Home বিজ্ঞান জগৎ রহস্যময় সাগরতল -আল জাবির

রহস্যময় সাগরতল -আল জাবির

রহস্যঘেরা মহাসমুদ্র

যোগাযোগের জন্য সমুদ্রপথ ব্যবহৃত হয়ে থাকে। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অংশই সমুদ্র। মহাসাগর পৃথিবীর মোট আয়তনের প্রায় ৭০ শতাংশ দখল করে আছে। মহাসাগরের অর্ধেকেরও বেশি জায়গার গড় গভীরতা ৩ হাজার মিটারেরও বেশি। বিশেষত মহাসাগরীয় বাষ্পীভবন প্রক্রিয়া গুরুত্ব বহন করে। এটি পানিচক্রের একটি প্রয়োজনীয় ধাপ। পৃথিবীতে বৃষ্টিপাতের উৎসস্থল হিসেবে মহাসাগরগুলো চিহ্নিত। সমুদ্র উপকূলের গভীরতা এবং দূরত্ব উপকূলীয় এলাকায় জীববৈচিত্র্যে অবদান রাখে। উপকূলীয় এলাকায় বিভিন্ন ধরনের গাছপালা জন্মে এবং বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণী বসবাস করে।
মহাসাগরের পানির রং নীল। যদিও পানিতে খুব কম পরিমাণে নীল রং থাকে। তবে যখন বিপুল জলরাশিকে একত্রে রাখা হয় তখন মহাসাগরের পানি নীল দেখায়। এখন পানির নিচ দিয়েও ভ্রমণ করা সম্ভব। প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপ হিসেবে নর্দার্ন মারিয়ানা দ্বীপের খাত সমুদ্রের গভীরতম বিন্দু।
ভূগোলবিদরা গবেষণার সুবিধার্থে মহাসাগরকে ৫টি অংশে বিভক্ত করেছেন।
প্রশান্ত মহাসাগর : এটি আমেরিকাকে এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়া থেকে বিভক্ত করেছে।
আটলান্টিক মহাসাগর : এটি আমেরিকাকে ইউরেশিয়া এবং আফ্রিকা থেকে বিভক্ত করেছে।
ভারত মহাসাগর : এটি দক্ষিণ এশিয়াকে ঘিরে রেখেছে এবং আফ্রিকা ও অস্ট্রেলিয়াকে বিভক্ত করেছে।
দক্ষিণ মহাসাগর বা অ্যান্টার্কটিক মহাসাগর : এ মহাসাগর অ্যান্টার্কটিক মহাদেশকে ঘিরে রেখেছে এবং প্রশান্ত, আটলান্টিক এবং ভারত মহাসাগরের বহিরাংশ হিসেবে নির্দেশিত হচ্ছে।
উত্তর মহাসাগর বা আর্কটিক মহাসাগর : এ মহাসাগরটি আটলান্টিক মহাসাগরের একটি সমুদ্র হিসেবে মর্যাদা পাচ্ছে, যা আর্কটিকের অধিকাংশ এলাকা এবং উত্তর আমেরিকা ও ইউরেশিয়ার একাংশকে ঘিরে রেখেছে।
চ্যালেঞ্জার ডিপ প্রশান্ত মহাসাগরের তলদেশের একটি খাদ মারিয়ানা ট্রেঞ্চ। বিশ্বের গভীরতম বিন্দু রয়েছে এখানেই। মারিয়ানা ট্রেঞ্চ প্রশান্ত মহাসাগরের পশ্চিম প্রান্তেমারিয়ানা দ্বীপপুঞ্জের ঠিক পূর্বে অবস্থিত। মারিয়ানা খাদ একটি বৃত্তচাপের আকারে উত্তর-পূর্ব থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে প্রায় ২ হাজার ৫৫০ কিলোমিটার ধরে বিস্তৃত। এর গড় বিস্তার ৭০ কিলোমিটার। খাদটির গভীরতা ১০ হাজার ৯১৫ মিটার। এটি ইতিহাসের সবচেয়ে গভীরতম ডিপ। মারিয়ানা ট্রেঞ্চ প্রায় ২ হাজার ৫৫০ কিলোমিটার। চওড়ায় এটি মাত্র ৬৯ কিলোমিটার। গভীর সাগরের তলদেশে অত্যাধুনিক যন্ত্রপাতি ব্যবহারে এখনো রয়ে গেছে নানা সমস্যা। ফলে বিজ্ঞানীদের ধারণা খাদের গভীরতা আরও বেশি হতে পারে। সে জন্যই তারা চালাচ্ছেন নিত্যনতুন অভিযান। মারিয়ানা ট্রেঞ্চের সবচেয়ে গভীর অংশটি শেষ হয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরের নিচে চ্যালেঞ্জার ডিপ নামের ভ্যালিতে গিয়ে। খাদের সবচেয়ে নিচু জায়গা চ্যালেঞ্জার ডিপ নামটি রাখা হয়েছে জলযান এইচএমএস চ্যালেঞ্জার-২-এর নাম থেকে নিয়ে। স্থানটির তাপমাত্রা এতই কম যে, বিজ্ঞানীরা বলেন, সাগরতলের সর্বনিম্ন তাপমাত্রার স্থান এটিই। কখনো হাইড্রোজেন সালফাইডসহ বিভিন্ন ধরনের খনিজসমৃদ্ধ গরম পানিও বের হয় চ্যালেঞ্জার ডিপের ছিদ্রপথ দিয়ে। এগুলো প্রধান খাদ্য ব্যারোফিলিক জাতীয় ব্যাকটেরিয়ার। এসব ব্যাকটেরিয়াকেই আবার কতগুলো ছোট ছোট জীব খায় যাদেরকে অনুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে দেখা যায়। এদের খেয়ে বেঁচে থাকে মাছেরা। এভাবেই সাগরতলের এত গভীরেও জীবনের চক্র কিন্তু ঠিকই চলতে থাকে, যেমনটি চলে সাগরের ওপর। অতি ক্ষুদ্র কিছু ব্যাকটেরিয়ারও দেখা মেলে মারিয়ানা খাদে।
সাধারণত সমুদ্রতলের গভীরে মৃত প্রাণীর কঙ্কাল, খোলস জমা পড়তে থাকে। এখানকার পানির রং সে জন্যই খানিকটা হলুদ। মারিয়ানা ট্রেঞ্চ চাঁদের মতোই বিরান বলে মন্তব্য করা হয়েছে।

