Home দেশ-মহাদেশ ইমাম বুখারীর মাতৃভূমি উজবেকিস্তান -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

ইমাম বুখারীর মাতৃভূমি উজবেকিস্তান -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

উজবেকিস্তান মধ্য এশিয়ার একটি দেশ। আয়তন ৪ লাখ ৪৭ হাজার ৪০০ বর্গ কিলোমিটার (১,৭২,৭৪২ বর্গ মাইল)। জনসংখ্যা ২০১৭ সালের আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী ৩ কোটি ২৯ লাখ ৭৯ হাজার। এ দেশের পশ্চিম ও উত্তরে কাজাকিস্তান, পূর্বে কিরগিজিস্তান, দক্ষিণ-পূর্বে তাজিকিস্তান এবং দক্ষিণে আফগানিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান। উজবেকিস্তানের পশ্চিম অংশে দেশটির প্রায় ৩৭ শতাংশ এলাকা নিয়ে স্বায়ত্তশাসিত কোরাকালপোগ প্রজাতন্ত্র অবস্থিত। উজবেকিস্তানের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে অবস্থিত তাশখন্দ দেশটির রাজধানী শহর এবং শিল্প ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র। উজবেকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ উজবেক জাতির লোক। উজবেক ও রুশ এদেশের রাষ্ট্রীয় ভাষা। এদেশের মুদ্রার নাম উজবেকিস্তানি স’ম (ইউজেডএস)।
উজবেকিস্তানে জাতিগত গ্রুপের মধ্যে রয়েছে উজবেক ৮৩.৮ শতাংশ, তাজিক ৪.৮ শতাংশ, কাজাখ ২.৫ শতাংশ, রুশ ২.৩ শতাংশ, কারাকালপাক ২.২ শতাংশ এবং অন্যান্য ৪.৪ শতাংশ। উজবেকিস্তানের জনগণের শতকরা ৭৯ ভাগ মুসলিম, ৫ ভাগ রুশ অর্থোডক্স খ্রিষ্টান এবং ১৬ ভাগ অন্যান্য ধর্মাবলম্বী। তবে পিউ রিসার্চ সেন্টারের রিপোর্ট অনুযায়ী উজবেকিস্তানের জনগণের শতকরা ৯৬.৩ ভাগ মুসলিম।
বিখ্যাত হাদিসবেত্তা ইমাম বুখারীর (১৯৪-২৫৬ হি:) জন্মভূমি এই উজবেকিস্তান। তার পুরো নাম মুহাম্মদ বিন ইসমাইল বিন ইবরাহীম বিন মুগীরাহ বিন বারদিযবাহ। তিনি ‘বুখারি শরিফ’ নামে একটি হাদিসের সংকলন রচনা করেন, যা মুসলিমদের নিকট হাদিসের সর্বোত্তম গ্রন্থ হিসেবে বিবেচিত। তার মূল নাম মুহাম্মদ। উপনাম আবু আবদুল্লাহ। ‘আমিরুল মুমিনিন ফিল হাদিস’ তাঁর উপাধি। বুখারা তাঁর জন্মস্থান বলে তাকে বুখারী বলা হয়।
তিনি খোরাসানের বুখারায় (বর্তমানে উজবেকিস্তানের অংশ) জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম ইসমাইল ইবনে ইব্রাহিম। তাঁর বাবা ইসমাইলও মুসলিম বিশ্বে একজন পরিচিত হাদিসবিদ ছিলেন। ইমাম বুখারী (রহ:) বাল্যকাল থেকেই শিক্ষা-দীক্ষার প্রতি গভীর আগ্রহী ছিলেন। তিনি প্রথমে কোরআন পাঠ শুরু করেন। মাত্র ৬ বছর বয়সে তিনি কুরআন মুখস্থ করেন। ১০ বছর বয়স থেকে তিনি হাদিস মুখস্থ করা শুরু করেন। ১৬ বছর বয়সেই তিনি বহু হাদিস মুখস্থ করে ফেলেন। মহান আল্লাহ্ তাকে অসাধারণ স্মরণশক্তি দান করেছিলেন।
ষোল বছর বয়সে তিনি মা এবং বড় ভাইয়ের সাথে হজে গমন করেন। হজের পর তিনি মক্কাতেই থেকে যান এবং হিজাজের হাদিসবিশারদদের কাছ থেকে হাদিস গ্রহণ করতে থাকেন। হাদিস অন্বেষণের জন্য তিনি ইরাক, সিরিয়া ও মিসরসহ বহু অঞ্চল সফর করেন। দীর্ঘ ১৬ বছর পর তিনি হাদিস অন্বষণের ভ্রমণ শেষ করে মাতৃভূমি বুখারায় ফিরে আসেন। ইমাম বুখারী রচিত গ্রন্থের সংখ্যা ২০টিরও বেশি। ইমাম বুখারী এক পর্যায়ে মাতৃভূমি বুখারা ত্যাগ করে সমরখন্দের খরতঙ্গে চলে যান এবং সেখানেই মৃত্যবরণ করেন। খরতঙ্গেই তাকে সমাহিত করা হয়।
