Home গল্প বিজয় -আবদুল ওহাব আজাদ

বিজয় -আবদুল ওহাব আজাদ

পাগলা বুড়োকে চেনে না এ তল্লাটে এমন লোক খুব কমই আছে। মাথা ভর্তি ঝাঁকড়া সাদা চুল, গোঁফ-দাড়িগুলো কবুতরের পাখনার মতো সাদা ফক ফক করছে। অবিন্যস্ত চুলে তাকে বড় ক্ষ্যাপা মনে হয়। পাগলা বুড়ো কখনও কাঁদে। কখনও হি হি করে হাসে আবার কখনও বা ঐতিহাসিক যাত্রার সংলাপ আওড়ায় নাটকীয় ভঙ্গিতে। পাগলা বুড়োর তাল তামাসা দেখে ছেলে-মেয়েরা কিটকিট করে হাসে। ওরা পেছন থেকে ঢিল ছুড়লে পাগলা বুড়ো ওদের তাড়া করে, তাড়া খেতেই যেন ছেলে-মেয়েদের আনন্দ।
একবার এক বেরসিক বটগাছ ভীষণ বিপদে ফেললো সবাইকে, সে কি দুর্ভোগ!
সেবার গ্রামের ছেলেমেয়েরা উল্টো তাড়া করলো পাগলা বুড়োকে। সে তো প্রাণপণে দৌড়াতে লাগলো। যত দৌড়ায় ছেলেমেয়েরা তত ঢিল ছুড়ে তাড়াতে লাগলো। বিপদ দেখা দিল তখন পাগলা বুড়ো যখন মাঠের কিনারে প্রকাণ্ড বটগাছটায় উঠতে লাগলো এদিকে সমান তালে কুকুরগুলো ডেকে যাচ্ছে ঘেউ ঘেউ করে। পাগলা বুড়োকে দেখলে কুকুরগুলোও ভীষণ রকম তেড়ে আসে। ক্ষ্যাপা কুকুরের ভয়ে আর ছেলেমেয়েদের নিষ্ঠুর অত্যাচারে পাগলা বুড়ো গাছের এ ডাল ও ডাল করতে লাগলো। হঠাৎ করে পা ফসকে পড়ে গেল সে। এরপর সে আর কিছু জানে না। গ্রামের লোকজন ধরাধরি করে নিয়ে গেল সদর হাসপাতালে। এক মাস পর খোঁড়া পা নিয়ে ফিরে এল পাগলা বুড়ো। সেই থেকে সে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটে।
রাত কাটাবার মত কোন নির্দিষ্ট জায়গা নেই তার। যেখানে সেখানে ঢুস মেরে পড়ে থাকে। প্রায় রাত সে ঘুমায় না। এ পাড়া ও পাড়া করে বেড়ায়। মাঝে মাঝে আবোল তাবোল বকে পাড়া মাত করে রাখে। বাস্তু ভিটাটুকু ধরে রাখতে প্রাণপণ চেষ্টা করেও পারেনি পাগলা বুড়ো। সলিম মাতব্বর ফন্দি ফিকির করে জমিটুকু নিজের নামে লিখে নিয়েছে। পাগলা বুড়োর তো পিছুটান নেই। কার জন্য সে এসব আগলে রাখবে। পথই যার আসল ঠিকানা।
মনিরার সঙ্গে পাগলা বুড়োর ভীষণ সদ্ভাব। মনিরা রসিদ সাহেবের মেয়ে। সে পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। সুযোগ পেলে মনিরার কাছে ছুটে আসে পাগলা বুড়ো। তার সঙ্গে সুখ-দুঃখের কথা বলে। মনে হয়, মেয়েটি তার কত আপন।
পাগলা বুড়োর মনে অনেক জ্বালা। একদিন তার সব ছিল, সংসার ছিল, সন্তান ছিল, স্ত্রী ছিল, আজ আর তার কিছু নেই। পথই তার একমাত্র ঠিকানা।
পাগলা বুড়োর আসল নাম ছমির আলী। ছমির আলী বয়সকালে খুব ভালো বাঁশি বাজাতে পারত। নাদীর ধার বেয়ে চাঁদনী রাতে হেঁটে হেঁটে বাঁশি বাজাতো সে কী মধুর সেই বাঁশির সুর।
ছমির আলীর ছেলে কুতুব তখন বি.এ ক্লাসের ছাত্র। বলিষ্ঠ পুরুষ ছমির আলীর মত শরীর স্বাস্থ্য তার। তখন স্বাধীনতার আন্দোলন চলছে। মুক্তিকামী মানুষ পথে প্রান্তরে নেমেছে। পরাধীনতার নাগপাশ ছিন্ন করে স্বাধীনতার বিজয় পতাকা উড়াতে। একাত্তরের মুক্তির ডাকে কুতুবের রক্তে নাচন ধরলো। সে আর ঘরে বসে থাকতে চায় না। দেশের স্বাধীনতা তার কাছে জীবনের চেয়ে প্রিয়।
তখন চারিদিকে গোলাগুলি চলছে। চারিদিকে অসংখ্য লাশ। এসব দেখে কুতুবের মন কেঁদে উঠলো। বেরিয়ে পড়লো যুদ্ধে।
ছমির আলী বলল,
“কোথায় যাচ্ছিস কুতুব?”
যুদ্ধে
যুদ্ধে কেন?
দেশ স্বাধীন করতে।
দেশ স্বাধীন হলে তোর কী লাভ?
