Home গল্প ল্যাপটপ -মাহবুব এ রহমান

ল্যাপটপ -মাহবুব এ রহমান

প্রতিদিনের মতো আজও দ্রুত বেডরুমে চলে গেল আফহাম।
‘নাতিটা ইদানীং কেমন যেন হয়ে গেছে। আগের মতো আর তেমন মেশে না আমার সাথে। গল্প শোনার জন্য বায়নাও ধরে না আজকাল, আফহামের নীরবে বেডরুমে চলে যাওয়া দেখে এসব ভাবছেন আফহামের দাদুমণি। পুরো নাম তানভির মোরশেদ আফহাম। পড়ে রাজধানীর একটি কেজি স্কুলে। সবে মাত্র ক্লাস ফোরে উঠেছে। বাসায় ওর আম্মু, দাদুমণি আর আব্বু। আগে গ্রামেই থাকতো ওরা। ঢাকায় আসা বছরখানেক হয়েছে। আব্বু চাকরি করেন একটি বেসরকারি ব্যাংকে আর আম্মু প্রাইমারি স্কুলে। আব্বুর ঢাকায় বদলি হওয়ায় চলে আসেন সবাই। আম্মুও ট্রান্সফার হয়ে আসেন রাজধানীর একটি স্কুলে। ক্লাস টু পর্যন্ত গ্রামেই পড়ালেখা করেছে আফহাম। বরাবরই ভালো ছাত্র ছিলো সে। কখনো পড়ালেখাতে কেউ তাকে পেছনে ফেলতে পারতো না। সব ক্লাসেই প্রথম রোলটা ছিল আফহামের দখলে। গ্রামের আলো-বাতাসে বড়ো হয়েছে ও। গ্রামের বিকেলের চিত্রটা শহরের মতো নয় মোটেই। গ্রামে আসরের পর শেষ বিকেলে যখন মাথার ওপর সূর্যটা ছড়াতো মিষ্টি রোদ। সবুজ ঘাসে চিকচিক মুচকি হেসে জানান দিতো বিদায় নেয়ার। তখন রাখালেরা প্রস্তুতি নিতো বাড়ি ফেরার। গাঁয়ের সকল ছেলে বেরিয়ে পড়তো মাঠে।
কেউ ফুটবল, কেউ ক্রিকেট আর কেউ গোল্লাছুট ইত্যাদি খেলায় মেতে উঠতো সবাই। সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ার পূর্বেই বাড়ি ফিরতো সবাই। আফহামও মাঠে বেরুতো বিকেলে। আফহামের আম্মু ছেলেকে মাঠে যেতে দিতে চাইতেন না। কিন্তু ওর দাদুমণি বকা দিতেন আম্মুকে। ‘ছোটো একটা মানুষ ও। বিকেল হয়েছে একটু মাঠে যাবে, খেলবে, ঘুরবে। তা না করে সারাদিন শুধু পড়া পড়া। এমন করে ছেলেকে একঘেয়ে বানাবে। কারো সাথে মিশতে চাইবে না পরে। নিজের মতো করে একটু না খেললে, ঘুরলে মানুষের সাথে মিশবে কেমন করে। সামাজিকতা শিখবে কেমনে!’ দাদুমণির এমন বকুনিতে আম্মু মাঠে যেতে দিতে বাধ্য হন।
আফহাম আর ওর বন্ধুরা মাঠের পাশের পুকুরপাড়ে দলবেঁধে গোল্লাছুট খেলতো। কিন্তু শহরে এমন নেই মোটেও। যে দিকে চোখ যায় শুধু যান্ত্রিক ব্যস্ততা। শহরে প্রথম আসার পর মোটেই ভালো লাগতো না আফহামের। চব্বিশ ঘণ্টাই চার দেয়ালের ভেতর বন্দী। দাদুমণিই ওর একমাত্র সাথী। মাঝে মাঝে একা একা বাসার ছাদে গিয়ে মনমরা হয়ে বসে থাকতো ও। ছাদে টবের ফুলগাছে প্রজাপতির ওড়াউড়ি দেখতো। সকালে ঘুম থেকে উঠেই নাশতা সেরে আম্মু দিয়ে যান স্কুলে। বেলা দুটোয় স্কুল বাস এনে নামিয়ে দিয়ে যায় বাসার নিচে। আম্মুর স্কুল ছুটি হয় বিকেল ৪টায়। তাই