Home গল্প পরোপকার -মুনাওয়ার শাহাদাত

পরোপকার -মুনাওয়ার শাহাদাত

একটু আগে রাকিবদের বাসার পাশের মসজিদে ফজরের আজান হয়েছে। বাইরে কনকনে শীত। কুয়াশার চাদরে ঢাকা পুরো পৃথিবী। আজানের পর পর রাকিবের ঘুম ভেঙে যায়। কিন্তু তারপরও রাকিব কম্বলটাকে ভালোভাবে গায়ের সাথে লেপ্টে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে। রাকিবের বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করছে না। ট্যাংকির হিমশীতল পানিগুলোর কথা মনে পড়তেই তার দাঁতে দাঁতে ঘর্ষণের একটা শব্দ অনুভূত হয়। ভোর রাতে ট্যাংকির পানিগুলোকে রাকিবের কাছে পানি মনে হয় না, মনে হয় আস্ত বরফের টুকরো। কুলির জন্য পানি মুখে নিলে মনে হয়, দাঁতগুলো তক্ষুনি খসে পড়ে যাবে। রাকিবের মা তাকে বাথরুমে যাবার সময় একবার ডেকে গেছেন। এখন বাথরুম সেরে অজু করে এসে তাকে কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে থাকতে দেখে, মাথার পাশে এসে বসলেন। বসে আলতো করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন; ‘রাকিব, তুমি এখনো উঠোনি? মসজিদে যাবে না? নামাজের জামাতের যে আর বেশি সময় বাকি নেই। তাড়াতাড়ি উঠো বাবা! যারা আল্লাহ তায়ালার ইবাদত বন্দেগিতে যত বেশি কষ্ট ভোগ করবে, আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে তত বেশি পুণ্য দান করবেন। এবং তাদের প্রতি তত বেশি সন্তুষ্ট হবেন।’ রাকিব মায়ের এমন দরদমাখা কথা শুনে আর শুয়ে থাকতে পারলো না। দ্রুত বিছানা ছেড়ে বাথরুম সেরে অযু করে রুমে ঢুকে তো সে অবাক। মায়ের হাতে একটি লাল টুকটুকে নতুন সোয়েটার। রাকিবের দিকে সেটি এগিয়ে দিতেই, রাকিব সেটি হাতে নিয়ে মায়ের দিকে জিজ্ঞাসু নেত্রে তাকিয়ে রইল। রাকিবকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে মা বলল; ‘এভাবে তাকিয়ে কী দেখছো? পছন্দ হয়েছে কিনা বল!’ রাকিব বলল; ‘পছন্দ হবে না মানে! খুব পছন্দ হয়েছে। এবার বলো, এটি কোত্থেকে এলো?’ মা বলল; ‘তোমার বাবা সৌদি থেকে পাঠিয়েছে। গতকাল তুমি যখন কোচিং এ ছিলে, তখন তোমার ছোটমামা দিয়ে যায়। আমি তোমাকে আজ সারপ্রাইজ দিবো বলে কাল বলি নি।’ রাকিব এবছর অষ্টম শ্রেণিতে উঠেছে। সে জেডিসি পরীক্ষার্থী। সে মায়ের মুখে কথাগুলো শুনে খুশিতে টগবগ করতে করতে নতুন সোয়েটারটা পরে মসজিদের দিকে পা বাড়ায়। আর মা তার গমনপথে একবার চেয়ে ‘পাগল ছেলে’ বলে একটা মুচকি হাসি দিয়ে দরজা বন্ধ করে নামাযে দাঁড়িয়ে যান।
রাকিব নামায শেষে মসজিদ থেকে ফেরার পথে একটি দৃশ্য দেখে থমকে দাঁড়ায়। সে দেখতে পায়,তাদের বাসার অদূরে তার জামাল আঙ্কেলের দোকানের সামনে দুটো সাদা বস্তা পড়ে আছে। যেগুলো সে মসজিদে যাবার পথেও দেখেছে। কিন্তু এখন দেখতে পায়, সেই বস্তাগুলোর একটি আচমকা নিজে নিজে নড়া চড়া করছে। তা দেখে সে কিছুটা ভয় পেয়ে যায়। তবু রাকিব বুকে সাহস নিয়ে এগিয়ে যায়। সে উৎসুক নয়নে বস্তাগুলোর ভেতরে তাকাতেই তার চক্ষু স্থির। হঠাৎ তার কচি বুকটা এক অজানা কারণে ব্যথায় চিন চিন করে ওঠে। সে দেখতে পায়, বস্তা দুটোর ভেতর দুটো মানুষ আড়াআড়িভাবে হাত, পা ও মাথা সবগুলো একসাথে করে শুয়ে আছে। একটার ভেতর একজন বয়স্ক মহিলা। অন্যটির ভেতর রাকিবের বয়সী একটা ছেলে। দেখে বুঝাই যাচ্ছে, এরা মা ছেলে। হতদরিদ্র। এদের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই। শীত নিবারণের বস্ত্র নেই। বস্তাগুলো দিয়ে তারা শীত নিবারণে ব্যর্থ চেষ্টা করে চলেছে। এদের এমন করুণ অবস্থা দেখে রাকিবের দু চোখ বেয়ে কয়েক ফোঁটা তপ্ত অশ্রুকণা গাল বেয়ে তার নতুন সোয়েটার স্পর্শ করে। সে দ্রুত একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় এবং তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে আসে।
রাকিব তার মাকে মসজিদ থেকে ফেরার পথে দেখা করুণ দৃশ্যটির কথা বলে এবং সাথে সাথে তার সিদ্ধান্তের কথাটিও মাকে জানায়। সে বলে, ‘আম্মু আমি আমার গতবারের পুরনো সোয়েটারটি আপনার অনুমতি হলে, বস্তার ভেতর শুয়ে থাকা সেই ছেলেটিকে দিয়ে তার কিছুটা হলেও উপকার করতে চাই।’ রাকিবের মা বলল, ‘এ তো আনন্দের কথা। অন্নহীনকে অন্ন দিলে আর বস্ত্রহীনকে বস্ত্র দিলে তো আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সা)ও খুশি হবেন। এটা তো অনেক বড় পুণ্যের কাজও বটে। মানুষকে তো মানুষেরই বিপদে-আপদে সহযোগিতা করতে হয়। এবং এতে আমি বরং খুশিই হবো।’ রাকিবের মা তার হাতে পুরনো সোয়েটারটি দিয়ে বলল; ‘বাবা, তুমি এক্ষুনি এটি অসহায় ছেলেটিকে দিয়ে আসো।’
রাকিব তার মায়ের আদেশ পেয়ে, তক্ষুনি সোয়েটারটি হাতে নিয়ে এক অজানা খুশির জোয়ারে ভাসতে ভাসতে সেই ছেলেটির উদ্দেশে বাড়ি ত্যাগ করলো, যেই অসহায় ছেলেটি বস্তা গায়ে শীত নিবারণের ব্যর্থ চেষ্টায় সারারাত রাস্তার পাশে শুয়ে আছে।

SHARE

Leave a Reply