Home গল্প ছেলেটি রহস্যময় -দেলোয়ার হোসেন

ছেলেটি রহস্যময় -দেলোয়ার হোসেন

দারিয়াপুর বাজারের উত্তরে ইটভাটা। কাছে কিনারে কোনো লোকবসতি নেই। একটু দূরে জঙ্গল। জঙ্গলের পাশ দিয়ে ইট বিছানো রাস্তা। ভ্যান, রিক্সা চলে নিয়মিত। ছলিমুদ্দিন কখনো ভ্যান বা রিক্সায় চড়ে না। শীত গ্রীষ্ম বর্ষা বলে কথা নয়, সব ঋতুতে সব সময়ই তার হাতে একটি ছাতা থাকে। বয়স পঞ্চাশের ওপরে। বাড়ি দুর্গাপুর।
লোকটা সৌদি থেকে ফিরে এসে বেশ জমিজমা করেছে। সংসারে মাত্র তিনজন মানুষ। স্বামী-স্ত্রী আর এক ছেলে। কিন্তু লোকটার মনে শান্তি নেই। কারণ তাদের ছেলেটি হাঁটতে পারে না। বয়স বারোতে পৌঁছেছে। ছেলেটির চেহারা মাসাআল্লাহ দেখার মতো। অথচ তার পা দু’টি শুকনো-কোনো বোধ নেই।
ছলিমুদ্দিন নিজের জমি জিরাত দেখাশুনা করে সময় কাটায়। তবে সকাল বিকাল ছাতা মাথায় বাজারে যায় চা খেতে। লোকের কাছে খোঁজ-খবর করে ভালো ফকির, কবিরাজের। ডাক্তার দেখেছে, ওষুধ দিয়েছে, নিয়মিত ওষুধ খেয়েছে কিন্তু কোনো ফল হয়নি।
একদিন দুপুর বেলা বাজার থেকে ফিরে আসার পথে সে দেখলো সাত/আট বছরের একটি ছেলে ইটের পাজার ওপর দৌড়ে দৌড়ে খেলছে। পাজার ভেতর থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছে।
কী ব্যাপার-কে এই ছেলে? থমকে দাঁড়ালো ছলিমুদ্দিন। তার মনে হলো এই খেলায় ছেলেটি বেশ মজাও পাচ্ছে। তবে তার সাথে আর কেউ নেই। একে তো দুপুর বেলা তার ওপর গরম পাজা। কথাটা ভাবতেই ছলিমুদ্দিন ঘামতে শুরু করলো। গাগুলে বমি আসার মতো মনে হলো। কোনো ছেলে-মেয়ের অস্বাভাবিক আচরণ দেখলে তার বড় কষ্ট হয়। সে দ্রুত কেটে পড়লো সেখান থেকে। বাড়ি ফিরে বৌকে বললো, একটু পাখা করো তো।
স্ত্রী ছলিমুদ্দির অবস্থা দেখে বাতাস করতে শুরু করলো। তারপর ঠান্ডা পানিতে হাত মুখ ধুয়ে বারান্দায় পাতা খাটিয়ায় শুয়ে পড়লো ছলিমুদ্দিন। স্ত্রী বললো, হঠাৎ কী হলো তোমার?
একটা দৃশ্য দেখে মনটা বড় বিচলিত হয়ে উঠলো। একটি ছোট ছেলেকে দেখলাম গরম ইটের পাজার ওপর দৌড়া-দৌড়ি করে খেলছে। আমাদের আশার চেয়ে একটু ছোট।
– হয় তো পুড়নো পাজা। আর ওখানে যারা কাজ করে, ছেলেটা তাদেরই কেউ হবে। এখনকার ছেলেরা সব পারে। আমাদের ছেলে আশা কি পারতো না! ওর পা দুটো আল্লাহ কেন যে এমন করলেন…
– মন খারাপ করো না। চেষ্টা করে যাচ্ছি। আমি ভাবছি ছেলেটির কথা। আমি পাজা দিয়ে ধোঁয়া উড়তে দেখলাম। তাহলে সেটা তো ঠান্ডা হতে পারে না!
