Home সম্পূর্ণ কিশোর উপন্যাস মায়ের জন্য ভালোবাসা -মূল : ডন রাইট ভাষান্তর : হোসেন মাহমুদ

মায়ের জন্য ভালোবাসা -মূল : ডন রাইট ভাষান্তর : হোসেন মাহমুদ

গত সংখ্যার পর

প্রশিক্ষণ শেষ। আমরা প্রত্যেকেই এখন সামরিক বাহিনীর স্নাতক। এখন আমাদের পোস্টিং অর্ডার জারি হবে এবং হয়ে গেল তা। আমরা সবাই ভিয়েতনামে যাচ্ছি। শুনতে পেলাম, আমাদের মধ্যে কিছু ছেলেকে চতুর্থ পদাতিক ডিভিশনে নিয়োগ করা হয়েছে। বাড়িতে ফোন করলাম। কথা বললাম বাবা ও মা’র সাথে। এখানে এতদিন যা হয়েছে, যা দেখেছি, শুনেছি, জেনেছি তার সব তাদের বলার ইচ্ছে হচ্ছিল। কিন্তু টেলিফোনে তা সম্ভব নয়। অতএব বাড়িতে গিয়ে বলব চিন্তা করলাম। ভিয়েতনামে যাওয়ার কথা শুনে কাঁদতে শুরু করলেন মা। তবে বাবা উৎসাহিত করলেন। সাহস দিলেন। এর দরকার ছিল আমার।
দক্ষিণ ভিয়েতনামের দা নাং-এ পৌঁছলাম আমরা। পত্রিকায় এ শহরটির কিছু খবর পড়েছিলাম। বিমান থেকে নামার পর দু’জন সার্জেন্ট অভ্যর্থনা জানালেন আমাদের। মার্চ করিয়ে নিয়ে গেলেন একটি মাঠের মধ্যে চারদিক ঘেরা একটি স্থানে। ভেতরে একদিকে মাইক্রোফোন সেট করা একটি মঞ্চ, তার বিপরীতে সারিবদ্ধ আসন। একজন মেজর মঞ্চে এলেন। আমরা উঠে দাঁড়ালাম। আমাদের তাকিয়ে দেখলেন তিনি। তারপর মাইক্রোফোনে সবাইকে নিজ নিজ আসনে বসতে বললেন। তার কথা শুরু হলো-
: ভিয়েতনামে তোমাদের স্বাগত জানাচ্ছি। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই তোমাদের ইউনিটগুলোর জন্য নির্দেশ জারি হবে। সারা দক্ষিণ ভিয়েতনাম জুড়ে আমাদের সেনা অভিযান চলছে। ইউনিটে যাওয়ার আগে পর্যন্ত বাসস্থান পাবে তোমরা। সেখানে গোসলের সুযোগ, খাবার সুব্যবস্থা আছে। অস্ত্রও দেয়া হবে তোমাদের। একজন সার্জেন্ট থাকবেন। তিনি তোমাদের যা যা প্রয়োজন তার সবকিছু নিশ্চিত করবেন। চিঠি লেখার কাগজ-কলম পাবে। আমরা চাই তোমরা তোমাদের বাড়িতে প্রিয়জনদের সবকিছু জানাও। কোনো বিধি-নিষেধ নেই। তোমাদের চিঠির খামে কোনো স্ট্যাম্প লাগাতে হবে না। চিঠিগুলো খামে ভরে মুখ আটকে ঠিকানা লিখে এখানকার যে কোনো লেটারবক্সে ফেলে দেবে। ব্যস। ঠিকানামত পৌঁছে যাবে সেগুলো। তবে নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত কেউ তার অস্ত্রে গুলি ভরবে না। ঠিক আছে! তোমাদের জন্য শুভকামনা।
এক সার্জেন্টের চিৎকার শোনা গেল: অ্যাটেনশন!
সবাই অ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়ালাম। মেজর চলে গেলে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরল সবাই। এদিকে আমার মাথার মধ্যে ঘন্টায় নয় শ’ মাইল বেগে চিন্তা চলছে। কোন ধরনের ইউনিটে দেয়া হবে আমাকে? আমি কি সেখানে খাপ খাওয়াতে পারব? একটা অনিশ্চয়তাবোধ টের পাচ্ছি। ভয়ও হচ্ছে একটু। না, এ ভয় তাড়াতেই হবে। দুর্বল হলে আমার চলবে না। আমাকে শক্ত হতে হবে। আমি কিন্তু কোনো খারাপ স্বপ্ন দেখছি না। এটা বাস্তবতা। এআইটিতে যে সব ইতিবাচক চিন্তা করতে শিখেছিলাম তা আর এখন কাজ করছে না। মনে হচ্ছে, মেজর যখন অস্ত্র ও গুলির কথা বললেন তখনি সব গোলমাল হয়ে গেছে। যাদের সাথে আমার কোনোদিন দেখা হয়নি, যাদের আমি চিনি না, তারা আমাকে হত্যা করার চেষ্টা করবে। এটা এআইটি নয়, এটা বাস্তব। সেখানে মহড়া শুরুর আগে সাজানো শত্রুর সাথে বসে গল্প করেছি। এখন বাস্তবে আমার সাথে বসে তাদের গল্পের কোনো প্রশ্ন আসে না, বরং দেখামাত্র গুলি করবে আমাকে। আমিও তাই করব।
