Home গল্প ভালা কাম -মোহাম্মদ লিয়াকত আলী

ভালা কাম -মোহাম্মদ লিয়াকত আলী

গ্রামের দুই কৃষক কেরামত আলী ও নেয়ামত উল্লাহ। জীবিকার টানে গ্রাম ছেড়ে ঢাকা শহরে এসেছে। শহরের প্রাণকেন্দ্রে বাসা ভাড়া অত্যধিক। তাই আশ্রয় নিয়েছে শহরতলি ভাটারায়। শহরে কোনো দোস্ত নেই। এখানে সবাই বন্ধু। কিন্তু তারা এখনো দুই দোস্ত। অবসর পেলেই আড্ডা দেয় বাড্ডা লেকের পাড়ে। একজন রাজমিস্ত্রি, একজন কাঠমিস্ত্রি। একজন আরেকজনকে ডাকে মেরামত ও কেয়ামত।
– কিরে মেরামত, সারাজীবন পরের বাড়ি মেরামত করলি। ঢাকায় নিজের বাড়ি কবে অইবো?
– আরে কেয়ামত, গান হোনছ নাই :
পরের জাগা পরের জমি ঘর বানায়া আমি রই
আমিতো সেই ঘরের মালিক নই।
– থাকনের জায়গা একটা অইলেই অইলো। সারাজীবন তো আল্লাহর নেয়ামত খাইলি। কেয়ামতের লাইগা কিছু জমাইছস?
– নামাজ পড়ি, রোজা করি, প্রত্যেক বছর টঙ্গীতে যাইয়া আখেরি মুনাজাত ধরি। আর কী জমাইমু?
– কিছু সদগায়ে জারিয়া কর? কেয়ামত পর্যন্ত নেয়ামত জমতে থাকবো।
– তুইতো শুরু কইরা দিছস হোনলাম? পোলারে মাদ্রাসায় ভর্তি করছস? মাদ্রাসায় পইড়া অইবো কী?
– তোর পোলারেতো স্কুলে ভর্তি করছস। স্কুলে পইড়া অইবো কী?
– এইডা কোন কতা অইলো। সারা দুনিয়ার পোলাপান স্কুলে পড়ে। আমারটাও পড়বো।
– তারপর?
– তারপর কলেজে।
– তারপর?
– তারপর ইনিভার্সিটিতে
– তারপর?
– তারপর ভালা চাকরি, সুখের ঘর-সংসার।
– তারপর?
– পাগলের মত তারপর তারপর করছ ক্যান। তারপরের কি শেষ আছে? হায়াত শেষ অইলেই শান্তিতে মউত। তার আর কোনো পর নাই।
– এইবার আইছস আসল জায়গায়। তারপরইতো আমার পোলার কাম শুরু।
– মানে?
– মরণের সময় খতমে ইউনুছ, মরার পর জানাজা, তিন দিন পর কুলখানি, তারপরে চেহলাম, চল্লিশা, ইসালে সওয়াব কেয়ামত পর্যন্ত নেয়ামতের পোলার কামই চলবো।
– মেলা প্যাছাল পারছস। রাইত অনেক অইছে। বাড়িত চল।
কেরামত আলীর ধারণা গরিব ঘরের বোকা মার্কা পোলাপানই মাদ্রাসায় পড়ে আর লিল্লাহ বোর্ডিংয়ে ফ্রি খায়। বড় অইয়া বরাতে থাকলে মসজিদ মাদ্রাসায় চাকরি পায়। মিলাদ পড়ায়া ওভার টাইম কামায়।
নেয়ামত উল্লার ছেলে ছানাউল্লা ক্যাডেট মাদ্রাসায় পড়ে। রাজমিস্ত্রির পোলার একটু রাজকীয় হাবভাব। একদিন মাকে বলে :
– আজ শিক্ষা সফরে যাবো। গাড়িতে বসে একসাথে নাস্তা খাব। নাস্তা টিফিন বক্সে দিয়ে দাও।
– কাম সারছে। নাস্তাতো পান্তা ভাত আর আলুবর্তা। এগুলো টিফিন বাক্সে দিমু?