ঘর থেকে বাবা-মার কথা শুনে আশা বললো, বাবা সেই ছেলেটাকে নিয়ে এলে না কেনো। তাকে দেখতে ইচ্ছে করছে। বাবা বললো, যদি তাকে কাছে পাই, তাহলে আসতে বলবো। আশা বললো, তুমি আমার কথা বলো।
বিকালে ছলিমুদ্দিন রাস্তা ছেড়ে হাঁটতে হাঁটতে ইট ভাটার সামনে গেলো। দু’তিনটি টিনের ছাপরায় লোকগুলো থাকে। ছলিমুদ্দিনকে দেখে একজন সালাম দিয়ে বললো, চাচা কিছু বলবেন?
– তোমাদের এখানে আট-ন বছরের কোনো ছেলে থাকে?
– না তো! কোনো ছোট ছেলেমেয়ে এখানে আসে না। আর এলেও আমরা তাদের তাড়িয়ে দেই।
– কিন্তু আমি একটা ছেলেকে দেখলাম তোমাদের সাজানো পাজার ওপর দিয়ে ছুটোছুটি করছে।
– বলেন কি! পাজায় তো আগুন জ্বলছে। ওর ওপর উঠা কি চাট্টিখানি কথা!
ছলিমুদ্দিন আর কিছু না বলে চিন্তিত মনে আবার ফিরে এলো পথে। তাহলে আমার দেখাটা কি ভুল! নানান চিন্তা করতে করতে বাজারে গিয়ে বসলো। ভাবলো এক কাপ চা খেয়ে মাথাটা ঠিক করি আগে। কিন্তু কথাটা সে কাউকে বলতে গেলো না। বললে হয়তো সবাই আমাকে পাগল ঠাওরাবে। যদিও আমার দেখার মধ্যে কোনো ভুল নেই।
দেখতে দেখতে ছায়া ঘনালো। বাজারের মসজিদে আজান হলো। ছলিমুদ্দিন মাগরিব পড়ে এসে আবার বসলো। ধীরে ধীরে চাঁদের আলোও উজ্জ্বল হতে শুরু করলো। তখন দারিয়াপুরের শমসের শেখ- এর ছেলে মেহেদী দু’জন বন্ধু নিয়ে এসে বসলো চায়ের দোকানে। ওরা সবাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। কথায় কথায় একজন বললো, পৃথিবীর মানুষ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। মহাকাশের ভাসমান অন্যান্য গ্রহবাসীদের চেনা জানার দিকে। তারা অবশ্য প্রযুক্তির দিক দিয়ে অনেক অনেক এগিয়ে। তারা পৃথিবীতে আসছে, দেখছে কিন্তু আমরা কিছুই দেখছি না-জানছি না। মেহেদী বললো, একদিন পৃথিবীর মানুষ চাঁদ এবং মঙ্গলে যাতায়াত শুরু করবে। ওখানে বসবাসও করবে। বিজ্ঞান একদিন অনেক রহস্যের জালই ছিন্ন করে অজানাকে টেনে আনবে মানুষের দোরগোড়ায়।
আর একটি ছেলে বললো, তাদের জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তি পৃথিবীর মানুষদের চেয়ে অনেক অনেকগুণ এগিয়ে আছে। তারা উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার করে মহাশূন্যে বিশেষ এক ওয়ার্মহোল সৃষ্টি করে দূরত্বকে ফাঁকি দিয়ে এই পৃথিবীতে এসেছে। আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির পাশের গ্যালাক্সি এনড্রোমিডার কোনও গ্রহ বা তার চেয়েও দূরের কোনও গ্যালাক্সির অচেনা এক গ্রহ থেকেও সে আসতে পারে। এই গ্রহের মতো আরো গ্রহ আছে মহাশূন্যে।
