Home বিশেষ রচনা আগুন ঝরা ফাগুন -নওরোজ ইরফান

আগুন ঝরা ফাগুন -নওরোজ ইরফান

গাছে গাছে ছড়িয়ে পড়ছে পলাশ আর শিমুলের মেলা। প্রকৃতি সেজেছে নতুনরূপে। শীতের খোলসে ঢুকে থাকা কৃষ্ণচূড়া জেগে উঠেছে। মৃদু-মন্দ বাতাসে ভেসে আসা ফুলের গন্ধে বসন্ত জানিয়ে দিচ্ছে, সত্যিই সে ঋতু রাজবসন্ত। ফুল ফোটার পুলকিত এই দিনে বন-বনান্তে কাননে-কাননে নানান রঙের কোলাহলে ভরে উঠবে চারদিক। ঋতুর রাজা বসন্ত কড়া নাড়ছে দরজায়। তাকে স্বাগত জানাতেই ফুলে ফুলে সেজে উঠতে শুরু করেছে প্রকৃতি। ফুলেদের রাজ্যে এখন ভরা মৌসুম। যেদিকেই চোখ যায়, শুধু নয়নাভিরাম ফুল।
প্রায় বসন্তের শুরু থেকেই সারা দেশের বেশ কিছু বড় বড় দেশি ও কিছু বিদেশি গাছে ফুল ফুটতে থাকে। একেবারে নিঃশব্দে নয়, বেশ যেন ঘটা করেই সেটা ঘটে। অবস্থা দেখে মনে হবে, বনে যেন ফাগুনের আগুন লেগেছে।
এ সময় বনের দিকে, বিশেষ করে শাল-গজারি এবং চিরহরিৎ বা চিরসবুজ বনের দিকে তাকালে দেখা যাবে আগুনের লেলিহান শিখার মতো প্রজ্বলিত হয়ে উঠেছে চাঁদোয়া। এ আগুনের উৎস আর কিছু নয়, আমাদের চারপাশের বন ও বনাঞ্চলের বাহারি শিমুল, পলাশ ও মাদার, কাঁটা মাদার, মান্দার বা প্রবাল আর টকটকে লাল ফুল যাদের ওই তীব্র লাল ঘোষণা করে বসন্তের আগমনকে।
তবে শহরের কোনো কোনো বাগানে ঝরনা বা প্যাগোডা ফুলের বা ফাউনটেইন ফ্লাওয়ার অন্য যেকোনো লাল ফুলকে হারিয়ে দিতে পারে। কিন্তু এটি একটি ভিনদেশি ফুলের প্রজাতি। বাকি লাল ফুলওয়ালা সব গাছই আমাদের দেশের।
বনে এবং বনের বাইরে দুই ধরনের মাদার বা মান্দার গাছ আছে। এদের বলে ‘কোরালট্রি’। একটির বাকলে কাঁটার সমারোহ কম এবং অন্যটিতে বেশি। উপরন্তু বেশি কাঁটাওয়ালা প্রজাতিটি গ্রামাঞ্চলের খেত-খামারের আইলে বা বাড়ির আঙিনায় লাগানো হয় মানুষ ও গবাদিপশুর অনুপ্রবেশ ঠেকানোর জন্য। এগুলো বেশ বড় হয়ে বেড়ে উঠে খুব ভঙ্গুর গাছে রূপ নিতে পারে। এর বাকল প্রায় হলুদাভ বাদামি ও অজস্র কাঁটাযুক্ত।
দ্বিতীয় প্রজাতিটির বাকল ফিকে সবুজ এবং কম কাঁটাযুক্ত। আর এদের যৌগিক পাতা বেশ বড় বড়। এই প্রজাতিটি গ্রাম ও বন উভয় জায়গাতেই ভালো হয়। তবে গাছ হিসেবে খুব বড় হয় না, কিন্তু খুব ভঙ্গুর।