সমুদ্রকাঁটা
সমুদ্র তলদেশে উদ্ভিদ বৈচিত্র্যের শেষ নেই। বিশ্লেষকরা দাবি করেন, মাটির ওপর নয়, সমুদ্রতলেই উদ্ভিদ বৈচিত্র্য বেশি। এখনো সমুদ্রতলে উদ্ভিদজগৎ নিয়ে খুব কম গবেষণার সুযোগ মিলেছে। সমুদ্রতলে দেখা মিলবে কাঁটা। গায়ে ফুটলে এগুলোর কোনোটি প্রাণঘাতী হতে পারে। এ ধরনের কাঁটাকে বলা হয়, ‘সি-আর্চিন’। এগুলো দৃষ্টিনন্দন ও রঙিন হওয়ায় যে কাউকে আকৃষ্ট করে। কিন্তু ডুবুরি ও শৌখিন সাঁতারুদের কাছে এটি বাড়তি আতঙ্ক। কিছু কিছু সি-আর্চিন খাওয়া যায়। কিছু প্রজাতির মাছের প্রিয় খাবার এগুলো। রেড সি-আর্চিন ব্রিটিশ কলম্বিয়ার বনে কার্পেটের ন্যায় বিছানো অবস্থায় দেখতে পাওয়া যায়। সমুদ্রতলেও এটি যেন লাল গালিচা।

