Home ক্যারিয়ার গাইড লাইন মোরা বড় হতে চাই -আহসান হাবীব ইমরোজ

মোরা বড় হতে চাই -আহসান হাবীব ইমরোজ

পড় এবং পড়,
যে পড়ে সে বড়
এক.
ছুটছে এক যুবক। কালবোশেখি মেঘের গতিতে। যেন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে তার নাঙা তলোয়ারে। ভিসুভিয়াস আগ্নেয়গিরির মতোই সে হামলে পড়লো ভগ্নিপতি ও বোনের ওপর। এরপর কী হলো; মক্কার জাবালে নুরের মতোই স্থির হয়ে গেল, যুবকটি। যেন গলে পড়তে থাকলো উচ্ছল ঝর্ণার মতোই। এরপর অবিনাশী এক আকর্ষণে ছুটতে থাকলো অথৈ সাগরের সফেদ কল্লোলে। যুবকটি ওমর রা: আর সাগর স্বয়ং নবী মুহাম্মদ সা:। ইতিহাস বলে, এরপর এই যুবকই পাল্টে দিয়েছিল পৃথিবীর সামগ্রিক বিশ্বব্যবস্থা। কিসে এই আকাশসম পরিবর্তনের সূচনা? সেতো মহাগ্রন্থ আল কুরআন থেকে সুমধুর তেলাওয়াত বা ‘পড়া’।

দুই.
১৯৯০ সাল। ঢাকা আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্ট। আব্বা-আম্মা হজে যাচ্ছেন, এগিয়ে দিচ্ছি। সাথে এসএসসি ফলপ্রার্থী নুরুল ইসলাম। সে আমার আব্বা-আম্মার প্রিয় ছাত্র, জেলার শ্রেষ্ঠ স্কুল বিন্দুবাসিনীর ফার্স্টবয়। সম্পর্ক প্রগাঢ় হতেই, সে অবলীলায় বলে গেল তার পূর্ব নাম ছিল গনেশ; পাঠ্যপুস্তকের ‘ওমর ফারুক’ কবিতাটি তার জীবনের এই আমূল পরিবর্তন ঘটিয়েছে। জেরুজালেম যাওয়ার পথে নিজ ভৃত্যকে পালা করে উটের পিঠে উঠিয়ে অর্ধজাহানের খলিফা ওমর ইতিহাসে যে অমর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন সেটি সেই, কবিতার ভাষায়;
ভৃত্য চড়িল উটের পৃষ্ঠে উমর ধরিল রশি,
মানুষে স্বর্গে তুলিয়া ধরিয়া ধুলায় নামিল শশী।
১৯৯৭ সাল। একটি কনফারেন্সে গিয়েছি ভারতের আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়ে। অবাক কান্ড! এখানেও সেই তরুণ; পিএইচডি করছে। অনেকদিন দেখা নেই। ২০১৪ সালে অনেক খোঁজাখুঁজি। জানা গেল; আলহামদুলিল্লাহ! সে মধ্যপ্রাচ্যের একটি বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছে। তার জীবনের এই আমূল পরিবর্তনের অনুঘটক কী? ‘পড়া’ এবং ‘পড়া’।
আজকে সেই পড়া নিয়েই কিছু আলোচনা করা যাক, কেমন?