মাদার বা প্রবাল, শিমুল এবং পলাশের প্রতিটি ফুলের গোড়ায় প্রচুর পরিমাণে মধু হয়। আর এ মধুর আকর্ষণে সেখানে ভ্রমরের সঙ্গে সঙ্গে ভিড় করে মৌমাছি, বোলতা, ভিমরুল, মাছি, প্রজাপতি, দেয়ালি পোকা বা মথ্ এবং অসংখ্য পাখপাখালির সঙ্গে কাঠবিড়ালী, বানর, বাদুড় এবং গন্ধ গোকুলে দল।
মধু সংগ্রহ করে তোতা বা বড় টিয়া, টিয়া, ময়না-শালিক, ফিঙে, কোকিল, কাক, কাঠঠোকরা, বসন্ত বাউড়ি, বুলবুলি, চড়ুই, টুনটুনি ও মৌটুসিদের দল।
ফাগুনে এমন মধুপানে লিপ্ত পাখি ও তার কলকাকলি এবং ফুলের বাহারি দৃশ্য যে কি দর্শনীয় তা বলাই বাহুল্য।
শীতের পরে আসে বসন্ত। বাসন্তী রঙ ধরে প্রকৃতি। হালকা হালকা শীত আর গরম পড়ে, যার কারণে পশু-পাখি আর মানুষের খুব আরাম হয়, গাছে-গাছে ফুটে অজস্র ফুল। ফুলের গন্ধে সুবাসিত হয় চারদিক। পাখিরা মনের সুখে সবুজ পাতা বা বাহারি ফুলের ডাল থেকে ডেকে ওঠে। তাদেরই একজন কোকিল। কোকিল বসন্তের ঘোষক। যদিও ফুলের বন্যায় ভেসে যাক চারদিক, পাখিরা সম্মিলিতভাবে ডাকুক, তবুও বসন্ত বলা যাবে না। যদি না কালো বর্ণের কোকিল বসন্ত ঘোষণা না করে। কোকিল মাঘ মাসের শীতের রাতেও ডাকে, ডাকে অনিবার্য কারণেই, ডাকে অন্য ঋতুতেও। বসন্তে বন থেকে ভেসে আসে পাখির গান, কিচিরমিচির ডাক। গাছের এক ডাল থেকে অপর ডালে লাফিয়ে বেড়ায় টুনটুনি, দোয়েল, কোয়েল, মাছরাঙা, ময়না। নজরুলের ভাষায়Ñ ‘দেখ বসন্তের পাখি কোয়েলা গেছে ডাকি।’ তখন মাঝে মাঝে আমরা শুনতে পাই কোকিলের কুহু কুহু ডাক। প্রকৃতি থেকে মানুষের অন্তর্গত ভেতর উদ্বেলিত হয় বসন্তের আগমনে। আর তা সূচিত হয় কোকিলের মিষ্টি কণ্ঠের কুহুতানের মধ্য দিয়ে।
পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র ১৩০ প্রজাতির কোকিল আছে। বাংলাদেশের ২০ প্রজাতির কোকিলের মধ্যে ১৪টি স্থায়ী বাসিন্দা এবং ৬টি পরিযায়ী। কোকিলের ঠোঁট সামান্য বাঁকানো, পুচ্ছ দীর্ঘ, ডানা চওড়া ও সুচালো, গড়ন লম্বাটে। এদের প্রতি পায়ে দুটি করে আঙুল অগ্রমুখী ও পশ্চাৎমুখী। পূর্ব গোলার্ধের কোকিলেরা বৃক্ষবাসী এবং এদের অন্যূন ৫০ প্রজাতি অন্য প্রজাতির পাখির বাসায় ডিম পাড়ে। কখনও এসব ডিম অবিকল পোষক পাখির ডিমের মতো। কোকিল সরাসরি অন্য যেসব পাখির বাসায় ডিম পাড়ে সেসব বাসা ছোট ও আবদ্ধ হতে পারে। পোষক পাখি বাসা ছেড়ে দূরে গেলে কোকিল পোষকের একটি ডিম ফেলে দিয়ে সেখানে নিজের একটি ডিম পেড়ে রাখে। প্রায় ১২ দিনে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়, বাচ্চার