Home সায়েন্স ফিকশন বামক-০৭ -হারুন ইবনে শাহাদাত

বামক-০৭ -হারুন ইবনে শাহাদাত

অভিযান শুরু

১ জানুয়ারি ৪০০১ সালের কথা বলছি। বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র বামক-০৭ এক গোপন বৈঠক চলছে। বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণার ক্ষেত্রে পৃথিবীর অন্য যে কোন দেশের চেয়ে এখন অনেক এগিয়ে। দেশের অতি গোপনীয় মিশনগুলো পরিচালিত হয় বামক-০৭ থেকে। অতএব তোমরা বুঝতেই পারছো এ গবেষণা কেন্দ্রটি কত গুরুত্বপূর্ণ। কোন শত্রুরাষ্ট্র এ কেন্দ্রের সন্ধান পেলে বাংলাদেশকে পেছনে ফেলতে ধ্বংস করে ফেলতে পারে বামক-০৭। এমন সঙ্গত কারণেই দেশের মানচিত্রে এ স্থানটির উল্লেখ নেই। একবিংশ শতাব্দীর একক পরাশক্তি আমেরিকার কথা তোমরা নিশ্চয়ই ইতিহাসে পড়েছো। আমেরিকা এরিয়া ফিফটি ওয়ান এর অস্তি¡ত্ব দীর্ঘদিন স্বীকার করেনি। যদিও এখন আর বিষয়টি কারও অজানা নয়। আমেরিকার সামরিক গবেষণার গোপনীয় কেন্দ্রের নাম এরিয়া ফিফটি ওয়ান। তাদের গোপনীয়তা যেন ফাঁস না হয়, সেজন্য আমেরিকার মানচিত্রের এরিয়া ফিফটি ওয়ান নামে কোন স্থানের চিহ্ন দীর্ঘ দিন ছিল না। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর আমেরিকান গবেষকরা অন্য কোন গোপন জায়গায় তাদের অবস্থান পাকাপোক্ত করেছেন- এমনটিই ধারণা করছেন বাংলাদেশী বিজ্ঞানী ও গবেষকরা। দেশের বৃহত্তর এ স্বার্থের কথা চিন্তা করেই রাষ্ট্রীয় এই অতি গোপনীয় স্থানটির পরিচিতি গোপন রাখলাম। কারণ এর সাথে জড়িয়ে আছে বাংলাদেশের মানসম্মান এবং নিরাপত্তা।
রাত ১১টা বাজার সাথে সাথে বামক-০৭ এর পরিচালক সাদিক জামানের নেতৃত্বে একদল নবীন-প্রবীণ বিজ্ঞানী ও গবেষক প্রবেশ করলেন মিটিং রুমে। সবাই আসন গ্রহণ করলেন। সাদিক জামান রিমোট হাতে নিয়ে প্রজন লেখা বাটনে চাপ দেয়ার সাথে সাথে রুমের দেয়াল পরিণত হলো বিশাল স্ক্রিনে।
সাদিক জামান বক্তৃতা শুরু করলেন, ‘সম্মানীয় গবেষকবৃন্দ। আজ আমরা বসেছি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে। আপনারা জানেন, পৃথিবীতে বিশাল ভূখন্ডের অধিকারী হওয়ার পরও আমেরিকা, ফ্রান্স, ব্রাজিলসহ বেশ কয়েকটি দেশ মহাশূন্যের এক একটি গ্রহ তাদের দখলে নিচ্ছে। শহর বন্দর নগর গ্রাম গড়ে জনবসতি শুরু করেছে। কয়েকটি দেশ তো নিজেদের জনসংখ্যা কম হওয়ায় গ্রিন কার্ডের মাধ্যমে নিজ দেশের নাগরিক বাড়িয়ে মহাশূন্য দখলের হীন ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছে। কিন্তু একথা সত্য মহাশূন্য দখলের সবচেয়ে বড় হকদার আমরা এই বাংলাদেশীরা। কারণ ছোট এ দেশ বিপুল জনসংখ্যার ভারে টইটম্বুর। তাই আমাদের বসে থাকার সময় নেই। খুঁজে বের করতে হবে নতুন নতুন গ্রহ, প্রয়োজনে উপগ্রহও। যেখানে আমরা বাংলাদেশের পতাকা ওড়াব। অনুগ্রহ করে সামনে তাকান। সাদিক জামানের কথা শেষ হওয়ার আগেই গবেষকদের দৃষ্টি চলে যায় সামনের বিশাল স্ক্রিনে। সেখানে দেখা যাচ্ছে গোটা সৌরজগৎ। সাদিক জামান গ্রহ নক্ষত্রের অবস্থান গবেষকদের নিকট ব্যাখ্যা করছেন, সম্মানীয় গবেষকবৃন্দ, আপনাদের কারো অজানা কিংবা অদেখা নয়, তারপরও আরেকবার নজর বুলিয়ে নিন। কারণ আমাদেরকে এমন একটি গ্রহ খুঁজে বের করতে হবে যা হবে মহাশূন্যে আরেকটি বাংলাদেশ। মঙ্গল দখল হয়ে গেছে প্রায় ৫ শ’ বছর আগে। চাঁদকেও বসবাসের উপযোগী করে দিয়েছে ফ্রান্স। সূর্যের কাছের গ্রহ বুধ। সূর্য হতে এর দূরত্ব ৫ কোটি ৭৯ লাখ কিলোমিটার। এটি আয়তনে পৃথিবীর ১৭ ভাগের এক ভাগ। সৌরজগতের এ ছোট গ্রহটি সূর্যকে ৮৮ দিনে একবার প্রদক্ষিণ করে। সূর্যের খুব কাছে হওয়ায় এ গ্রহ দখলের চিন্তা কারও মাথায় আসেনি। আমাদের পৃথিবী সূর্য থেকে ১৪ কোটি ৯৫ লাখ ৯৭ হাজার কিলোমিটার দূরে। দুই গ্রহের সূর্যের সাথে দূরত্বের ব্যবধান নিয়ে গবেষণা করে দেখতে হবে সেখানে সূর্য তাপের তীব্রতা কতটা হতে পারে। এমন একটা প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে হবে যাতে পৃথিবীর মত পরিবেশ বুধে বিরাজ করে।’
নবীন মহাকাশ বিজ্ঞানী জাহিদ সায়েম মুখ খুলেন, ‘সম্মানীয় উপস্থিতি আমার মনে হয় বুধের চেয়ে শুক্র গ্রহে অভিযান পরিচালনা আমাদের জন্য সহজসাধ্য হবে। আর এ গ্রহটিও এখন পর্যন্ত বেদখল হয়নি।
NASA (National Aeronautics and Space Adminstration) অর্থাৎ আমেরিকান বিজ্ঞানীরা কয়েকবার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অগ্রসর হননি। আমরা চেষ্টা করে দেখতে পারি। আমাদের মহাকাশ গবেষণা ওদের অনেক পরে শুরু হলেও, একথা স্বীকার করতেই হবে ওদের চেয়ে আমরা এখন অনেক এগিয়ে।’
জামান সাদিক বলেন, ‘চমৎকার আইডিয়া, শুক্র হতে সূর্যের দূরত্ব ১০ কোটি ৮২ লাখ কিলোমিটার। আয়তনে এটি পৃথিবীর আয়তনের ১০ ভাগের ৯ ভাগ। আকাশের সবচেয়ে উজ্জ্বল এ গ্রহের সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে সময় লাগে ২২৫ দিন।’
বিস্তারিত আলোচনার পর সভায় সর্বসম্মতিক্রমে সিদ্ধান্ত হয় আগামী ২৬ মার্চ, বাংলাদেশের স্বাধীনতা দিবসের দিন শুক্র গ্রহে অবতরণ করবে দু’জন নভোচারী বহনকারী মহাকাশ যান তিতুমীর-০০১। নবীন বিজ্ঞানী জাহিদ সায়েমকে প্রধান করে তিন সদস্যের গবেষক দলকে দায়িত্ব দেয়া হয় অভিযানের সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করার।

