Home জানার আছে অনেক কিছু নিজের জীবন গড়বো নিজেই =ড. মুহা. রফিকুল ইসলাম

নিজের জীবন গড়বো নিজেই =ড. মুহা. রফিকুল ইসলাম

বন্ধুরা, আস্সালামু আলাইকুম। পুরো বছরজুড়ে তোমরা ভালো থাক এই কামনা করছি। ইংরেজি নতুন একটি বছর শুরু হয়েছে। আশা করি তোমাদের পরিকল্পনামত সব ঠিক চলছে। গত সংখ্যায় জীবনগঠনের জন্য বেশ কিছু ব্যাপারে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। সেগুলো পুরো জীবনের সাথে যুক্ত। যার যতটুকু বয়স, তার ততটুকু গ্রহণ করার চেষ্টা করতে হবে। দুনিয়া এবং আখিরাতে সফল হওয়ার জন্য অনেক কাজ করতে হবে। মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করতে হবে তার শেখানো বাণীতে। তিনি সূরা আল বাকারার ২০১ নম্বর আয়াতে বলেছেন : ‘হে আমাদের রব দুনিয়া ও আখিরাতে কল্যাণ দান কর।’ সফলতার জন্য দোয়া করার পাশাপাশি সর্বোচ্চ উপায়ে সব ধরনের চেষ্টা করতে হবে। কেননা চেষ্টা ছাড়া কোন মানুষ সফলতা লাভ করে না। সফল জীবনের জন্য কী কী কাজ করতে হয়? আমাদের দৃষ্টিতে যারা সফল মানুষ হিসেবে পরিচিত তারা কী করতেন? একটু ভেবে দেখ। এটা পড়ার আগে একটু কল্পনা কর। তোমাদের যে বন্ধুরা অগ্রসর তারা কী করে? যে বন্ধু ভালো ফুটবল বা ক্রিকেট খেলে এবং ক্লাসে ভালো রেজাল্ট করে সে কী করে? তারা হয়তো আর্থিকভাবে তোমাদের চাইতে অনেক বেশি চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে, তথাপি তারা অনেক এগিয়ে যায়। কেন? তোমরাও পারবে। অবশ্যই পারবে। সে জন্য কিছু কাজ করতে হবে।

ক্লাসের কাজ এবং বাড়ির কাজ যথাযথভাবে করা
একজন ছাত্র হিসেবে তোমাদের প্রথম কাজ সময়মত ক্লাসে যাওয়া এবং ক্লাস প্রদত্ত সকল কাজ যথাযথভাবে শেষ করা। যেসব মানুষ জীবনে সফল হয়েছেন, তাদের কেউ খারাপ ছাত্র-ছাত্রী ছিলেন না। হয়ত তারা ডিগ্রি অর্জনের ক্ষেত্রে কখনও সফল হননি তথাপি শিক্ষক এবং বন্ধুদের কাছে তারা ভালো ছাত্র হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে তারা সফল হয়েছেন। সুতরাং তোমাদের ঐ স্থানটি অর্জন করতে হবে। ‘তুমি একজন ভালো ক্লাস পারফরমার’- এমন একটি পরিচিতি সবার মাঝে অর্জন করতে হবে।

ইতিবাচক মনোভাব বজায় রাখা
ইতিবাচক মনোভাব সফলতার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনেক কিছু পছন্দ না হতে পারে, কিন্তু তা খুব উপকারী যা তোমার জানা নেই। এ জন্য শিক্ষক বা সিনিয়র কোন সম্মানীয় ব্যক্তি কিছু বললেই সে ব্যাপারে নেতিবচিক চিন্তা থেকে বিরত থাকতে হবে। সেখানে ইতিবাচক কোন্ কোন্ বিষয় আছে তা গ্রহণ করতে হবে। যে ব্যক্তি বড় হবে, তার উচিত অন্যের মাঝে নেগেটিভ খোঁজ না করে পজিটিভ খুঁজে বের করা। এ ব্যাপারে Winston Churchill এর একটি কথা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন, “A pessimist sees the difficulty in every opportunity; an optimist sees the opportunity in every difficulty” ‘একজন নেতিবাচক ব্যক্তি প্রত্যেক সুযোগের মাঝে অসুবিধা দেখে, আর একজন ইতিবাচক মানুষ প্রত্যেক অসুবিধার মাঝে সুবিধা খুঁজে পায়’। সুতরাং তোমাদের অবশ্যই দ্বিতীয় দলের মাঝে শামিল হতে হবে।

