Home বিশেষ রচনা হাড় কাঁপানো শীত ও আমাদের শিশুরা -মুহাম্মদ নূরুল হুদা

হাড় কাঁপানো শীত ও আমাদের শিশুরা -মুহাম্মদ নূরুল হুদা

শীতের ঋতুতেই শীত এসেছে এটা নতুন বিষয় নয়। ঋতু পরম্পরায় ছয় ঋতুর ধারায় একটার পর একটা ঋতু আসবে। এটাই স্বাভাবিক। এর মধ্যেই কল্যাণ নিহিত। নতুন একটি ঋতুর কথা কল্পনা করলে বোঝা যায় কেমন হতো যদি ঐ একটি ঋতুই অব্যাহত থাকতো। বনি আদম অতিষ্ঠ হয়ে উঠত, নতুবা আল্লাহর কল্যাণকামী বিধান অনুযায়ী তা প্রতিপালিত হতো। মানুষও তা সহনীয় বলে মেনে নিতো। কিন্তু বর্তমান পৃথিবীর শীত, গ্রীষ্ম ও বর্ষা ঋতু ইহলৌকিক জগতেই নির্দিষ্ট সময়ের পরে তার ভালো লাগার কথা নয়। আর অস্বাভাবিকতাও কারো কাম্য নয়।
আসলে পৌষ ও মাঘ বছরের একটি ঋতুকে শীতকাল হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। এই দুই মাসের শীতকাল ষড়ঋতুর বাংলাদেশের একটি ঋতু বটে। শীতের ঋতু দুই মাসের বলা হলেও তা হেমন্ত, শীত ও বসন্ত এই তিন ঋতুকে জুড়ে শীতের আবহ আমরা এক সময় লক্ষ করতাম। গ্রাম বাংলার তো শীত আগে থেকেই শুরু হয়ে যায়। এভাবেও বলা যায় নভেম্বর, ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত শীত চলতেই থাকে। আর বাংলা মাস হিসেবে তা বলা যায় অগ্রহায়ণ, পৌষ, মাঘ ও ফাল্গুন মাস। কিন্তু শহরে পুরো আবহ আমরা লক্ষ করে থাকি ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসজুড়ে। নভেম্বর ও ফেব্রুয়ারি মাস শহরে শীত প্রকম্পিত করে তোলে না। শহরে শীত বলতেই ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসকে বোঝায়।
অনেক সময় গ্রাম এবং শহরে দুপুর ১২টায়ও সূর্যের মুখ দেখা যায় না। এটা প্রতিনিয়ত ঘটে থাকে কোন কোন এলাকায়। কিন্তু তারপরও শীতের ভোরে দুধপিঠা খেতে ভালোই লাগে যদিও অসহ্য শীতের কাঁপুনি শীতার্ত মানুষ তথা বিত্তহীনদের শিশুদের জানান দিয়ে যায় হাড় কাঁপুনি শীত কাকে বলে। শ্রেণী বিভাগ অনুযায়ী উচ্চবিত্ত, উচ্চমধ্যবিত্ত, মধ্যবিত্ত এবং বিত্তহীনদের কথা বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায় বিত্তহীন তারা যেখানেই বসবাস করুক না কেন তাদের জন্য শীত ভালো লাগার ঋতু নয়। আর দারিদ্র্যক্লিষ্ট শিশুদের তো নয়ই। শীতে আমাদের আদরের অনাদরে বেড়ে ওঠা শিশুদের কষ্টের শেষ নেই। বিত্তহীনদের থাকার ঘরের শ্রীহীন অবস্থায় উত্তরের হিমেল বাতাস প্রবেশ করে শীতার্ত বনি আদমকে আরো অসহনীয় করে তোলে। নেই পর্যাপ্ত কাঁথা, কম্বল বা লেপ তোশক। কোন রকমে শীতের লম্বা রাত এ-পাশ ও-পাশ করে কাটিয়ে দেয়। তারা মনে করে শীতের রাতটা কাটিয়ে দিতে পারলে ভোরে নাড়া অথবা খড়কুটা পুড়িয়ে আগুন পোহানোর পর প্রায় সারাদিন তো রোদের ঝলক থাকবে, এতে কাজ করতে করতে কেটে যাবে।
