Home গল্প নদী বয়ে যায় -আবদুল ওহাব আজাদ

নদী বয়ে যায় -আবদুল ওহাব আজাদ

তোপধ্বনি শুনে নড়ে চড়ে ওঠে বৃদ্ধ শের আলী, স্থবির শের আলী মনে বল পায় যেন ঐ শব্দে রক্তে নাচন লাগে, যুদ্ধের কথা মনে পড়ে যায়- তার, মুক্তিযোদ্ধা শের আলী এখন পঙ্গুত্ব জীবন-যাপন করছে, মনের জোর নেই আগের মত, তার ওপর স্ট্রোক হানা দিয়েছে বলে শের আলীর শরীরে কোন রকম ক্র্যাচে ভর করে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটে, সে মনে হয় জীবনযুদ্ধে এক পরাজিত সৈনিক শের আলী।
আজ ১৬ ডিসেম্বর।
২১ বার তোপধ্বনির শব্দে ঘুম ভাঙে শের আলীর ক্র্যাচে হাত রেখে পাগলের মত ডাকতে থাকে মেহের আলীকে। মেহের আলী তার পোতা ছেলে, মেহের আলীর বাবা জোহর আলী লিভার সিরোসিসে মারা গেছে। ভালো চিকিৎসা হয়নি তার। শের আলী মুক্তিযোদ্ধা কিন্তু সেই সার্টিফিকেটে আর পেট ভরে না। তখন ছেলের চিকিৎসা করার মতো সামর্থ্য ছিল না তার। কয়েকটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন কিছু টাকার ব্যবস্থা করেছিল আর গ্রামের লোকজনেরও চেষ্টার ত্রুটি ছিল না। কিন্তু রাজধানীতে নিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেনি কেউ, অবশেষে জোহর আলী মারা গেল। বৃদ্ধ শের আলী আবার চিৎকার দেয় কিরে মেহের আলী এখনো উঠলিনে? মেহের আলী চোখ মুছতে মুছতে দাদুর কাছে আসে। ঘুম ঘুম চোখে সে বলে,
“দাদু আবার ডাকাডাকি করতে ছাও ক্যান” শের আলী সস্নেহে বলে,
দাদু ভাই, আজ সেই বিজয় দিবস, আমার একটু মরিচ্চাপ নদীর কাছে নিয়ে যাবি।
মেহের আলী- এ কথার অর্থ বোঝে না, কৌতূহল ভরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে মেহের বলে,
কেন হনে কি করতি যাবা, হনে তোমার কী?
‘ও তুই বুঝবি না দাদু ভাই আমার একটু নিয়ে চল না দেখবি অনেক গল্প করবো।
গল্প করবা তা হনে কেন? বাড়ি বসে করো। শের আলী রেগে যায়, বাঘের মত গর্জন দিয়ে বলে,
মেহের আলী বেশি বুঝতে চাসনে, আমারে মরিচ্চাপ নদীর কাছে নিয়ে চল।
হাঁফায় শের আলী। চোখ দুটো লাল। রেগে গেলে এমন হয়। অবশেষে মেহের এর ঘাড়ে ভর দিয়ে নদীর কাছে যায় শের আলী। নদীর দিকে উদাস চোখে চেয়ে থাকে সে, মেহের বলে,
কী দেখো দাদু?
নদী। মরিচ্চাপ নদী। এক সময় এই নদীতে লঞ্চ চলতো, স্টিমার চলতো আরো কত কিছু।
দাদু এখন চলে না কেন?
এখন তো নদী বুজে গেছে। জানিস মেহের একাত্তরে এই মরিচ্চাপ নদীতে ভয়ঙ্কর স্রোত ছিল। এই নদীর ধার বেয়ে আমরা সেদিন যুদ্ধ করেছিলাম। বর্ডারে যুদ্ধ করতে গিয়ে একটা গুলি এসে লাগলো পায়ে, সেই গুলি বের করতে গিয়ে পায়ে হলো সেপটিক, তার থেকে গ্যাংগ্রিন, অবশেষে পা কেটে বাদ দিতে হলো।
এখন তোমাকে কেউ দেখে না দাদু ভাই?
কে দেখবে আবার? মাঝে মধ্যে পাড়ার ছেলেরা অনুষ্ঠান করে ২/১ বার লুঙি পাঞ্জাবি আর কখনো সার্টিফিকেটের মত কি দিয়েছিল। এখন আর কেউ কিছু দেয় না, কেউ ডাকেও না।
