হুদা

বৈশাখ বরণ নিয়ে নববর্ষে একটা আবহমান ধারা গ্রাম বাংলায় লক্ষ করে থাকি। অনুষ্ঠিত হয় নানান মেলা। শহর বন্দরে যেভাবে মাতামাতি হয় গ্রামবাংলায় ততটা হয় না। গ্রামে এই সময়ের সংস্কৃতি আপন মহিমায় উদ্ভাসিত, যা গ্রীষ্ম ঋতুর অংশবিশেষ বলা চলে। এতে নেই বাড়াবাড়ি। হাটবাজারে পাওয়া যায় মাছ, ঘোড়া, গরু, পাখি, হরিণ, মঠ জাতীয় চিনি সাঝ এবং মিষ্টি জাতীয় ও মিষ্টি ছাড়া মুড়মুড়া বা আখরি (টাঙ্গাইলের ভাষা)। এগুলো বৈশাখকে পরিচিত করে দেয় গ্রামবাংলায়। আর মেলায় চড়কগাছ ঘোরানো (নাগরদোলা) খেলাসহ নানা ঐতিহ্যভিত্তিক জিনিস পাওয়া যায়। আর এ মেলা থেকে আম (কাঁচা) কাটার ছুরি বা চাকুই স্মরণ করিয়ে দেয় আম, কাঁঠাল ও লিচুর মওসুম এসেছে। আর এ সময় চিনি সাঝ, মুড়মুড়া ও বিন্নিধানের খই নিয়ে আত্মীয়ের বাড়িতে বেড়াতে দেখা যায়। বৈশাখ মানে চৈত্রের খরতাপ শেষে কৃষকের কল্যাণে বয়ে যাওয়া শান্তির বারিধারা। কৃষক মহা আনন্দে আউশ ধান ও পাট চাষের প্রস্তুতি নেয়। ঐ কৃষকের জন্যই তার ছেলেকে সকালের খাবার পানতা ভাত নিয়ে যেতে দেখা যায়। কয়েক দিনের মধ্যেই ছোট ছোট ধানগাছ ও পাটগাছ গজাতে দেখা যায়। আর চলে নিজের সন্তানের মতোই পরিচর্যা।
আবার বৈশাখ মানেই কালবৈশাখী ঝড়, টর্নেডো ইত্যাদি। মুহূর্তেই সব লন্ডভন্ড হয়ে প্রাণ হারায় বহু বনি আদমসহ অসংখ্য জীবজন্তু। আমি ষাটের দশকে দেখেছি কালবৈশাখী ঝড়ে সারস পাখি, শকুন কাক ও শালিকসহ অসংখ্য পাখি নেতিয়ে পড়ে থাকতে। মনে হয়েছে যেন কালবৈশাখী ঝড়ে সব লন্ডভন্ড করে গেছে। বাড়িঘর সব ওলট-পালট করে দিয়ে গেছে।
বাংলা বর্ষবরণের কোনো সুনির্দিষ্ট ইতিহাস পাওয়া যায় না। কারো কারো মতে বাংলা সন চালু করেছেন মোগল সম্রাট আকবর। বাদশাহি খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্যই নাকি তিনি হিজরি ৯৬২-৬৩ সনে প্রবর্তন করেছিলেন ফসল কাটার মওসুমে। তাই ১৫৫৬ সালের ১১ এপ্রিল বাংলা সনের শুভযাত্রা শুরু হয়েছিল। এই সনের নাম দেয়া হয় ‘ফসলি বছর’। তখন এই বাংলা নববর্ষকে স্বাগত জানানোর জন্য চলতো ঘরে বাইরে ব্যাপক প্রস্তুতি। সেই যুগের মানুষের বন্ধমূল ধারণা ছিলো, নববর্ষের দিনে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কাপড় পরিধান করলে গরু-বাছুরকে গোসল করানো হলে, কেউ কারো সাথে ঝগড়াঝাঁটি না করলে এমনকি আরো ভালো ভালো কাজকর্ম করলে সারা বছরটা ভালো যাবে।
অতীত ও বর্তমান কাল মিলে নববর্ষের আয়োজনে আমরা মিল ও অমিল খুঁজে পাই। বর্ষবরণ উৎসবের সূচনা সম্ভবত ‘হালখাতা’ থেকেই বলে অনুমিত হয়। ক্রেতাগণ নির্দিষ্ট কোনো দোকান (পাইকারি/ছোটো দোকান) থেকে বাকিতে কেনাকাটা করতেন। দোকানি একটা লাল রঙের খেরো খাতায় বাকির হিসেবে লিখে রাখতেন বা এখনো লিখে রাখেন। নববর্ষের হালখাতা অনুষ্ঠানে কার্ড দিয়ে নিমন্ত্রণ জানানো হতো এবং এখনো জানানো হয়ে থাকে। ক্রেতাগণ কখনো পুরো পাওনা, কখনো আংশিক পাওনা পরিশোধ করতেন এবং এখনও করে থাকেন। দোকানি মিষ্টি দিয়ে সবাইকে আপ্যায়ন করতেন।
আকর্ষণীয় খেলাধুলার কথা তো রয়েছেই। ঘোরদৌড়, ষাঁড়ের লড়াই, মোরগের লড়াই, কুস্তি লাঠিখেলা, তলোয়ার খেলা, নৌকাবাইচসহ নানা ধরনের খেলাধুলা অনুষ্ঠিত হতো আগেকার দিনে। গরুর দৌড় প্রতিযোগিতাও হতো। জোয়ালে একজোড়া করে গরু বেঁধে তার পেছনে মই বেঁধে দেয়া হতো। মইয়ের ওপর বসতেন গরুর মালিক। পুরনো ঢাকায় পায়রা উড়ানোর প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হতো। গিরিবাজ পায়রাদের ওড়াউড়ি প্রতিযোগিতা দেখার জন্য লোকজনের ভিড় জমে যেতো। নববর্ষে অনেক স্থানে ঘুড়ি উড়ানোর প্রতিযোগিতা হতো। চৈত্র সংক্রান্তির রাতে পাটকাঠিতে আগুন জ্বেলে কিশোর ও তরুণেরা গ্রাম প্রদক্ষিণ করত যাতে নতুন বছরে গ্রামটিতে কোনো রোগবালাই না থাকে।
বর্ষবরণ করার জন্য মেলা হচ্ছে গ্রামীণ মানুষদের একটি প্রাচীন উৎসব। মেলায় বিক্রি হতো মুড়ি-মুড়কি, খই, বাতাসা, কদমা মুরালি এসব খাদ্যসামগ্রী। কুমারেরা মেলায় নিয়ে আসতেন মাটির তৈরি ঘোড়া, ষাঁড়, হরিণ, বাঘ, ময়না, টিয়া, মাছ, আম, পেঁপে এসব। ছুতারেরা নিয়ে আসতেন কাঠের তৈরি শিশুদের খেলাঘর সাজানোর জিনিসপত্র, বাঁশি, ঢোল, ডুগডুগি এসব বাদ্যযন্ত্র ও রঙিন কাগজের তৈরি নানা রকমের ফুল তৈরি হতো মেলায়। নাগরদোলা ছাড়াতো মেলার রূপই খুলত না। হাজার বছরের ঐতিহ্যের এসব মেলাও আজ হারিয়ে যাচ্ছে। তাই আমাদের উচিত ঐতিহ্য রক্ষায় এগিয়ে এসে অপসংস্কৃতিকে রুখে দেয়া।

SHARE

Leave a Reply