বৃদ্ধ প্রবাল
সাগরতলে সৌন্দর্যের আধার বলা হয় প্রবালকে। শুধু রঙের দিক থেকেই নয়, সাগরতলের ইতিহাস লেখকও সে। প্রবাল মূলত অ্যান্থজোয়া শ্রেণিভুক্ত সামুদ্রিক প্রাণী। এরা কলোনি তৈরি করে বসবাস করে। প্রাণী হলেও জীবনের পূর্ণ বয়স্ক অবস্থায় সাগরতলে কোনো দৃঢ়তলের ওপর গেড়ে বসে বাকি জীবন পার করে দেয় নিশ্চল হয়ে। প্রতিটি প্রবাল পলিপ যেখানে গেড়ে বসে সেখানে নিজের দেহের চার পাশে ক্যালসিয়াম কার্বনেট নিঃসরণের মাধ্যমে শক্ত পাথুরে খোলস তৈরি করে। প্রবালে বৈচিত্র্যের শেষ নেই। প্রবালের তালিকায় চোখ ধাঁধিয়ে দেবে নীল প্রবাল। এ ছাড়া খোঁজ মিলেছে লোবের। এই প্রবাল দেখতে অনেকটা সূর্যের মতো। অনেকেই একে সমুদ্রতলের সূর্য বলে উপমা দিয়ে থাকেন। এর বয়স কমপক্ষে ৫০০ বছর। লোব কোরালের দেখা পাওয়া যায় প্রশান্ত মহাসাগরের দক্ষিণ দিকে, লাইন দ্বীপের কাছে।

সমুদ্র হত্যা
ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের লরা পার্কার গত বছরই বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দেন সমুদ্র হত্যায় মানুষের উৎসবের কথা। পৃথিবীর অনেকেই জানত না, সমুদ্রবাসীর কী সর্বনাশ হয়েছে গত কয়েক দশকে। মালয়েশিয়া এয়ারলাইন্স ৩৭০ নিখোঁজের পর মহাসাগরজুড়ে তল্লাশি শুরু করে বিভিন্ন দেশ। তখনই সবার চোখে ধরা পড়ে আরেক দৃশ্য। সমুদ্রজুড়ে শুধুই আবর্জনা। অস্ট্রেলিয়ান উপকূলজুড়ে আবর্জনা ছেয়ে গেছে। মাছ ধরার টুকরো উপাদান, কার্গো জাহাজগুলোর বাতিল অংশ, প্লাস্টিকের শপিং ব্যাগসহ আবর্জনার এই স্তূপ পুরো সাগরকে যেন গিলে নিয়েছে। বিজ্ঞানীরা স্যাটেলাইট ছবি দেখে আর স্থির থাকতে পারেননি। সমুদ্রগভীরে পৌঁছার কথা ভাবতেই তারা শিউরে উঠলেন। সমুদ্রতলে যাত্রা শুরু হয়, যা ভাবা হয়েছিল ঠিক তাই। কোথাও কোথাও আবর্জনার পাহাড় তৈরি হয়ে গেছে। দুশ্চিন্তার বিষয় হলো, এই আবর্জনার বেশির ভাগ অংশই সহজে পচে যায় না। প্যাসিফিক আর আটলান্টিকের অতলের এই দৃশ্যকে সমুদ্র হত্যা বলা হয়। উত্তর ও দক্ষিণে সরে এসেও একই দৃশ্য দেখা গেল। ভারত মহাসাগর, আফ্রিকা এবং অস্ট্রেলিয়ার মধ্যাংশ সমুদ্রতল আবর্জনায় ডুবে গেছে। এতে সমুদ্রতলের প্রাণীবৈচিত্র্য অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে।
ভয়ানক সি ক্রেইট
সমুদ্রে বাস করে বিষাক্ত সাপের দলও। সি ক্রেইট তাদেরই একটি। এই সাপের বিষে মানুষের মৃত্যু অনিবার্য। একটু ভুলেই এটি হয়ে উঠতে পারে যে কোনো সাঁতারু বা ডুবুরির দুঃস্বপ্ন। পৃথিবীর স্থলে অন্যতম বিষধর হিসেবে র‌্যাব টলস্রেকের কথা বলা হয়। র‌্যাব টল স্রেক সি ক্রেইটের বিষের কাছে নেহায়তই ছেলেখেলা। কারণ সি ক্রেইট র‌্যাব টল স্রেক থেকে কমপক্ষে দশগুণ বেশি বিষাক্ত। সমুদ্রের গভীরে চলাচল বেশি বলে এটি মানুষকে কম আক্রমণ করে। এটি সমুদ্রজলে ঘুরে বেড়ায়, প্রবালের আনাচে-কানাচে বাস করে। ম্যানগ্রোভ বনেও এদের দেখা যায়। সমুদ্রে বিষধরের অভাব নেই। অনেক ভয়ানক মাছ রয়েছে, উদ্ভিদ রয়েছে। কিন্তু সি ক্রেইট সব কিছুকে ছাড়িয়ে যায়। সমুদ্রের ছোট-বড় সব প্রাণী তাকে ভয় পায়। এরা সমুদ্রের আরেক আতঙ্ক বৈদ্যুতিক ইলকে অনায়াসে পেটে পুরে নেয়। ছোট মাছ, মাছের ডিম এদের প্রধান খাবার।