বড়দের সম্মান করা
বড়দের সম্মান না করলে নিজে বড় হওয়া যায় না। কবি বলেছেন, ‘বড় যদি হতে চাও, ছোট হও তবে’। বড় মানুষেরা বড় হওয়ার প্রেরণা না দিলে কখনও কেউ বড় হয় না। তোমরা মনে করতে পারবে কেউ তোমাকে ইশারায় দেখিয়ে বলেছে ‘এই ছেলে বা মেয়ে’ ভবিষ্যতে বড় কিছু হবে? যদি বলে, তাহলে তা খুব আশাব্যঞ্জক কথা, তুমি তা মনে রাখবে এবং তা প্রমাণ করে দেখাবে। আর যদি কেউ না বলে থাকে, তাহলে আজ থেকেই শুরু হোক তোমার পথ চলা, যাতে মানুষ বলতে বাধ্য হয়। তোমার সুন্দর কাজ, আচরণ এবং পড়ালেখার ব্যাপারে আন্তরিক হওয়ার মাধ্যমে মানুষ বলতে বাধ্য হবে তুমি বড় হবে। তোমরা মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সা:-এর ঐ গল্পটা জানোÑ ‘তিনি যখন চাচার সাথে বাণিজ্যের জন্য সিরিয়ায় যাচ্ছিলেন, তখন খ্রিষ্টান পাদরি ঐ কাফেলায় কিশোর মুহাম্মদ সা:-কে দেখে তাঁর চাচাকে বলেছিলেন, ‘তাঁকে সাবধানে রেখো সে খুব বড় একজন হবে’। দেখো একজন বড় মানুষ আরেক জনকে বড় হওয়ার বার্তা দিয়ে যায়। আমাদের নবী বলেছেন, ‘যে বড়দের সম্মান করে না আর ছোটদের স্নেহ করে না সে আমার দলভুক্ত নয় অর্থাৎ উম্মত নয়।’ অতএব অন্যকে সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা ও সম্মান করতে হবে, যাতে তোমরা আরো বেশি সম্মানিত হতে পারো।

অতিরিক্ত চাহিদা পোষণ না করা
প্রতিটি সফল মানুষের জীবনে কষ্ট করার শত শত স্মৃতি রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর প্রফেসর ড. আতিউর রহমানের জীবনী তোমরা জানো। তিনি যখন ক্যাডেট কলেজে ভর্তির জন্য মৌখিক পরীক্ষা দিতে গিয়েছেন, তখন দফতরি সাহেবের জামা কাপড় পরিধান করে ভাইভা দিয়েছেন, যখন ভর্তি হতে গিয়েছেন, তখন গ্রামের মানুষেরা বাজার থেকে চাঁদা তুলে দিয়েছেন এবং তিনি ভর্তি হয়েছেন। আচ্ছা তোমাদের কত দাবি থাকে পিতা-মাতার কাছে? অনেক তাই না? তারা সব কিছু পূরণ করেন আর একটি মাত্র কথা বলেন, ‘সবকিছু পাবে যদি রেজাল্ট ভালো করো’ তাই না? আমরা কি পারি সেটা করতে? অধিকাংশ সময় ব্যর্থ হই। তার পরও আমাদের চাহিদার শেষ থাকে না। সফল হওয়ার জন্য অনেক চাহিদা থাকা চলবে না। অল্পে তুষ্ট থাকতে হবে। পিতা-মাতার সামর্থ্যরে মাঝে অবস্থান করেই সফলতা অর্জন করতে হবে।

আচরণে সংযমী হওয়া
সফল হওয়ার জন্য ‘বিনয়-ন¤্র’ হওয়া অত্যন্ত প্রয়োজন। বিনয়ী মানুষের আচরণ অত্যন্ত সুন্দর হয়। তাকে সবাই ভালোবাসে, ¯েœহ করে, মায়া করে। সে সবার মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। তোমার স্কুল বা মাদরাসার যে সকল ছাত্র বা ছাত্রী আচরণে বিনয়ী এবং সংযমী তাকে সকলে পছন্দ করে। তাকে তার শিক্ষকগণ বড় হওয়ার প্রেরণা দেন, তার জন্য দোয়া করে। পরিবারের মাঝেও সংযমী আচরণের সন্তানকে আব্বা-আম্মা একটু বেশি নজর রাখেন। তাকে একটু বেশি ভালোবাসেন। আর জীবনে সফলতার জন্য আসল পিতা-মাতা এবং পিতৃ-মাতৃসম শিক্ষক-শিক্ষিকাদের দোয়া অপরিহার্য, যা সকলের অর্জন করতে হবে।

সহপাঠীদের সাথে সুসম্পর্ক
বজায় রাখা
পথ চলার জন্য পাথেয় হচ্ছে সহপাঠী বন্ধু। তাদের মাঝেই তোমার শ্রেষ্ঠত্ব খুঁজে নিতে হবে। যদি কেউ বন্ধুদের পরিচালনা করতে পারে তাহলে সে অনন্য। সহপাঠীদের সাথে পড়ালেখার বিষয়ে মতবিনিময়সহ সব ব্যাপারে সুন্দর সম্পর্ক রক্ষা করতে হবে। অন্যথায় একা হয়ে যেতে হবে। সহপাঠীদের নিকট থেকে বড় হওয়ার এবং সফল হওয়ার অসংখ্য গুণ অর্জন করা যায়। একজন মনীষী বলেছেন, ‘মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব তার বন্ধুদের মাঝেই বিকশিত হয়।’

