Home প্রচ্ছদ রচনা বিজয় আমার এই পতাকা -জয়নুল আবেদীন আজাদ

বিজয় আমার এই পতাকা -জয়নুল আবেদীন আজাদ

প্রকৃতি থেকেও অনেক কিছু শেখার আছে আমাদের। প্রকৃতি শান্ত থাকে, আবার কখনো হয় চঞ্চল। প্রকৃতিতে আছে নানা প্রহর, সব একরকম নয়। যেমন ভোর। ভোরবেলার ঠান্ডা বাতাস সবার প্রিয়। ভোরের আকাশ কতোই না সুন্দর! লাল সূর্যটা যখন আকাশে উদিত হয়, তখন পাখিরা আর নীড়ে থাকে না। উড়ে এসে গান গেয়ে স্বাগত জানায় ভোরের হাসিখুশি সূর্যটাকে। শুধু কি পাখি, ফুলও সৌরভ ছড়িয়ে অভিবাদন জানায় সূর্যকে। প্রকৃতিতে তখন যেন আনন্দমেলা। তবে সবাই এই আনন্দমেলার বন্ধু হতে পারে না। তোমরাই বলো, যারা ঘুমিয়ে থাকে তারা এই আনন্দমেলার বন্ধু হবে কেমন করে? আসলে প্রকৃতি ও মানুষের বন্ধু হলে জাগতে হয়, হতে হয় প্রাণচঞ্চল। এই কথাটাই আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম চমৎকারভাবে বলে গেছেন-
“আমি হব সকালবেলার পাখি।
সবার আগে কুসুম-বাগে উঠ্ব আমি ডাকি।
সূয্যি মামা জাগার আগে উঠ্ব আমি জেগে।
“হয়নি সকাল ঘুমো এখন”-মা বলবেন রেগে!
বল্ব আমি, “আলসে মেয়ে! ঘুমিয়ে তুমি থাক,
হয়নি সকাল- তাই বলে কি সকাল হবে না ক’!
আমরা যদি না জাগি মা কেমনে সকাল হবে?
তোমার ছেলে উঠলে গো মা রাত পোহাবে তবে!”
সুন্দর কিছু দেখতে হলে, ভালো কিছু করতে হলে জাগতে হয়। ঘুমিয়ে থেকে কিছু করা যায় না। আর অলসরা সব কাজে পড়ে থাকে পেছনে। তাই তো আমাদের জাতীয় কবি অলসদের ঘুম ভাঙাতে জাগরণের গান গেয়েছেন, কবিতা লিখেছেন। আমাদের দেশের মানুষ জাগতে ভালোবাসে। তারা জেগেছিলো বলেইতো আমরা স্বাধীনতাযুদ্ধ করতে পেরেছি। দীর্ঘ লড়াইয়ের পর আমরা অর্জন করেছি স্বাধীন দেশ। বিজয়ের লাল-সবুজ পতাকা এখন আমাদের হাতে।
বন্ধুরা, প্রতি বছর ১৬ ডিসেম্বর আমরা পালন করে থাকি মহান বিজয় দিবস। বিজয়ের কথা বলতে গেলে চলে আসে বিজয়-সংগ্রামের কথা। আর আমাদের বিজয়-সংগ্রাম মানে মহান মুক্তিযুদ্ধের সংগ্রাম। পাকিস্তানের স্বৈর শাসকরা এই জনপদের মানুষের ভোটের রায়কে মেনে নিতে চায়নি। তারা আমাদের গণতান্ত্রিক অধিকার, দেশ শাসনের অধিকারকে পদদলিত করতে চেয়েছে। অস্ত্রের ভাষায় জনপদের মানুষকে স্তব্ধ করতে চেয়েছে। কিন্তু জাগ্রত জনতাকে তারা রুখতে পারেনি। আমাদের বীর জনতা ঝাঁপিয়ে পড়েছেন মুক্তিযুদ্ধে। জীবন ও রক্তের বিনিময়ে আমাদের স্বাধীন দেশ উপহার দিয়েছেন মুক্তিযোদ্ধারা। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর দেশ হয় শত্রুমুক্ত। এই ঐতিহাসিক দিনটিকে জাতি স্মরণ করে বিজয় দিবস হিসেবে।
মানুষ স্বাধীন থাকতে চায়, তাই স্বাধীন দেশ তার কাম্য। ১৬ ডিসেম্বর আমাদের স্বাধীন দেশের স্বপ্ন পূর্ণ হয়েছে। বিজয়ের এই দিনে সবাই মন খুলে কথা বলতে চায়। কথা বলতে চায় শিশু-কিশোররাও। কবি তাদের মনের কথা তুলে ধরেছেন এভাবে-
“বিজয় আমার দেশের মাটি
বিজয় গোলার ধান
বিজয় আমার দোয়েল পাখি
মিষ্টি মধুর গান।

বিজয় আমার মায়ের ভাষা
বিজয় মুক্ত হাসি,
বর্ণমালার পাতায় পাতায়
বিজয় রাশি রাশি।

বিজয় আমার এই পতাকা
লালসবুজে গড়া,
বাংলাদেশের ঘরে ঘরে
এই পতাকাই ওড়া।

বিজয় আমার দীপ্ত শপথ
দেশ ও জাতির জন্য,
বিজয়পরাগ ছড়াবো আজ
হবো আমি ধন্য।”
বিজয় দিবসে দেশ ও জাতির জন্য কাজ করার শপথ নেয়া হয়েছে। এটাই তো স্বাভাবিক। দেশকে, দেশের মানুষকে ভালোবাসলে কাজ করে দেখাতে হয়। কারণ দেশপ্রেমের কথা সত্য হয়ে ওঠে কাজের মাধ্যমেই। আমাদের সামনে অনেক কাজ। আমাদের সমস্যা আছে, আছে সম্ভাবনাও। স্বাধীনতার ৪৬ বছরেও আমরা উন্নত দেশের কাতারে শামিল হতে পারিনি। বিজ্ঞান-প্রযুক্তিতেও আমরা অনেক পিছিয়ে। এসব বিষয়ে বড়রা কাজ করেছেন, তবে ছোটদেরও কিছু করণীয় আছে। ছোটদের মূল কাজটা হলো নিজকে গড়ে তোলা। ছোটরা নিজেদের জ্ঞানে, গুণে এবং নৈতিকতায় পুষ্ট করলে আগামীতে জাতি যোগ্য নাগরিক পাবে। আর আমরা তো এ কথা জানি যে, দেশকে উন্নত দেশের কাতারে শামিল করতে হলে অনেক যোগ্য নাগরিকের প্রয়োজন। যোগ্য নাগরিকরা কথায় বড় না হয়ে কাজে বড় হন। এই কথাটাই কবি সুন্দর করে বলে গেছেন-
“আমাদের দেশে হবে সেই ছেলে কবে
কথায় না বড় হয়ে কাজে বড় হবে।”
আমাদের ছেলে-মেয়েরা যেন আসলেই কাজে বড় হয়ে ওঠে- বিজয় দিবসে মহান স্্রষ্টার কাছে এটাই আমাদের একান্ত প্রার্থনা।

SHARE

Leave a Reply