আমাদের কোমলমতি বিত্তহীন শিশুরা এক কঠিন সংগ্রামের মধ্য দিয়ে শীত পাড়ি দেয়। স্কুল থেকেই ঝরে পড়া শিশুরা অভাবের তাড়নায় শিশুশ্রমে লিপ্ত হয়। সংখ্যায় বড় সংখ্যকই শিশুশ্রমে নিয়োজিত। শ্রম হিসেবে কর্মে নিয়োজিত আদরের শিশুরা শীত গ্রীষ্মকে বরণ করে নেয় জীবিকার তাগিদে এবং তাদের জন্য তা অনেক সময় সহনীয় হয়ে ওঠে। তবে শহর বন্দর গ্রামে অনেক শিশুকেই বস্ত্রহীন অবস্থায় দেখতে পাওয়া যায়। এই দৃশ্যকে অনেক মানুষ নিজের পরিবারের আদরের শিশুসন্তানের সাথে তুলনা করে তারা হৃদয় উজাড় করে কিছু করার চেষ্টা করেন। তাদের চেতনা জাগ্রত হয় এই বলে যে, পথের ধারের দারিদ্র্যক্লিষ্ট শিশুটি তো আমার হতে পারতো।
আমরা ছোটবেলায় দেখেছি একটি লেপের মধ্যে যত বেশি সংখ্যক বাচ্চা শিশু থাকত তাতে শীতের প্রকোপ কিছুটা কম থাকতো অর্থাৎ গরম হয়ে উঠত। কিন্তু লেপের দু’পাশে যে শিশুরা থাকতো হয়তো দেখা যেতো অনেক সময়ই তারা লেপের বাইরে থেকে যেতো। আর মাঝখানের বাচ্চাদের শীতে কাবু করতে পারতো না।
শীতের এই সময়ে শ্রমজীবী মানুষকে শীত উপেক্ষা করেই কাজে বের হতে হয়। কুয়াশাচ্ছন্ন শীতে গ্রাম বাংলার জেলেরা যখন গোটা শরীরে সরিষার তেল মেখে ভোরে পুকুর অথবা নদীর বাঁকে গভীর পানিতে অর্থাৎ ঝাড়ে মাছ ধরার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়ে তখন শরীর শিহরিয়া উঠে। জেলেরা কাঁপতে কাঁপতে উপরে উঠে আসে এবং তাদের জন্য আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থা করা হয়। রুটি রুজির জন্য এই শীতার্ত ভোরে জেলেসহ কৃষক তথা শ্রমজীবী মানুষ কাজে লেগে যায়। কৃষক তথা শিশুরা জমি থেকে উৎপাদিত বেগুন, লাউ, শিম, শালগম, ফুলকপি, বাঁধাকপি, কলাই, মটরশুঁটি এবং পালংসহ অন্যান্য শাক, টমেটো ও অন্যান্য রবি সবজি উত্তোলন করে কুয়াশার মধ্যে শিশির পায়ে দূর-দূরান্তের বাজারে যায়। জমির মাঝখানে এগুলো উত্তোলনের সময় এবং জমির বাতর (ছোট সরু রাস্তা) দিয়ে যাওয়ার সময় তার কাপড় ভিজে একাকার হয়ে যায়। শীতেই তার রুটি রুজির এই কষ্টটুকু করতে হয়। গ্রাম বাংলার শীতার্ত শিশুদের নেই পর্যাপ্ত বস্ত্র, অথচ শীতকে উপেক্ষা করেই তাদেরকে কাজের সন্ধানে বের হতে হয়। শীতের পোশাকের ক্রয়ক্ষমতা গরিব মানুষের অনেক ক্ষেত্রেই হয় না। কারণ প্রচলিত পোশাক সামগ্রীর তুলনায় শীতের পোশাক সামগ্রীর দাম একটু বেশিই থাকে।
যার নুন আনতে পান্তা ফুরায় তার আবার এসব শীতের সামগ্রী কেনার ক্ষমতা কোথায় থাকে। বিষয়টি বিত্তবানদের জন্য সক্রিয় বিবেচনায় থাকা ভালো। পবিত্র মাহে রমজান দিয়েই বিত্তবানদের বিত্তহীনদের দুঃখের অংশীদার হওয়ার শিক্ষা দেয়া হয়েছে। শুধুমাত্র ক্ষুধার শিক্ষাকেই এ ক্ষেত্রে নিয়ে আসা হয়নি। সার্বিকভাবে বিশেষ করে রোজার পাশাপাশি জাকাত ব্যবস্থা এ ক্ষেত্রে কার্যকর হওয়া বাঞ্ছনীয়। জাকাতে ধনীদের সম্পদে বিত্তহীনদের অধিকারের কথা বলা হয়েছে। বিত্তবানরা বিত্তহীনদের অধিকার কানায় কানায় বুঝিয়ে দিলে শীতার্ত মানুষের কষ্ট লাঘব হতে পারে। এ ছাড়াও মানবিক আচরণের বহিঃপ্রকাশ স্বরূপ একজন ধনাঢ্য ব্যক্তি কখনো শীতের কষ্টের এই সময়ে চুপ করে ঘরে বসে থাকতে পারে না।
