Home দেশ-মহাদেশ বিশ্বের ভূমি পরিবেষ্টিত বৃহত্তম দেশ কাজাখস্তান -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

বিশ্বের ভূমি পরিবেষ্টিত বৃহত্তম দেশ কাজাখস্তান -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

কাজাখস্তান প্রজাতন্ত্র এশিয়ার একটি দেশ। আয়তনের দিক দিয়ে কাজাখস্তান বিশে^র বৃহত্তম ভূমি পরিবেষ্টিত রাষ্ট্র এবং বিশে^র সব রাষ্ট্রের মধ্যে নবম বৃহত্তম; রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ব্রাজিল, ইন্দোনেশিয়া, অস্ট্রেলিয়া, চীন ও ভারতের পরেই কাজাখস্তানের স্থান। এদেশের উত্তরে রাশিয়া, পূর্বে গণচীন, দক্ষিণে কিরঘিজস্তান, উজবেকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান এবং পশ্চিমে কাস্পিয়ান সাগর ও রাশিয়া। উল্লেখ্য, কাস্পিয়ানকে সাগর বলা হলেও এটি আসলে সাগর নয়, বরং আয়তন অনুসারে পৃথিবীর বৃহত্তম আবদ্ধ জলাশয়। এটাকে পৃথিবীর বৃহত্তম হ্রদ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়, যার আয়তন একটি সম্পূর্ণ সাগরের সমান।
কাজাখস্তান প্রায় সম্পূর্ণভাবে এশিয়া মহাদেশে অবস্থিত। তবে দেশটির কিছু অংশ উরাল নদীর পশ্চিমে ইউরোপ মহাদেশে পড়েছে। দেশের উত্তর অংশে অবস্থিত আসতানা শহর দেশটির রাজধানী। বৃহত্তম শহর আলমাতি। ১৯৯৭ সালের আগে আলমাতিই ছিলো কাজাখস্তানের রাজধানী। কাজাখস্তানের আয়তন ২৭ লাখ ২৪ হাজার ৯০০ বর্গ কিলোমিটার (১০ লাখ ৫২ হাজার ১০০ বর্গ মাইল)। মোট জনসংখ্যা ১ কোটি ৮৫ লাখ ৫৬ হাজার ৬৯৮ জন। জনসংখ্যার ৭০ ভাগ মুসলিম, ২৬ ভাগ খ্রিষ্টান এবং বাকি ৪ ভাগ অন্যান্য ধর্মাবলম্বী। অষ্টম শতাব্দীতে আরবদের আগমনের ফলে এই অঞ্চলে ইসলাম পরিচিতি লাভ করে। ইসলাম প্রথমে দক্ষিণের তুর্কেস্তানে প্রতিষ্ঠা লাভ করে, তারপর উত্তর দিকে বিস্তার লাভ করে।
দেশটির ১৩১টি জাতিগত গ্রুপের মধ্যে কাজাখ নামের তুর্কীয় জাতি এখানকার প্রধান জনগোষ্ঠী। জনসংখ্যার ৬৩ ভাগ কাজাখ, ৩০ ভাগ রুশ এবং বাকি ৭ ভাগ অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী। কাজাখ ও রুশ কাজাখস্তানের সরকারি ভাষা।
কাজখস্তানের অর্থনীতি মধ্য এশিয়ায় বৃহত্তম এবং বলিষ্ঠভাবে কার্যকর। এর তেল-গ্যাস শিল্প থেকে এই অঞ্চলের জিডিপির ৬০ শতাংশ আসে। প্রধান কৃষিপণ্যের মধ্যে রয়েছে শস্য, গোল আলু, শাক-সবজি ও গবাদি পশু। এদেশে অঢেল খনিজসম্পদও রয়েছে। কাজাখস্তানের প্রধান রফতানি পণ্যের মধ্যে রয়েছে গম, বস্ত্র ও গবাদি পশু। কাজাখস্তান শীর্ষস্থানীয় ইউরেনিয়াম রফতানিকারক দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম।
বিশ্বের যে কয়েকটি স্থানে আপেলের উৎপত্তি হয় বলে গণ্য করা হয় সেগুলোর মধ্যে কাজাখস্তান অন্যতম। এখানকার আপেলের প্রাচীন জাতটা হলো ম্যালাস সিভারসি। কাজাখস্তানের স্থানীয় ভাষায় এটাকে আলমা বলা হয়। যে অঞ্চলে এর উৎপত্তি ঘটে তাকে বলে আলমাতি অর্থাৎ আপেল সমৃদ্ধ স্থান। মধ্য এশিয়ার দক্ষিণ কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান ও তাজিকিস্তান এবং চীনে ঝিনজিয়াংয়ের পার্বত্য বন-জঙ্গলে এখনো প্রাকৃতিকভাবে এই আপেল গাছ জন্মে।
