Home ধর্ম চিন্তা দেশের প্রতি ভালোবাসা ক্যারিয়ার গঠনের অন্যতম বাহন -ড. মুহা. রফিকুল...

দেশের প্রতি ভালোবাসা ক্যারিয়ার গঠনের অন্যতম বাহন -ড. মুহা. রফিকুল ইসলাম

বন্ধুরা, আসসালামু আলাইকুম। সকলের প্রতি আন্তরিক শুভেচ্ছা রইলো। দেখতে দেখতে আমরা মার্চ মাসে চলে এসেছি। এ মাস আমাদের জীবনে অত্যন্ত তাৎপর্য বহন করে। বাংলাদেশের যত স্মরণীয় ও আনন্দময় দিবস আছে, মার্চ মাসে তার একটি রয়েছে। এতক্ষণে নিশ্চয় বুঝেছো, মার্চ মাস আমাদের স্বাধীনতার মাস। ১৯৭২ সালের ২২ জানুয়ারি এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এ মাসের ২৬ তারিখ বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবস হিসেবে পালন করা হয়। এ দিবসের পেছনে অনেক ত্যাগ-তিতিক্ষা জড়িত। যাদের জীবন এবং যৌবনের বিনিমিয়ে আমরা প্রিয় বাংলাদেশ পেয়েছি তাদের জন্য আমরা সবসময় দোয়া করবো তাই না? কেননা, তারা আমাদের জন্য একটি সুন্দর দেশ উপহার দিয়েছেন। আর যারা নিরীহ, ঘুমন্ত মানুষের ওপর অন্যায়ভাবে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে তারা অবশ্যই যেন উপযুক্ত শাস্তি পায়, সে ব্যাপারেও আমরা প্রার্থনা করবো।
বন্ধুরা, এখন প্রিয় বাংলাদেশের জন্য আমাদের করণীয় কী? এ দেশের জন্য তোমরা ছোট ছোট কিশোর বন্ধুরা কী করতে পারো? সেটাই ভাবতে হবে। সুজলা-সুফলা সুন্দর ও মনোহর এ বাংলাদেশের মাটিতে বসে তোমার জীবনকে কিভাবে উচ্চতায় নিতে পারো? কিভাবে এদেশের জন্য অবদান রাখতে পারো? কী করলে এ দেশ ভালো হবে; সে সব নিয়ে তোমাদের ভাবনাগুলো সাজাতে পারো আমাদের ভাবনাগুলোর সাথে। আমরা আমাদের ক্যারিয়ারের জন্য, দেশের জন্য এবং আমাদের উন্নতি ও নিরাপত্তার জন্য অনেক কাজ করতে হবে। তবে সব কাজ তো আর এখনই তোমাদের পক্ষে করা সম্ভব না তাই না? এ জন্য বিশেষ করে তোমরা এবং আমরা যেসব কাজ করতে পারি তা হচ্ছেÑ

১.
দেশকে মনপ্রাণ দিয়ে ভালোবাসা
ব্যক্তির অন্তর্নিহিত আবেগের বহিঃপ্রকাশকে ভালোবাসা বলে। দেশের প্রতি যদি যে আবেগ প্রতিফলিত হয়, তাকে দেশের প্রতি ভালোবাসা বলে। স্বদেশের প্রতি ভালোবাসা, গভীর অনুভূতি এবং মমত্ববোধকে দেশপ্রেম বলে। নিজের দেশকে ভালোবাসতে হবে। নবী করিম সা:কে যখন স্বজাতির লোকেরা মক্কা ত্যাগে বাধ্য করেছিলো তখন তিনি নিজ দেশ সম্পর্কে বলেছিলেন, “তোমার থেকে অধিক পবিত্র দেশ আমার কাছে আর নেই, যদি আমার জাতির লোকেরা তোমার থেকে বের করে না দিত, আমি অন্যত্র বসবাস করতাম না।” (তিরমিজি) দেশের ভালোবাসার ব্যাপারে প্রখ্যাত পন্ডিত ও বহু ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ (১৮৮৫-১৯৬৯) বলেন, ‘মাতা, মাতৃভূমি ও মাতৃভাষা আমাদের কাছে সর্বাপেক্ষা মূল্যবান।’ সাহাবাগণও দেশকে খুব ভালোবাসতেন। মদিনায় একবার হজরত আবু বকর রা: এবং বেলাল রা: জ্বরে আক্রান্ত হলেন। তারা মক্কার কথা ভেবে কবিতা আবৃত্তি করছিলেন। সাহাবীদের এ অবস্থা দেখে নবী করিম সা: দোয়া করলেন, ‘আল্লাহুম্মা হাব্বিব ইলাইনাল মাদিনা কা হুব্বিনা মাক্কাহ আও আশাদ্দা’Ñ হে আল্লাহ, আমরা মক্কাকে যেমন ভালোবাসি, আমাদের অন্তরে মদিনার প্রতি তার চেয়ে অধিক ভালোবাসা দান করুন।’ (বুখারি ও মুসলিম) অতএব দেশের প্রতি ভালোবাসা অবশ্যই থাকতে হবে।

