Home গল্প কালু চাচা -শরীফ আবদুল গোফরান

কালু চাচা -শরীফ আবদুল গোফরান

রাফেরা কুমিল্লায় থাকে। স্টেশন রোডে তাদের বাসা। দাদা হোসেন উকিলের নামেই বাসার নাম- ‘হোসেন মঞ্জিল’। বাবা একটি পত্রিকার সাংবাদিক। মা একটি বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন। আব্বা, আম্মা ছোট ভাই রিফাত ও দাদাকে নিয়ে তাদের সংসার। দাদা হোসেন উকিল একবারে বুড়ো হয়ে গেছেন। খুব একটা হাঁটাচলা করতে পারেন না। সারাদিন একা একা বাড়ির দোতলায় লাঠি ধরে হাঁটাহাঁটি করেন। মাঝে মধ্যে নিজের আলমারিতে রাখা আইনের বইগুলো নিয়ে হাতাহাতি করেন। সব সময় তসবিহ হাতে থাকে। তাকে সঙ্গ দেয়ার কেউ নেই। বছর দুই-তিন আগে দাদিও মারা গেছেন। সে থেকে তিনি আরো নিঃসঙ্গ হয়ে পড়েন। রাফে মাঝে মধ্যে দাদাকে সঙ্গ দেয়ার চেষ্টা করে। নানা গল্প শোনে দাদার কাছে। দাদা রাফেকে পুরনো দিনের গল্প শোনায়। শোনায় সাহার বানু, বানেচা পরীর কিচ্ছা। কিন্তু রাফে দাদার গল্প শুনে খুব একটা মজা পায় না। দাদা কথা শুরু করলে আর থামতে চায় না। তা ছাড়া দাদার কথা শুনলে এমনিতেই হাসি পায়। কারণ দাদার একটি দাঁতও নেই। কি সে বলেন মোটেও বোঝা যায় না। দাদা গল্প বলার সময় এমন হাসাহাসি করেন, তার কথা আর হাসি একাকার হয়ে যায়। তাই রাফেও দাদার সাথে হাসতে হাসতে লুটোপুটি খায়। গল্প বলার ফাঁকে ফাঁকে দাদা আবার জিজ্ঞেস করে, কী! মজা লাগে দাদু? তখন রাফে বলে, কিভাবে মজা লাগবে। তোমার কথাইতো বোঝা যায় না। জানো দাদু, গল্পের চেয়ে তোমার হাসিটাই বেশি মজা লাগে। তাইতো আমি হাসি। দাদা তখন হোঃ হোঃ করে আরো বেশি করে হাসতে থাকে। দাদা-নাতির হাসি দেখে সবাই অবাক হতেন। মজা পেতেন।
রাফে পড়ে ফাইভে। আর রিফাত টুয়ে। স্কুলে যাওয়া আসা করে কালু চাচার সাথে। সকাল হলে কালু চাচা দুই কাঁধে দুই ব্যাগ নিয়ে দুই হাতে দু’জনকে ধরে চলতে শুরু করেন স্কুলে। বাড়ি ফিরে আবার কালু চাচাই তাদের আপনজন। কারণ ওসময় মা-বাবা বাসায় থাকে না। তারা তখন অফিসে। রাতে ছাড়া মা-বাবার সাথে দেখা হয় না। কালু চাচাই তাদের খেলার সাথী, আবার কালু চাচার গল্প শুনতে শুনতেই তাদের ঘুম আসে। কখন কি করতে হবে সব মুখস্থ তাদের। কালু চাচা আগে থেকেই তাদের সব মুখস্থ করে দিয়েছে। তাদের কোনো কথায় কালু চাচা রাগ করে না।
সেদিন হরতাল। স্কুলে ক্লাস হবে না। তাই স্কুল ছুটি হয়ে গেছে। বন্ধু শিপন রাফের হাত ধরে বললো, বন্ধু চলো আজকে আমাদের বাসায় যাবে। বিকেলে আমাদের গাড়ি দিয়ে তোমাকে বাসায় পৌঁছায়ে দেবো। রাফেও এতে উচ্চবাচ্য করলো না। ও শিপনের সাথে সুড়সুড় করে গাড়িতে উঠে বসলো। কিন্তু হঠাৎ মনে পড়ে যায় কালু চাচার কথা। কালু চাচাতো আমাকে না পেয়ে চিন্তায় পড়ে যাবে। খোঁজাখুঁজি করবে। আমাকে না পেলে তো রিফাত কাঁদবে। আবার দাদাওতো কালু চাচাকে বকবে। মনে মনে ভাবলো, যাবে কি যাবে না। এবার স্থির করে নিলো। না যাই। একদিন না হয় না বলেই গেলাম। বিকেলেতো বাসায় ফিরবোই।