একজন সার্জেন্ট সামনে এসে দাঁড়ালেন। বললেন-
: ছেলেরা শোনো! আমরা ৫০ জনের একটি করে মোট চারটি প্লাটুন গঠন করব। আমি নাম ধরে ডাকার পর লাইন ধরে দাঁড়াবে।
প্লাটুন গঠনের পর আমরা মার্চ করে যার যার নির্দিষ্ট ব্যারাকে গেলাম। আমাদের সার্জেন্ট ৩০ মিনিটের মধ্যে সবাইকে মেস হলে হাজির হতে বললেন খাবার খাওয়ার জন্য। খুব ভালো হলো। কারণ, ভীষণ খিদে পেয়েছিল আমার।
খাবার পর সার্জেন্ট আবার ফল ইন করালেন আমাদের। তারপর মার্চ করে ব্যারাকে ফিরলাম আমরা। ডিসমিস করার আগে বললেন-
: এখন বাকি সময়ের জন্য তোমাদের বিশ্রাম। সকালে আদেশ এসে যাবে। প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ জন তাদের অর্ডার পাবে। অর্ডার পাওয়ার আগে পর্যন্ত কারা যাবে, কোথায় যাবে সে ব্যাপারে আমাকে জিজ্ঞেস করো না। আমি বলতে পারব না। কারণ আমি তা জানি না। আদেশ পাওয়ার পর তোমরা কিছু জানতে চাইলে আমার পক্ষে যা সম্ভব তা জানাতে চেষ্টা করব। ততক্ষণ পর্যন্ত চিন্তামুক্ত থাক। এ এলাকা ছেড়ে কেউ কোথাও যাবে না। কোনো সমস্যা হলে আমাকে জানাবে। হলের শেষ মাথায় আমার রুম। ঠিক আছে! ফল আউট।
৬.
নিজের বাংকে ফিরলাম। সবাই যার যার বাংকে শুয়ে বা বসে। জানি না, তাদের কতজনকে আমার সাথে এক ইউনিটে পাব। ডেভিড নামে একটি ছেলে আছে। মেইন থেকে এসেছে। আশা করছি সে অন্তত থাকবে না আমার ইউনিটে। তার হামবড়া ভাবটা অসহ্য। যেন দুনিয়ার সব কিছুই তার জানা। গোটা দলের মধ্যে সবচেয়ে ভালো ছেলে হওয়ার চেষ্টা করছে সে, কিন্তু হতে পারবে কি না তাতে বিলক্ষণ সন্দেহ আছে আমার। এদিকে আমার জীবনে এই প্রথম কি চিন্তা করব বুঝতে পারছি না। আমার সারা শরীরে আবেগ রোলার কোস্টারের মত গড়াগড়ি খেয়ে চলেছে। আমাকে ঘিরে ধরেছে অজানা কোনো ভয়। আমি জানি আমি কাপুরুষ নই। যুদ্ধ দেখে আমি ভয় পাব না। আর সবার মত আমিও জীবনপণ করে লড়ব। কাপুরুষ হতে পারব না আমি। ইউনিটের সম্মান নষ্ট হতে দেব না কিছুতেই।
দ্বিতীয় দিনে আমার অর্ডার এসে গেল। চতুর্থ পদাতিক ডিভিশন। সদর দফতর প্লেইকু। প্লেইকুর অবস্থান আগুনের মাঝখানে। মানে সেখানে প্রচন্ড যুদ্ধ চলছে। যাদের অর্ডার এসেছে, সার্জেন্ট তাদের আলাদা করে নিলেন। আমরা নিজ নিজ জিনিসপত্র ও অস্ত্র গুছিয়ে নিলাম। এল জেড-এ (ল্যান্ডিং জোন) না পৌঁছা পর্যন্ত অস্ত্রে গুলি ভরা যাবে না। সবাই একত্র হওয়ার পর সার্জেন্ট বললেন, আমাদের জন্য কপ্টার অপেক্ষা করেেছ। চল।
হেলিকপ্টারে উঠলাম আমরা।
পেটের ভেতর মোচড় দিচ্ছিল। কপ্টারের গর্জনে কান ঝালাপালা। সবাই নার্ভাস, তবে আমাকে বোধ হয় সবচেয়ে বেশি নার্ভাস দেখাচ্ছিল। আমার মধ্যে আবার ভয় ফিরে এলো। অজানা ভয়। চেষ্টা করেও তাড়াতে পারলাম না। সার্জেন্ট আমার দিকে তাকিয়ে হাসলেন। বললেন-
: ভয় পাওয়ার কিছু নেই। সৈনিকের জীবন এমনই।
আমি কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেলাম। একদিক দিয়ে হয়ত ভালোই হলো। কারণ কি বলতে গিয়ে কি বলে ফেলতাম কে জানে। শেষে সামরিক বিধি লংঘনের অভিযোগে পড়তে হতো।
