Home নিবন্ধ ছড়া কবিতায় শীত -সাকী মাহবুব

ছড়া কবিতায় শীত -সাকী মাহবুব

‘মাঘের শীতে বাঘ কাঁদে’ আমাদের দেশের এক প্রাচীন প্রবচন। অমন যে দুর্ধর্ষ প্রাণী বাঘ, তারও নিস্তার নেই এই ঋতুর হিমশীতল আলিঙ্গন থেকে। এ অবশ্যই এক নিদারুণ বাস্তবতা। আসলেই শীত ভীষণ অন্তর্মুখী এক ঋতু। যে ঋতু অন্য ঋতুদের মতো প্রকৃতির অবয়বে কোনো রঙের প্রলেপ বুলিয়ে দেয় না। যেন শীত নিজেই নিজের ভেতর সারাদিনভর করে স্কেটিং। আঁকে ছবি আবছা বিরতিহীন। সাদা ধবধবে তুষার আচ্ছন্ন হিলস্টেশনে থেমে থাকা এক পশলা শীতের ডাউনট্রেনের শার্সিকাচের ওপাশে ছায়াচ্ছন্ন কারো প্রিয়মুখের নম্র রেখায় চন্দ্রমল্লিকার অনন্ত শীতেরই সুবাস আছে ফুটে। আর গহিন অরণ্যের বুক চিরে বয়ে যাওয়া খরস্রোতা কনকনে ইটের সোলিং জাগা পথের শেষ মাথায় আছে দাঁড়িয়ে এক মেঘ শিরিষের চূড়া-পরে ধু-ধু মেঘলা কানটুপি। বাংলার শীতের যেমন রয়েছে এক আবহমান চিরায়ত ঋতু বৈভব। তেমনি রয়েছে শীতের নীল ধূসর এক গভীর অভিব্যক্তিও। বর্ণিল ঋতু হেমন্ত আর ঋতুরাজ বসন্তের বুকপকেটে শীত ঝাঁপিয়ে পড়ে দুরন্ত খরগোশের খাড়া কর্ণকুহরের ভেতর কনকনে হিমঠান্ডা রৌদ্রকণার মতো। কাঁপিয়ে দিয়ে যায় যেন হেমন্ত আর বসন্তের শীতাচ্ছন্ন বাড়ির রেলিং, ব্যালকনি। শীত এসে ডুবিয়ে দেয় কবিতার শব্দ পঙ্ক্তিতে ঝরে পড়া পাখিদের ডানা। ধুধু বিল, লেক, বনবাদাড়, পড়ন্ত এরোড্রোম। কবিতার মনোগ্রামগুলো তখন উড়তে থাকে ঠান্ডা ভোরের পশমি মাফলারের মতো। সমগ্র বাংলায় যেমন পৌষ-মাঘে জেঁকে বসে শীত। তেমনি ছড়া কবিতার ফুলকায়ও জাগে কবির হৃদয়ের কাব্য স্পন্দন।
বাংলাসাহিত্যের নোবেলবিজয়ী কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ঋতুবিষয়ক কবিতার কমতি নেই তার কাব্যে। সব ঋতু নিয়েই সর্বত্রই তাঁর সরব উপস্থিতি। তবে শীত ঋতুবিষয়ক ছড়া কবিতা প্রাধান্য পেয়েছে তার লেখনীতে এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। শীত নিয়ে তিনি লিখেছেন-
‘অঘ্রাণ হলো সারা
স্বচ্ছ নদীর ধারা
বহি চলে কল সঙ্গীতে।
কম্পিত ডালে
মর্মর তালে তালে
শিরীষের পাতা ঝরে শীতে।’
(শীত/রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)
সুপ্রিয় পাঠক, রবীন্দ্র বলয় থেকে বেরিয়ে এবার কাজী নজরুল ইসলামের কবিতার পাঠ উদ্ধার করতে গিয়ে দেখবো কবি তাঁর দৃষ্টিতে কিভাবে শীতকে দেখেছেন:
‘ঘর -দুয়ার আজ বাউল যেন
শীতের উদার মাঠের মতো,
ঝরছে গাছে সবুজ পাতা
আমার মনের বনের যত।’
(উন্মুনা/কাজী নজরুল ইসলাম)
সৌন্দর্য পিয়াসু কবি ফররুখ আহমদ তাঁর ঝানু হাতে শীত ঋতুর বর্ণনা দিয়েছেন অত্যন্ত চমৎকার ভাষায়। তাঁর সুদৃঢ় উচ্চারণ-
‘উত্তরী বায়ু এলোমেলো
পউষ এল! পউষ এল!
হিমেল হাওয়ায় শিরশিরিয়ে
এল অচিন সড়ক দিয়ে—
