Home খেলার চমক রশিদ খান বোলিংয়ের নতুন জাদুকর -আবু আবদুল্লাহ

রশিদ খান বোলিংয়ের নতুন জাদুকর -আবু আবদুল্লাহ

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এই সময়ের সেরা তরুণ ক্রিকেটারের নাম বলতে বললে সবার আগে যে নামটি উঠে আসবে সেটি নিঃসন্দেহে রশিদ খান। আফগানিস্তানের এই লেগ স্পিনার সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে সফল ক্রিকেটারদের একজন। গত ফেব্রুয়ারিতে বিশ্বের সবচেয়ে কম বয়সী ক্রিকেটার হিসেবে স্থান করে নিয়েছেন আইসিসির ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি র‌্যাংকিংয়ের এক নম্বর স্থানে। ভারতীয় ফ্রাঞ্চাইজি লিগ আইপিএলে তাকে নিয়ে কাড়াকাড়ি হয়েছে নিলামের টেবিলে, দাম উঠেছে আকাশচুম্বী। গত কয়েক বছরে আফগানিস্তানের ক্রিকেটের অভাবনীয় উত্থানের পেছনে যাদের অবদান সবচেয়ে বেশি তাদের মধ্যে রশিদ খান অন্যতম।
তার হাত ধরেই সাম্প্রতিক সময়ে একের পর এক সাফল্য পেয়েছে আফগানিস্তান। আইসিসির সহযোগী সদস্য দেশের ক্রিকেটার হয়ে বিশ্বসেরা হওয়ার নজির আগে কখনো দেখেনি বিশ্ব। রশিদ খান দেখিয়েছেন, ছোট দল-বড় দল কোন ব্যাপার নয়, প্রতিভা থাকলে বিশ্বে মাথা উঁচু করেই চলা যায়। তাকে এখন অনেকেই ছোট দলের বড় তারকা হিসেবে সম্বোধন করতে শুরু করেছেন। কেউ কেউ শেন ওয়ার্ন-পরবর্তী বিশ্বে সেরা লেগ স্পিনার আখ্যাও দিচ্ছেন। ২০১৫ সালের শেষ দিকে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে পা রাখা রশিদ খান, মাত্র দুই বছরেই নিজেকে নিয়ে গেছেন সেরাদের কাতারে। এই সময়ে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে তিনিই সবচেয়ে সফল লেগ স্পিনার। এখনো টেস্ট খেলার সুযোগ পাননি তাই সাদা পোশাকে তার কার্যকারিতা কতটুকু তা বলার সময় হয়নি।
১৯৯৮ সালে আফগানিস্তানের নানগাহার জেলায় জন্ম রশিদ খানের। (অবশ্য বয়স নিয়ে কিছুটা দ্বিধা আছে অনেকের মধ্যে। কাগজে কলমে বয়স ১৯ হলেও শারীরিক গঠন বলছে দু-এক বছর বেশিও হতে পারে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সাধারণত প্রকৃত বয়স আর সার্টিফিকেটের বয়সে পার্থক্য থাকে। বাংলাদেশেও যেমনটা আছে।) শৈশব ও কৈশোর কেটেছে যুদ্ধের ভয়াবহতার মধ্যে; কিন্তু তারপরও আরো অনেক আফগান তরুণের মতো যুদ্ধ কেড়ে নিতে পারেনি তার স্বপ্ন আর উদ্দাম তারুণ্য। বাড়ির আঙিনায় ৮ ভাই মিলে নিয়মিত ক্রিকেট খেলতেন। টেপ টেনিসের সেই খেলায় তার সাফল্য দেখেই পেশাদার ক্রিকেটে আসার উৎসাহ দেয় ভাইয়েরা। তারপর শুরু পথচলা। অনূর্ধ্ব-১৯ দল হয়ে এক সময় জায়গা করে নিয়েছেন জাতীয় দলে। সেই শুরু….. এরপর একের পর এক ধাপ পেরিয়ে আজ তিনি বিশ্বসেরাদের কাতারে। টিভিতে খেলা দেখে দেখে ভক্ত হয়েছেন পাকিস্তানি সুপারস্টার শহীদ আফ্রিদির। তাকে আদর্শ মেনেই খেলতে শুরু করেন। তার অনুকরণেই শুরু করেন লেগ স্পিন, বোলিং অ্যাকশনও আফ্রিদির মতো। এখনতো উইকেট পাওয়ার পর রশিদ খানের উদযাপন করার ভঙ্গিও হয়ে গেছে আফ্রিদির মতো।
