Home ভ্রমণ লিওর সঙ্গে পঞ্চগড়ে কয়েক দিন -আকতার হাসান নূর (নাহিদ)

লিওর সঙ্গে পঞ্চগড়ে কয়েক দিন -আকতার হাসান নূর (নাহিদ)

আমার ক্লাস ওয়ানের পরীক্ষা শেষ। তাই আমি বায়না ধরলাম পঞ্চগড়ে আমার বড় চাচার বাড়িতে বেড়াতে যাবো। তখন সবাই রাজি হলো। আমরা বৃহস্পতিবার যাবো বলে ট্রেনের টিকেট কাটলাম। আমার সাথে আম্মু, বড় আপু নদী ও আমার পোষা একটা বিড়াল। ওর নাম লিও। কথামত আমরা যথাসময়ে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশন থেকে তিতুমীর ট্রেনে রওনা দিলাম পঞ্চগড়ে। লিওকে নেয়া হয়েছে পাখির খাঁচাতে। আপুর একটা জামা দিয়ে খাঁচাটা ঢেকে দেয়া হলো। ট্রেনের বগিটি ছিল পুরাতন। তারপর ট্রেন চলতে থাকল। একটার পর একটা স্টেশন চলতে চলতে শেষে বেলা ২টার দিকে চিলাহাটি স্টেশনে পৌঁছালাম। সেখান থেকে অটোরিক্সা ও পরে সিএনজির মতো এক ধরনের অটোরিকসা যার নাম পাগলু, পাগলুতে চড়ে প্রায় ৫০ মিনিট লাগল পঞ্চগড়ের ইসলামবাগ এলাকায় যেতে। আমার বড় চাচার বাড়িতে পৌঁছালাম বিকেল ৪টায়।
খাঁচা থেকে লিওকে বের করলাম এবং খাবার দিলাম। লিও খাবার খেল। লিওকে অবশ্য আমাদের সাথে নেয়ার কারণ হলো পঞ্চগড়ে চাচির কাছে রেখে পোষা। কারণ আমাদের বাসায় চট্টগ্রাম থেকে আনা দু’টি টিয়া পাখির একটিকে লিও আক্রমণ করে মেরে ফেলেছে। তাই অন্য টিয়াটিকে লিও এর হাত থেকে বাঁচাতে তাকে পঞ্চগড়ে আনা। তা নাহলে একই সাথে দুই ধরনের স্বভাবের প্রাণী মিল খাচ্ছিল না। কারণ বিড়াল মানেই সে ছোটখাটো শিকার করবেই। তারপর সে তার মত করে চলাফেরা করছিল। দুষ্টুমি করছিল, খেলছিল বিছানায়, সবার সাথে বসে টিভি দেখছিল।
আমরা পঞ্চগড়ে সাত দিন থাকলাম। বিভিন্ন জায়গায় বেড়ালাম, তার মধ্যে কমলা বাগান, চা বাগান, আমলকী বাগান এবং তেঁতুলিয়ায় গিয়ে হিমালয় দেখলাম। সেখানে বাংলাদেশের উত্তরের সর্বশেষ সীমানা জিরোপয়েন্ট দেখলাম, ছবি তুললাম। সেখান থেকে ভারতের হিমালয় খুব সুন্দর দেখা যাচ্ছে, দেখা যায় চায়ের বাগান এবং মহানন্দা নদীতে মানুষ পাথর তুলছে। সেখানে অনেক পাথর মেশিন দিয়ে ভাঙছে। আরেকটি জায়গায় গেলাম সেটা ইমিগ্রেশন পয়েন্ট সেখানকার বারান্দাতে দাঁড়িয়ে দেখলাম হিমালয় থেকে নেমে আসা মহানন্দা নদী, নদী থেকে পাথর তোলা। সে কী সুন্দর দৃশ্য! এখান থেকেই দেখা যাচ্ছে চায়ের বাগান তার পেছনে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে হিমালয়। তারপর সবুজ গাছপালায় ভরা দূরের পাহাড়, আর চা বাগান মনে হয় সবুজ বিছানা। সাদা ও হালকা লাল আভা, পাহাড়ের কয়েকটি চূড়া দেখতে পাওয়া যাচ্ছে এখানে, সেটা যে কী অপূর্ব তা ঠিক বুঝাতে পারবো না। সে যে কী সুন্দর দৃশ্য না দেখলে বোঝানো মুশকিল। আমরা সেখানে বসে বারো ভাজা খেলাম যা ভীষণ ঝাল ছিল।
আমরা গাড়িতে উঠলাম এবং জানালা দিয়ে দেখতে দেখতে বাড়িতে এলাম। এসে নাস্তা খেলাম, টিভি দেখছিলাম, লিও আমার সাথে দুষ্টুমি করছিল। এই বাড়ির বারান্দা বেশ বড়, সেখানে ফুলের বাগান ছিল। লিও সেখানে খেলতো এবং অন্য আরো বিড়ালও সেখানে আসতো। একদিন অন্য বিড়ালের সাথে লিও বাড়ির বাহিরে গেল কিন্তু আর বাড়ি ফিরে এলো না। তাকে আশপাশের বাড়ি বাড়ি অনেক খোঁজ করা হলো, দেয়ালে দেয়ালে পোস্টার লাগানো হলো এবং মাইকিং করা হলো, তাও পাওয়া গেল না। আমরা সাত দিন পর রাজশাহী ফিরে এলাম। তখনও লিওর খোঁজ পাওয়া যায়নি, তাই আমার মনে খুব কষ্ট হচ্ছিল। আমি আসার দিনে লিওকে দেখতে পাইনি, তাই আমার মনে অনেক দুঃখও হচ্ছিল। আসার পথে সারা রাস্তা লিওর খোঁজ পাওয়ার খবরের আশা করছিলাম, কখন আপু ফোন করে জানাবে যে লিওকে পাওয়া গেছে। আমার আপুর ইউনিভার্সিটির ক্লাস বন্ধ, তাই পঞ্চগড়েই থেকে গেছে। আব্বু আমাদের নিতে রাজশাহী স্টেশনে এলেন, আমি ও আম্মু ট্রেন থেকে নেমে বাড়ি পৌঁছালাম। এইভাবে আমাদের আনন্দ ও দুঃখের মধ্য দিয়ে লিওকে হারিয়ে মন খারাপের মধ্য দিয়ে পঞ্চগড় ভ্রমণ শেষ হলো ।
আমরা রাজশাহীতে আসার ছয় দিন পর লিওকে পাওয়া গেল পুকরের পাড়ের একটি বাড়িতে অনেক কাহিল ও রোগা অবস্থায়। সেখান থেকে এনে আপু গরম দুধ, মাছ-ভাত খাওয়ায়ে সুস্থ করে তুলেছে। আমার মন এখন খুব ভালো আছে।

SHARE

Leave a Reply