Home গল্প ভুকুর ভাত -আফজাল হোসেন

ভুকুর ভাত -আফজাল হোসেন

আজ বৃহস্পতিবার। হাফ স্কুল। আগামীকাল শুক্রবার, স্কুল ছুটি। অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে ফয়সাল, এজাজ, মুকুল, সফিক, বারীসহ আরো অনেকে। হাফ স্কুল শেষ করে তারা সিদ্ধান্ত নিলো আগামী কাল পাড়ার সকল ছেলে-মেয়ে এক সঙ্গে চড়–ইভাতি বা ভুকুর ভাত করবে। স্কুল ছুটি হলে সবাই যার যার মত বাসায় ফিরলো। গ্রামের আমবাগানের নিচে একটি টিনের মসজিদ। সেখানে পাড়ার মুরুব্বিসহ এলাকার স্কুলপড়ুয়া অধিকাংশ ছেলে নামাজ আদায় করে। আমরা সবাই মাগরিবের নামাজের সময় মিলিত হলাম। নামাজ শেষ করে সকলেই সিদ্ধান্ত নিলাম আগামীকাল ভুকুর ভাত কিভাবে সম্পন্ন করা যায়। এদের ভেতর ফয়সাল ছিল এলাকার সব থেকে মেধাবী, চরিত্রবান ও সকলের কাছে খুব প্রিয়। ক্লাসে তার রোল এক। তাই গ্রামের সব ছেলে তাকে খুব শ্রদ্ধা করে ও ভালোবাসে। সুতরাং তাদের ভুকুর ভাত বাস্তবায়ন কমিটির দায়িত্ব তাকে দিলো সবাই। তারা সিদ্ধান্ত নিলো আগামী কাল সকলের বাসা থেকে এক কৌটা করে চাল, ১০ টাকা করে নগদ এবং একটি করে ডিম সংগ্রহ করবে। এর সাথে সকলেই একমত পোষণ করে যার মত বাসায় ফিরলো।
পরদিন জুমার নামাজের আগে এজাজ, সফিক ও মুকুল একটি ব্যাগ নিয়ে বাসায় বাসায় হাজির হলো, চাল, টাকা ও ডিম সংগ্রহের জন্য। পাড়ার মায়েরা সকলেই যে যার মত চাল, টাকা ও ডিম দিলেন।
পাড়ায় হাসানের পরিবার ছিলো খুব দরিদ্র, তার বাসায় চাল, টাকা দেয়ার মতো কোন সামর্থ্য ছিল না। এজাজেরা তার বাসায় গেলে হাসান তার মায়ের কাছে দৌড়ে গেল, ‘মা ও মা এজাজ ভাইয়েরা এসেছে চাল ও টাকা দাও না মা’ তার মাকে বার বার বলতে থাকলো। কিন্তু তার মা কোন জবাব দিলেন না। এ অবস্থা দেখে তাদের আর বুঝতে বাকি রইল না যে, তাদের বাসায় চাল ও টাকা দেয়ার মতো সামর্থ্য নেই। তারা সেখানে বেশি সময় না থেকে বেরিয়ে এলো। এভাবে তারা প্রায় ২০-২৫ জনের বাসায় চাল, টাকা ও ডিম সংগ্রহ করল।
জুমার নামাজ শেষ করে সবাই পাশের বাগানে এসে মিলিত হলো। চারিদিকে আনন্দের জোয়ার বইছে। ফয়সাল, এজাজ ও মুকুল কোদাল, দাউলি, শাবল ও কিছু ইট দিয়ে একটি চুলা তৈরি করল ভুকুর ভাত রান্নার জন্য। মুকুল এর বাসায় ছিল একটি বড় হাঁড়ি সেই হাঁড়িটা নিয়ে আসা হলো। এদিকে বারী ও সফিকের দায়িত্ব ছিল তেল, লবণ, পেঁয়াজ, মরিচসহ প্রয়োজনীয় মসলাপাতি কিনাকাটা করা। তারা এগুলো নিয়ে চুলার কাছে হাজির হলো। সবাই গোল হয়ে বসে মসলাপাতি তৈরি এবং চাল ডালগুলো ভালোভাবে পরিষ্কার করা শুরু করল। এলাকার ছেলেমেয়েরা দলবদ্ধভাবে এসে চুলার কাছে ভিড় জমাতে থাকে। কখন রান্না হবে? এই অপেক্ষায় তাদের মন ব্যাকুল হয়ে ওঠে। ফয়সাল ও এজাজ রান্না করতে যাবে এমন সময় দেখে রান্নার জন্য যে কাঠ, খড়ি প্রয়োজন সেগুলো নেই। সাথে সাথে তারা সকলকে ডেকে তাদের সমস্যার কথা বলল। সকলেই যে যার মত কাঠ ও খড়ি নিয়ে এসে হাজির হলো। আসরের নামাজ শেষ করে শুরু হলো রান্না।