একই মানবগোষ্ঠীর সদস্য হয়ে অপর ভাইয়ের কথা স্মরণ করে দেখা উচিত যে, তাদের শিশুরা আমাদের শিশুসন্তানদের চেয়ে কত কষ্টে শীতের লম্বা রাত কাটিয়ে দেয়। পরনে যেমন পর্যাপ্ত কাপড় থাকে না তেমনি শীতবস্ত্রেরও প্রচণ্ড অভাব তাদের। বছরের একটা বিশেষ সময় পর্যন্ত এদেরকে এই শীতের কষ্ট পোহাতে হয়। আর শীতের সময়সীমা তাদের ওপর দিয়ে বেশি সময় ধরে প্রবাহিত হয় বলেও তারা বেশি সময় ধরে শীতে কষ্ট পেয়ে থাকে।
আজকে প্রবাদ বাক্যের সেই কথাটি উল্লেখ করলে শীতে গরিবদের অবস্থা যে তথৈবচ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। পৌষে তুষের শীত আর মাঘে বাঘের শীত। অর্থাৎ হাড় কাঁপানো শীতে দুর্দশাগ্রস্ত মানুষের অবস্থান বড় অসহনীয়, বড় দুঃসহ হয়ে থাকে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। এই কষ্টদায়ক কষ্টের শীত ভোগ করতে হয়। লম্বা রাত শেষে এদেরকে ভোরে বাড়ির আঙিনায় আগুন জ্বালিয়ে গা গরম করতে দেখা যায়।
গাদাগাদিভাবে তৈরি করা ভবন, বিপুল জনসংখ্যার চাপ, মিল-ফ্যাক্টরি, কারখানা, দোকান, অফিস, আদালত ইত্যাদি নানা কারণেই শীতের ধকলটা কম লাগে নগরবাসীদের ওপর। তুলনামূলক গ্রামের চেয়ে শহরে শীত কম এবং তা সর্বোপরি সহনীয়ও বলা যায়। কিন্তু শীতের তাপমাত্রা গ্রামে যখন ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে যায় তখন শীতার্ত মানুষের অবস্থা কেমন তা সহজেই অনুমেয়। প্রায় প্রতি বছর না হলেও কয়েক বছর অন্তর দেশের উত্তরাঞ্চলে এমনকি অন্যত্র ভয়াবহ শীতের প্রকোপে অনেক বনি আদমের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। অথচ শহরে এটা কম। গ্রামের খোলা প্রান্তরজুড়ে শীতের প্রবাহ বয়ে যায়। কষ্ট পায় গ্রামবাসী, শিশু ও বয়স্করা।
শীত মৌসুম আল্লাহর বড় নিয়ামত। এই শীতজুড়ে সবটাই কল্যাণকামিতায় পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন আল্লাহ তায়ালা। শীতের পিঠা, শীতের সবজি সবই আল্লাহর দান। সবই আমাদের মতো বনি আদমকে ভোগ করার জন্য দিয়েছেন। আমরাও শীতকে পেয়ে পরিতৃপ্ত। আল্লাহর দরবারে কৃতজ্ঞতা বা শোকরিয়া জানিয়ে থাকি শীতের এই রহমতকে পেয়ে। কিন্তু শীতার্ত মানুষ তথা শিশুদের প্রতি কি আমাদের দায়িত্ব নেই? শিশুদের বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে কি আমাদের সামঞ্জস্যপূর্ণ দায়িত্ব নেই। আমরা কি পারি না দারিদ্র্যের কশাঘাতে নিপাতিত শিশুটির প্রতি হাত বাড়িয়ে দিতে। এই অনুভূতি, এই দায়িত্ববোধ জাগ্রত হলে কোনো আদরে অবহেলার শিশুটি বঞ্চিত থাকবে না। আমাদের সম্পদে তো তাদের হক বা অধিকার রয়েছে। আমরা যদি যথাযথভাবে তা তাদেরকে প্রদান করি তাহলেই তো ভারসাম্য রক্ষা হয়। সবচেয়ে বড় কথা জাকাতের যথার্থ প্রয়োগ হলে এবং বিত্তহীনদের আয় বাড়াতে পারলে তারা আর এই শীতে করুণার পাত্র হয়ে থাকবে না। সামাজিক প্রেক্ষাপটে এই ব্যবস্থাটি আমাদের করা প্রয়োজন। নতুবা ক্ষুধার কষ্ট, আর্থিক কষ্ট, সামাজিক কষ্ট এবং শীত ও গরমের কষ্ট থেকেই যাবে।

SHARE

Leave a Reply