Home তোমাদের গল্প জাদুর লাঠি মোনোয়ার হোসেন

জাদুর লাঠি মোনোয়ার হোসেন

খায়ের সাহেবের ছেলেমেয়েরা সবাই থাকেন শহরে। কেউ চাকরি করেন, কেউ ব্যবসা করেন। তাদের ছেলেমেয়েগুলো শহরে লেখাপড়া করে বলে তারা চাইলেও সবসময় গ্রামে আসতে পারেন না। ডিসেম্বর মাসে ছেলেমেয়েদের পরীক্ষা শেষ হলে তারা ছুটে আসেন গ্রামে। হৈ-হুল্লোড় করেন। শীতের পিঠেপুলি খান। এসময় খায়ের সাহেবের বাড়িতে বসে যেন আনন্দের হাট। পিঠার মৌ মৌ গন্ধে চারপাশ ভরে ওঠে। তখন খায়ের সাহেবের মন গৌরবে ভরে যায়। মুখে জর্দা দিয়ে পান পুরেন। হো হো করে হাসেন। নাতি-পুতিদের নিয়ে খোশগল্পে মশগুল থাকেন।
আজও নাতি-পুতিদের নিয়ে খোশগল্পে বসেছেন তিনি। নাতি-পুতিরা তাকে ঘিরে বসেছে। তিনি বসেছেন সবার মাঝখানে। মাঝখানে বসে সুন্দর করে মুখে একটা পান পুরলেন। জর্দা দিয়ে পান। পান মুখে পুরার সঙ্গে সঙ্গে জর্দার মৌ মৌ ঘ্রাণে চারপাশ ভরে গেল। পানের পিক ফেলে বললেন, বলো আজ তোমরা কী গল্প শুনতে চাও?
ভূতের গল্প দাদু। বলল গল্পের আসরে বসা সবার ছোট মাহদি।
না, না, না। আজ কোনো ভূতের গল্প নয় দাদু। আজ আমরা মেঘপরীর গল্প শুনবো। তুমি মেঘপরীর গল্প বলো। বলল রাফিয়া।
ইফতি বলল, না, না, আজ ওসব কোনো গল্প চলবে না। ভূত আর পরীর গল্প অনেক শুনেছি। আজ আমরা রূপকথার গল্প শুনবো। রাজা-রানী আর রাজকুমার-রাজকুমারীর গল্প।
খায়ের সাহেব বললেন, আজ কোনো গল্প নয়। আজ আমি তোমাদেরকে একটা সত্য ঘটনা বলবো। এই ঘটনার ভেতর রাজার কথাও আছে।
রাজার কথা আছে? কী মজা! কী মজা! বলে হাততালি দেয় মাহদি। তুমি এটাই বলো দাদু।
ইফতি আর রাফিয়াও বলল, হ্যাঁ দাদু, সত্য ঘটনাই বলো।
অনেকদিন আগের কথা। হাজার হাজার বছর আগের কথা। দাদু গল্প শুরু করেন। অনেক দূর দেশে একটা পাহাড় আছে। পাহাড়টার নাম তুর পাহাড়। সেই তুর পাহাড়ের পাশে এক বালক মেষ চরাচ্ছিলেন। বালকের নাম হজরত মুসা (আ)। তিনি দেখলেন হঠাৎ তুর পাহাড়ে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠলো।
পাহাড়ে আকস্মিক আগুন দেখে প্রচন্ড ভয় পেয়ে গেলেন মুসা (আ)। পাহাড়ের কাছ থেকে পালিয়ে যেতে উদ্যত হলেন।
এমন সময় আগুনের ভেতর থেকে কে যেন তাকে বলে উঠলো, ভয় পেয়ো না মুসা। তোমার ভয়ের কোনো কারণ নেই। তুমি কাছে এসো। কিন্তু ভয় কী আর সহজে যায়? মুসা (আ) তবুও ভয়ে আগুনের কাছে যেতে চান না। আগুনের ভেতর থেকে আবার সেই কণ্ঠ বলে উঠলো, ভয় করো না মুসা। তুমি কাছে এসো।
মুসা (আ) ভয়ে ভয়ে আগুনের কাছে আসেন।
এবার সেই কণ্ঠ বললো, হে মুসা, আমি তোমার সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ তায়ালা।
মুসা (আ) তো নির্বাক! আল্লাহ তায়ালা! সৃষ্টিকর্তা বললেন, হুম। আমি তোমার সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তায়ালা। তারপর বললেন, মুসা! তোমার হাতে ওটা কী?
লাঠি।
তুমি ওই লাঠি দিয়ে কী করো?
মেষদের জন্য গাছের পাতা পাড়ি, আর অবাধ্য দলছুট মেষদের গায়ে আঘাত করি। যেনো তারা দলছুট না হয়ে যায়।
তুমি ওই লাঠিটা মাটিতে ফেলে দাও।
সৃষ্টিকর্তার নির্দেশে মুসা (আ) হাতের লাঠি মাটিতে ফেলে দিলেন।
লাঠি মাটিতে ফেলে দেয়ার সাথে সাথে তা একটি বিশাল অজগর সাপ হয়ে গেল। সাপ হয়ে এদিক ওদিক ছোটাছুটি করতে লাগল।
বলো কী দাদু! সবাই অবাক। লাঠিটা সাপ হয়ে গেল!
হুম। সাপ হয়ে গেল।
তারপর? তারপর কী হলো দাদু? বললো রাফিয়া।
সেই সাপ দেখে মুসা (আ) তো ভয়ে একেবারে যায় যায় অবস্থা।
আল্লাহ তায়ালা বললেন, তুমি একদম ভয় পেয়ো না মুসা, এবার তুমি সাপটি ধরো।
