Home গল্প ফুল মেয়ে জরি -আহসান হাবিব বুলবুল

ফুল মেয়ে জরি -আহসান হাবিব বুলবুল

জরি একগুচ্ছ গোলাপ নিয়ে গাড়ির ফাঁকে পা চালায়। জানালার কাচ খোলা পেলেই হাত বাড়ায়।
“স্যার একটা ফুল ন্যান।” জরি কোন দাম হাঁকে না। সাহেবরা খুশি হয়ে যা দেয় তাই নেয়। যানজটের সময় গাড়ি-ঘোড়ার সমুদ্রে এভাবে ঢুকে পড়লে যেকোন সময় বিপদ হতে পারে; সেদিকে ওর কোনো খেয়াল নেই।
মগবাজার চৌরাস্তার মোড়ে প্রায়ই যানজট হয়। জরি বেশির ভাগ সময় এখানেই ফুল বেচে। ও একা নয়। ওর সমবয়সী আরো কয়েকটি মেয়ে ফুল বেচে। ছবি, নাসিমা, শেফালিকেও চেনে। ওরা আসে কাওরান বাজার বস্তি থেকে। জরিরা থাকে মালিবাগ বস্তিতে। রোজ সকালে ওদের মা-বাবা কাজে বেরিয়ে গেলে ওরাও বেরিয়ে পড়ে। চলে যায় শাহবাগে। এখানে অনেকগুলো ফুলের দোকান আছে। এসব দোকানে ওরা ফুট-ফরমায়েস খাটে। ফুল ছাড়ানো, পানি ছিটানো- এমনি ছোটখাটো কাজ করে দেয়। বিনিময়ে পায় ফুল। সঙ্গে ওরা কিছু ভালো ফুলও অল্প দামে কিনে নেয়। তারপর ছোটে বিক্রির জন্য। মগবাজার, ইস্কাটন ছাড়িয়ে ওরা কখনো কখনো কাওরান বাজার পর্যন্ত যায়। শাহবাগ, রমনা পার্ক, পাবলিক লাইব্রেরি, বিশ্ববিদ্যালয় অঞ্চল ওদের ফুল বিক্রির জায়গা। বেইলী রোড ধরে শান্তিনগর, মালিবাগেও ওদের যাতায়াত চলে।
জরির বয়স বারো। পরনে খাটো সালোয়ার কামিজ। কী যে তার রঙ ছিল বোঝার উপায় নেই। ময়লা লেগে লেগে নষ্ট হয়ে গেছে। মাথায় কোঁকড়া চুল ঘাড় ছাপিয়ে গেছে। তেলের অভাবে চুল কটা। তারপরও ওর ভাসা ভাসা দু’চোখ একটা মায়া ছড়িয়ে থাকে। কেউ একবার দৃষ্টি তুলে তাকালে ফুল না নিয়ে পারে না।
হেমন্তের শেষেও ঢাকা শহরে তেমন একটা শীত পড়ে না। মেঘমুক্ত আকাশ। ফুরফুরে বাতাস। জরির কেমন যেন একটু শীত শীত করে। রাতে সম্ভবত এক পশলা বৃষ্টি হয়েছে। জরির বেশ ভালো লাগে। বেলি ফুলের গন্ধ ওর মন ভরিয়ে দেয়। ও একবার নীল আকাশ দেখার চেষ্টা করে। বিশাল অট্টালিকাগুলো বাদ সাধে।
একটুখানি সবুজের জন্য ও আশপাশে তাকায়।