– এক কাজ কর। আলুভর্তা দিয়া চারটা গোল গোল বল বানাও। একটু ডিম মেখে দুই ফোঁটা তেলে ভেজে দাও। আর একমুঠ পান্তা ভাতে একটা পিঁয়াজ কেটে তেলে ভাজ। পান্তা ভাত-আলুবর্তাই হয়ে যাবে রাইস ফ্রাই অ্যান্ড পটেটো চপ।
শিক্ষা সফরে প্রিন্সিপাল সাহেব একজন পীর সাহেবকে দাওয়াত দিয়েছেন। প্রিন্সিপালের ধারণা, লং ড্রাইভে আল্লাহওয়ালা লোক সাথে থাকলে জার্নি নিরাপদ হয়।
পীর সাহেব বসেছেন ছানাউল্লার পাশে। গল্প-গুজবে পীর সাহেবের সাথে ভাব জমিয়ে ফেলে ছানাউল্লাহ।
– তুমি একটু হেলপ করতে পার? রাতে ঢাকায় থাকতে হবে। হোটেলে একটা সিটের প্রয়োজন।
– আমার একজন পরিচিত হোটেল ম্যানেজার আছে। আমি মোবাইল যোগাযোগ করিয়ে দিচ্ছি।
মোবাইল কানেকশন দিয়ে পীর সাহেবকে ধরিয়ে দেয় :
– হ্যালো, রাতের জন্য আমার একটা সিট দরকার। প্লিজ, বুকিং দেন।
– নাম বলুন।
– লেখেন, পীরানে পীর দস্তগীর, পীরে কামেল, শরিয়তে মোকাম্মেল, হাদিয়ে জামান, মোজাদ্দেদে আমান, মেফতাউল আরেফিন, সেরাজুস সালেহিন, মাহবুবে সোবহানি, কুতুবে রাব্বানি, শাহ্ সুফি সৈয়দ …
– থামেন থামেন, এতো বললেন টাইটেল, এবার আসল নাম বলুন।
– নামতো হারু মিয়া। শুধু নাম বললে কেউ চিনবে না। সংক্ষেপে লেখেন, মাওলানা হারু মিয়া নক্সেবন্দিয়া।
– মাওলানা হারু মিয়া নামে বুকিং দিয়ে দিলাম।
– পীরের তরিকাÑ নক্সেবন্দিয়া, মোজাদ্দেদিয়া, চিস্তিয়া, কাদেরিয়া, চার তরিকার নাম শোনেন নাই?
– জি শুনেছি।
– ফোন রাখেন, আমার সিট লাগবে না।
রাগে গজ গজ করতে করতে মোবাইল সেট ফেরত দিয়ে দেয়।
– কত বড় মূর্খ ম্যানেজার? তরিকত, শরিয়ত, মারেফত, হাকিকত কিছুই বুঝে না।
– হুজুর, ম্যানেজারকে বুঝানোর আগে নিজেদের বুঝা দরকার। তারিক মানে রাস্তা। আমরা যে রাস্তা দিয়ে যাচ্ছি তার নাম তারিকুল আরিচা, মানে আরিচা রোড। শিক্ষা মন্ত্রণালয়কে বলে ওজারাতুল মারেফাত। নাহিদ সাহেব মারেফত বিষয়কমন্ত্রী।
– তুমি এত কিছু বুঝলা কেমনে?
– বুঝছি লেখা পড়া কইরা। শুধু আলিফ বা তা ছা পড়লে এলেম হয় না। দরকার পড়লে চীনে যেতে হয়।
– তাই যাও, চীনে যাইয়া বেঙ খাও। আর এলেম কামাও।
নেয়ামত ছেলেকে মাঝে মাঝে ওয়াজ মাহফিলে নিয়ে যায়। ছোটকালে তাকে ওয়াজ মাহফিলে নিয়ে একটি গজল শিখিয়েছিল :
খোদা তোমায় ডাকতে জানি না
ডাকার মত ডাকলে খোদায় কেমনে শোনে না
লেখাপড়া শিখে তার ধারণা হয়েছে আল্লাহতো কানে কম শোনে না, চোখেও কম দেখে না, কখনো ঘুমায়ও না। সুতরাং তাকে ডাকাডাকির দরকার কী? আল্লাহতো ডাকতে বলেন নাই। আল্লাহ বলেছেন “ওয়া কাদা রাব্বুকা আল্লাহ তা-বুদু ইল্লা ইইয়াহু ওয়া বিল ওয়ালিদাইনি ইহসানা।” তোমরা আল্লাহর নির্দেশ মেনে চলো ও পিতা-মাতার সাথে ভালো আচরণ কর। এখানেতো ডাকাডাকি হাঁকাহাঁকির কোন কথা নেই। আদেশ নিষেধ মেনে চলার কথা বলা হয়েছে। যে লোক শুধু আল্লাহু আল্লাহু করে গলা ফাটায় কিন্তু আল্লাহর কোন বিধি-নিষেধ মানে না, যে ছেলে শুধু বাবাগো বাবাগো বলে ঘ্যানর ঘ্যানর করে কিন্তু বাবার কোন কথা শোনে না, তারা তো ভালো মানুষ হতে পারে না। তাই সে ডাকাডাকি হাঁকাহাঁকিতে বিশ্বাসী না হয়ে কাজে-কর্মে পারদর্শী হতে চেষ্টা করে।