মাঠ, ঘাট, বন ঝিরিয়ে গেল,
পউষ এল! পউষ এল!’
(পউষ এল/ফররুখ আহমদ)
আধুনিক বাংলা কবিতায় প্রকৃতি শীতের চিত্র অঙ্কন করেছেন পল্লীকবি জসীমউদ্দীন। তাঁর বিখ্যাত ‘রাখাল ছেলে’ কবিতায়। কবি লিখেছেন-
‘ঘুম হতে আজ জেগেই দেখি শিশির-ঝরা ঘাসে,
সারা রাতের স্বপ্ন আমার মিঠেল রোদে হাসে।
আমার সাথে করতে খেলা প্রভাত হাওয়া ভাই,
সরষে ফুলের পাপড়ি নাড়ি ডাকছে মোরে তাই।’
(রাখাল ছেলে/জসীমউদ্দীন)
পৌষ মাস মানেই গ্রামবাংলা খড়ের ওপর পাটি, মাদুর, হোগলা বিছিয়ে সকালের মিঠে রোদ পোহানো আর পিঠেপুলি ভোজের দৃশ্য। কবি বেগম সুফিয়া কামাল তাঁর কবিতায় গ্রাম বাংলার সেই রূপটিই চিত্রায়িত করেছেন এভাবে-
‘পৌষ পার্বণে পিঠা খেতে বসি খুশিতে ভিষম খেয়ে
আরো উল্লাস বাড়িয়াছে মনে মায়ের বকুনি পেয়ে।’
(পল্লীমায়ের কোল/সুফিয়া কামাল)
শীতের দাপট থেকে বাঁচার জন্য চুলোর আগুনে তাপ পোহাবার জন্য কবি আসাদ চৌধুরীর ব্যস্ততা দেখবার মতো। তিনি লিখেছেন-
‘চিরল চিরল তেঁতুল পাতা
বাতাস পাইলে কাঁপে
সাপের মতোন লক লকাইয়া
চুলার আগুন তাপে
(আমার) শীতে কাঁপে দেহ।’
(সন্দেহ/আসাদ চৌধুরী)
শীত যেমন আনন্দের ঋতু তেমনি কষ্টেরও। গরিব লোকেরা গরম কাপড় কিনতে পারে না বলে শীতের সকালে তাদের দুঃখ-কষ্টের সীমা থাকে না। আবার এমনও অনেক লোক আছে যাদের ঘরবাড়ি নেই, শহরে ফুট ফরমাশ খাটে আর রাতে ঘুমায় ফুটপাথে। তাদের জন্যে শীত এক অভিশাপ। শামসুর রাহমান তাই লিখেছেন-
‘শীত সকালে লোকটা কাঁপে
কাঁদে সবার পা ধরে।
একটা শুধু ছিল জামা
তাও ছিঁড়েছে ভাদরে।
হি-হি শীতে থাকে পড়ে
ডাকে না কেউ আদরে।
কবি শাহাবুদ্দীন নাগরীর ছড়ায় শীত চিত্রিত হয়েছে এভাবে-
‘হিসেব ছিল ভুলটায়
তাই উঠেছি পুলটায়
খোলা আকাশ হঠাৎ দেখি
শীতের হাঁড়ি উল্টায়।
পাই না আমি কারো আদর
কে দেবে আজ একটি চাদর?
কাঁপছি পথে থরথরিয়ে
প্রাণ যাচ্ছে বেরিয়ে
সামনে দেখি অনন্ত পথ
কিভাবে যাই পেরিয়ে?
হঠাৎ দেখি সূর্য মামা
পরিয়ে দিল গরম জামা।
(গরম জামা/শাহাবুদ্দীন নাগরী)
কবি মোশাররফ হোসেন খান শীতকে দারুণভাবে তুলে ধরেছেন তার কবিতায়। তার উচ্চারণ-
‘ভোরগুলো শিরশির কেঁপে ওঠে বুক
এক ফোঁটা রোদ যেন শিশুদের মুখ।
চারদিকে মেলে আছে কুয়াশার ছাতা
টুপটাপ ঝরে পড়ে সরিষার পাতা।
ভোরগুলো শিরশির জিউলের মেয়ে
ঘাই মেরে উড়ে যায় প্যারাসুট বেয়ে।
কুয়াশা কহর ফুঁড়ে জেলেদের নাও
ছুটে যায় ঢেউ-নদ ঝিনুকের গাঁও।’
(শীতের ভোর/মোশাররফ হোসেন খান)
ছড়াকার সাজজাদ হোসাইন খান শীত নিয়ে লিখেছেন এক মন-মুগ্ধকর ছড়া-
‘গন্ধরাজেরর মাথা
ঘাসফড়িঙের ছাতা
হাওয়ায় দোলে
শীতে
গন্ধ মাখা চিতে।
শীতের পাখায় চড়ে
মাঠে তেপান্তরে
খুশির পাখি
ফুল
খুশবুরা তুলতুল।
শীত এলো ঐ শীত
আনন্দ নিশ্চিত।’
(শীত/সাজজাদ হোসাইন খান)