কেউ কেউ যুক্তি দেখান যে, কাজাকিস্তানকে ইউরোপীয় দেশ হিসেবে গণ্য করা যেতে পারে, কেননা কাজাখস্তানের পশ্চিম অঞ্চল ইউরোপীয় মহাদেশে পড়েছে এবং দেশটি ইউরোপে অন্তর্ভুক্তির ব্যাপারে ইউরোপীয় কাউন্সিলের অনেক শর্তই পূরণ করে। কাজাখস্তানের মুদ্রার নাম টেঙ্গে (কেটিজি)।
১৮৭০-১৮৭৬ সালের মধ্যে রাশিয়া কাজাখস্তান দখল করে নেয়। ১৯২২ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত কাজাখস্তান সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ ছিল। ১৯৯১ সালের ২৫ ডিসেম্বর কাজাখস্তান সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীনতার পর থেকে দেশটিতে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা বিদ্যমান। ১৯৯৫ সালে একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা হয়, যাতে রাষ্ট্রপতিকে একচ্ছত্র ক্ষমতা দেওয়া হয়।
কাজাকিস্তানের রাজনীতি রাষ্ট্রপতিশাসিত প্রজাতন্ত্র কাঠামোয় পরিচালিত হয়। রাষ্ট্রপতি হলেন রাষ্ট্রের প্রধান। সরকারপ্রধান রাষ্ট্রপতি কর্তৃক মনোনীত হন। রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা সরকারের ওপর ন্যস্ত। আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সরকার এবং দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা (৪৭ সদস্যের সিনেট ও ১১৭ সদস্যের মাজিলিস) উভয়ের ওপর ন্যস্ত। কাজাখস্তানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট নূরসুলতান আবিশুলি নাজারবায়েভ (১৯৯০ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি সোভিয়েত আমল থেকে ক্ষমতাসীন) এবং প্রধানমন্ত্রী বাকিতজান সাগিনতায়েভ (২০১৬ সালের ৯ সেপ্টেম্বর থেকে ক্ষমতাসীন)। নূর সুলতান নাজারবায়েভ ১৯৯১ সালে স্বাধীনতার পর থেকেই প্রেসিডেন্ট পদে আসীন রয়েছেন এবং তার শাসনব্যবস্থাকে স্বৈরশাসন হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়।
কাজাখস্তানের প্রশাসনিক এলাকা চৌদ্দটি অবলিস্টার বা অঞ্চলে বিভক্ত। সেগুলো হলো পশ্চিম কাজাখস্তান, আতিরাউ, মানজিসতাও, আকতোব, কসতানে, কিজিলরডা, উত্তর কাজ, দক্ষিণ কাজ, আকমোলা, কারাগান্ডি, ঝামবিল, পাভলোডর, পূর্ব কাজাখস্তান ও আলমাতি। অঞ্চলগুলো ১১৭টি জেলায় এবং জেলাগুলো গ্রামীণ জেলায় বিভক্ত। প্রত্যেক অঞ্চলের নেতৃত্ব দেন প্রেসিডেন্টের নিযুক্ত একজন আকিম বা আঞ্চলিক গভর্নর এবং জেলা আকিমদের নিয়োগ দেন আকিমরা।
