Home প্রচ্ছদ রচনা একুশ ও একুশে বইমেলা -ড. রফিক রইচ

একুশ ও একুশে বইমেলা -ড. রফিক রইচ

আগামীর ভাষাবিদ বন্ধুরা, তোমাদের জন্য আজকের লেখাটা একটা ছোট ছড়া দিয়ে শুরু করছি। ছড়াটি হলো-
ফেব্রুয়ারি ভাষার গাড়ি
দিচ্ছে পাড়ি বিশ্বতে,
পাচ্ছি তারি মানটা ভারী
সুখের কাঁড়ি দৃশ্যতে।

ফেব্রুয়ারি দুঃখের বাড়ি
একটা সারি লাশ,
চেতন তারি কষ্টে ভারী
ফেব্রুয়ারি মাস।
ফেব্রুয়ারি মাস এলেই আমাদের কষ্ট ও বেদনার গান বেজে ওঠে মনে। আমরা ফিরে যাই ’৫২-এর একুশে। এদিনেই ভাষার জন্য সংগ্রাম করতে যেয়ে রফিক, বরকত, জব্বার, সালাহউদ্দিন মৃত্যুবরণ করেন। সালাম ঐ দিনই আহত হয়ে শেষমেশ ৭ এপ্রিল তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁদের এ রক্তের বিনিময়ে টিকে যায়, থেকে যায় আমাদের মুখে মুখে মধুর এ বাংলা ভাষা। এই যে আমি আজ লিখছি তোমাদের জন্য, সেটা বাংলা ভাষায়। তোমরা এটা পড়বে জানবে আর জানার আলোয় তোমাদের ভালো লাগবে সেটাও এই বাংলা ভাষার জন্যই। এ ভাষার মতো মিষ্টি ভাষা বিশ্বের আর কোথাও নেই। থাকতে পারে না। এ ভাষায় কথা বলে সারা বিশ্বের প্রায় ৩০ কোটিরও বেশি মানুষ।
এখন অনেক দেশের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হলো এই বাংলা ভাষা। আসলে বন্ধুরা যে কোন ভালো কাজের পেছনে রয়েছে শ্রম, সাধনা, ত্যাগÑ সর্বোপরি জীবন দান। অমর একুশেও এর বাইরে নয়। যে কারণে এ ভাষা পেয়েছে বিশ্ব স্বীকৃতি। এ দিবসকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে। বাংলা ভাষা ছড়িয়ে পড়েছে দেশ থেকে দেশে, সারা বিশ্বময়। ফেব্রুয়ারি যেন ভাষার গাড়ি হয়ে পাড়ি দিয়েছে সারা বিশ্ব, সারা জগৎময়। যে কারণে এর মানটাও আমরা কম পাইনি। সুখও কোন অংশে কম নয়।
১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি বাংলা ভাষার জন্য জীবন দানের যে বীরত্বপূর্ণ বড় ঘটনা ঘটে সেই বিরল স্মৃতিকে জিইয়ে রাখতে জীবন্ত রাখতে এ মাস জুড়ে বাংলা একাডেমি চত্বরে আয়োজন করা হয় অমর একুশে বইমেলার। এ মেলাটা এদেশের ঐতিহ্যবাহী সব মেলাগুলোর মধ্যে অন্যতম। এ মেলার গোড়াপত্তন করেন চিত্তরঞ্জন সাহা। ১৯৮৩ সালে বাংলা একাডেমিতে প্রথম অমর একুশে গ্রন্থমেলা বা বইমেলার আয়োজন সম্পন্ন করা হলেও সেই সময়ের সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্র মিছিলে ট্রাক তুলে দিলে দু’জন ছাত্র মারা যাওয়ায় সেই বছর আর বইমেলা করা হয়নি। কিন্তু ১৯৮৪ সালে ঢাকঢোল পিটিয়ে এই একুশে মেলার সূচনা করা হয়। এ বইমেলা এখন বৃহৎ আয়োজনে সম্পন্ন হয়ে আসছে। স্থান সঙ্কুলান না হওয়ায় ২০১৪ সাল থেকে এটি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্প্রসারণ করা হয়েছে। আগে এই বইমেলা ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম দিন থেকে শুরু হয়ে ২১ ফেব্রুয়ারি শেষ হয়ে যেত। কিন্তু পরে দর্শক, ক্রেতা ও বিক্রেতাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে এ গ্রন্থমেলা বা বইমেলাকে ফেব্রুয়ারি মাসব্যাপী করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয় এবং সেভাবেই এখন হয়ে আসছে। বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় মেলা নিয়ন্ত্রণের যাবতীয় দায়িত্ব পালন করে থাকে।