শের আলীর অতীতের কথা মনে পড়ে যায়, হাউ মাউ করে মেহেরকে জড়িয়ে ধরে বলে,
দাদু ভাই।
কি হলো দাদু তুমি কাঁদো কেন?
“তোর দাদীর কথা মনে পড়ে গেলরে। তোর দাদী অপূর্ব সুন্দরী ছিল, আমি মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম বলে পাক সেনারা এদেশের নরপিশাচদের সহযোগিতায় ওরা তোর দাদীকে তুলে নিয়ে যায় তারপর যা হওয়ার তাই হলো-
কি হলো দাদু ভাই?
“ওরা তোর দাদীকে”
আর বলতে পারলো না শের আলী, কিছুক্ষণ কাঁদলো তার স্ত্রীর কথা ভেবে, তারপর আবার বলতে শুরু করলোÑ তোর দাদী অপমান সহ্য করতে না পেরে এই মরিচ্চাপ নদীতে ঝাঁপ দিলো, কয়দিন পর তোর দাদীর লাশ ভেসে উঠলো। তোর বাবা তখন খুব ছোট।
দাদু ভাই তোমার কি দাদীর কথা মনে পড়ছে?
হ্যাঁ। আজ আমার তোর দাদীর কথা খুব মনে পড়ছে। এদেশের জন্য স্বাধীন পতাকার জন্য আমি আমার প্রিয়তমা স্ত্রীকে হারিয়েছি। আমার পা হারিয়েছি। আমার ছেলে হারিয়েছি। এত কিছু হারানোর বিনিময়ে যে স্বাধীনতা পেলাম, সে স্বাধীনতা আমার কী দিল, বল কী দিল?
শের আলী প্রলাপ বকতে লাগলো। মেহের শুধু শুনলো কোন কথায় উত্তর দিতে পারলো না, কারণ এ কথার উত্তর মেহের আলীর জানা নেই।
মেহের বলল, খুব ঠান্ডা পড়েছে। চলো দাদু বাড়ি যাই।
না-রে মেহের না, এই মরিচ্চাপ নদীতে তোর দাদী শুয়ে আছে, এই মরিচ্চাপের তীর বেয়ে কত যুদ্ধ করেছি। এই মরিচ্চাপ জুড়ে আমার বহু স্বপ্ন, বহু স্মৃতি জড়িয়ে আছে। ওর পাশে আমার কিছুক্ষণ থাকতে হবে (দাদু ভাই) অসহায় শিশুর মতো করুণ আকুতি শের আলীর। বিজয় দিবসের সকালে গ্রামের বিভিন্ন স্কুলে অনুষ্ঠান থেকে মাইকে ভেসে আসছে সেই জনপ্রিয় গানগুলো, আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি, সালাম সালাম হাজার সালাম, মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যুদ্ধ করি, সব কয়টা জানালার খুলে দাও দ্বার।
স্কুল, কলেজের ছেলেরা গায়ে জাতীয় পতাকার রঙে জামা পরে নদীর ধার দিয়ে অনুষ্ঠানে যাচ্ছে। মনে তাদের বিজয়ের প্রেরণা, কণ্ঠে দেশের গান, ওরা একদিন বড় হবে, দেশের স্বাধীনতা রক্ষায় ওরা কঠিন ভূমিকা রাখবে, শের আলীর বড় ভালো লাগলো ছেলেদের এ জাতীয় পোশাক দেখে। শের আলী ওদের গতিরোধ করে বললোÑ দাঁড়াও, কোথায় যাচ্ছ তোমরা?
“বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানে”।
তোমাদের কিছু বলা দরকার
বলুন,
তোমরা যে পোশাকটা পরেছ এর কি অর্থ বহন করে জানো?
জানি, এটা জাতীয় পতাকা, এটা বাংলাদেশের অস্তিত্ব, এটা বাংলাদেশ।
হ্যাঁ, বাবারা, বাংলাদেশকে শুধু পোশাকে ধরলে হবে না, মনে ধারণ করতে হবে, মনে।
ছেলেরা শুধু বলে গেল,
দোয়া করবেন চাচা আমরা যেন আপনার কথা রাখতে পারি।
শের আলী চেয়ে আছে ছেলেগুলোর দিকে, ওরা এক সময় অদৃশ্য হয়ে যায়। শের আলী আবার চোখ রাখে মরিচ্চাপ নদীতে। নদীর সে গর্জন নেই আর। নেই সেই ভয়ঙ্কর তান্ডব, সেই নদী আজও বয়ে যায় নীরবে নিভৃতে।

SHARE

Leave a Reply