আইল্যান্ডের ইপিল-ইপিল গাছ আর দূরে ইতস্তত দু’-একটা নারিকেল গাছের সবুজ পাতা ওকে হাতছানি দেয়। জরির গ্রামের কথা মনে পড়ে। এক নিমিষেই করতোয়ার পাড় দিয়ে ঘুরে আসে। হলদেপুর গ্রামের সোনাঝরা বিকেলগুলোর কথা ও ভুলতে পারে না। ছি-বুড়ি, গোল্লাছুটের দুরন্ত দৌড়গুলো ওর চোখের সামনে ছোটাছুটি করে। ট্রাফিকের বাঁশির কড়া শব্দে জরি সম্বিত ফিরে পায়। জরির মুখে কথার ফুলঝুরি ফোটে।
“একটা বেলি ফুলের মালা ন্যান স্যার। তাজা ফুল। সুনদোর ঘেরান।”
সুবারু গাড়ির স্বচ্ছ কাচের ফাঁকে এক বালক হাত বাড়ায়। জরি একগুচ্ছ বেলি ফুলের মালা তুলে দেয়।
: কত দিতে হবে।
: আপনার যা ইচ্ছা হয় দ্যান।
: আমার কাছে তো খুচরো টাকা নেই; তাহলে তুমি এটা নাও। সুজন ওর গেম সেটটা এগিয়ে দেয়।
: হায় আল্লাহ! এটা নিয়া আমি কি করমু। থাক কিছু দিতে হইব না। ফুল আমি এমনি দিলাম।
: এ্যাই শোন! তুমি আমাকে আপনি করে বলছো কেন। আমি তো তোমার ছোট হবো।
: হ টিকই। তাইলে ছোট ভাইয়া…। জরির ঠোঁটে একটা হাসির রেখা ফুটে ওঠে। সিগন্যাল বাতির দিকে তাকিয়ে ও দ্রুত পা বাড়ায় অন্য গাড়ির দিকে।
দুপুরে ঘরে ফিরে জরির কাজে মন বসে না। ওর শুধু সুজনের কথা মনে পড়ে।
সুজনের মতো ওর একটা ছোট ভাই ছিল। সেবার ভীষণ বন্যা। সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে গেল। জরিরা গিয়ে উঠল বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে। কিছুদিন পর বন্যার পানি নেমে গেল ঠিকই। কিন্তু দুর্ভোগ আরো বাড়ল। খাবার পানি নেই, খাবার নেই, কাজ নেই, চারদিকে হাহাকার। অখাদ্য খেয়ে দেখা দিল ডায়রিয়া। সেই কালরোগে ওর পুতুলের মত ছোট ভাইটি সবাইকে ছেড়ে চলে গেল। তারপর ওরা দুঃখ নদী সাঁতরিয়ে ভেসে ভেসে পাড়ি জমালো ঢাকা শহরে। এসব ভাবতে ভাবতে জরির দু’চোখের কোণ ভিজে ওঠে।
মায়ের পায়ের আওয়াজ শোনা যায়। জরি ওড়নার আঁচল দিয়ে চোখ মোছে।
: মা’জানের মনটা আইজ ভার মনে হইতেছে। কেউ গালমন্দ করছে!
: কই নাঃ। জান মা আইজ বড় লোকের এক ছেলে আমার কাছ থাইক্যা ফুল নিছে। ভাঙতি টাকা নাই জন্যি আমারে যন্ত্রের মত একটা জিনিস দিতে নিছিল। আমি নেই নাই। ফুল এমনি দিয়া দিছি।
: খুব ভালো করছো মা। ছোট মানুষ খুব খুশি হইচে তাইনারে!
: হ… মা। আচ্ছা মা ওই জিনিসটা কি?