মুসা (আ) ভয়ে তো আর সাপ ধরতে যান না।
তুমি সাপটি ধরো, তোমার কোনো ভয় নেই।
মুসা (আ) এবার ধীর পায়ে সাপটির কাছে গেলেন। তাকে ধরলেন। সাপ ধরার সঙ্গে সঙ্গে তা আবার লাঠি হয়ে গেল।
সবার চোখ একেবারে চড়কগাছ! এ কী করে সম্ভব দাদু?
সম্ভব। বললেন খায়ের সাহেব। আল্লাহ তায়ালা ইচ্ছে করলে সব অসম্ভবকে সম্ভব করে দিতে পারেন।
তারপর কী হলো দাদু? বলল ইফতি।
আল্লাহ তায়ালা বললেন, হে মুসা, আমি তোমাকে নবী হিসেবে বাছাই করেছি। আমি তোমাকে নবুয়ত দিচ্ছি। আর এই যে তোমার হাতের লাঠিটা সাপ হয়ে গেল এটা আমার মোজেজা। নিদর্শন। তুমি এই নিদর্শন নিয়ে ফেরাউনের কাছে যাও। তাকে আমার কথা বলো।
ফেরাউন! সে আবার কে দাদু? বলল মাহদি।
তখন সে দেশের যে রাজা ছিল তার নাম ছিল ফেরাউন। খুব অত্যাচারী রাজা ছিল সে। প্রজাদের খুব কষ্ট দিতো। নিজেকে আল্লাহ বলে দাবি করতো।
এতো পচা রাজা!
হুম খুব পচা রাজা ছিল সে। তো একদিন সেই ফেরাউন রাজা সিংহাসনে বসে আছে। মন্ত্রীগণও রাজার পাশে বসে খোশগল্প করছে। এমন সময় মুসা (আ) রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করলেন।
তাকে দেখে রাজা বললো, তুমি কি কিছু বলতে চাও?
জি।
বলো।
আল্লাহ তায়ালা আমাকে নবুয়ত দিয়েছেন। আমি আল্লাহর নবী। আপনি আল্লাহর দাসত্ব গ্রহণ করুন। আর আপনি যে সকল লোকের সাথে অত্যাচার করছেন তাদেরকে আমার সাথে যেতে দিন। আমি তাদের নিয়ে অনেক দূরে চলে যাবো।
মুসার কথা শুনে রাজা তো তেলে বেগুনে জ্বলে উঠলো। বললো, তুমি যে নবী তার কি কোনো প্রমাণ তোমার কাছে আছে?
জি, আছে।
দেখাও তবে।
মুসা (আ) সাথে সাথে তার হাতের লাঠিটা মাটিতে ফেলে দিলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে সেই লাঠি বিশাল এক অজগর সাপ হয়ে গেল। সাপ হয়ে সিংহাসনের দিকে তিরতির করে এগিয়ে যেতে লাগল।
তা দেখে রাজপ্রাসাদের সবাই ভয়ে দিগি¦দিক দৌড়াতে লাগল।
রাজা বললো, হে মুসা, তুমি তোমার সাপকে থামাও।
মুসা (আ) সাপটি ধরতেই তা আবার লাঠিতে রূপান্তরিত হয়ে গেল।
মুসা (আ) বললেন, আমি যে নবী, এটাই আমার মোজেজা। এবার আপনি আল্লাহর দাসত্ব কবুল করুন।
ফেরাউন বললো, আমি বিশ্বাস করি না তোমাকে। এটা নিশ্চয় তোমার কোনো জাদু। জাদু দেখিয়ে তুমি আমাকে বোকা বানাতে চাচ্ছ। আমাকে বোকা বানিয়ে আমার সিংহাসন দখল করতে চাচ্ছ। আমি তোমার সেই আশা কখনো পূরণ হতে দেবো না। আমি অনেক বড় বড় জাদুকর নিয়ে আসবো। তুমি যদি তাদের হারাতে পারো তবে আমি আল্লাহর দাসত্ব গ্রহণ করবো।
ঠিক আছে।
রাজার হুকুমে একদিন রাজ্যের সব বড় বড় জাদুকরকে রাজপ্রাসাদে ডেকে আনা হলো। রাজা তাদের বললো, যে মুসার জাদুকে হারাতে পারবে, আমি তাকে অনেক টাকা দেবো।
সবাই জাদু দেখানোর জন্য প্রস্তুত।
মুসা (আ)ও প্রস্তুত।
জাদুকররা মুসা (আ)কে বললেন, তুমি আগে তোমার জাদু দেখাও।
মুসা (আ) বললেন, না! তোমরা আগে দেখাও।
জাদুকররা তাদের জাদু শুরু করলো। ইয়া বড় বড় সাপ তৈরি করলো। সাপগুলো দেখে সবার পিলে চমকে যায়।
তারপর জাদুকররা মুসা (আ)কে বললো, এবার তোমার জাদু দেখাও।
মুসা (আ) এবার তার হাতের লাঠিটা মাটিতে রাখলেন। সাথে সাথে সেই লাঠি বিশাল এক অজগর সাপ হয়ে গেল। তারপর একে একে জাদুকরদের সব সাপ খেয়ে ফেললো।
জাদুকররা বুঝতে পারলো নিশ্চয় এটা জাদু নয়। এটা আল্লাহর মোজেজা। আর মুসা (আ) নিশ্চয় আল্লাহর নবী।
সঙ্গে সঙ্গে জাদুকররা মুসা (আ)-এর ধর্ম গ্রহণ করলো এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনলো।

SHARE

Leave a Reply