কবি জাকির আবু জাফরের ছড়ায় শীতের যে চিত্র আমাদের বিমোহিত করে তাহলো-
‘শীত নেমেছে বাংলাদেশের
সবুজ ভরা গায়ে
শীত নেমেছে ঘাসের বুকে
শিশির ধোয়া পায়ে।
শীত নেমেছে বৃক্ষ বুকে
শীত নেমেছে ফুলে
রোদের বুকে উষ্ণতা যেন্
কেউ নিয়েছে তুলে।’
(শীত নেমেছে বাংলাদেশে/জাকির আবু জাফর)
আলম তালুকদার শীতে মুগ্ধ হয়ে রচনা করেছেন এক জাদুময়ী ছড়া। তিনি লিখেছেন-
‘শীতে থাকে জড়তা আর থাকে থির
ঠান্ডা বাতাসে কাঁপে কোটি শির
পুরো দেশ করে দেয় বরফের ক্ষীর
কম্বলে ঢুকে যায় বাঘা বাঘা বীর।
খানা দানি জমে যায়, জমে যায় শ্বাস
বরফের দখলে তাজা ইতিহাস
গরমের অভাবে গরিবেরা লাশ
এই সব শীতভীতি আর কত মাস?
(শীত বাবা/আলম তালুকদার)
কুয়াশা জড়ানো ভোর, পাতাঝরা দিন, কাকডাকা ভোরে, খেজুর গাছ থেকে গাছির রস আহরণ, শর্ষে ফুলের হলুদ বিছানা, অতিথি পাখির আনাগোনা কিংবা শাপলার পাপড়িতে শিশিরের কণা এতো ঋতুরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। স্বভাবতই শীতের এই মুগ্ধতা বারবার কবির কলমে নিত্য নতুন পঙক্তিমালায় উঠে আসবে এটাই স্বাভাবিক। তাই শীত নিয়ে রচিত সব পঙক্তিমালা বাংলা ছড়া সাহিত্যে হীরক খন্ডের দ্যুতি নিয়ে বেঁচে থাকবে হাজার বছর, এ প্রত্যাশা সকলের।

SHARE

Leave a Reply