তো, শুরুতেই অভিধান বাবাজির সহযোগিতা নিই। বাংলা একাডেমি (১৯৫৫ সালে জন্ম হলেও প্রায় ৬০ বছর লেগেছে নিজের নামটি ‘বাংলা একাডেমী’ থেকে শুদ্ধ করে ‘বাংলা একাডেমি’ লিখতে) এক্ষেত্রে আমাদের সর্বোচ্চ মুরব্বি। সেখানে প্রায় একই উচ্চারণে দু’টি শব্দ আছে, ‘পরা’ এবং ‘পড়া’। চলোই না আগে জেনে নেই কী তাদের পার্থক্য।
পরা : (বিশেষণ)Ñ পরমা, প্রধানা। (ক্রিয়া)Ñ পরিধান করা। (অব্যয়)Ñ পরাক্রম, পরাজয়, পরাকাষ্ঠা।
এরপর আমাদের আলোচ্য শব্দটি ‘পড়া’ পাঠ বা অধ্যয়ন করা বা আবৃত্তি করা। এ ছাড়াও এর আরো ২৭ রকম অর্থ হতে পারে; যেমনÑ
পড়া: গাছ থেকে পড়া বা পতিত হওয়া, স্মরণে পড়া, উদয় হওয়া, আবদ্ধ হওয়া, শুয়ে বা বসে পড়া, ধরা পড়া, অসুখে পড়া, শীত বা গরম পড়া, বৃষ্টি পড়া, চোখে পড়া, দাম বা বাজার পড়া, শক্ত পাল্লায় পড়া, দাঁত বা চুল পড়া, পেছনে পড়া, শান্ত হওয়া বা রাগ পড়া, নদী সাগরে পড়া, আছাড় পড়া, গলে পড়া, বাকি পড়া, বেলা পড়া ইত্যাদি।
ঠিক কোন বয়সে বই হাতে নিয়েছিলাম মনে নেই। তবে দিব্যি বলা যায় একটি তুমুল পড়ার পরিবেশেই বড় হয়েছিলাম। জন্ম নানা বাড়িতে; ওখানেই শৈশবের বেশির ভাগ সময় কেটেছে। আব্বা, আম্মা এবং ছোট মামা তিনটি আলাদা স্কুলের প্রধান হিসেবে অবসরে আসেন। তাদের প্রত্যেকেরই ছিল বইয়ের বিপুল সংগ্রহ। সেখানে তৈমুর লং আর হালাকুর মতো কত যে হানা দিয়েছি লেখাজোখা নেই। আর নানা, নানু, বড় মামা, বড় খালা, নুর খালা; এদের অনেকেরই নাকটা সারাদিন দেখাই যেত না বললেই চলে, কারণ তা বইয়ে ডুবে থাকতো। একটি উদাহরণ দিলে কেমন হয়; বড় মামা খুবই অসুস্থ; মৃত্যুর মাসখানেক আগে দেখতে গিয়েছি ঢাকা থেকে। বাসায় বিদ্যুৎ নেই; ভাবছি, না জানি কত কষ্টে শুয়ে কাতরাচ্ছেন তিনি। কিন্তু রুমে ঢুকেই ভূত দেখার মতোই চমকে উঠলাম! তাজ্জব কান্ড! কাঁথা গায়ে জমিয়ে বসে হারিকেনের ভূতুড়ে আলোয় সাইমুম সিরিজ পড়ছেন; প্র্রায় ৮৫ বছর বয়সী বড় মামা। আমি কাছে ছিলাম না; তবে আমার বিশ্বাস মৃত্যুর আগ মুহূর্তেও হয়তো শিয়রে পাঠের অপেক্ষায় ছিল তার প্রিয় কোনো হাদিসগ্রন্থ। এ যেন পুলিৎজার বিজয়ী মার্কিন সাহিত্যিক ও সাংবাদিক নরমান মিলারের (১৯২৩-২০০৭) হৃদয়ের আর্তি ‘আমি চাই বই পাঠরত অবস্থায় যেন আমার মৃত্যু হয়।’
‘ছাগলে কি না খায়’ জাতের পাঠক ছিলাম। যা পেতাম সামনে সমানে সাবাড়; একেবারে গপাগপ। ভাগ্যিস, পাঠাগারের গর্বিত মালিকগণ যেমন মামা, মা-বাবা এরা আলোকিত মানুষ (অন্তত আমাদের ভাবনায়) ছিলেন, তাই কোন বাজে বই পাইনি, আল্লাহর রহমতে উচ্ছন্নে যাইনি। ব্রিটিশ দার্শনিক ও আধুনিক প্রয়োগবাদের জনক ফ্রান্সিস বেকন (১৫৬১-১৬২৬) বলেছেন, ‘কতগুলো বইকে শুধু চাখতে হবে, কতগুলোকে গিলতে হবে এবং কিছু সংখ্যক বইকে চিবুতে ও হজম করতে হবে।’ যদ্দুর মনে আসে যখন স্কুলে যাই যাই বয়স। কায়দা, শিশু-শিক্ষাতো ছিলই; এক রাতে মতিঝিলের শিক্ষক, বাবা এনে দিলেন রঙচঙের এক অদ্ভুত ছড়া বই। সোভিয়েতরা সে সময় তৃতীয় বিশ্বে তাদের সংস্কৃতির জোয়ার তৈরি করতে চাচ্ছে; প্রচুর রঙিন শিশুতোষ বইয়ে বাজার সয়লাব। বোধ করি এটিও তাদেরই ছিল। একটি ছড়া এখনও মনে গেঁথে আছে;