: বড়লোকের শখের কত কি থাকে। হয় কোনো খেলনা-টেলনা হইব।
: মা ওই ছেলেটা না আমাগো মানিকের মতো দ্যাখতে।
– জরির মা একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছেড়ে মেয়েকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরেন।
জরি ভাবে, আগামীকাল কি আবার ছোট ভাইয়ার সঙ্গে দেখা হবে। ওদের বাসা কোথায়? কোন স্কুলে পড়ে? সুজনদের বাসা শেরেবাংলা নগরে মনিপুরী পাড়ায়। বাবা শিল্পপতি। সুজন গাড়িতে এ পথেই স্কুলে যাতায়াত করে।
সেদিন ফুলের দাম দিতে না পেরে সুজন নিজের ভেতর একটা তাগিদ অনুভব করে। ও ক’দিন হলো মগবাজার মোড়ে এলেই খেয়াল করে সেই মেয়েটিকে দেখা যায় কি না। কিন্তু না। ট্রাফিক সিগন্যাল না পড়ায় গাড়ি দ্রুত চলে যায়। আবার কোনদিন সিগন্যাল পড়লেও ভিড়ে মেয়েটির দেখা পাওয়া ভার হয়ে ওঠে।
জরির মনও আনচান করছে, ছেলেটির দেখা পেতে। জরি ভাবে প্রতিদিনই ও এ পথে আসতে যাবে কেন? শুধু শুধুই খুঁজছি। সিগন্যালে লাল বাতি জ্বলে ওঠে। জরি একমুঠো রজনীগন্ধার ডাটা নিয়ে ঢুকে পড়ে যানবাহনের ভিড়ে। মৃদু স্বরে হাঁকে,
‘স্যার ফুল ন্যান। একটা রজনীগন্ধার ডাটা।’ দূর থেকে একটা অস্পষ্ট কণ্ঠ ভেসে আসে- “এ্যাই ফুল এ্যাই মেয়ে….
জরি দৃষ্টি মেলে। এদিক ওদিক তাকায়। হ্যাঁ ওই তো সেই ছেলেটি। ও দ্রুত ছুটে যায়। হয়ত এক্ষুনি সবুজ বাতি জ্বলে উঠবে, জরি একগুচ্ছ রজনীগন্ধা সুজনের হাতে তুলে দেয়।
: কেমন আছো ভাইয়া
: ভালো। তুমি ভালো।
: হ।
– সুজন দশ টাকার একটা কড়কড়ে নোট জরির দিকে এগিয়ে দেয়।
: টাকা দিতে হইব না। তুমি এমনি নাও।
: তা হয় না। আম্মু তোমাকে টাকা দিতে বলেছেন।
: তুমি খুব ভালো ছোট ভাইয়া।
আবার একটার পর একটা গাড়ি চলতে থাকে। জীবন থেমে নেই। ছুটছে তো ছুটছেই। জরি আইল্যান্ডে এসে দাঁড়ায়। আগের মত গাড়ির কালো ধোঁয়ায় দম আটকানো অবস্থা আর নেই। চোখও ঝাঁজ করে না। সরকার টু-স্ট্রোক থ্রি হুইলার চলাচল বন্ধ করে দিয়েছে। রাস্তায় নেমেছে সিএনজি চালিত গাড়ি। এতে ঢাকা শহরের পরিবেশের অনেকটা উন্নতি হয়েছে। জরি অবশ্য এ সবের কোন খবর রাখে না। এভাবেই মাঝে মধ্যে জরির সঙ্গে সুজনের দেখা হয়ে যায়। ফুল পেয়ে সুজন খুশি হয়। জরি কোনো দিন দাম নেয়, কোনো দিন নেয় না।
শীতটা ক্রমেই পড়তে শুরু করেছে, সন্ধ্যা নামার পরপরই মালিবাগ রেলগেটের বস্তিতে প্রাণের সঞ্চার হয়। এ সময় কাজ থেকে সবাই ঘরে ফেরে। কুয়াশায় ঢাকা বস্তির ওপর সোডিয়াম বাতির আলো এসে পড়ে। আলো আঁধারিতে বস্তির মানুষের জীবনের গল্প যেন জমে ওঠে। তারপর এক সময় চারদিকের কোলাহল থেমে যায়। একটা নিস্তব্ধতা নেমে আসে।