সিদ্ধান্ত হলো চাল, ডাল ও সবজি দিয়ে খিচুড়ি এবং ডিম রান্না হবে। শুরু হলো রান্না। একদিকে চলে রান্না আর অন্য দিকে পাড়ার ছেলেরা বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা ও গল্প আড্ডায় মেতে থাকে রান্নার আশপাশে। তাদের ভেতর যেন আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। চারিদিকে যেন উৎসবের আমেজ। পাড়ার মায়েরা, চাচিরা এসে এসে দেখে যান আমরা ঠিক মত রান্না করতে পারছি কিনা। তারাও আমাদের রান্না কাজে সহযোগিতা করেন। ইতোমধ্যে রান্নার সুগন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে আশপাশে। রান্নার সুগন্ধে ছেলেমেয়েরা এসে চুলার পাশে ভিড় জমানো শুরু করেছে।
রান্না শেষ হতে প্রায় মাগরিবের আজানের সময় হয়ে এলো। ফয়সাল সকলকে ডেকে একত্র করলো। ঘোষণা দিলো এখন মাগরিবের নামাজের বিরতি এবং নামাজ শেষ করে সকলেই নিজ নিজ দায়িত্বে বাসা থেকে খাবার থালা নিয়ে আসবে। সবাই মাগরিবের নামাজ শেষ করে যে যার মত বাসায় গিয়ে খাবার থালা নিয়ে এসে চুলার পাশে ভিড় জমানো শুরু করলো। ফয়সাল, এজাজ, মুকুল, বারী, সফিকসহ পাড়ার সকল ছেলেমেয়ে উপস্থিত। কিন্তু ফয়সাল এদিক ওদিক তাকিয়ে কাকে যেন খুঁজছে। তার এই খোঁজাখুঁজি দেখে এজাজ জিজ্ঞেস করে, ফয়সাল তুমি কি কাউকে খুঁজছো? ফয়সাল বলে হ্যাঁ, সবাইকে দেখছি কিন্তু হাসানকে দেখছি না! সে আসেনি? এজাজ বললো, না সে ভুকুর ভাত করার জন্য তার মাকে খুব অনুরোধ করেছিলো, কিন্তু তার বাসায় চাল ও টাকা না থাকায় ভুকুর ভাতে অংশ নিতে পারেনি। ফয়সাল রাগান্বিত হয়ে বলল, আগে বলনি কেন? চলো আমরা সকলেই তার বাসায় গিয়ে তাকে নিয়ে আসি। আমাদের এই ভুকুর ভাতে তাকেও অংশগ্রহণ করাই। আমরা এই আনন্দ সকলের মাঝে ছড়িয়ে দিতে চাই। টাকা আর চালের অভাবে আমাদের কোন বন্ধু এই খাবার থেকে বাদ পড়ুক এটা আমরা চাই না। আমাদের আনন্দ, উল্লাস, দুঃখ-বেদনা সকলের মাঝে ভাগ করে দিতে চাই। এই কথা শুনে সকলেই খুশি হলো এবং ফয়সাল, এজাজসহ পাঁচ ছয়জন হাসানের বাসায় গেল। ফয়সাল তার বাসায় গিয়ে তার মাকে ডাক দিলো, চাচি মা, ও চাচি মা, হাসান কোথায়? তার মা বলল, বাবা সেতো সারাদিন ঘর থেকে বের হয়নি। পাড়ার ছেলেমেয়েরা সবাই চাল দিয়ে ভুকুর ভাত করে আনন্দ করছে, আর সে তাতে অংশগ্রহণ না করতে পেরে ঘরে দরজা বন্ধ করে শুয়ে আছে। ফয়সাল তার দরজার কাছে গিয়ে ডাক দিলোÑ হাসান, ও হাসান দরজা খুলো। আমরা এসেছি তোমাকে নিয়ে যেতে। চাঁদা দিতে পারনিতো কী হয়েছে। আমরাতো আছি, আমরা সকলেই একসঙ্গে ভাগাভাগি করে খাবো এসো। এ কথা শুনো হাসান আনন্দে দ্রুত দরজা খুলে ফয়সালকে জড়িয়ে ধরলো আর বলল, তোমরা আমার সত্যিকারের বন্ধু। আমি ভাবতেই পারিনি তোমরা আমাকে বাসায় ডাকতে আসবে। তাদের এই ভালোবাসা দেখে হাসানের মায়ের চোখে পানি ঝরতে লাগলো। তারা হাসানকে বাসা থেকে নিয়ে হাজির হলো বাগানের সেই রান্নার জায়গায়। সেখানে সবাই অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিলো তাদের জন্য। হাসানকে দেখে সকলেই আনন্দে আত্মহারা হয়ে গেল। সকলেই আনন্দে উল্লাস করতে থাকলো। ফয়সাল, এজাজ, মুকুলসহ চার-পাঁচজন মিলে সকলে গোল হয়ে বসালো এবং সকলকে তাদের নিজ নিজ থালাতে খাবার তুলে দেয়া হলো। ফয়সাল, হাসানকে তার পাশে বসালো। এভাবে সকলকে যখন খাবার ভাগ করে দেয়া শেষ হলো তখন সবাই এক সঙ্গে খাওয়া শুরু করল। এভাবেই সকলের আনন্দের মধ্য দিয়ে শেষ হলো ভুকুর ভাত।

SHARE

Leave a Reply