Home তোমাদের গল্প একটুখানি অভিমান -আনিছুর রহমান

একটুখানি অভিমান -আনিছুর রহমান

আমি লাবিব। আমি এ বছর SSC-তে A+ পেয়েছি। আব্বু আমাকে বলেছিল A+ পেলে আমাকে রেজাল্টের পরেই ল্যাপটপ কিনে দিবে। আর এখন আমি আব্বুকে বলতেই বলছে এত তাড়াহুড়ো করার কী দরকার। আমি আবার তাড়াহুড়ো করলাম কই? আমি তো A+ পেয়েছি। আর ল্যাপটপের কথা তো আমি বলিনি। আব্বু নিজেই বলেছেন। এখন আবার বলছেন ব্যবসার অবস্থা ভালো না। পরীক্ষার আগে তো আমাকে বলা হয়নি ব্যবসার অবস্থা ভালো থাকলে ল্যাপটপ কিনে দিব। তাহলে তো আমি আর এত স্বপ্ন দেখতাম না। এদিকে রাজু ভাই আমাকে দুটো গেমসের সিডি গিফ্ট করবে বলেছে। রিকশায় বসে এ কথাগুলো মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছিল। হঠাৎ রিকশা ড্রাইভারের কথা শুনে সম্বিত ফিরে পেলাম। রিকশা ড্রাইভার বলছিল কোথায় যাবেন? আমি কোথায় যাবো জানি না, আপনার যেখানে ইচ্ছা নিয়ে যান। ড্রাইভার চালাচ্ছিল এ সময় তার ফোন বেজে উঠল। ড্রাইভার কথা বলছিল এইভাবে : ট্যাহার মিল করতে পারলে আনবো। তয় আইজকা আর ঔষধ আননের পারমু না। ফোন রেখে রিক্সার ড্রাইভার কথা বলছিল, বড় বিপদে আছি ভাই, যা আয় রোজগার অয় তা দিয়া বাজানের ঔষধ কেনাই শেষ। এহন আবার কইছে বাপের লাইগা একখান কম্বল নেওনের লাইগা। দুইশো ট্যাহার নিচে তো আর কম্বল পাওয়া যাইবো না। ড্রাইভার বলল : আপনে এইখানে নামেন। আমি নেমে ভাড়া দিতে যাবো দেখি রাগ করে আসার সময় মানিব্যাগ ফেলে এসেছি। তাই ড্রাইভারকে বললাম, আমার ঘড়িটা নেন। আমি তো মানিব্যাগ রুমে রেখে এসেছি। ড্রাইভার বলল: আপনের বিপদের সময় আপনের কাছ থেইকা ঘড়ি নিমু! আইজকা না হয় নাই, যেই দিন থাকবো সেইদিন দিয়েন, আমারে না পাইলে গরিব কাউরে দিয়া দিয়েন। রিকশা থেকে নেমে ভাবলাম রাগ করে কাজটা কি ভুল হয়ে গেল নাকি? না! যে বাড়িতে আমার মূল্যায়ন নেই সে বাড়িতে আর যাবো না। হঠাৎ আসরের আযান দিল, সবাই নামাজ পড়তে যাচ্ছে, আমিও নামাজ পড়তে গেলাম। নামাজ শেষ করে দেখি প্রচন্ড খিদে পেয়েছে। কিছু খেতে হবে টাকাও নাই। পাশে একটি দোকানে গিয়ে এক গ্লাস পানি পান করলাম। এরপর দোকানে কিছু সময় ধরে বসে আছি, সেই দোকানে কাজ করত আমার মত ছোট্ট একটি ছেলে। অনেকক্ষণ পর ছেলেটি বলল: ভাইজান কিছু লাগবে।
তখন আমি দোকানদারকে সবকিছু খুলে বললাম। সে বলল, আরে ভাই ট্যাহা নাই ত কি অইছে পেটে ক্ষুধা লাগছে খান। তখন সে নাস্তা আর চা খেতে দিল। তাকে জিগাইলাম পড়াশোনার কথা, সে বলল হ ভাই ক্লাস নাইন পর্যন্ত পড়ছিলাম। ভাইজান জানেন আমি কিন্তু ক্লাসে দুই নাম্বারে ছিলাম। এক নাম্বার হইতাম কিন্তু এক যার হে হইল গিয়া স্কুল কমিটির সদস্যের পোলা। তাই সারেরা তারে মার্ক বেশি দিত। তয় স্কুল থেইকা কিন্তু আমি একাই বৃত্তি পাইছিলাম।
হঠাৎ কারখানা থেইকা খবর আইলো বাপজান মারা গেছে। বিশ্বাস করেন বাইজান আমার খুব ভালা মানুষ আছিল। আর এই শোকে আমার মায় কথা কইবার পারে না। ডাক্টার কইছে ভালো করতে অনেক ট্যাহা লাগবো। আমার এক সারে এই দোকানডা ধরাইয়া দিছে। এহান থেইকা যা আয় হয় কিছু খরচ করি আর কিছু রাখি মার জন্য। কথাগুলো শুনে আমি নিজেকে ঠিক রাখতে পারলাম না, আমার চোখের সামনে আমার বাবার কষ্টের ছবি ভেসে উঠল। ভাবলাম আর কখনো বাবা-মায়ের সাথে এমনটি করবো না এবং আমি বাড়ির পথে পা বাড়ালাম।

SHARE

Leave a Reply