সারা বিকেল শিপনের সাথে কাটালো রাফে। খেলা আর আনন্দের মাঝে বাসার কথা ভুলেই গেল। ভুলে গেল রিফাতের কথাও। এর মধ্যে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। বুকের ভেতর কেমন যেন ধুকধুক করে উঠলো রাফের। বাড়ির কথা মনে হতেই কেমন যেন কাঁদো কাঁদো ভাব রাফে। এতে শিপনও চিন্তিত হয়ে পড়লো। না রাফেকে এত দেরি করানো ঠিক হয়নি।
এদিকে কালু চাচা রাস্তায় রাস্তায় কত খোঁজাখুঁজি করলেন রাফেকে। না পেয়ে অবশেষে রিফাতকে নিয়ে বাড়ি ফিরেছে। ততক্ষণ বাবা-মাও বাড়ি ফিরেছেন। কালু চাচার মুখে সব শুনে রাগ হয়েছেন কালু চাচার ওপর। দাদা এসেতো লাঠি দিয়ে কয়েক ঘা বসিয়ে দিলেন কালু চাচার পিঠে।
বাড়ির সামনে শিপনদের গাড়ি এসে থামলো। রাফে গাড়ি থেকে নেমে তাকিয়ে দেখে-আব্বা, আম্মা, দাদা সবাই দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। কালু চাচা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চোখ কচলাচ্ছে। দেখা মাত্র মা এসে রাফেকে জড়িয়ে ধরলেন। বলতে লাগলেন, বাপ তুই কোথায় ছিলি! ছেলে ধরা ধরেনিতো? না মা, আমি শিপনদের বাসায় ছিলাম। আমার কিচ্ছু হয়নি। বাবা এসে দু’গালে চুমু খেতে লাগলেন। দাদার আদর যেন আর শেষই হয় না। কিন্তু কালু চাচাকে দেখা যাচ্ছে না। কালু চাচা এখনো দরজার পাশে দাঁড়িয়ে কাঁদছে। রাফে কালু চাচার কাছে ক্ষমা চাইলো। কিন্তু তবুও তার কাঁদা যেন থামছে না। পরে জানতে পারে দাদা কালু চাচাকে লাঠি দিয়ে মেরেছে। বাসা ছেড়ে গ্রামে চলে যেতে বলেছে। এসব শুনে রাফের কষ্ট হলো। কান্না আসতে লাগলো। এক দৌড়ে শোয়ার ঘরে গিয়ে কাঁদতে লাগলো রাফে।
এর মধ্যে আব্বা আম্মা এসে গেছে তার কাছে। আম্মু রাফেকে জড়িয়ে ধরে জিজ্ঞেস করছে, কী হয়েছে রাফে সোনা খেলতে গিয়ে ব্যথা পেয়েছো? শিপন মেরেছে? রাফের কান্না দেখে ছোট্ট রিফাতও তাকে বার বার জড়িয়ে ধরছে। আর সান্তনা দিচ্ছে। ভাই কেঁদো না কেঁদো না। এদিকে বাবাও রেগে গেলো কালু চাচার ওপর। বাবা রেগে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, কিরে কালু রাফেকে শিপনদের বাসায় যেতে দিলি কেন? কোনো জবাবা দিলো না কালু। মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকলো। বাবা কালুকে বকাঝকা করে গলা ধাক্কা দিয়ে ঘর থেকে বের করে দিলো। কালু বাবার পা জড়িয়ে ধরে। কিন্তু বাবার রাগ আর থামে না। একসময় কালু চাচা তার পুঁটলিটা বুকে জড়িয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যায় স্টেশনের উদ্দেশে। সে আর এখানে থাকবে না। চলে যাবে নিজের গাঁয়ে। যেখানে তার স্ত্রী-পুত্র রয়েছে।