২.
যেভাবে দেশকে ভালোবাসা যায়
আমরা অনেক কাজের মাধ্যমে দেশকে ভালোবাসতে পারি। আমরা আমাদের অনেক প্রিয় বস্তুকে যেমন ভালোবাসি, তেমনি আমাদের দেশকে ভালোবাসতে হবে। এ ভালোবাসা শুধু কোনো একদিন বা এক মাস অথবা এক মুহূর্তের ব্যাপার নয়, বরং এমন হবে, যার মাধ্যমে এ দেশ বিশ্বের মাঝে খুব ভালো বলে বিবেচিত হবে। সব ধরনের অত্যাচার, নির্যাতন, অবৈধ সকল কর্মকান্ড থেকে মুক্ত হয়ে মানুষের জন্য একটি উত্তম আশ্রয় হিসেবে বিবেচিত হবে। দেশকে কেমন ভালোবাসতে হবে তা বুঝতে হলে ফিলিস্তিনের মানুষদের দিকে নজর ফিরাতে হবে। দেশ না থাকলে কত কষ্ট সহ্য করতে হয়, তা রোহিঙ্গা থেকে আগত মানুষদের দেখলেই যথেষ্ট অনুধাবন করা যায়। সুতরাং আমরা দেশকে কিভাবে ভালোবাসতে পারি এখানে তার কিছু ইঙ্গিত প্রদান করা হলো।
ক. তোমরা বন্ধুরা একে অপরকে ভালো কাজে সহযোগিতা করে এবং মন্দ কাজ থেকে বিরত রেখে। স্কুল, কলেজ এবং মাদরাসা থেকে যারা ভালো হয়ে বেড়ে উঠবে, তারা দেশের জন্য সম্পদ হিসেবে পরবর্তীকালে দেশকে এগিয়ে নিতে পারে।
খ. একে অপরকে ভালোবাসা, ¯েœহ ও সহযোগিতার মাধ্যমে। এক শরীরের মত হয়ে বেড়ে ওঠা। শরীরের যেমন কোনো অঙ্গে ব্যথা হলে সমস্ত শরীর ব্যথা অনুভব করে, তেমনি তোমাদের শৈশব ও কৈশোর পর্যায়ে যে বন্ধুরা বিপদে পড়বে অথবা সমস্যার সম্মুখীন হয় তাকে সাহায্যের মাধ্যমে।
গ. দেশের ভালোবাসার জন্য দেশের ভালো ভালো দিকসমূহ বিভিন্ন মানুষের সমাবেশে উপস্থাপন করা। যেমনÑ বাসা, মসজিদ, কর্মক্ষেত্র, ক্লাব বা তোমরা যখন নিজেরা কোন আলোচনা কর তখন দেশের ইতিবাচক সব বিষয় নিয়ে আলোচনা করা।
ঘ. দেশের সেবা ও কল্যাণমূলক সকল ইতিবাচক কাজে অংশগ্রহণ। যেমনÑ তোমার এলাকায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা করা, স্যানিটেশন ব্যবস্থাপনা করা, মানব চলাচলের খোলা স্থানে কোন ময়লা জমা হলে তা দূর করা, কোন স্থানে গাছ পড়ে থাকলে বা রাস্তা খারাপ থাকলে বন্ধুরা মিলে ঠিক করে মানুষের চলাচলের উপযোগী করে দেয়া।
ঙ. কোন বন্ধু যদি মাদক গ্রহণ করে, ধূমপান করে, ক্লাস ফাঁকি দেয়, ইভটিজিং করে তাকে সে সব কর্মকান্ড থেকে বিরত রাখা।
চ. কেউ যদি মিথ্যা কথা বলে, চুরি করে, বাবা-মা, বন্ধু-বান্ধবী, শিক্ষক ও গুরুজনদের সাথে খারাপ আচরণ করে তাকে সে সকল আচরণ থেকে বিরত রাখা।
ছ. নিজ দেশের শান্তি, নিরাপত্তা ও মর্যাদা রক্ষার জন্য তোমাকে দেশের সেবার জন্য, মানুষের উপকারের জন্য নিজকে তৈরি করা ও অন্যদের তৈরি করার জন্য চেষ্টা করা।