বাসায় এসে দাদুমণির হাতে খাবার খেয়ে গল্প জুড়তো দাদুমণির সাথে। দাদুমণি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে ঘুম পাড়াতেন ওকে। বাসার পাশে ছোট্ট একটু খালি জায়গা। দেখতে ছোটখাটো একটি মাঠের মতো। বিকেলে বস্তির ছেলেরা বেরুতো ফুটবল নিয়ে। আফহামও যেতে চাইতো কিন্তু ওর আম্মু ওদের সাথে মিশতে দিতেন না ওকে। ধীরে ধীরে মিশতে থাকে নতুন স্কুলের বন্ধুদের সাথে। জানতে পারে ওরা প্রত্যেকেই কেউ টিভি দেখে, কেউ ট্যাব অথবা ল্যাপটপে গেম খেলে বিকেলের সময়টা পার করে। তাই আফহাম আব্বুর কাছে বায়না ধরে তাকে একটি ট্যাব কিনে দেয়ার জন্য। অনেক ভেবেচিন্তে এবং শেষে ওর দাদুমণির কথায় মাঝারি দামের একটি ওয়ালটন ট্যাব কিনে দেন ওকে। প্রতিদিন বিকেলে আসরের পর আম্মু ট্যাব বের করে দিতেন। গেম খেলত আফহাম। আবার সন্ধ্যার আগে নিয়ে নিতেন। এমন করেই চলছিলো। আফহামের ছোটো চাচ্চু আমেরিকায় থাকেন। একদিন ফোনে কথা বলতে আফহামকে বলেন ‘শহরে এসেছো। আরো ভালো করে লেখাপড়া করতে হবে। যদি থ্রিতে তোমার ক্লাসে ফার্স্ট হতে পারো তাহলে একটা ল্যাপটপ পাঠাবো তোমার জন্য’ আফহাম আরো মন দিয়ে শুরু করলো লেখাপড়া। বার্ষিক পরীক্ষা এলো। ভালো করে পরীক্ষা দিলো এবং রীতিমতো অবাক করে দিয়ে ফার্স্ট হলো আফহাম। গ্রাম থেকে এসে নতুন একটি ছেলের এমন রেজাল্ট! তাই বিস্মিত ও খুশি শিক্ষকরাও। চাচ্চুও কথামতো ল্যাপটপ পাঠালেন আমেরিকা থেকে। আফহামের আম্মু ল্যাপটপটিও আগের মতো বিকেলে একটু ব্যবহার করতে দিতেন।
একদিন আফহাম স্কুল ব্যাগে লুকিয়ে স্কুলে নিয়ে যায় ল্যাপটপটি। বন্ধুদের কাছ থেকে সংগ্রহ করে নতুন নতুন গেম। ল্যাপটপটা রাখা ছিলো বেডরুমেই। ওর আম্মু সিকিউরিটি লক লাগিয়ে রাখতেন। কিন্তু কেমন করে কোডটি জেনে যায় আফহাম। তাই আগের মতো স্কুল থেকে এসে দাদুমণির সাথে গল্প করে ঘুমোয় না। দুপুরের খাবার খেয়ে দ্রুত চলে যায় বেডরুমে। ঘুমের ভান করে ল্যাপটপে পড়ে থাকে গেম নিয়ে। দাদুমণি তেমন খেয়াল করেন না বেডরুমে। ভাবেন ও বড় হচ্ছে, নিজে নিজে ঘুমোতে শিখছে। এভাবে ঘুমকে ফাঁকি দিয়ে গেম খেলে সময় পার করে আফহাম। গেমের প্রতি দারুণ রকমের আসক্ত হয়ে পড়ে। পড়ালেখার প্রতি আগ্রহটা কমতে থাকে দিন দিন। এমন করে চলে আসে ফোরের বার্ষিক পরীক্ষা। পরীক্ষা দেয় আফহাম। রেজাল্ট বেরুনোর দিন ওর আব্বুও সাথে যান স্কুলে। এবারও ছেলে ফার্স্ট হবে এই আশায় এসেছিলেন স্কুলে। রেজাল্ট বেরুলো। আফহামের রোল সাত। মাথায় আকাশ ভেঙে পড়লো আফহামের আব্বুর। তাকান ওর মুখের দিকে। মনমরা হয়ে ছেলেকে নিয়ে পথ ধরেন বাসার।

SHARE

Leave a Reply