পরাধীন হিসেবে বেঁচে থেকে কোনো লাভ নেই আব্বা, তাছাড়া স্বাধীনতার পর দেখবে মানুষ আবার নতুন করে বাঁচতে শিখবে।
অশ্রু ছলছল চোখে ছমির বলেছিল,
যুদ্ধে যাচ্ছিস কিন্তু তুই যদি আর না ফিরিস? যুদ্ধ জয় হলো দেশ স্বাধীন হলো পতাকা বদল হলো কিন্তু কুতুবের আর ফেরা হলো না।
ছমির আলী ছেলের লাশটাও দেখতে পায়নি। পুত্রশোকে পাগলের মত পথে ঘাটে বেড়িয়েছে। তারপর আস্তে আস্তে ছমির আলী পাগলা বুড়ো নামে পরিচিত হয়ে গেছে।
পাগলা স্বামীকে নিয়ে ঘর সংসার করতে চায়নি ছমির আলীর স্ত্রী। একদিন তাই ছমিরকে ছেড়ে বাপের বাড়ি চলে গেল সে। আর ফিরে এলো না। সেই থেকে ছমির আলী একা ভীষণ একা একাত্তরের পর থেকে কত বিজয় দিবস এলো পাগলা বুড়োর জীবনে কিন্তু কেউ আর তাকে এখন ডাকে না। ঐদিন কোথাও যদি ডাল খিচুড়ি জোটে তবে তাই পেট পুরে খায় সে।
তখন আবার নতুন করে ভাবে কুতুবের কথা কুতুব তো এই বিজয়ের জন্য জীবন দিয়েছে। হো হো করে হাসে হাসির মাঝ দিয়ে আবার পাগলা বুড়োর চোখে অশ্রু খেলা করে।
বিজয় দিবসে পাগলা বুড়ো মনিরাদের বাড়িতে বেড়াতে আসে ও কেমন করে যেন বুঝতে পারে আজ বিজয় দিবস ১৬ ডিসেম্বর।
মনিরা পাগলা বুড়োকে আপ্যায়ন করে আদর করে।
তখন কেবল পুব আকাশ লাল হয়েছে। পাখি গান ধরেছে। মাঝ রাতে কয়েকবার তোপধ্বনি শব্দও শোনা গেছে। সকাল হতে না হতেই পাগলা বুড়ো এসে হাজির। মনিরা তাকে বসতে দিয়ে বলল,
বুড়ো দাদু আজ বিজয় দিবস তাই না?
পাগলা বুড়ো কয়েকবার ঘাড় নাড়ে।
মনিরা আবার বলল,
এই বিজয়ের জন্য কুতুব চাচা মারা গেছে তাই না?
কোন কথায় জবাব দিল না পাগলা বুড়ো। শুধু চোখটা ছলছল করে উঠলো।
মনিরা আবার জিজ্ঞাসা করলো,
কিছু খেয়েছো বুড়ো দাদু?
পাগলা বুড়ো ইশারায় বুঝালো রাত থেকে তার খাওয়া হয়নি। পাগলা বুড়ো যেন হঠাৎ করে নির্বাক হয়ে গেছে। অস্পষ্ট কণ্ঠে কথা ফুটছে না। মনিরা কিছুক্ষণের জন্য বাড়ির ভেতর গেল, আজ তার স্কুল ছুটি, অত তাড়া হুড়ো নেই।
পাগলা বুড়ো ঠায় বসে রইল। বিড়বিড় করে শুধু ঠোঁট নাড়ছে আর চোখের পানি ফেলছে সে। খোঁড়া পা খানা হঠাৎ করে বেশ ফুলে গেছে। যন্ত্রণায় বেশি পথ হাঁটতে পারে না সে। ফোলা পা তুলে কয়েকবার দেখলো পাগলা বুড়ো। তারপর আবার পায় হাত বুলালো সে।
মনিরা থালা ভর্তি খাবার নিয়ে এসে বলল-
এগুলো খাও, বুড়ো দাদু।
পাগলা বুড়ো খাবারে হাত দিল না।
মনিরা জোর করে বুড়ো দাদুর হাতটা প্লেটে নামিয়ে দিয়ে বলল- কি হলো খাচ্ছো না কেন?
পাগলা বুড়ো এবার আর না খেয়ে পারলো না।
আজ যেন পাগলা বুড়োর হৈ হুল্লোড় নেই। পাগলামি কমে গেছে, কেন জানি ভারাক্রান্ত বুক তার, ভীষণ অনুতপ্ত সে। পাগলা বুড়ো খাওয়া শেষ করলো।
মনিরা পাঞ্জাবির প্যাকেটটি এগিয়ে দিয়ে বলল, এই পাঞ্জাবিটা পরো বুড়ো দাদু।
মনিরা প্রতি বছর বিজয় দিবসে বুড়ো দাদুকে একটা করে পাঞ্জাবি দেয়। পাগলা বুড়ো এ কথা জেনে ছুটে আসে মনিরার কাছে। ছোট মানুষ অথচ গভীর শ্রদ্ধায় তাকে জড়িয়ে রাখে।
মুক্তিযোদ্ধার পিতার স্বীকৃতিটুকু অন্তত মনিরা দেয়। পাঞ্জাবির প্যাকেটটা হাত বাড়িয়ে নিল পাগলা বুড়ো। তারপর কি এক পরম স্নেহে মনিরাকে বুকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলো কিছুক্ষণ।

SHARE

Leave a Reply