ছলিমুদ্দির খুব ভালো লাগতে লাগলো বিজ্ঞানের এই সব আলোচনা। সে কথার ফাঁকে বলে উঠলো আচ্ছা বাবারা, অন্য গ্রহের মানুষরা কি এমন হতে পারে যে, তারা আগুনের উপর দিয়েও হাঁটতে পারে আবার পানির মধ্যে ডুবতে পারে। ইচ্ছে করলে পানির উপর দিয়েও হাঁটতে পারে? মেহেদী বললো, চাচা এর কোনোটাই হয় তো তাদের কাছে অসম্ভব নয়। কারণ সৃষ্টিকর্তা পৃথিবী জুড়ে যা কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে রেখেছেন তার ব্যবহার আমরা জানি না। সত্যিকথা বলতে কি, আমরা সে সব নিয়ে চেষ্টাতো দূরের কথা চিন্তাও করি না। যার ফলে দিন দিন পিছিয়ে পড়ছি আমরা। অথচ এক সময় আমরাই ছিলাম, সাহিত্য জ্ঞান-বিজ্ঞানে শ্রেষ্ঠ।
ছলিমুদ্দিন কিছু বলতে গিয়েও কেন যেনো থেমে গেলো। তবে এটুকুই বললো যে, মেহেদী তোমার সাথে আলাদাভাবে কিছু কথা বলবো-তবে এখন না।
ছলিমুদ্দিন দেখলো কথায় কথায় রাত বেড়ে যাচ্ছে, আর দেরি করা ঠিক হবে না। সে বাড়ির দিকে রওনা করলো। ইট ভাটার কাছে এসে মনের অজান্তেই তাকালো সেদিকে। তেমন কিছু চোখে পড়লো না। ভাবতে ভাবতে জঙ্গলের কাছে আসতেই সামনেই দেখতে পেলো অন্ধকারে এক জোড়া চোখ যেনো জ্বলজ্বল করছে।
ও দুটো কি শিয়ালের চোখ? না কি বনবিড়াল! কিন্তু বিড়াল এত উঁচু হয় কী করে। তখন রাত বেশি না হলেও বেশ শীত পড়তে শুরু করেছে। ছলিমুদ্দিন কিছু বুঝতে পারলো না। তবে ছাতাটা শক্ত হাতে ধরে এগিয়ে চললো। এর মধ্যেই জ্বলজ্বলে চোখ দুটো আর দেখা গেলো না। ছলিমুদ্দিনও জঙ্গলটা পার হয়ে আবার ফাঁকা রাস্তায় বেরুলো। হঠাৎ খেয়াল করলো, তার পিছু পিছু একটি ছোট ছেলে হাঁটছে। উদোম গা, পরনে এক টুকরো রঙিন কাপড়।
Ñ তুই কে রে ছেলে?
কোনো উত্তর নেই। তবে ছেলেটির সবুজ আভাযুুক্ত জ্বলজ্বল করা চোখ আর চোখের তীক্ষè দৃষ্টি দেখে শরীরটা কেমন শির শির করে উঠলো ছলিমুদ্দির। ছেলেটির মুখটা বড় হাসি হাসি। ছোট ছোট দাঁত। চেহারাটা অ্যাবনর্মাল শিশুদের মতো। তখনই তার মনে হলো-তাহলে কি এ ছেলে ভিনগ্রহের কেউ? পৃথিবীর ভূত-প্রেত যে নয়, সে বিশ্বাস মনে স্থাপন করে ভাবলো, এরা বুদ্ধিমান জ্ঞানেগুণে অনেক বড়। তাই ভয়ের কিছু নেই। কিন্তু বার বার আমাকে দেখা দিচ্ছে কেন? এটা কি আমার ভালোর জন্য? ছলিমুদ্দিন প্রশ্ন করলো, তুমি আমার সাথে আমার বাড়িতে যাবে? সে হাসলো। খুদে চোখ, হাসলে দুষ্টু ছেলেদের মতো দেখায়।
