Home সম্পূর্ণ কিশোর উপন্যাস মায়ের জন্য ভালোবাসা মূল : ডন রাইট ভাষান্তর : হোসেন মাহমুদ

মায়ের জন্য ভালোবাসা মূল : ডন রাইট ভাষান্তর : হোসেন মাহমুদ

গত সংখ্যার পর

৭.
বালির ব্যাগ দিয়ে ঘেরাও করা ফক্সহোলে অবস্থান নিয়েছি। খুব উদ্বিগ্ন। আমি জানি আমি সাহসী নই। তবে কাপুরুষও নই। আমরা হাতাহাতি যুদ্ধের কিছু প্রশিক্ষণ পেয়েছি। তবে তা খুব বেশি নয়। ফলে খুব একটা দক্ষতা অর্জন করেছি তা বলা যাবে না। শুটিং রেঞ্জে গিয়ে টার্গেট প্র্যাকটিস করেছি ঠিকই, কিন্তু অবশ্যই সেরা শুটার নই। আসলে বাস্তব অভিজ্ঞতা অন্য জিনিস। যে কোনো সময় সেটা হতে পারে। তখন কি পারব, কতটা পারব লড়াই করতে বলতে পারছি না। জানি না কেন আমার এ ধরনের অনুভূতি হচ্ছে। সার্জেন্ট বললেন, ভিয়েতকনরা এখন নাও আসতে পারে। কিন্তু একদিন তো তারা আসবে। তখন কি প্রস্তুত থাকব আমি?
দুই সপ্তাহ কেটে গেল। কয়েকবার টহলে বাইরে গেছি। বেশ পরিচিত হয়ে উঠেছি এলাকার সাথে। আমাদের স্কোয়াড লিডার খুব ঠাণ্ডা মানুষ। সবাই তাকে খুব পছন্দ করে। আমার সাথেও স্কোয়াডের সবার একটা সুন্দর সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। আমরা যখন টহলে বাইরে যাই সবাই পরস্পরের কাছাকাছি থাকি। প্রস্তুত থাকি একে অপরকে সাহায্য করার জন্য। নিজের জীবন নিয়ে আমার তেমন চিন্তা নেই, কিন্তু স্কোয়াডকে নিয়ে চিন্তা আছে। এর সাথেই এখন জড়িয়ে গেছে আমার জীবন। এর মাঝে গুলি বিনিময়ের অভিজ্ঞতা হয়েছে। মনে হয় খারাপ করিনি খুব একটা। ভিয়েতকনরা এখনো হামলা করেনি, তবে করবে নিশ্চয়ই। আমরাও তৈরি থাকব তাদের জন্য।
এখানে আসার পর তিন মাস হয়ে গেছে। এখন তিন দিনের আর আর (রেস্ট অ্যান্ড রিল্যাক্স) পাওনা হয়েছে আমার। বাবা ও মার কথা খুব মনে পড়ছে। তারাই তো আমার সবচেয়ে আপন। বিশেষ করে মা। মা তো কখনোই চায়নি আমি সেনাবাহিনীতে যোগ দেই আর ভিয়েতনামে আসি। খুব ইচ্ছে করছে বাড়ি যেতে আর তাদের একটু দেখতে। কিন্তু তত সময় নেই আমার। জানি না কী করছে মানুষ দু’জন। অবশ্য নিয়মিত ভাবে তাদের চিঠি পাই, সময় পেলে আমিও তাদের কাছে লিখি। বাবা-মা চিঠিতে আমাকে জানান- তারা ভালো আছেন। তাই যেন থাকেন তারা।
আমাদের স্কোয়াড বালির বস্তা দিয়ে অবস্থান আরো মজবুত করছে। সার্জেন্ট বললেন, উত্তরে বহু ভিয়েতকন সমবেত হওয়ার কথা জানা গেছে। আমার মনে হচ্ছে, খুব শিগগিরই তারা হামলা করবে। করুক। আশ্চর্য! একটুও নার্ভাস মনে হচ্ছে না নিজেকে। তারা যদি হামলা করে আর আবহাওয়া যদি ভালো থাকে তাহলে বিমান সমর্থন পাব আমরা। বিমান সমর্থন ছাড়া আমরা তাদের প্রতিরোধ করতে পারব কিনা জানি না। সার্জেন্টের অনুমান তারা আগামীকাল রাতের প্রথম ভাগে হামলা চালাবে। তাদের হামলার ধরন জানা। ভিয়েতকনরা হামলার আগে প্রথমে অগ্রবর্তী একটি দলকে পাঠায়- আমরা তাদের জ্যাপার বলি। ছোট একটি দল। তাদের কাজ হচ্ছে আমাদের শক্তি কি রকম তা একটু বাজিয়ে দেখা। আমাদের গোটা ঘাঁটিটাই শক্ত প্রতিরোধের জন্য প্রস্তুত।