বইমেলায় বিভিন্ন এলাকা ভাগ ভাগ থাকে। যেমন ধর- প্রকাশক এলাকা, প্রকাশক বিক্রেতা এলাকা, সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এলাকা, লিটল ম্যাগাজিন এলাকা ও থাকে জমজমাট শিশু কর্নার। কিন্তু এখানে কিছু কথা বলি, যেহেতু শিশুরাই আগামী দিনের পাঞ্জেরী বা আলোকবর্তিকা। তাই শিশু কর্নারটিকে আরও সমৃদ্ধ করতে হবে। বাড়াতে হবে স্থান, বাড়াতে হবে শিশু প্রকাশনীর স্টল। এই কর্নারটির প্রবেশ দরজা হবে পৃথক। যাতে করে অনায়াসেই শিশু-কিশোররা ঢুকতে পারে, বেরুতে পারে। আবার হওয়া উচিত প্রবেশ দরজার খুবই কাছাকাছি। আবার প্রকাশনীগুলোর মালিকদের উচিত হবে শিশুদের জন্য ভালো মানের বই প্রকাশ করা। যাতে করে শিশু-কিশোররা বই পড়ে উপকৃত হয়। ভালো মানুষ হয়ে গড়ে ওঠার সুযোগ পায়। শুধু ব্যবসায়িক দিক বিবেচনা করে মানহীন বই যেন মলাটবদ্ধ না হয় সে দিকে প্রকাশকদের খেয়াল রাখতে হবে। আবার তোমরা যারা শিশু-কিশোর তারাও যেন বই কেনার সময় শুধু মলাটের চাকচিক্য দেখে বই না কিনো সেদিকে খেয়াল রাখবে। একটি ভালো মানের বই তোমাদের জীবনকে, জীবনবোধকে পাল্টে দিতে পারে। তাই এ ব্যাপারে সবাইকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। যা হোক বন্ধুরা এ মেলাকে বিভিন্ন মনীষীর নামেও স্থান ভাগ করে দেয়া হয়। যেমন ধরÑ জব্বার, রফিক, সালাম, বরকত, শফিউর, কাজী নজরুল ইসলাম, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ড. শহীদুল্লাহ, আব্দুল করিম সাহিত্যবিশারদ চত্বর ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
এ মেলায় দেশী প্রকাশনীগুলো ছাড়াও বিদেশী যেমন ধরÑ ভারত, জাপান, রাশিয়া ইত্যাদি দেশ থেকে বিভিন্ন প্রকাশনী অংশগ্রহণ করে থাকে। এ ছাড়া এদেশের সরকারের রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এ মেলায় অংশগ্রহণ করে মেলাকে সমৃদ্ধ করে থাকে। যেমন ধরÑ বাংলাদেশ প্রতœতত্ত্ব অধিদফতর, পর্যটন করপোরেশন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।
বইমেলাতে প্রতিদিন আলোচনা অনুষ্ঠান, কবিতা পাঠের আসর বসে। হয় বিকেলের দিকে সাংস্কৃতিক নানা অনুষ্ঠান। এছাড়া মেলায় লেখক কুঞ্জ থাকে যেখানে লেখকরা উপস্থিত থাকেন। এখানে লেখকদের বইয়ের উপরে দর্শক ও পাঠকদের সাথে মতবিনিময় হয়। প্রতিদিন বিকেলে এসবের পাশাপাশি হয় নতুন নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন। হয় প্রতিনিয়ত উপচে পড়া ভিড়। আসলে বাংলা ভাষার জন্য ভাষাকে সমৃদ্ধ করার জন্য এ মেলার কোন তুলনা চলে না।
এ মেলা চলাকালীন দেশের বিখ্যাত সব লেখকের সাহিত্য ক্ষেত্রে বিশেষ অবদানের জন্য দেয়া হয় একুশে পদক। প্রকাশকদের দেয়া হয় মেলা প্রবর্তক চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পদক এবং ক্রেতাদের দেয়া হয় পলান সরকার পুরস্কার। স্টল ও অঙ্গসজ্জার জন্য দেয়া হয় সরদার জয়েন উদ্দীন স্মৃতি পুরস্কার।
তবে বন্ধুরা, তোমাদের সুখের পাশাপাশি কিছু দুঃখেরও কথা বলি। এখন দেশের রাষ্ট্রভাষা বাংলা হলেও সর্বত্র চলছে ইংরেজি ভাষা। অফিস আদালত থেকে শুরু করে নানা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে চলছে ইংরেজি ভাষার যারপরনাই ব্যবহার। তোমাদের মধ্যে অনেকেই আছ যারা ইংরেজি মিডিয়ামের স্কুল কলেজে পড়ছো। রাস্তাঘাটের নানা সাইনবোর্ড থেকে শুরু করে সর্বত্র ইংরেজিকে ব্যবহার করার জন্য যেন প্রতিযোগিতা চলছে।