চিঠি নিয়ে ঘুরছে পিয়ন পাড়াতে/ কে জানে চিঠি আছে বা কার বরাতে?/ দলামোচড়া খাম, আর তাতে লেখা আছে/ দিতে হবে অকম্মার (অকর্মা) হাতে।/ এক তালাতে দিলে পিয়ন টোকা/ দেখে, ও মা! নিজের হাতে খেতে জানে না খোকা/গল্প বলে খাওয়াতে হয়, বুলিয়ন/ নাও অকম্মার চিঠি বললে, পিয়ন।/ চমকে উঠে খোকা, নিজেই নিলে চামচ/বল্লে, না না নেই এখানে তেমন অকম্মা (অকর্মা)॥…
ষষ্ঠ-সপ্তম বয়সেই মামার লাইব্রেরি চষে ধীরাজ ভট্টাচার্যের ‘যখন পুলিশ ছিলাম’, ‘যখন নায়ক ছিলাম’ বই শেষ। সোভিয়েত ঘরানার বই ‘গ্রহান্তরের আগন্তুক’ আমার বৈজ্ঞানিক কল্পকাহিনীর প্রথম পাঠ। ওইটুকুন বয়সে সেই বিখ্যাত ‘হৈটি টৈটি’ গ্রোগাসে গিলেছি। যুদ্ধে নিহত তরুণ এক বৈজ্ঞানিকের মস্তিষ্কবিজ্ঞানী প্রফেসর ভাগনারের কৌশলে কিভাবে হাতির মাথায় প্রতিস্থাপিত হয়, অফ্রিকার গহিন অরণ্য থেকে শুরু করে নানা স্থানে সেই হাতি-মানবের রোমাঞ্চকর ভ্রমণের গল্প। এ ছিল আলেক্সান্দার বেলিয়েভের (১৮৮৪-১৯৪২) রচনা; যাকে রাশিয়ান জুলভার্ন বলা হতো। পরবর্তীতে ভিন্ন মতের কারণে তাকে সাইবেরিয়ায় নির্বাসনে পাঠালে, সেখানেই তিনি মারা যান।
রহস্য-উপন্যাস পেলেতো সারাদিন পঙ্খিরাজে চড়ে টগবগিয়ে ছুটতাম। শশধর দত্তের দস্যু মোহন, মোহাম্মদ আবুল কাসেমের দস্যু বাহরাম। দস্যু বনহুর ও দস্যু রানী সিরিজের প্রায় ২৫০ বই লিখেছিলেন বগুড়ার রোমেনা আফাজ। ডা: নিহার রঞ্জন গুপ্ত (১৯১১-৮৬) নড়াইলের লোহাগড়ার মানুষ। বিখ্যাত চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ছিলেন। ছদ্মনাম বানভট্ট। তিনি ছিলেন কিরিটি রায়ের ¯্রষ্টা। তার প্রথম বই ‘কালো ভ্রমর’। ২০০টির বেশি উপন্যাস লিখেছিলেন তিনি।
যাযাবর এর ‘দৃষ্টিকোণ’ এর কথা কে না জানে। কাজী আনোয়ার হোসেন (১৯৩৬), ছদ্মনাম বিদ্যুৎ মিত্র, শামসুদ্দীন নওয়াব। কুয়াশা, মাসুদরানা রহস্য উপন্যাসসহ তার বইয়ের পরিমাণ প্রায় ৪৫০।
আগস্ট, ২০১০-এর একটি হিসেবে পৃথিবীতে বইয়ের সংখ্যা প্রায় ১৩ কোটি। এ সংখ্যাটি স্থির থাকলে এবং একজন মানুষ প্রতিদিন একটি করে বই পড়লেও তার সময় লাগবে প্রায় ৩,৫৬,১৬৪ বছর। তোমাদের কারো পক্ষে সম্ভব কি? বোধ হয় নয়। তাই বাছাই করে ভালো বইগুলো পড়তে হবে। বিখ্যাত ডাচ দার্শনিক স্পিনাজো (১৬৩২-১৬৭৭) বলেছেন, ‘ভালো খাদ্যবস্তুতে পেট ভরে, কিন্তু ভালো বই মানুষের আত্মাকে পরিতৃপ্ত করে।’ তাহলে উল্টো করে বলা যায়, ‘খারাপ খাবারে বদহজম, ডায়েরিয়া, কলেরা আর খারাপ বইয়ে আত্মার পচন।’ সুতরাং সময় থাকতেই, সাধু সাবধান!