১৯২৪ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত উজবেকিস্তান সোভিয়েত ইউনিয়নের অধীনে উজবেক সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র নামে পরিচিত ছিল। ১৯৯১ সালে দেশটি স্বাধীনতা লাভ করে। ১৯৯২ সালে সংবিধান সংশোধন করে এদেশকে একটি ধর্মনিরপেক্ষ ও গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও সোভিয়েত আমলে প্রচলিত কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণের বিভিন্ন রূপ আজও দেশটির আর্থ-রাজনৈতিক কাঠামোয় রয়ে গেছে।
জারশাসিত উজবেকিস্তান: রুশ শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পূর্বে বর্তমান উজবেকিস্তান বুখারা আমিরাত, খিভা খানাত এবং কোকান্দ খানাতের মধ্যে বিভক্ত ছিল। ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষার্ধে উজবেকিস্তান রুশ সাম্রাজ্যের অন্তর্গত হয়। এ সময় প্রচুরসংখ্যক রুশ এ অঞ্চলে বসতি স্থাপন করে। ১৯১২ সালের হিসাব অনুযায়ী, জারশাসিত উজবেকিস্তানে বসবাসকারী রুশদের সংখ্যা ছিল ২,১০,৩০৬ জন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে রুশ কর্তৃপক্ষ উজবেকিস্তানসহ মধ্য এশিয়া থেকে সৈন্য সংগ্রহ করার প্রচেষ্টা চালালে এ অঞ্চলব্যাপী বিদ্রোহ দেখা দেয়। ১৯১৭ সালে রুশ বিপ্লবের ফলে রাশিয়ায় জারতন্ত্রের পতন ঘটে এবং রাশিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু হয়। এমতাবস্থায় রুশ সরকার উজবেকিস্তানের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলে।
সোভিয়েত উজবেকিস্তান : ১৯২০ সালের মধ্যে মধ্য এশিয়ায় রুশ কর্তৃত্ব পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয় এবং কিছু প্রতিরোধ সত্ত্বেও উজবেকিস্তানসহ সমগ্র মধ্য এশিয়া সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯২৪ সালের ২৭ অক্টোবর উজবেক সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে হিটলারের নেতৃত্বাধীন জার্মানি সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করলে ১৪ লাখ ৩৩ হাজার ২৩০ জন উজবেক সৈন্য সোভিয়েত রেড আর্মির পক্ষে নাৎসি জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশ নেয়। ২,৬৩,০০৫ জন উজবেক সৈন্য যুদ্ধ চলাকালে নিহত হন এবং ৩২,৬৭০ জন নিখোঁজ হন।
১৯৯১ সালের ৩১ আগস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনকালে উজবেকিস্তান স্বাধীনতা ঘোষণা করে। ১ সেপ্টেম্বরকে উজবেকিস্তানের জাতীয় স্বাধীনতা দিবস ঘোষণা করা হয়।
উজবেকিস্তানের রাজনীতি একটি রাষ্ট্রপতিশাসিত প্রজাতন্ত্র কাঠামোয় পরিচালিত হয়। রাষ্ট্রপতি হলেন একাধারে রাষ্ট্রের প্রধান ও সরকার প্রধান। রাষ্ট্রের নির্বাহী ক্ষমতা সরকারের ওপর ন্যস্ত। আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সরকার এবং দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা উভয়ের ওপর ন্যস্ত। উজবেকিস্তানের আইনসভা ১৫০ সদস্যের নি¤œকক্ষ ওলি মজলিস (সর্বোচ্চ পরিষদ) এবং ১০০ সদস্যের সিনেট নিয়ে গঠিত। উজবেকিস্তানে সরকারি পদপ্রাপ্তি রাজনৈতিক দলের সদস্যপদ নয়, বরং কে কোন গোত্রের, তার ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল। উজবেকিস্তানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট শাভকাত মিরজিয়য়েভ এবং প্রধানমন্ত্রী আবদুল্লাহ আরিপভ।
উজবেকিস্তানের প্রশাসনিক এলাকা ১২টি ভিলোইয়াতি বা প্রদেশ, একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রজাতন্ত্র এবং একটি শাহরি বা স্বতন্ত্র নগরীতে (তাশখন্দ) বিভক্ত। সেগুলো হলো যথাক্রমে আন্দিজান, বুখারা, ফারগানা, জিজজাখ, কাশকাদারিয়া, খোরেজম, নামানগান, নাভোইয়ি, সমরখন্দ, সুরখানদারিয়া, সিরদারিয়া ও তাশখন্দ ভিলোইয়াতি, কারাকালপাকসতান প্রজাতন্ত্র এবং তাশখন্দ নগরী।