অবতরণের পর ব্যাটালিয়ন সদর দফতরে নিয়ে যাওয়া হলো আমাদের। একটি তাঁবু থেকে একজন সার্জেন্ট বেরিয়ে এলেন। তার হাতে একটি রোস্টার। বললেন-
: আমি এখন যাদের নাম বলব তারা সবাই সি-১-৮-এ (চার্লি কোম্পানি, ১ম ব্যাটালিয়ন, ৮ম পদাতিক ব্যাটালিয়ন) সম্পৃক্ত হবে। আমাদের যাদের নাম ডাকা হলো, একসাথে জড়ো হলাম আমরা। তারপর তিনি অন্যান্য ইউনিটের সদস্যদের ডাকলেন। একজন স্পেশালিস্ট এলেন আমাদের কাছে। অনুসরণ করতে বললেন তাকে। চললাম তার পিছে পিছে। তিনি আমাদের কমান্ড পোস্টে নিয়ে গেলেন। ফার্স্ট সার্জেন্টকে আমাদের উপস্থিতির কথা জানালেন। ফার্স্ট সার্জেন্ট কিছু সময় অপেক্ষা করতে বললেন সবাইকে।
এ অবসরে চারদিকে তাকিয়ে দেখার সুযোগ হলো। উঁচু বালির বস্তার আড়ালে অস্ত্র হাতে পজিশন নিয়ে আছে অনেক সৈন্য। বাইরে জঙ্গলের দিকে তাদের চোখ। কি দেখছে তারা মাথায় ঢুকল না। একটি ছেলে হেঁটে যাচ্ছিল। তাকে জিজ্ঞেস করলাম-
: আচ্ছা, ব্যাপার কি? সবাই বাইরের দিকে তাকিয়ে কেন? কি দেখছে?
ছেলেটি আমার দিকে চেয়ে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। বলল-
: চার্লি (ভিয়েতকনরা) কাছে চলে এসেছে। তাদের খুঁজছে ওরা।
ছেলেটি যেন আমার জ্ঞানচক্ষু খুলে দিল। আমি কোথায় এসেছি, কেন আনা হয়েছে আমাদের, সব কিছু যেন ভুলে গিয়েছিলাম। এখন সব পরিষ্কার হয়ে গেছে। হঠাৎই খুব অসুস্থ বোধ করলাম। আবার পেটের ভেতর মোচড় দিচ্ছে। নাড়িভুঁড়ি সব যেন পাক খাচ্ছে। এসব কি হচ্ছে! দাঁড়িয়ে থাকতে পারছি না। কি করব, কোথাও একটু বসব- বুঝতে পারছি না।
আমাদের থাকার জায়গায় নিয়ে যাওয়া হলো। সাদামাটা ব্যবস্থা। ফার্স্ট সার্জেন্ট পরিচিত হলেন আমাদের সাথে। বললেন, ভিয়েতকনরা হামলা চালাবে বলে তারা মনে করছেন। যে কোনো দিনই সে হামলা হতে পারে।
তার কথা শুনে মনে হলো, সব ভয় ও উদ্বেগ যেন বাস্তব হতে চলেছে। যুদ্ধ এতক্ষণে তার চেহারা দেখাতে শুরু করেছে। যুদ্ধ মানে হয় মর নয় বাঁচ। এখানে অন্য কোনো বিকল্প নেই।
এক তরুণ সার্জেন্ট এলেন। পাশে বসলেন আমার। হাত বাড়িয়ে দিয়ে বললেন-
: আমি গিফোর্ড। প্রথম এসেছ?
: হ্যাঁ, এই তো একটু আগে। আমার কণ্ঠে জড়তা।
: আমি তোমাদের স্কোয়াড লিডার। চিন্তা করো না, সব ঠিক হয়ে যাবে। তারা হামলা করলেও রাতের আগে করবে না। সপ্তাহে চার-পাঁচদিন এ রকম পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয় আমাদের। যদি তারা আসেই, অস্ত্র হাতে নেবে। হিসেব করে গুলি ছুঁড়বে। আরেকবার বিমান সরবরাহ না আসা পর্যন্ত আমাদের গোলা-বারুদের টানাটানি অবস্থাটা কাটবে না। যাহোক, নার্ভাস হওয়ার কিছু নেই। ট্রেনিং-এ যা শিখেছ তা কাজে লাগিও। দেখবে, ভালো করবে তুমি। আমাদের দু’টি টহল দল বাইরে রয়েছে। তাদের যেন আবার গুলি করে বসো না। ঠিক আছে, আমি এখন যাচ্ছি। আবার আসব। তোমার সাথে আছি আমি। পরে আমরা একসাথে বসে কথা বলব। এখানকার অবস্থা সম্পর্কে তোমাকে যতটা সম্ভব পরিষ্কার একটা ধারণা দেয়ার চেষ্টা করব।
চলে গেলেন সার্জেন্ট গিফোর্ড। [আগামী সংখ্যায় সমাপ্ত]

SHARE

Leave a Reply