আধুনিক সময়ের কয়েকজন দিকপালের কথা আলোচনা করবো। তারা স্ব স্ব ক্ষেত্রে এক একজন উজ্জ্বল নক্ষত্র। তবে প্রত্যেকের মূল বৈশিষ্ট্য হলো, এরা ছিলেন তাদের ক্ষেত্রে সেরা পাঠক।
বিশ্বের সর্বকালের সবচেয়ে সেরা বিনিয়োগকারী আমেরিকান ব্যবসায়ী ওয়ারেন বাফেট (১৯৩০-)কে প্রশ্ন করা হয়েছিল, সফলতার চাবিকাঠি কী? তিনি বলেছিলেন, ‘গাদা গাদা বই’। ‘প্রতিদিন কমপক্ষে ৫০০ পৃষ্ঠার ওপর নজর বুলাও, তুমিও সফল হবে।’ যখন তার বয়স সবে ১১, তিনি স্টক কিনেন। যখন কেবল ১৬ তিনি নানা জায়গায় ইনভেস্ট করে ৫৩,০০০ ইউএস ডলারের (বাংলাদেশী টাকায় ৪৪ লক্ষ টাকা মাত্র) মালিক বনে যান। হার্ভার্ড বিজনেস স্কুল থেকে রিজেক্ট হন। তার টুইট অ্যাকাউন্ট আছে কখনও তিনি টুইট করেননি। তিনি নোকিয়ার প্রথম আমলের একটি ফ্লিপ ফোন ব্যবহার করেন। আর সেটি গর্বের সাথে দেখিয়ে রসিকতা করে বলেন, ‘হা-হা- এটি আমাকে আলেকজান্ডার গ্রাহামবেল সরাসরি দিয়েছেন, ২০-২৫ বছর না হওয়া পর্যন্ত এটি আমি ফেলছি না।’ তার ডেস্কে কোনো কমপিউটার নেই। তিনি জীবনে একবার বাধ্য হয়ে ফেডারেল কোর্টে ইমেইল করেছেন এবং আরেকবার আরেকটি ইমেইলের উত্তর দিতে হয়েছে। তিনি ফোরবিসের দৃষ্টিতে কয়েকবার বিশ্বের এক নাম্বার আর অধিকাংশ সময় দ্বিতীয় সম্পদশালী ব্যক্তি থেকেছেন। তার বর্তমান সম্পদের পরিমাণ ৯৩.২ বিলিয়ন ইউএস ডলার বাংলাদেশী মুদ্রায় ৭,৭৬৩,৫৬০,০০০,০০০ টাকা মাত্র। যেটি বাংলাদেশের সামগ্রিক জাতীয় রিজার্ভের (৩৩ বিলিয়ন ইউএস ডলার; জানুয়ারি ২০১৮ ) প্রায় তিন গুণ।
৮৭ বছর বয়সী এই বাফেট এখনও প্রতিদিন ৬০০ থেকে ১০০০ পৃষ্ঠা পড়েন। মাত্র ৭ বছর বয়সেই একটি বই পড়ার জন্য বাছাই করেন, যার টাইটেল ছিল, ‘ঙহব ঞযড়ঁংধহফ ডধুং ঃড় গধশব $ ১০০০’। তার বিনিয়োগের সূচনাকাল থেকেই এখনও দিনের সিংহভাগ তিনি পড়াতেই কাটান। বয়স যখন ২১ তখনই ভালো বক্তা হওয়ার জন্য ১০০ ডলার খরচ করে ডেল কার্নেগির কোর্স করেন। প্রতিদিন প্রায় ৫০০ পৃষ্ঠা অর্থ ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত ডকুমেন্ট তন্ন তন্ন করে পড়েন; ৬ প্রভাবশালী নিউজ পেপার পড়েন। এভাবে প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা সময় পড়াতেই কাটান। দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের মডেল তারই উদ্ভাবন; তিনি সম্পদের ৯৪% আয় করেন তার ৬০তম জন্মদিনের পরেই। গত ৬০ বছর যাবৎ একই বাসায় আছেন যেটি সেই সময়ের মূল্য মাত্র ৩১,৫০০ ইউএস ডলার (বাংলাদেশী টাকায় ২৬ লক্ষ টাকা, এ দিয়ে বাংলাদেশের কোন জেলা শহরে একটি বাড়ি কেনা যাবে কিনা সন্দেহ!)। আসলেই কি তিনি কৃপণ দ্য গ্রেট? বোধ হয় নয়; কেননা এ পর্যন্ত দান করেছেন, ২৫.৫ বিলিয়ন ইউএস মার্কিন ডলার।
বিশ্বের এক নম্বর ধনী বিল গেটস বছরে ৫০টি বই পড়েন। সর্বদা বই সাথে রাখেন, যেখানেই যান, যার সাথেই কথা বলেন বই আছেই। পড়াই যেন তার প্রধান কাজ হয়ে যায়। তার এ পড়ার অবশ্যই সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকে; নতুন তথ্য সংগ্রহ এবং পুরানো জ্ঞান ঝালাই করা। চুটিয়ে টিভি দেখা নয়, রাতে ঘুমের আগে গেটস অবশ্যই ১ ঘণ্টা বই পড়েন; যা তার ঘুমেরও সহায়ক হয়। তাদের সফলতার মূল সুর অধ্যয়ন, আর আমাদের দেশে যারা সম্পদে সফল হতে চায় তাদের হাতে বই রাখাও যেন পাপ!