সার্জেন্ট এলেন আমাদের পরিদর্শন করতে। প্রথমেই দেখলেন আমরা সাথে প্রচুর খাবার পানি রেখেছি কিনা। বললেন-
: জ্যাপাররা যদি আজ রাতে আসে তাহলে শান্ত থাকবে সবাই। কেউ দিশাহারা হয়ে পড়ে সবকিছু এবং যে কোনো কিছুর দিকে গুলি করবে না। আগে টার্গেট স্থির করবে, তারপর গুলি করবে। মনে রাখবে, এই ঘাঁটির তারের বেড়ার ওপাশে আমাদের একটি স্কোয়াড রয়েছে। তাই গুলি করার আগে দেখে নেবে কাকে এবং কিসে গুলি করছ। যুদ্ধ শুরু হলে তোমার ডানে ও বামে চোখ খোলা রাখবে। কেউ আহত হলে তাকে যতটা সম্ভব সাহায্য করবে। প্রত্যেকে প্রত্যেকের পেছনে নজর রাখবে, আর হ্যাঁ- জীবিত থাকবে।
সার্জেন্ট চলে গেলেন। এদিকে আমার মন কিছু কারণে ফিরে গেল অতীতে, মা-বাবার সাথে বাড়িতে থাকার সময়ে। পুরনো স্মৃতিগুলো মনে পড়তে লাগল। নাকে যেন মা’র রান্নার সুগন্ধ পেলাম। এ মুহূর্তে মায়ের হাতের ফ্রায়েড চিকেন খেতে খুব ইচ্ছে করল। কিন্তু তা কি করে সম্ভব?
সন্ধ্যার আবছা আঁধার পেরিয়ে রাত নামল। তারের বেড়া বরাবর ফক্সহোলগুলোতে অবস্থান নিয়ে আছি আমরা। রাতে অল্প সময়ই ঘুমাতে পারব। আমাদের ফক্সহোলটাতে আমরা দু’জন রয়েছি। সঙ্গীর নাম জ্যাকব। ফিলাডেলফিয়ার ছেলে। বেশ ভালো ছেলেটি। কথা কম বলে। আমার সাথে মিলেছে ভালো।
কম্পাউন্ডের অপর দিক থেকে গুলির আওয়াজ আসছে। আমার হাত ঘামতে শুরু করেছে, কাঁপছে একটু একটু। গুলি চালাতে পারব তো?
এ সময় এলেন সার্জেন্ট-
: জ্যাপাররা তারের বেড়ার ওপাশে। সতর্ক থেক। তারা আমাদের শক্তি যাচাইয়ের চেষ্টা করবে। মনে রেখ, আগে তোমার টার্গেট স্থির করবে। ভয় পাবে না, অস্থির হবে না।
তার কথা শেষ হতেই দু’জন ভিয়েতকন তারের বেড়ায় একটি গর্ত করার চেষ্টা করল। আমি তাদের গুলি করার আগেই গর্জে উঠল আমাদের ৫০ ক্যালিবারের মেশিনগান। আমাদের আর গুলি ছুঁড়তে হলো না। একটু স্বস্তি। আমি এর আগে টহলে গিয়েছি, কিন্তু এ রকম পরিস্থিতি দেখা দেয়নি। সবচেয়ে কঠিন হলো চুপ করে বসে থাকা আর অপেক্ষা করা। এর ফলে স্নায়ুর ওপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি হয়। কিন্তু আমার মনে হচ্ছে, এর চেয়েও কঠিন অবস্থা আসতে যাচ্ছে।
পরদিন আমাদের প্রতিরক্ষা নিñিদ্র করার জন্য যা করা সম্ভব তাই করা হলো। আমরা বুঝতে পারছিলাম আজ রাতেই আমাদের ওপর হামলা হতে যাচ্ছে। সার্জেন্টকে দেখা গেল। বললেন-
: তোমরা বাড়িতে চিঠি লিখতে চাইলে একজন একজন করে রুমে যেতে পার। এখন থেকে শুরু কর। তাহলে আজকের কপ্টারেই চিঠি চলে যাবে।
তার এ কথা আমাকে নার্ভাস করে দিল। ইচ্ছে হলে আমরাই তো চিঠি লিখব। কিন্তু তিনি চিঠি লেখার তাগাদা দিচ্ছেন কেন? তবে কি এমন কিছু ঘটতে চলেছে যা তিনি জানেন কিন্তু আমরা জানি না?