রশিদ খানের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয়েছে ২০১৫ সালের অক্টোবরে। তখন তার বয়স ১৭ বছর হতে এক মাস বাকি। শুরু থেকেই উইকেট নেয়ার ক্ষেত্রে খুবই ধারাবাহিক এই তরুণ লেগ স্পিনার। আর রান দেয়ার বেলায় ভীষণ কিপটে। পরের বছর (২০১৬) মার্চে ভারতের অনুষ্ঠিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে প্রথম সাড়া জাগানো পারফরম্যান্স দেখান রশিদ খান। ওই টুর্নামেন্টে ১১ উইকেট নিয়ে ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের প্রশংসা কুড়ান। এই পারফরম্যান্সের পুরস্কার হিসেবেই ২০১৭ সালের আইপিএলে তাকে চার কোটি ভারতীয় রুপিতে দলে নেয় সানরাইজার্স হায়দরাবাদ। কোন সহযোগী সদস্য দেশের ক্রিকেটার হিসেবে এটি ছিলো সর্বোচ্চ পারিশ্রমিকের রেকর্ড।
আইপিএলে ২০১৭ মৌসুমে প্রতিটি ম্যাচে সুযোগ পেয়েছেন দলের হয়ে। পারফর্ম করেই নিজের স্থান পাকা করে নিয়েছেন। ১৪ ম্যাচে নিয়েছেন ১৭ উইকেট। ওভার প্রতি রান দিয়েছেন ছয়ের কিছু বেশি, আসরের সেরা দশ বোলারের মধ্যে যা সবচেয়ে কম। পুরো বছর জুড়েই ছিলো রশিদ খানের দাপট। ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি দুই ফরম্যাটেই দেখিয়েছেন একের পর এক ঘূর্ণি জাদু। ২০১৭ সালটি তার কেটেছে স্বপ্নের মতো। মার্চে আয়ারল্যান্ডের সাথে ৫ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে নিয়েছে ১৬ উইকেট, আর তিন ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজে নিয়েছেন একটি ৫ উইকেটসহ মোট ৯ উইকেট। এরপর জুনে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে গিয়ে প্রথম ম্যাচেই ১৮ রানে ৭ উইকেট নিয়ে বিশ্বে হইচই ফেলে দেন রশিদ। পরের ম্যাচেও নেন তিনটি উইকেট। ডিসেম্বরে আয়ারল্যান্ডের বিরুদ্ধে তিন ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজে নিয়েছেন ৭ উইকেট। আর এসবের পুরস্কার হিসেবেই পেয়েছেন আইসিসির সেরা সহযোগী দেশের ক্রিকেটারের অ্যাওয়ার্ড। ক্যারিবীয় প্রিমিয়ার লিগ সিপিএলে খেলেছেন দাপটের সাথে। গত বছর সিপিএলে গায়ানা অ্যামাজন ওয়ারিয়র্সের হয়ে করেছেন একটি হ্যাটট্রিক। বছরের শেষে অস্ট্রেলিয়ার বিগব্যাশ লিগেও খেলেছেন দাপটের সাথে। অস্ট্রেলিয়ার বাউন্সি পিচেও এই লেগ স্পিনার হয়েছেন টুর্নামেন্টের সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি (১১ ম্যাচে ১৮ উইকেট)। বিপিএলে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ান্সের হয়ে ৭ ম্যাচ খেলে ওভার প্রতি পাঁচেরও কম রান দিয়ে উইকেট নিয়েছেন ৬টি।