মাদাম কুরি (১৮৬৭-১৯৩৪=৬৭), জন্ম পোল্যান্ডের ওয়ারশতে কিন্তু উচ্চশিক্ষা এবং পরবর্তী জীবন কাটে ফ্রান্সে। শিক্ষক দম্পতির ৫ সন্তানের তিনি ছিলেন কনিষ্ঠতমা। স্বদেশের উন্নয়নের কাজের জন্য তার পিতা ও মাতার স্বজনেরা একেবারে রিক্তহস্ত হয়ে যান। তার দাদাও একজন বিখ্যাত শিক্ষক ছিলেন। মাত্র ১০ বছর বয়সে তিনি মা ও বড় বোনকে হারান। তিনি স্কুলজীবনেই সর্বোচ্চ ভালো ফলাফলের জন্য গোল্ড মেডেল পান। সে সময়ের রাশিয়ার অধিকৃত পোল্যান্ডে মহিলা শিক্ষা নিষিদ্ধ থাকায় তাকে গোপন স্কুলে পড়তে হয়েছে। আর্থিক দৈন্যতার জন্য খরচ চালাতে তাকে অন্যের বাড়িতে গৃহশিক্ষিকার কাজ করতে হতো। তিনি স্বদেশকে খুবই ভালবাসতেন নিজ কন্যাদের পোলিশ ভাষা শেখান এবং তাদের পোল্যান্ড ভ্রমণে উদ্বুদ্ধ করেন। তার আবিষ্কৃত একটি পদার্থের নাম রাখেন পোলোনিয়াম।
তিনিই প্রথম মহিলা যিনি ফ্রান্সের প্যারিস বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মহিলা অধ্যাপক, ফ্রান্সের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় হতে প্রথম ডক্টরেট প্রাপ্ত, প্রথম মহিলা নোবেল পান, প্রথম ব্যক্তি এবং একমাত্র মহিলা যিনি দুইবার নোবেল পান এবং একমাত্র ব্যক্তি যে দু’টি ভিন্ন সাবজেক্টে নোবেল পান। পদার্থ ও রসায়ন এবং শান্তিতে নিজে দু’টিসহ তার পরিবারের ৬ সদস্যের মধ্যে ৫ জনে ৬টি নোবেল পান। দ্বিতীয় কন্যা পাননি কিন্তু তিনি ১০২ বছর জীবিত ছিলেন। দু’টি পদার্থেরও তিনি আবিষ্কর্তা। জ্ঞানের শ্রেষ্ঠত্বের ৬টি ক্ষেত্রে প্রথম এবং নিজ পরিবারে ৬টি নোবেল পাওয়া মাদাম কুরি ও তার স্বামী ‘পড়া’ এবং গবেষণার জন্য কী পরিমাণ কষ্ট করেছেন কল্পনা করা যায়? একটি কুঁড়েঘড়ের মতো বাসায় তাদের গবেষণাকর্ম পরিচালনা করতেন। মাঝে মাঝে আর্থিক কষ্টের কারণে তাকে অভুক্ত থাকতে হতো, এতে তিনি অজ্ঞান হয়ে যেতেন। আটচালা এক কুঁড়েঘরে তিনি ও তার স্বামী টানা ৪৫ মাস দিনমজুরের মতো খেটে নানা পরীক্ষা নিরীক্ষায় ডুবে থাকতেন। তাদের রেডিয়াম নিষ্কাশনের পেটেন্ট নিতে অনুরোধ করা হয়। তারা এতে বিপুল অর্থের মালিক হতে পারতেন। কারণ তখন এক গ্রাম রেডিয়ামের মূল্য ১,৫০,০০০ ডলার। কিন্তু তারা রাজি না হয়ে বললেন, ‘এটির সমুদয় উপার্জন মানবতার কল্যাণে উৎসর্গ হোক।’ যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে বলা হলো, ফ্রান্সের মন্ত্রিসভা তাদের সংবর্ধনা দিতে চায়। তারা বিনয়ের সাথে লিখলেন, ‘আমাদের পক্ষ থেকে মন্ত্রীদের ধন্যবাদ। আমরা সম্মান চাই না। মানবতার কল্যাণে গবেষণায় আমাদের দরকার শুধু একটি ভালো ল্যাবরেটরি।’ জ্ঞান-গবেষণায় কী নিদারুণ সাধনা যার মূলে পাঠ্যপুস্তক পড়া ও গভীর অধ্যয়ন। আমরা যারা সত্যিকার অধ্যয়ন এবং গভীর গবেষণাতে নেই শুধু মুখস্থ বিদ্যায় ভর করে গোল্ডেন এ প্লাসের ধামাকা অফার পেতে অস্থির; কিন্তু নোবেলের ধামা তাদের জুটবে কি?
আমেরিকার ২৬তম এবং সর্বপ্রথম নোবেল পাওয়া প্রেসিডেন্ট থিওডোর রুজভেল্ট (১৮৫৮-১৯১৯=৬১)। তিনি ব্রেকফাস্টের আগেই একটি বই পড়া শেষ করতেন। আর সারাদিনের ব্যস্ততার ভেতরে আরো ২-৩টি। মাত্র ৪২ বছর বয়সে আমেরিকার সর্বকনিষ্ঠ প্রেসিডেন্ট হওয়ার আগে তিনি নিউইয়র্কের পুলিশ কমিশনার ছিলেন। তার নিজের ধারণা সমগ্র জীবনে তিনি প্রায় ১০ হাজার বই পড়েছেন। ওদিকে মাত্র ৫০ বছরেই বিশ্ব কাঁপিয়ে দেওয়া নেপোলিয়ান বোনাপার্টের (১৭৬৯-১৮২১) হিসাবটা কিন্তু আলাদা। তিনি বলেছিলেন, ‘অন্তত ষাট হাজার বই সঙ্গে না থাকলে জীবনটা অচল’ যুদ্ধ ক্ষেত্রেও তিনি রীতিমত লাইব্রেরিসহ যেতেন। তার শয়নকক্ষের পাশেই থাকতো প্রায় ১৩,০০০ বই সংবলিত লাইব্রেরি। রুজভেল্ট জীবনে ৪০টি বই, প্রায় ১০০ আর্টিকেল এবং ১৫০,০০০টি চিঠি লিখেন। বক্সিং, রেসলিং, বডি বিল্ডিং, নাচ, কবিতা আবৃত্তি, প্রকৃতিবিদ্যাসহ তার ছিল বহুমুখী প্রতিভা। তার প্রথম বই পাখি বিষয়ক যেটি তিনি কলেজের সামারের বন্ধে লিখেন। তিনি তার ডায়েরিতে লিখেন দিনের ভেতর কমপক্ষে ৬ ঘণ্টা তিনি পড়াতে কাটান। ট্রেন বা বাসের অপেক্ষা, ব্যক্তির সাথে আলাপ এমনকি পার্টির মিটিং বা কনফারেন্সে তিনি বই খুলে পড়া শুরু করতেন। আমেরিকার অন্যতম প্রভাবশালী প্রেসিডেন্টের সফলতার মূল কিন্তু পড়া। আমাদের সমাজে কি কল্পনা করা যায়?
সমাজে, দেশে এবং বিশ্বে বড় কিছু করতে চাইলে আমাদের পড়ার সাথে গভীর মহব্বত গড়ে তুলতে হবে। বিদ্রোহী ও জাতীয় কবির আহবান দিয়েই শেষ করছি;
কে আছ জোয়ান হও আগুয়ান হাঁকিছে ভবিষ্যৎ।
এ তুফান ভারী, দিতে হবে পাড়ি, নিতে হবে তরী পার॥

SHARE

Leave a Reply