এবার ছলিমুদ্দিন স্বাভাবিক হয়ে নিজে অঙ্গভঙ্গি করে এটাই বুঝলো যে, তুমি খালি গায়ে আছো। তোমার শীত করছে না? ছেলেটি মাথা নাড়লো। ছলিমুদ্দিন মুখে পেটে হাত দিয়ে বুঝাতে চেষ্টা করলো যে, তোমার ক্ষুধা পেয়েছে? তুমি কি কিছু খেতে চাও? ছেলেটি এবারও তেমন কোনো ইচ্ছা প্রকাশ করলো না।
এভাবেই ছলিমুদ্দিন গল্পে গল্পে এসে দাঁড়ালো শুকিয়ে যাওয়া খালের পাড়ে। অল্প কাদাপানির উপর ১০-১২ হাত লম্বা বাঁশের সাঁকো। তো সে ছেলেটিকে কিছু বলার মুহূর্তেই ছেলেটি বেশ খানিকটা শূন্যের উপর দিয়ে ওপারে গিয়ে দাঁড়ালো। যেনো একটা ড্রপ দেয়া বল এপার থেকে ওপারে চলে গেলো।
ছলিমুদ্দিন এতেও ঘাবড়ালো না। সে ঘরে ঢুকার পূর্বেই বারান্দা থেকে ছেলেকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো, আমার আশা বাবা কি শুয়ে পড়েছে? স্ত্রী বললো, এই মাত্র ভাত খাওয়ায়ে বিছানায় রেখে এলাম। একটা আনন্দের কথা কি জানো! আমাদের আশা ও ঘরে নেয়ার সময় বলছে, মা আমার হাঁটতে ইচ্ছে করছে। পা দুটোর মধ্যে কেমন গরম গরম মনে হচ্ছে।
স্ত্রীর কথা শুনে অবাক হয়ে ছলিমুদ্দিন বললো, বলো কি আশার মা, আল্লাহ চাহে তো আশা খুব তাড়াতাড়িই আর দশজনের মতো হাঁটা-চলা করতে পারবে। তখনই স্ত্রী বারান্দার নিচে ভূতের বাচ্চার মতো কিছু একটা দেখে বেশ ভয় পেয়ে অস্ফুটো বলে উঠলো, ওটা কী? মানুষ না ভূত না অন্য কিছু? স্ত্রীর কথায় ছলিমুদ্দিন হাসতে হাসতে বললো, ভয় পেয়ো না আর চিৎকারও করো না। আজ সকালে যে ছেলেটির কথা তোমাকে বলেছিলাম এ সেই ছেলে। আশা ছেলেটিকে নিয়ে আসতে বলেছিলো। অথচ দেখো ও হয়তো নিজেই আসার জন্য জঙ্গলের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো। হঠাৎ দেখি আমার পিছু পিছু আসছে। কোনো কথা বলতে পারে না। ইঙ্গিতে কিছু বুঝালে ও মাথা নেড়ে উত্তর দেয়।
ছলিমুদ্দিন ছেলেটিকে ডাকার জন্য বারান্দার নিচে তাকালো। কিন্তু ছেলেটিতো নাই। মাথায় যেনো আকাশ ভেঙে পড়লো তার। ছুটে গেলো পথের দিকে। খুব চাপা স্বরে বললো, কোথায় তুমি, তোমাকে খুঁজছি। কোনো সাড়া নেই। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর সে ফিরে এলো ঘরে। তার স্ত্রীও কেমন উদাস মনে বসে আছে বারান্দায় পাতা একটা ঠেস দেয়া বেঞ্চে।
– পেলে?