উজবেকিস্তানের ৮০% এলাকা সমতল মরুভূমি। দেশের পূর্বভাগে রয়েছে সুউচ্চ পর্বতমালা যেগুলো ৪,৫০০ মিটার উচ্চতা পর্যন্ত উঠে গেছে। উজবেকিস্তানের দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্ত তিয়ান শান পর্বতমালার পশ্চিম পাদদেশ নিয়ে গঠিত। উজবেকিস্তানের উত্তরের নিম্নভূমি কিজিল কুম নামের এক বিশাল মরুভূমি, যা দক্ষিণ কাজাকিস্তানেও প্রসারিত হয়েছে। ফের্গানা উপত্যকা উজবেকিস্তানের সবচেয়ে উর্বর অঞ্চল; এটি কিজিল কুম মরুভূমির ঠিক পূর্বে অবস্থিত এবং উত্তর, দক্ষিণ ও পশ্চিমে পর্বতমালা দ্বারা বেষ্টিত। সির দরিয়া নদী এই অঞ্চলটিকে কিজিল কুম মরুভূমি থেকে পৃথক করেছে। আমু দরিয়া অপর গুরুত্বপূর্ণ নদী।
উজবেকিস্তানে প্রায়ই ভূমিকম্প হয়। ১৯৬৬ সালে এমনই এক ভূমিকম্পে রাজধানী তাশখন্দের বেশির ভাগ অংশ ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
উজবেকিস্তান প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সভ্যতাকে সংযুক্তকারী বিখ্যাত সিলক রুটের ওপর অবস্থিত। উজবেকিস্তানের জাদুঘরগুলোতে প্রায় ২০ লাখের মত প্রতœবস্তু রয়েছে, যেগুলো মধ্য এশিয়ায় প্রায় ৭০০০ বছর ধরে বসবাসকারী বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে। অনেক পর্যটক এই সমৃদ্ধ ইতিহাস সম্বন্ধে জানার উদ্দেশ্যে উজবেকিস্তান ভ্রমণ করেন। এছাড়াও যারা সক্রিয় পর্যটনে আগ্রহী, তাদের জন্য উজবেকিস্তানের পাহাড়গুলোতে চড়া এবং তুষারাবৃত পাহাড়গুলোতে স্কি করার সুব্যবস্থা আছে। উজবেকিস্তানের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর সমরখন্দ রেশম পথের মধ্যস্থলে অবস্থিত এবং এটি বিশ্বের প্রাচীনতম শহরগুলোর একটি। আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব সপ্তম শতকে এটি প্রতিষ্ঠিত হয়। এখানকার অধিবাসীরা মূলত তাজিক। ৩২৯ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আলেকজান্ডার এটি জয় করেন। সমরখন্দের প্রধান আকর্ষণ রেগিস্তান নামের এলাকা, যার চারপাশ ঘিরে আছে অনেকগুলো প্রাচীন মাদ্রাসা। এছাড়াও এখানে অনেক বিখ্যাত মসজিদ ও স্মৃতিস্তম্ভ আছে।
উজবেকিস্তানের প্রধান ভাষা হলো উজবেক। এই ভাষায় উজবেকিস্তানের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ লোক কথা বলেন। প্রায় ১৪% লোক রুশ ভাষায় এবং প্রায় ৪% লোক তাজিকি ভাষায় কথা বলেন। এ ছাড়া পার্শ্ববর্তী দেশগুলো থেকে আগত অনেকগুলো ভাষা, যেমন তুর্কমেন, কাজাক ও কিরঘিজ ভাষা এখানে প্রচলিত।
উজবেক ভাষা বিংশ শতাব্দীর শুরুতে আরবি লিপিতে লেখা হতো। সোভিয়েত ইউনিয়নের অংশ হওয়ার পর লেনিনের অধীনে এটি লাতিন লিপিতে লেখা শুরু হয়। কিন্তু স্তালিন ক্ষমতা দখলের পর ১৯৪০-এর দশক থেকে এটি সিরিলীয় লিপিতে লেখা হতে থাকে। ১৯৯১ সালে উজবেকিস্তান স্বাধীনতা লাভ করলে প্রাক্তন সোভিয়েত দেশগুলো থেকে রাষ্ট্রীয় স্বাতন্ত্র্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে উজবেক সরকার ১৯৯৩ সালে উজবেক ভাষা সরকারিভাবে আবার লাতিন লিপিতে লেখার আদেশ জারি করে। উজবেক শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানগুলোতে ধাপে ধাপে এই লিপি সংস্কার বাস্তবায়ন করা হয় এবং ২০০০-এর দশকের মাঝামাঝি এই সংস্কার সম্পূর্ণ হবে বলে ধারণা করা হয়। কিন্তু এই লিপি সংস্কার সিরিলীয় লিপিতে অভ্যস্ত বয়স্ক ও প্রবাসী উজবেকদের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। তা ছাড়া এতে দেশটির নবীন প্রজন্মের সিরিলীয় লিপিতে লেখা ইতিহাস থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ার আশঙ্কা আছে।

SHARE

Leave a Reply