ভালো বন্ধু নির্বাচন করা
মানুষ কখনও একা চলতে পারে না। সে যখন যে পর্যায়ে উপনীত হয়, সে কিছু মানুষ পেয়ে যায়, যার সাথে সে সবকিছু শেয়ার করতে পারে। তোমরাও চিন্তা করে দেখ তোমার খুব ক্লোজ বন্ধু আছে তাই না? বেশ ভালো, তবে বন্ধু নির্ধারণের ক্ষেত্রে হজরত আলী রা:-এর কথা মনে রাখতে হবে। তিনি বলেছেন, ‘ভদ্র এবং আল্লাহভীরু মানুষ ব্যতীত কাউকে বন্ধু হিসেবে নির্বাচন করো না’। কবি বলেছেন, ‘সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস, অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ’। ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে, ‘ÔA man is known by the company he keeps.’ ‘একজন মানুষ তার সঙ্গী দ্বারা পরিচিত হয়’। অতএব তোমরা ভবিষ্যতের কল্যাণের কথা ভেবে তোমার ক্লোজ সহচর নির্ধারণ করবে, আশা করা যায় অনেক সফলতার চাবিকাঠি তার নিকট থেকেই পাবে।

স্মার্ট হওয়া
স্মার্ট-এর সংজ্ঞা কী? একটু চিন্তা করা যাক। কিছু মনে এলো? হুম এসেছে। কী? যে ভালো প্যান্ট শার্ট পরে, যে ছেলে হাতে বালা পরে, চুল স্টাইল করে জেল লাগিয়ে রাখে, মাঝে মাঝে মোটরবাইক নিয়ে আসে, ভেতরে গেঞ্জি পরে ওপরে শার্টের বোতাম খোলা রাখে, ক্লাসে সবার শেষে এসে পেছনের বেঞ্চে আসন গ্রহণ করে, শিক্ষক ক্লাসের পাঠ জিজ্ঞাসা করলে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে ইত্যাদি ইত্যাদি… তারা স্মার্ট তাই না? কেউ যদি এমন মনে করে তাহলে সে বোকা মানুষ। কেননা, ঐ ছাত্র স্মার্ট নয় বরং বখাটে টাইপ। তাহলে স্মার্ট কিভাবে হওয়া যাবে? এ শব্দের মাঝেই তার করণীয় বলা রয়েছে। আমরা তা জেনে নেই। Smart এর পূর্ণ অর্থ হচ্ছে- S= Specific, সুনির্দিষ্ট অর্থাৎ সঠিকভাবে যা করা উচিত, তা করতে হবে। M= Measurable,, পরিমাপযোগ্য; কোন্ অবস্থায় কী করতে হবে অর্থাৎ পরিস্থিতির আলোকে কী করতে হবে সে ব্যাপারে ভালো বোধশক্তি থাকা। A= Achievable, অর্জনযোগ্য; তোমার এ সময়ে কী শিখতে হবে, কী অর্জন করা উচিত, কিসের ওপর জোর দেয়া উচিত তা বুঝতে পারা। R= Realistic, বাস্তবধর্মী; তোমাদের খুব বাস্তববাদী বা প্রাকটিক্যাল হতে হবে। তোমার সাধ্যের আলোকে সর্বোচ্চ সফলতা পাওয়ার দক্ষতাই বাস্তবধর্মী হওয়ার প্রমাণ বহন করবে। T= Timeframe,, সময়কাঠামো; সময়ের আলোকে নিজেকে খাপ খাওয়াতে হবে। সময়কে তুমি ব্যবহার করতে না পারলে সে তোমাকে ব্যবহার করবে। একটি প্রবাদ আছে, ‘সময় তরবারির মত, তুমি তাকে কর্তন করতে না পার, সে তোমাকে কাটবে।’
বন্ধুরা সফল হওয়ার জন্য অনেক কষ্ট করতে হবে এবং সতর্ক থাকতে হবে। তোমাকে বড় স্বপ্ন দেখতে হবে। রাসূল সা:-এর দেখানো পথে তা অর্জন করার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হবে। অভিভাবকগণ যে চেষ্টা করতে পারেন তা হচ্ছে, always keep him or her in a good and holy touch in all academic level. তাহলে ছাত্র-ছাত্রীদের চেষ্টা এবং অভিভাবকদের সঠিক পথে আন্তরিক প্রচেষ্টায় একজন ছাত্রকে দুনিয়া ও আখিরাতে সফলতার স্বর্ণশিখরে পৌঁছানো যাবে।

SHARE

Leave a Reply