– না। এমন হলো কেন! আমরা তো কেউ কোনো খারাপ কথাও তাকে বলিনি।
হঠাৎ কানে এলো কারো কথা বলার শব্দ। মনে হলো তাদের ছেলে আশাই কথা বলছে। কিন্তু কার সাথে সে কথা বলছে। ঘরে তো অন্য কেউ নেই। তবে কি সে স্বপ্নের মধ্যে কথা বলছে। তখন দুজনই এগিয়ে গেলো ঘরের মধ্যে। ঘরে ঢুকেই অবাক হলো-হালকা সবুজ আলোয় ঘরখানা ভরে আছে। তখনই ছলিমুদ্দিন বুঝে নিলো ছেলেটি কোনো সাধারণ ছেলে নয়। সে কোন ফাঁকে আমাদের চোখের আড়াল দিয়ে আশার কাছে গেছে। আমরা তা বুঝতেও পারিনি।
দুজনের বুকটাই আশার আলোয় ভরে উঠলো। চুপি চুপি এগিয়ে গেলো-ছেলের ঘরের দিকে। দরজা থেকেই দেখতে পেলো আশা বিছানার ওপর বসে ছেলেটির সাথে হাত নেড়ে অঙ্গভঙ্গি করছে। আর ছোট্ট ছেলেটি ওর দু’পায়ের দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কিছুক্ষণ পর অসহ্য ব্যথায় উ: আ: করতে শুরু করলো আশা।
আশার মা ছেলের ব্যথা সহ্য করতে পারছিলো না। সে ছুটে ছেলের কাছে যেতে চাইলো আর কিছু বলতেও গেলো কিন্তু ছলিমুদ্দিন তাকে ইশারায় থামিয়ে ও ঘরে নিয়ে গেলো। সে বুঝতে পারলো-এই ছেলে এসেছে তার আশাকে ভালো করে দিতে।
এক সময় আর কোনো শব্দ না পেয়ে বাবা মা দুজনই আবার গেলো আশার রুমের সামনে। দেখা গেলো আশা শুয়ে আছে আর সে গভীর ঘুমে মগ্ন। কিন্তু সেই ছোট ছেলেটি কোথাও নেই। ওর মা বললো, অতটুকু ছেলে এই শীতে খালি গায়ে গেলো কোথায়? ওকে খুঁজে বের করো। ওর জন্য আমার বড় মায়া হচ্ছে। ও আমার আশাকে ভালো করতে এসেছে। বলতে বলতে দু’চোখের পানিতে ভিজলো তার বুক। ছলিমুদ্দিন বললো, তুমি অস্থির হয়ো না। ও তোমার স্নেহের কথা বুঝতে পেরেছে। ও যেখানেই যাক আবার এসে তোমাকে দেখা দেবে। কিন্তু কাউকে বলতে যেয়ো না এ কথা।
এখন সবুজ আলো আর নেই। ছলিমুদ্দিন দেখলো ছেলে তার সত্যি ঘুমাচ্ছে। স্বাভাবিকভাবে নিঃশ্বাস টানছে ছাড়ছে। শুধু ওর পা দুটো থির থির করে কাঁপছে। সে এ কথা আর স্ত্রীকে না বলে বললো, চলো আমরা ঘুমিয়ে পড়ি। ছেলেটি হয়তো আবারও আসতে পারে। তারপর দরজা জানালা বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়লো তারা।
ভোর হয়েছে রাত। নতুন দিনের নতুন আলোয় ভরে উঠেছে চারদিক। পৃথিবী জেগেছে তার সাথে জেগেছে জীবজগৎ। কিন্তু ছলিমুদ্দিন আর তার স্ত্রীর ঘুম ভাঙেনি তখনো। আধো ঘুমে আধো জাগরণে কি এক মধুর স্বপ্নে তাদের সময় যাচ্ছে হারিয়ে। হঠাৎ কানে বাজলো ছেলের কণ্ঠ। মা, বাবা তোমরা উঠছো না কেন? ছেলের কণ্ঠ শুনে মায়ের ঘুম ভাঙলো। চোখ মেলতেই সারা দুনিয়ার বিস্ময় এসে নির্বাক করে দিলো মায়ের কণ্ঠ।
মা চেয়ে আছে ছেলের দিকে অপলক। যে ছেলে এক পা হাঁটতে পারে না ঠিকঠাক দাঁড়াতে পারে না সে কিনা ও-ঘর থেকে এসে দাঁড়িয়েছে তাদের শিয়রে!
– তুই কি হেঁটে এলি সোনা?