মা খাইয়ে দিয়ে রাফেকে ঘুম পাড়িয়ে যায়। কিন্তু রাফের যে মোটেও ঘুম আসে না। বার বার কালু চাচার কথা মনে পড়ে। সে তার ভুল বুঝতে পারে। বার বার নিজেকে প্রশ্ন করছে, ভুলতো আমি করেছি কালু চাচাকে মারলো কেন! কালু চাচা তুমি আমার জন্য মার খেয়েছো, আমাকে ক্ষমা করে দাও। বাবার কথায় রাগ করো না। আমি আর কখনো এমন করবো না। তুমি আমাকে ছেড়ে যেয়ো না।
এখন মধ্য রাত। প্রকৃতি শান্ত। নীরব নিস্তব্ধ। শুধু ঝিঁ ঝিঁ পোকার একটানা ঝিঁ ঝিঁ ডাক ভেসে আসছে। নরম চাঁদের আলো বাইরে ঝলমল করছে। চারদিকে কুয়াশার চাদরে ঢাকা। রাফে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ভাবছে কালু চাচার সাথে দেখা করবে। কিন্তু এর মধ্যে মা টের পেয়ে যায়। মা ডাক দিয়ে বলে, রাফে এত রাত অবধি কি করছো? তাড়াতাড়ি ঘুমাতে যাও। মার কথা শুনে রাফে ঘুমিয়ে পড়ে। কখন যে ভোর হয়ে গেছে টেরই পেলো না।
কালুদের বাড়ি নাঙ্গলকোটের মুহুরীগঞ্জ গ্রামে। ঐ গ্রামেই রাফের নানা বাড়ি। কালু চাচা রাফের নানা বাড়িতেই কাজ করতেন। রাফের নানা নাতিদের জন্যই কালুকে পাঠায় তাদের বাসায়। কালু বলতে গেলে তাদের আপন লোকই। নিজের ছেলেমেয়েদের চেয়েও বেশি আদর করেন রাফে ও রিফাতকে।
রাফের বাবার বকুনি খেয়ে কালু চাচা আসে কুমিল্লা রেলস্টেশন। তার চোখে পানি। রাফে ও রিফাতের কথা মন থেকে পড়ছে না। তবুও সে আর শহরে থাকবে না। শহরের মানুষগুলো নির্দয়। তাদের মায়াদয়া নেই। শহরের লোক তার আর মোটেও পছন্দ নয়। শহরের লোকেরা গরিবদের ভালোবাসে না। তারা শুধু শুধু মারে। একসময় সে আনমনা হয়ে রেল লাইনের ওপর এসে দাঁড়ায়। বার বার পেছন ফিরে তাকায়। যেন রাফের কষ্ট তার কানে ভেসে আসছে। ভাবতে ভাবতে সে তন্ময় হয়ে যায়। হঠাৎ একটি আন্তঃনগর ট্রেন ভোঁ করে চলে যায়। এসময় কালু দাঁড়িয়েছিল রেল লাইনের ওপর। অমনি ট্রেনের নিচে পড়ে সাঙ্গ হলো কালু চাচার প্রাণ। তার নিষ্প্রাণ দেহটি দ্বিখন্ডিত হয়ে পড়ে রইলো রেল লাইনের ওপর।
ভোর হয়েছে। চারদিকে মানুষের হাঁটাচলার শব্দ কানে আসছে। রিফাত ঘুম থেকে ওঠে হাতমুখ ধুয়ে দাঁড়িয়ে আছে দক্ষিণ পাশের বারান্দায়। ততক্ষণে রিফাতও এসে দাঁড়িয়েছে তার পাশে। রাস্তায় সবাই বলাবলি করছে, স্টেশনে একটি লোক কাটা পড়েছে। পাড়ার ছেলেরা দল বেঁধে যাচ্ছে স্টেশনের দিকে। রাফে-রিফাতও যেতে চাইলো। কিন্তু আব্বু যেতে দিলো না। একসময় ডোমরা এসে লাশটি নিয়ে গেল। পাড়ার ছেলেরা ফিরে এসে চিৎকার করে বলে, রাফে তোর কালু চাচা ট্রেনে কাটা পড়েছে। অমনি রাফে দরজা খুলে স্টেশনের দিকে কালু চাচা, কালু চাচা বলে চিৎকার করতে করতে দৌড়াতে লাগলো। এরপর সে যে কোথায় গেল, আর কখনো ফিরে আসেনি। বাবা-মায়ের সন্দেহ হয়তো স্টেশন থেকে ছেলেধরা নিয়ে গেছে।

SHARE

Leave a Reply