ঘুমের ঘোরে জরি অস্ফুট চিৎকার করে ওঠে। মা পাশ ফেরেন। জরিকে বুকে টেনে নেন। ‘আয়াতুল কুরসি’ পড়ে মেয়ের বুকে ফুঁ দেন। মা’র চোখে আর ঘুম আসে না। অনেক সাত-পাঁচ ভাবেন। মেয়েকে আর ফুল বেচতে পাঠাবেন না। আজকাল কত অঘটনই না ঘটছে। জরির বাপের শরীরটাও ভালো যাচ্ছে না। কী করবেন ভেবে পান না।
অনেকদিন হলো জরিকে দেখে না সুজন। ‘মেয়েটা গেল কোথায়? ফুল বিক্রি ছেড়ে দিল নাকি! ওর নামটাও জানা হলো না।’
-মগবাজার মোড়ে এলেই সুজন ভাবে। এদিক ওদিক উঁকি-ঝুঁকি দেয়। কিন্তু দেখা মেলে না। ও ড্রাইভার ভাইয়াকে জিজ্ঞেস করেও কোনো সদুত্তর পায় না।
আজ পড়ার টেবিলে বসে সুজনের মন বসছে না। একটা বইয়ের পাতা উল্টাতে গিয়ে পৃষ্ঠার ভাঁজে একটি গোলাপের পাপড়ি দেখতে পায়। শুকিয়ে বিবর্ণ হয়ে গেছে। সুজন পাপড়িটি হাতে নিয়ে দেখে। ঘ্রাণ নেয়। আম্মুকে রুমে আসতে দেখে জিজ্ঞেস করে, “আম্মু, আমি যে মেয়েটির কাছ থেকে ফুল নিতাম সেই মেয়েটিকে আর দেখি না, ওর কী হয়েছে।”
মা লক্ষ করেন, ছেলে বোকার মত প্রশ্ন করছে। একটু সময় নিয়ে বলেন, “কি আর হবে। ওদের জীবনের কোন মায়া আছে; যেভাবে গাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়! হয়ত কোন অসুখ-বিসুখ করেছে।”
সুজনের বুকের ভেতর ছ্যাঁৎ করে ওঠে। তাহলে কোন দু…র্ঘ..ট..না। না তা হবে কেন। অসুখই হয়েছে। সুজন তার মনকে এভাবেই সান্ত¡না দেয়।
বাবা-মায়ের পক্ষে জরিকে বেশি দিন হাসপাতালে রাখা সম্ভব হয়নি। মেয়েকে বাসায় নিয়ে এসেছেন। ডাক্তার বলেছেন, এক মাস পর পায়ের ব্যান্ডেজ কাটতে হবে। তবে জরি আর স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারবে না। জরি বস্তির জীর্ণ কুটিরে শুয়ে শুয়ে রাজ্যের সব ভাবনা ভাবে। বাবাকে জিজ্ঞেস করে, ‘বাজান’ আমার পা কি আর ভালো হইবো না। আমি কি আর হাঁটতে পারমু না। বাজান, থানায় গেছিলে? পুলিশে কি কইল। গাড়ির মালিক কি টাকা পয়সা দিবো?
জরির বাবা মেয়ের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন। মেয়েকে মিথ্যা সান্তনা দিতে তার মন চায় না। জরি ভাবে, ছোট ভাইয়া কি জানে? যদি জানতো, তাহলে গাড়ি চালিয়ে আমাকে দেখতে আসতো?
প্রতিদিনের মত আজো মগবাজার চৌরাস্তার মোড়ে বিশাল জ্যাম সৃষ্টি হয়েছে। জরি ক্র্যাচ ভর দিয়ে খট খট শব্দ তুলে গাড়ি-ঘোড়ার ভিড়ের মধ্যে ঢুকে পড়ে। শব্দের ঝংকার তোলে, “একটা ফুল ন্যান স্যার। একটা ফুল… শীতের ফুল। সহসা সুজনের দৃষ্টি কাড়ে জরি। সুজনের বিশ্বাস হতে চায় না। এই সেই মেয়ে। সুজন হাত নেড়ে চিৎকার করতে থাকে, এ্যাই মেয়ে, এ্যাই মেয়ে তোমার একি… ততক্ষণে গাড়ি ছেড়ে দেয়। গাড়ির গতি দ্রুত বাড়তে থাকে।

SHARE

Leave a Reply