– হ্যাঁ মা-বেশ হাঁটতে পারছি। সেই ছেলেটি কোথায় মা? কাল রাতে সে আমার পায়ে হাত বুলিয়ে দিয়েছিলো।
মা ধড়ফড় করে উঠে বসলো। ডেকে তুললো আশার বাবাকে। এই উঠোতো-দেখো আমাদের আশা হাঁটতে পারছে। বাবাও উঠে অবাক হয়ে ছেলের দিকে তাকালো। আশা বললো, বাবা সেই ছেলেটা কোথায়? বাবা বললোÑ
– তাকে তো গতকাল অনেক খুঁজেছি, দেখা পাইনি।
– তুমি এখনি আবার দেখো, পাওয়া যায় কি না। সেই আমার পা ভালো করে দিয়েছে।
তখন আশার মাও বললো, তুমি সেই ইট ভাটার ওখানে যাও। দেখো ছেলেটাকে দেখা যায় কি না। আশার বাবা মুখ হাত ধুয়ে ছাতাটা হাতে নিয়ে বের হয়ে গেলো। তার বুকের মধ্যে শব্দহীন ঝরছে স্নেহের কুয়াশা। পায়ে পায়ে প্রথমে সেই জঙ্গলে গিয়ে ঢুকলো। চার দিকে গভীর দৃষ্টি বুলালেন। গাছের ওপর দিকেও তাকালো। না কোথাও তাকে দেখা যাচ্ছে না। এবার ইট ভাটায় চলে গেলো। নতুন পাজার মুখে ছেলেরা শুকনো কাঠের ছোট ছোট গুঁড়ি ঠেলে দিচ্ছে। দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুন।
একটি ছেলে এগিয়ে এসে বললো, চাচা-কিছু বলবেন?
– একটি আট-নয় বছরের ছেলেকে খুঁজছি।
– এদিকে কোনো ছেলে তো আসে নাই। সে আপনার কিছু হয়?
– সে আমার আপনের চেয়েও আপন। রাতে হঠাৎ ঘর থেকে বেরিয়ে কোথায় যে গেলো।
– বলেন কি!
– তার গায়ে কোনো কাপড়ও নেই।
– বলেন কি! অবাক করা কান্ড!
– যা সত্য তাই তো বলছি।
ছলিমুদ্দিন ছেলেটির জন্য কেমন যেনো হয়ে গেলো। কিন্তু ছেলেটার রহস্যের কথাটা সে কাউকে বললো না। সারাদিন খুঁজলো, লোকে তার বেভোলা অবস্থা দেখে বললো, ছলিম ঘটনাটা খুলে বলো তো। সে তখন সত্যি ঘটনাটাই খুলে বললো সবার সামনে। সেই ছেলেটাই আমার আশাকে ভালো করে দিয়েছে। ও এখন হাঁটতে পারে।
অনেকেই বিশ্বাস করলো না। ভাবলো ছলিমুদ্দিন ছেলের কথা ভাবতে ভাবতে সে এখন অলৌকিক এক জগতে হারিয়ে গেছে। কেউ ছুটে গেলো তার বাড়িতে। পাড়ার মানুষ এসে জড়ো হয়েছে। খবর শুনে ছুটে এলো মেহেদী। সে বললো, ঐ ছেলে সত্যি অন্য কোনো গ্রহ থেকে এসেছিলো। এ কথা অন্য কেউ বিশ্বাস না করলেও আমি বিশ্বাস করি।
আমরা কোনো গ্রহবাসীর খোঁজ না রাখতে পারলেও অন্য গ্রহের অদ্ভুত মানুষ আমাদের পৃথিবীর অনেক খবরই রাখে। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে আমরাও অনেক এগিয়ে যেতে সক্ষম হবো।
তারপর ধীরে ধীরে রোগমুক্ত হলো আশা। মায়ার টানে ছলিমুদ্দিন এখনো পথে পথে খুঁজে বেড়ায় ছেলেটিকে। আজো কেউ এই রহস্যের জাল ছিঁড়তে পারেনি।

SHARE

Leave a Reply