আলমাতি ও রাজধানী আস্তানার বিশেষ মর্যাদা রয়েছে এবং এ দুটি নগরী কোনো অবলিস্টার বা অঞ্চলের অংশ নয়। বাইকোনুর নগরীরও বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। কেননা, ছয় হাজার বর্গ কিলোমিটার আয়তনের বাইকোনুর কসমোড্রোমের জন্য এই নগরীটি ২০৫০ সাল পর্যন্ত রাশিয়ার কাছে ইজারা দেওয়া রয়েছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন এই বাইকোনুর কসমোড্রোম থেকেই মহাশূন্যে প্রথম মানুষ পাঠায় এবং সোভিয়েত মহাকাশ শাটলযান বুরান ও সুপরিচিত মহাকাশ স্টেশন মির উৎক্ষেপণ করে। কাজাখস্তানের অন্যান্য প্রধান নগরীগুলোর মধ্যে রয়েছে শিমকেন্ত, কারাগান্ডা, আকতোব, তারাজ, পাভলোডর, ওসকেমেন, সেমি ও ওরাল।
কাজাখস্তান গোটা পশ্চিম ইউরোপের আয়তনের সমান। কাজখস্তানের ভূখন্ড পশ্চিম-পূর্বে কাস্পিয়ান সাগর থেকে আলতাই পর্বতমালা পর্যন্ত, উত্তর-দক্ষিণে পশ্চিম সাহারার সমভূমি থেকে মধ্য এশিয়ার মরূদ্যান ও মরুভূমি পর্যন্ত বিস্তৃত। কাজাখস্তানের ভূমি সমতল, শুষ্ক তৃণাবৃত ও বৃক্ষহীন প্রান্তর, জলমগ্ন পাইন বনভূমি, গভীর গিরিখাত, পাহাড়, ব-দ্বীপ, তুষারাবৃত পর্বত ও মরুভূমিতে বেশ বৈচিত্র্যময়। কাজাখস্তানে চরম মহাদেশীয় আবহাওয়া বিরাজ করে। গ্রীষ্মকাল উষ্ণ কিন্তু শীতকাল ভীষণ ঠান্ডা। মোঙ্গলিয়ার উলানবাটরের পর আস্তানা বিশ্বের দ্বিতীয় ঠান্ডাতম রাজধানী। উষর ও আধা-উষর অবস্থাভেদে বৃষ্টিপাতে তারতম্য রয়েছে। এখানে শীতকালে তেমন বৃষ্টিপাত হয় না। বিশাল ভূমি এলাকা থাকা সত্ত্বেও এদেশের জনসংখ্যার ঘনত্ব সবচেয়ে কম।
কাজাখস্তান ভূখন্ডে অতীতে তুর্কি যাযাবরদের বসবাস ছিল। প্রাচীন তুর্কি ভাষায় ‘কাজাখ’ বলতে ‘যাযাবর’ এবং পার্সিয়ান ভাষায় ‘স্তান’ বলতে ‘ভূমি’ বুঝায়। অতএব কাজাখস্তানের অর্থ দাঁড়ায় ‘যাযাবরদের ভূমি’। কাজাখদের পূর্বপুরুষরা তুর্কি খাগানেটের মতো বেশ কয়েকটি তুর্কি রাজ্যে বাস করতো। ত্রয়োদশ শতাব্দীতে এই অঞ্চল চেঙ্গিস খানের অধীনে মোঙ্গলীয় সা¤্রাজ্যের সাথে যুক্ত হয়। ষোড়শ শতাব্দীর মধ্যে কাজাখরা তিনটি অঞ্চলে বিভক্ত হয়ে পৃথক গ্রুপ হিসেবে আবির্ভূত হয়। রুশরা অষ্টাদশ শতাব্দীতে কাজাখ অঞ্চলের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে এবং ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে তারা গোটা কাজাখস্তান রুশ সা¤্রাজ্যের অংশ হিসেবে শাসন করতে শুরু করে। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লব এবং তৎপরবর্তী গৃহযুদ্ধের পর কাজাখস্তান অঞ্চল বেশ কয়েকবার পুনর্গঠন করা হয়। ১৯৩৬ সালে এটাকে সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ হিসেবে কাজাখ সোভিয়েত সোসালিস্ট বিপাবলিকে পরিণত করা হয়। সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ হিসেবে থাকাকালে কাজাখস্তান তার ভূখন্ডের কিছু অংশ চীনের ঝিনজিয়াং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের কাছে এবং কিছু অংশ উজবেকিস্তানের কারাকালপাকস্তান স্বায়ত্তশাসিত রিপাবলিকের কাছে হারায়।
কাজাখস্তান জাতিসংঘ, ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও), সিআইএস, ইউরেশিয়ান ইকোনমিক ইউনিয়ন, সিএসটিও, এসসিও, ওএসসিই ও টিইউআরকেএসও ওয়াইয়ের সদস্য।

SHARE

Leave a Reply