ওয়াজ মাহফিলে বহুবার একই ওয়াজ শোনেছে সে। মরার সময় কিছুই সাথে যাইবো না। সঙ্গে যাইবো ঈমান আর আমল। কালেমা পড়লেই ঈমান অয়। কিন্তু আমল বড়ই কঠিন। আমল ছাড়া উপায় নাই।
আমল শব্দের অর্থ কাজ। মধ্যপ্রাচ্যে শ্রমিকদের বলে আমেল, প্রবাসীদের পাসপোর্টে ভিসার সিলে লেখা থাকে তাশিরাতুল আমেল। আমেল ভিসা নিয়ে লক্ষ লক্ষ বাংলাদেশী বিদেশে যায় আমল করতে।
আমাদের দেশে কাজ না করার নাম আমল। বাবা বলেছে :
– আমাদের হুজুর খুবই আমলদার। কোন কাম কাজ করে না। হুজরায় বসে সারাদিন আল্লাহু আল্লাহু করে। হুজুরের বুদ্ধিতেই তরে মাদ্রাসায় ভর্তি করছি। যাতে আমল ভালা হয়।
– বাবা, মাদ্রাসা আমলের জায়গা না। আমার কয়েকজন বন্ধু সুইমিং অ্যাকাডেমিতে ভর্তি হয়েছে সাঁতার শিখার জন্য। সবাইকে একটা বই দিয়েছে। নাম সাঁতার শিক্ষা। আমি একটা বই ফার্স্ট টু লাস্ট পড়ে ফেলেছি। আমি কি পানিতে নামলেই সাঁতরাইতে পারবো?
– আরে বোকা, বই পইড়া হাতুর হিগন যায় নাকি? পানিতে চুবানি খাইয়া আমরা হাতুর হিগছি। আমি হাতরাইয়া নদী পাড় অইবার পাড়ি। আমি কি বই পড়ছি?
– সেই কথাইতো বলতেছি। মাদ্রাসার কিতাব পড়লেই আমল হয় না। পানিতে নামতে হয়।
– হুজুরতো ঠিকই কয়্ হরকতে বরকত। দরকার মেহেনত।
– হরকত হরকত কম উচ্চারণ কর। হরকাতুল জিহাদের গন্ধ আছে। বিপদের চান্স আছে।
– সারা জীবন ওয়াজ হোনলাম, হরকত বরকত খেদমত মেহনত। না বুঝলেও মনে অয় সব বুঝি। এখন আবার হুনি কিয়ের জঙ্গি, জিহাদি, সন্ত্রাসী, মৌলবাদী, চরমপন্থী।
– তোমার আর বুইঝা কাম নাই। যা বুঝ তাই নিয়া থাক। জিহাদ করে জঙ্গিরা, ট্রেনিং নেয় চরমপন্থীরা, তালিম করে বুজর্গরা। মানে একটাই। উর্দু শব্দ জং, মানে যুদ্ধ। যারা যুদ্ধ করে তারাই জঙ্গি। টার্গেট এচিভের জন্য চরম যে চেষ্টা করে, সে চরমপন্থী, যারা মূলনীতিতে বিশ্বাসী তারা মৌলবাদী, যাদের কাজে প্রতিপক্ষ ভীত-সন্ত্রস্ত হয়, তারা সন্ত্রাসী। চোর-ডাকাতের কাছে পুলিশও সন্ত্রাসী।
– বাবা, এইবার থাম। আমার আর বুঝন লাগব না।
– যারা তোমারে বুঝায়, তারাই কিছু বুঝে না। মসজিদে বইসা মাইক লাগায়া আল্লাহু আল্লাহু করলেই পীরে কামেল, বুজর্গানে দীন।
– থাক বাবা, গিবত কইয়া লাভ নাই। তুমি ঠিকমত লেহা পড়া কর আর আল্লাহ-বিল্লাহ কর। আমলে সালেহ কর। তাতেই আল্লাহ খুশি।
– আমরা যা করতাছি ভালা কামই করতাছি। আমলে সালেহ মানেই ভালা কাম।

SHARE

Leave a Reply