৮.
অন্য দিনের চেয়ে আজকের রাতটা যেন বেশ দ্রুত নামল। রাত যত ঘন হতে লাগল ততই বাড়তে থাকল আমার হাতের কাঁপুনি। হৃদস্পন্দন দ্রুততর হলো। আমাদের ফক্সহোলে আমি, আর ডান দিকে জ্যাকব। আমরা আমাদের সামনে আরো বালির বস্তা স্তূপীকৃত করলাম, প্রস্তুত অস্ত্র হাতে। তাদের আসার অপেক্ষা করছি। সময় বয়ে চলেছে। অপেক্ষাটা অসহ্য হয়ে উঠছে ক্রমেই। শেষ পর্যন্ত কথা শুরু করলাম জ্যাকবের সাথে। দু’জনে দু’জনার বাড়ির কথা বলছি। আমরা দু’জনেই এসেছি ভিন্ন ভিন্ন জায়গা, পরিবেশ থেকে। কিন্তু আমাদের মধ্যে অনেক কিছুতেই মিল।
চারদিকে স্তব্ধতা। এক অলৌকিক অনুভূতি বেড়ে উঠছে আমার মধ্যে। অন্য সময় যা ভাবা যায় না এখন তা ভাবতে ইচ্ছে করছে। ঠিক সে মুহূর্তে কান ফাটানো আওয়াজে চুরমার হয়ে গেল সব নিস্তব্ধতা। আমাদের চারপাশে অসংখ্য মর্টারের গোলা এসে পড়ছে। এক পলকের জন্য বালির বস্তার উপর মাথাটা তুলে সামনে তাকালাম। কি দেখলাম? অবিশ্বাস্য দৃশ্য। সব জায়গায় তারা- ভিয়েতকনরা। হাজার হাজার।
গুলি শুরু করলাম। পর মুহূর্তে গর্জে উঠল আমাদের মর্টারগুলো। কিন্তু কোনো লাভ হচ্ছে না। তারা আসছেই। আমরা কত গুলি ছুঁড়লাম, মর্টারের কত রাউন্ড গোলা নিক্ষেপ করা হলো, সে হিসেব অনাবশ্যক। তারা আসতেই থাকল সাগরের ঢেউয়ের মতো। আমাদের অবস্থান থেকে তারের বেড়ার ঘেরাও পঞ্চাশ গজ দূরে। তারা তারের বেড়া কেটে ঢুকতে থাকল। আমরা তাদের থামাতে পারলাম না। তবে কি ওরা আমাদের নিশ্চিহ্ন করে দেবে? তাকিয়ে দেখলাম, একটি হেলিকপ্টার এসেছে, বৃষ্টির মত গুলি ছুঁড়ছে তাদের ওপর। যাক, তাহলে বিমান সমর্থন এসেছে। আশা করি, আরো বিমান আসবে। পরিস্থিতি আমাদের অনুকূলে আসবে। বাইরে থেকে দৃষ্টি ফিরিয়ে জ্যাকবের দিকে চাইলাম। বুকটা ছ্যাঁৎ করে উঠল। মারা গেছে জ্যাকব। গুলিতে ফুটো হয়ে গেছে মাথা। ফক্সহোলে আমি একা।
আমার গুলি ফুরিয়ে আসছে। তাড়াতাড়ি জ্যাকবের রাইফেলটা নিলাম। তাকাতেই দেখি, এক ভিয়েতকন রাইফেল তুলেছে আমার দিকে। এই কি আমার মৃত্যুদূত? গুলি করছে সে। একটা প্রচণ্ড বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেল। এরপর আমার প্রথম উপলব্ধি হলো, আমার শরীর অবশ হয়ে গেছে। খুব শীত করছে। অনেক কষ্টে পেটের দিকে তাকালাম। ইউনিফর্ম ভেদ করে রক্তের ধারা ছুটেছে। শরীর ক্রমেই দুর্বল হয়ে আসছে। আঁধার ও নীরবতা গ্রাস করছে আমাকে।
তাহলে আমার চিরকালের চেনা ছোট শহরটায় আর ফেরা হলো না। শহরটাকে কোনোদিন ভালোবাসতে পারিনি ঠিকই, কিন্তু ওটাই ছিল আমার জন্ম শহর। অলি-গলি, পথ-ঘাট সবই আমার হাতের তালুর মতই চেনা। আর কোনেদিন সেখানকার কারো সাথে আমার দেখা হবে না।
মায়ের মুখটা ভেসে উঠল মনে। মা যা চায়নি তাই করেছি আমি। কিন্তু কি লাভ হলো তাতে? আমার মৃত্যুর খবর পেলে কি অবস্থা হবে মায়ের? আর বাবা! সহ্য করতে পারবেন তো তিনি?
শেষ মুহূর্তে আমার হৃদয়ের গভীর থেকে উচ্চারিত হলো কয়েকটি শব্দ- তোমাকে ভালোবাসি মা। খুউব ভালোবাসি। কিন্তু কেউই শুনতে পেল না তা।
* ডন রাইট ১৯৫৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের ডালাসে জন্মগ্রহণ করেন। ইন্টারনেটে ছোটদের জন্য লেখেন। ভিয়েতনাম যুদ্ধে যোগ দেয়া বাবা-মার একমাত্র সন্তান এক তরুণ সৈনিকের জীবনের কথকতামূলক তার এ ছোট্ট উপন্যাসটির ইংরেজি নাম ‘স্ট্রেইট ফ্রম দ্য হার্ট।’ [সমাপ্ত]

SHARE

Leave a Reply