সমুদ্রতলের আগ্নেয়গিরি
বিজ্ঞানীরা দাবি করেন পৃথিবীর ৮০ শতাংশ আগ্নেয়গিরি সমুদ্রের তলদেশে রয়েছে এবং এগুলো নিয়মিত অগ্ন্যুৎপাত করে থাকে। এই আগ্নেয়গিরির বেশির ভাগই সমুদ্রের হাজার ফুট গভীরে রয়েছে। এগুলো সহজে খুঁজে পাওয়া যায় না। ২০০৯ সালের মে মাসে বিজ্ঞানীরা সমুদ্রের সবচেয়ে গভীরে অগ্ন্যুৎপাতের চিত্র ধারণ করতে সক্ষম হন। প্রশান্ত মহাসাগরের সামাও, ফিজি এবং টোঙ্গার মধ্যবর্তী অংশে অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনাটি ঘটে। সেটি প্রশান্ত মহাসাগরের তলভাগ থেকে কমপক্ষে চার হাজার মিটার গভীরে ছিল। অগ্ন্যুৎপাতের পরপরই লাভা নির্গত হয়ে সমুদ্রতলে পুরো অঞ্চল কুয়াশায় আচ্ছন্ন করে ফেলে। গলিত পাথরের স্রোত বয়ে যায়। পরীক্ষার পর জানা যায়, এটি ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে উত্তপ্ত অগ্ন্যুৎপাতের ঘটনা। সমুদ্রে দ্বীপ গড়ে ওঠার সঙ্গে বিজ্ঞানীরা অগ্ন্যুৎপাতের একটি সম্পর্ক খুঁজে পেয়েছেন। সমুদ্র তলদেশের প্রকৃতি নির্ণয়েও এ ধরনের আগ্নেয়গিরির ভূমিকা মূল্যায়ন করা হচ্ছে।
সমুদ্রতলের অনেক রহস্য এখনো আমাদের অজানা রয়েছে। বিজ্ঞানীরা আমাদের প্রতিনিয়ত বিভিন্ন তথ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফলে আমরা নতুন জিনিস সম্পর্কে জানতে পারছি এবং মহান রবের বিশাল সৃষ্টির সৌন্দর্যে বিমোহিত হচ্ছি।

SHARE

Leave a Reply