জ. যেকোনো ধরনের মারামারি, হানাহানি, দলাদলি পরিত্যাগ করার পাশাপাশি প্রাকৃতিক পরিবেশের ক্ষতি সাধন থেকে বিরত থাকা। মহান আল্লাহ বলেছেন, ‘জলে এবং স্থলে যত বিশৃঙ্খলা দেখা যায় তা মানুষের হাতের অর্জন। (সূরা আর রূম, আয়াত নং ৪১)
সুতরাং এ সকল বিধিনিষেধ পালন অথবা বর্জনের মাধ্যমে দেশকে অনেক বেশি ভালোবাসা যায়।
৩.
দেশকে ভালোবাসলে দেশ আমাকে কী দিতে পারে?
একজন মানুষ যখন স্বাধীন দেশে জন্মগ্রহণ করে এবং আরেকজন পরাধীন দেশে এ দু’জনের মাঝে মন-মানসিকতার দিক থেকে বিশাল পার্থক্য সূচিত হয়। স্বাধীন ভূখ-ের মানুষ সকল মৌলিক অধিকার এবং মানবীয় অধিকার নিয়ে বেড়ে ওঠে, পক্ষান্তরে যে স্বাধীন নয়, সে অনেক ধরনের অপ্রাপ্তি নিয়ে বেড়ে ওঠে। প্রথমত এবং প্রধানত এ আত্মবিশ্বাস নিয়ে বেড়ে ওঠার শক্তি দেশ আমাকে প্রদান করে। যারা দেশকে ভালোবেসেছে এবং দেশের জন্য কাজ করেছে, দেশ তাদের জন্য অনেক কিছু করেছে। যেমনÑ ১৯৫২ সালে বাংলা ভাষার জন্য যারা জীবন দান করেছেন, তারা অত্যন্ত ভালো কাজ করেছেন তাই না? বাংলাদেশে তাদের স্মরণে অনেক কিছু করা হয়েছে। পাশাপাশি তাদের এ ভালো কাজের জন্য অনেকেই দোয়া করেন। তাঁরা এ দোয়া পাওয়ার অধিকারী হয়েছেন, দেশকে ভালোবেসে জীবন দেয়ার জন্যই। বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এ দেশের মানুষকে ধারণ করে অনেক কবিতা ও গল্প রচনা করেছেন। তাঁর একটি প্রত্যাশা ছিলো মসজিদের পাশে কবর যেন হয়। এ দেশ তাঁকে তার আশা পূরণ করার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মসজিদের পাশে তাকে কবর দেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণে, বাংলাদেশকে সুন্দর, মনোরম ও নিরাপদ করার জন্য যারাই ত্যাগ স্বীকার করেছেন আমাদের এ প্রিয় দেশ যথাযোগ্য মর্যাদায় তাদের সে অবদানের কথা পাঠ্য বইতে, কোন কোন সেন্টার করে, কখনও রাস্তার নামকরণ করে, কখনও জাতীয় পুরস্কার প্রদান করে তাদেরকে যথাযোগ্য মর্যাদায় স্মরণ করেছে। এটা ব্যক্তির জন্য খুব বড় অর্জন।
বন্ধুরা, মূলত দেশকে ভালোবাসা এবং এর সেবা করা আমাদের ক্যারিয়ারের অংশ। প্রিয় ‘বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণে কাজ করবে’ এতটুকু স্বপ্ন তোমাদের বড় হবার জন্য যথেষ্ট। তবে এ কথাটি মনে রাখতে হবে, দেশ তোমার জন্য কী করলো সেটা বড় কথা নয়, বরং তুমি দেশের জন্য কী করলে সেটাই বড় ব্যাপার। সুতরাং তোমাকে অনন্য সাধারণ করার জন্য এখনই প্রস্তুতি নাও!
স্বাধীনতার এ মাসে আমাদের প্রত্যয় হোকÑ ‘দেশকে সেবা দেয়ার জন্যে ক্যারিয়ার অর্জন করে দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতা অর্জন করা।

SHARE

Leave a Reply