২০১৮ সালটি আরো দুর্দান্তভাবে শুরু করেছেন রশিদ খান। ফেব্রুয়ারিতে সংযুক্ত আরব আমিরাতের শারজায় জিম্বাবুয়েকে একাই ধসিয়ে দিয়েছেন এই তরুণ। ৫ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে নিয়েছেন ১৬ উইকেট। হাতে-নাতে পুরস্কারও পেয়েছেন এই সাফল্যের ফেব্রুয়ারিতে র‌্যাংকিংয়ে উঠে এসেছেন এক নম্বরে। প্রথম কোনো সহযোগী সদস্য দেশের ক্রিকেটার হিসেবে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টির সেরা বোলার হয়েছেন। ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগ আইপিএলের এবারের আসরের নিলামে তাকে নিয়ে রীতিমতো কাড়াকাড়ি হয়েছে দলগুলোর মধ্যে। শেষ পর্যন্ত পুরনো দল হায়দরাবাদই তাকে কিনে নিয়েছে ৯ কোটি ভারতীয় রুপিতে। বিশ্বের অনেক বাঘা বাঘা খেলোয়াড়ও যেখানে তার মতো দাম পাননি। এসবই বলে দেয় রশিদের দক্ষতা আর যোগ্যতা কতখানি।
আফগানিস্তান সহযোগী সদস্য দেশ হওয়ার কারণে প্রতি বছর খুব বেশি ম্যাচ খেলার সুযোগ পান না রশিদ খান। অবশ্য সহযোগী তকমা নিয়ে রশিদ খানকে আর খুব বেশি দিন কাটাতে হবে না। এ বছরই প্রথম টেস্ট খেলতে যাচ্ছে তার দেশ। সাদা পোশাকের অভিজাত আঙিনায় নিজেকে রাঙিয়ে তোলার সুযোগ পাবেন রশিদ। টেস্ট আঙিনায় প্রবেশ করলে ম্যাচের সংখ্যা বেড়ে যাবে অনেকগুণ। নতুন নতুন ভেল্কিতে বোকা বানাতে পারবেন ব্যাটসম্যানদের, যা হতে পারে তার ক্যারিয়ারের জন্য নতুন মাইলফলক।
অপেক্ষাকৃত লম্বা রানআপ আর লাফিয়ে উঠে বল করা রশিদ খানের প্রধান শক্তি গতির সাথে টার্ন। সাধারণত লেগ স্পিনারদের বলে তার মতো গতি দেখা যায় না। যে কারণে ব্যাটসম্যানরা তার বল বুঝে উঠতে পারেন না ঠিকমতো। গুগলি ডেলিভারিগুলো আরো বেশি মারাত্মক। কখনো কখনো বল ঝুলিয়ে দিয়ে ব্যাটসম্যানকে বোকা বানান, জোরে মারতে গিয়ে ক্যাচ তুলে দেয়। নিখুঁত লাইন ও সঠিক জায়গায় বল ফেলা (লেন্থ) তার আরেকটি বড় শক্তি। সব মিলে আন্তর্জাতিক ওয়ানডেতে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নিয়েছেন ৩৭ ম্যাচে ৮৬ উইকেট, ৫ বা তার বেশি উইকেট পেয়েছন ৩ বার। টি-টোয়েন্টিতে ২৯ ম্যাচে ৪৭ উইকেট, ৫ উইকেট একটি।
শৈশবে যুদ্ধের কারণে পরিবারের সাথে দেশ ছেড়ে আশ্রয় নিয়েছিলেন পাকিস্তানে। পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হলে যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে যখন ফিরে আসেন তখন চারদিকে ধ্বংসস্তূপ; কিন্তু লড়াকু রশিদ খানের স্বপ্ন ভেঙে পড়েনি তাতে। ১২ বছর বয়সে শুরু করেন ক্রিকেটার হওয়ার যুদ্ধ, যে যুদ্ধে আজ তিনি বিজয়ী বীর। সময় আর ফিটনেস অনুকূলে থাকলে আগামী দিনে শেন ওয়ার্ন, আবদুল কাদিরদের পাশাপাশি তার নামও হয়তো লেখা হবে বিশ্বসেরা লেগ স্পিনারদের তালিকায়।

SHARE

Leave a Reply