Home তোমাদের গল্প আরাকান যুবক -রুবাইয়্যাত সামছ

আরাকান যুবক -রুবাইয়্যাত সামছ

আজ সকালেই একটি নৌকা করিম মিয়ার বাড়ির অদূরে, নদীর কূলে এসে ভিড়েছে। অথচ করিম মিয়া নিজেই জানেন না। বাজার থেকে ফেরার পথে অনেক মানুষের ভিড় দেখলেন তার বাড়ির সামনে। একটু হকচকিয়ে গিয়ে, দ্রুত ভিড় ঠেলে ঢুকলেন ব্যাপার কী জানার জন্য। শ্যাওলা ধরা নৌকায় তিনজন ব্যক্তি, চেহারা চেনার উপায় নেই। তাদের শরীরেও শ্যাওলা ধরেছে। মাছির মিছিলের সাথে উটকো দুর্গন্ধ। একজনও বেঁচে আছে বলে মনে হচ্ছে না। সবাই বলছে ওরা রোহিংগা। অদ্ভুতভাবে সবাই চেয়ে আছে, কিন্তু কেউ সাহস করে কাছেও যাচ্ছে না। দশ কি বারো হবে এমন বয়সের একটি ছেলেও আছে। ছেলেটি হঠাৎ পানি পানি বলে কুঁকিয়ে উঠল। এতটাই অস্পষ্ট বোঝাই যাচ্ছে না কি চাচ্ছে?
করিম মিয়ার অনেক খারাপ লাগতে লাগলো। মৃত দুইজনের জানাজার ব্যবস্থা করার কথা বলে ছেলেটিকে পাঁজাকোলা করে বাড়িতে আনলেন। সারা শরীরে এত বিশ্রী গন্ধ বলার উপায় নেই!
করিম মিয়া শুনেছেন প্রায়ই এমন লাশ ভেসে আসছে। লাশগুলো নাকি রোহিঙ্গাদের। মিয়ানমার সরকার তাদের মেরে ফেলছে। ভয়ে যারা পালিয়ে বাংলাদেশে আসতে চাচ্ছে, তারাও আসতে পারছে না। সীমান্তের তারকাঁটা তো উন্মুক্ত না? যে চাইবে সেই ঢুকতে পারবে। সে আলাদা করে দেয় তুমি বাংলাদেশি, তুমি রোহিংগা, তুমি পাকিস্তানি, তুমি ভারতী। পরিচয়ও আজ কাঁটাতারে আবদ্ধ।
করিম মিয়ার কোনো ছেলেমেয়ে নেই। অনেক করে আল্লাহর কাছে চেয়েছেন কিন্তু এখনো ভাগ্য খুলেনি। তারা স্বামী-স্ত্রী এক প্রকার আশা ছেড়েই দিয়েছেন। মূসা আ: ও খিজিরের ঘটনার উদাহরণ টেনে করিম মিয়া তার স্ত্রীকে প্রায়ই সান্ত¡না দেন। হয়রত খিযির একটি বালককে হত্যা করেছিলো তার ব্যাখ্যা হলো বালকটির মা-বাবা মুমিন কিন্তু ছেলেটি বড় হয়ে জালিম হবে, আল্লাহ তাদের এই সন্তানটির পরিবর্তে আরেকটি নেককার সন্তান দান করবেন, সে জন্য হযরত খিযির আল্লাহর নির্দেশে ছেলেটিকে হত্যা করেন। করিম মিয়া তার স্ত্রীর হতাশায় প্রায়ই এই ঘটনা বলেন। হয়ত আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের কোনো খারাপ সন্তান দিতে চান না, খারাপের থেকে নিঃসন্তানই উত্তম। স্বভাবতই অযাচিত আরাকান যুবকের এই পরিবারে ভালোবাসার কমতি ছিলো না। মাত্র কয়েক দিনের মধ্যেই ছেলেটি অনেক খানি সুস্থ হয়ে উঠেছে। আগের শ্যাওলা ধরা চেহারা এখন আর নেই। মায়াবী, ডাগর চোখের ছেলেটিকে করিম মিয়ার স্ত্রীর ছেলে হিসেবে পালতে কোনো সমস্যা নেই। অনেকটা ধারণা করেই নিয়েছেন, আল্লাহ তায়ালা খুশি হয়ে তাদের এই সন্তানটি দান করেছেন।
আরাকান যুবকটির আমাদের মতোই নাম আব্দুল্লাহ। তার নতুন ঠিকানার মানুষ দু’টির ভালোবাসা তাকে প্রতিনিয়ত তার আরাকানের ছোট পরিপাটি সংসারে ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তার একটি সুন্দর পরিবার ছিলো, বাবা-মা, বড় বোন সব মিলিয়ে সুখী পরিবার। বাবা ছিলেন ইঞ্জিনিয়ার, বড় বোন ভার্সিটির ছাত্রী কিন্তু আজ কিছু নেই। সে দিনটির কথা তার চোখে ভেসে উঠছে বারবার। কী নির্মমভাবে তারা তার বাবাকে হত্যা করেছিলো। বাবাকে বাঁচাতে আসায় মাকে গুলি করে হত্যা করে। আর বড় বোনকে তারা পশুর মতো হামলে ছিঁড়ে খেয়েছে।
কী ছিলো তাদের অপরাধ?
তারা মুসলমান তাই?
মুসলমানদের কি বেঁচে থাকার অধিকার নেই? আব্দুল্লাহ আর ভাবতে পারে না কান্নায় ভেঙে পড়ে, ডুকরে-ডুকরে, অনেক শব্দে, যে কান্নায় বেরিয়ে আসছে হৃদয় পোড়া বাষ্পীভূত হাহাকার। এখন তার আশ্রয় করিম মিয়ার শক্ত বাহু আর তার স্ত্রী কোহিনূর বানুর হৃদয় আগলানো ভালোবাসায়। আর চোখে নিজ দেশে ফিরে যাওয়ার প্রবল বাসনা। আবার কবে ফিরে পাবো আরাকান, চিরচেনা শহর, গ্রাম…।

SHARE

Leave a Reply