এটা আসলে আমাদের ভাষার জন্য ভালো কোন খবর নয়। যদিও নিজেদের এগিয়ে নেয়ার জন্য পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন দেশের সাথে ভাব বিনিময় করতে ইংরেজি ভাষা শিখতে লিখতে ও বলতে জানতে পারাটা জরুরি হয়ে পড়েছে তথাপিও নিজের ভাষা বাদ দিয়ে নয়। আসলে আমাদের ভাষাকে টিকিয়ে রাখতে এবং বিশ্বের দরবারে পরিচিত ও ব্যবহার উপযোগ্য করে তুলতে নিজেদের করতে হবে নানা বৈজ্ঞানিক আবিষ্কার ও টেকসই সাহিত্য সৃষ্টি, ক্রীড়াঙ্গনে সফলতা অর্জন। সেগুলোকে উপস্থাপন করতে হবে নিখাদ বাংলা ভাষায়। অন্য ভাষাভাষী মানুষদের এসব আবিষ্কার, টেকসই সাহিত্য ও ক্রীড়া অঙ্গনের সফলতা ইত্যাদি জানতে তাদের বাংলা জানতে হবে শিখতে হবে। যাতে করে আমাদের ভাষা বাংলা ভাষার বাড়বে কদর, সম্মান। বিশ্বের দরবারে আমরা পরিচিত হবো ভাষার রাজ মুকুট পরে।
আমাদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়-গুলোতে এখনো আমরা যে গবেষণাগুলো করি সেগুলোর অধিকাংশই ইংরেজিতে লিখে দিতে হয়। কারণ এসব থিসিস ইংরেজি জানা পরীক্ষকদের কাছে যায়। বাংলা ভাষা লিখে দিলে তারা বুঝতে পারে না বলে। কিন্তু তাদের থিসিস বা গবেষণার বইগুলো আমাদের দেশের পরীক্ষকদের কাছে আসে তাদের ভাষায়। তাহলে আমরা কেন এটা পারছি না এখনো। আমরা সকল থিসিস, গবেষণা, প্রবন্ধ সব বাংলা ভাষাতে লিখবো। সে ব্যবস্থা রাষ্ট্রীয়ভাবে করে দিতে হবে। আমরা সে দিনেরই অপেক্ষায় থাকবো এবং থাকলাম।
তোমাদের এ বিষয়ে একটি গল্প বলি। একবার আমার এক স্যারের নিকট কোরিয়া দেশ থেকে কোরিয়ান ভাষায় একটি গবেষণা পত্র আসে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে ফলাফল পাঠানোর জন্য। আমার স্যার তখন কি করবেন? তখন বাধ্য হয়ে কোরিয়ান ভাষা শিক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। কারণ কোরিয়ান ভাষা না জানলে গবেষণাপত্রটি মূল্যায়ন করা যাবে কী করে?
কাজেই ওদের মত আমাদেরও হতে হবে সে ব্যবস্থাও থাকতে হবে। তাহলে আমাদের বাংলাতে লেখা গবেষণাপত্র ওদের মূল্যায়ন করতে অবশ্যই বাংলা জানতে হবে। বাংলা শিখতে হবে। তাই বন্ধুরা আজ থেকে আমরাও সেভাবে গড়ে উঠবো, বেড়ে উঠবো তাহলে আমাদের বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষা হবে। আমরা হবো টেকসই উন্নত জাতি।
পরিশেষে তোমাদেরকে কিছু কথা বলে আজকের লেখাটি শেষ করতে চাই আর তাহলো তোমরা এখন অনেকেই স্মার্টফোন, ট্যাব, ল্যাপটপ ইত্যাদি আধুনিক যন্ত্র ব্যবহার করছো। বাটন টিপলেই পাচ্ছ নাটক, সিনেমা, কার্টুন, কমেডি ও খেলাধুলাসহ আরো কত কিছু। ফলে তোমরা ক্রমাগত বই পড়া কমিয়ে দিচ্ছ। এটা কিন্তু সুখের কথা নয়। তোমরা বেশি বেশি ভালো মানের বই পত্রিকা কিনবে এবং পড়বে। এতে করে তোমাদের বুদ্ধির চর্চা অব্যাহত থাকবে। নইলে দৃষ্টিশক্তির পাশাপাশি তোমাদের বুদ্ধিও ক্রমশ ভোঁতা হতে থাকবে। যা ভালো ও উন্নত জাতিগঠনে বাধার সৃষ্টি করবে। আমরা পিছিয়ে পড়বো। সর্বোপরি দেশ সোনার বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়বে। আর এটা প্রত্যাশা করা একজন দেশপ্রেমিকের কাজ নয়। তোমরা ভালো দেশপ্রেমিক হবে। দেশের জন্য নিজেকে গড়বে এবং প্রয়োজন হলে লড়বে।

SHARE

Leave a Reply