শরীর তখন পুরো খালি থাকে। বাচ্চাটি শিগগিরই পালক পিতা-মাতার ডিম বা নবজাত বাচ্চাদের পিঠে তুলে বাসার কিনারায় ঠেলে দেয় এবং পালক পিতা-মাতার আনা সকল খাবার গ্রহণ করে। কোকিল সম্ভবত নিঃসঙ্গচারী, পুরুষরা প্রায়শ অতিশয় আকর্ষণীয় এবং ডাকে উচ্চস্বরে, সুরেলা কণ্ঠে, এমনকি রাতেও অথচ স্ত্রীরা থাকে আড়ালে, ডাকে ভিন্নভাবে, এমনকি ডাকেও না। শুঁয়োপোকা এদের প্রধান খাদ্য।
প্রকৃতি এখন বসন্তময়। চারদিকে বসন্ত ঋতুর সাজ। গাছের ডালে ডালে নতুন প্রাণের আবহ। পথে প্রান্তরে পত্র-পল্লবহীন আমড়া গাছের ডালে দু-চারটি পরিপক্ব ফল চোখে পড়ে। মানুষ তো বটেই, পাকা রসালো আমড়ায় আকৃষ্ট হয় পাখিও। দেশের দক্ষিণাঞ্চলে উপকূলজুড়ে হাজারো পাখির বিচরণ। তবে নজরকাড়া সৌন্দর্যের পাখি খুব একটা দেখা যায় না। পাতাবিহীন আমড়াগাছের মগডালে কয়েকটি পাকা আমড়া ঝুলে আছে। আর বর্ণিল একটি পাখি একাকী আপন মনে একটা পাকা আমড়ায় ঠোকর দিয়ে ফলের অম্ল-মধুর স্বাদ নেয়। পাখিটির নাম বসন্ত বোউরি। এটিকে ধনিয়া, বড় বসন্ত বোউরি বা বসন্ত বাউরি নামেও ডাকা হয়। এরা বাংলাদেশের স্থায়ী বাসিন্দা। বসন্ত বোউরির ইংরেজি নাম Throated Barbet. বৈজ্ঞানিক নাম Megalaima asiatica| এটি Capitonidae গোত্রের অন্তর্ভুক্ত। বসন্ত বোউরির মুখাবয়ব, গলা ও বুকের ওপরের দিক দৃষ্টি-আকর্ষী গাঢ় আসমানি নীল। বাকি সারা দেহ কলাপাতা-সবুজ। লাল মাথার ওপরে চূড়া বরাবর হলুদ ও কালো পরপর দুটি পট্টি। বুকের দু’পাশে একটি করে লাল ছোপ। ঠোঁটের সামনের অর্ধেক কালো, বাকি অংশ হয় নীলাভ না হয় নীলের ওপরে হলুদের আভাযুক্ত। পা ধূসর বা পাটকিলে বর্ণের। চোখের তারা লালচে। চোখের চারিদিকে লাল পট্টিবিশিষ্ট চামড়া দেখা যায়। স্ত্রী ও পুরুষ পাখি দেখতে একই রকম, কেবল কম বয়সীগুলোর চেহারায় বয়স্কদের লাল-নীলের চাকচিক্য থাকে না। দৈর্ঘ্যে কমবেশি ২৫ সেন্টিমিটার। বড় বসন্ত বোউরি সাধারণত ছোট ছোট দলে একসাথে থাকে। অনেক সময় ৩০-৪০ জনের বড় বড় দলেও থাকতে দেখা যায়। সাধারণত শীতকালে এবং বড় কোনো খাদ্যের উৎসকে কেন্দ্র করে এরা বড় দল গঠন করে, যেমন বটগাছ। বসন্ত বোউরি নরম ফল বিশেষ করে বটের ফল, কদম, দেবদারু, ডেউয়া, আম, কলা, তেলাকুচা, কিছু পোকামাকড় ও শুঁয়োপোকা খেতে পছন্দ করে।

SHARE

Leave a Reply