মহাকাশ স্টেশনে পদ্মা-০২

চূড়ান্ত অভিযানের আগে প্রস্তুতি পর্ব সম্পন্ন করতে ব্যস্ত নবীন বিজ্ঞানী জাহিদ সায়েম। শুক্রগ্রহের সঠিক অবস্থান, পরিবেশ, দূরত্ব নির্ণয় করতে হবে। জানতে হবে গবেষকদের ওপর কি বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে অভিযানের সময়। কারণ বিরূপ প্রভাব কাটানোর উপায় জানা না থাকলে কেউ সুস্থ অবস্থায় পৃথিবীতে ফিরতে পারবে না, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে গবেষকদের। অতএব তোমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছো বিষয়টি কত জরুরি। জাহিদ সায়েমের কাজে সহযোগিতার জন্য রয়েছেন ২ জন বিজ্ঞ গবেষক এবং ২ জন তরুণ। তরুণ দু’জন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের Aeronautics and space science বিভাগের মেধাবী ছাত্র। তাদের একজনের নাম শাকিল কামাল আরেক জন সুলতান সালাম। সার্বিক দিক দেখা শোনার দায়িত্ব পালন করছেন বাংলাদেশ মহাকাশ গবেষণা কেন্দ্র বামক-০৭ এর প্রধান সাদিক জামান। তরুণদের এ গবেষণার সাথে রাখার উদ্দেশ্য ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দক্ষ জনশক্তিতে পরিণত করা। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এই বিষয়টি কয়েক দশক আগে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এখন আর এ দেশের শিক্ষার্থীরা শুধু তাত্ত্বিক শিক্ষায় নয়, সাথে ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জনও করছে।
জাহিদ সায়েমের নেতৃত্বাধীন গবেষক দল প্রথমে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন মহাশূন্যে মানুষবিহীন খেয়াযান ঝিনাই-৯৯কে পাঠানো হবে, তথ্য সংগ্রহের জন্য। কিন্তু পরে শাকিল কামাল আর সুলতান সালামের উৎসাহে ও দুঃসাহসী মানসিকতার কারণে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হয়েছে, মানুষবিহীন খেয়াযান নয়, মানুষ বহনযোগ্য খেয়াযান পদ্মা-০২ পাঠানো হবে। দু’আসন বিশিষ্ট এ খেয়াযানে মহাশূন্যে যাবে দুই তরুণ শাকিল কামাল ও সুলতান সালাম। বামক-০০১ এ বসে ওদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিবেন জাহিদ সায়েম। বামক-০০৭ এ তৈরি করা হয়েছে কৃত্রিম সৌরজগৎ। দুই সপ্তাহ ধরে দিনরাত্রি প্রশিক্ষণ দেয়া হচ্ছে শাকিল কামাল ও সুলতান সালামকে। কঠোর নিয়ম-শৃঙ্খলা মেনে নিষ্ঠার সাথে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছে ওরা দু’জন।
২০ ফেব্রুয়ারি ৪০০১ বাংলাদেশের জন্য একটি স্মরণীয় দিন। এই দিন প্রথম মহাকাশে উড়ে পৃৃথিবীর সবচেয়ে কম বয়সী দু’জন মহাকাশ গবেষক। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’জন ছাত্র। ছাত্রাবস্থায় গবেষণা কাজে মহাশূন্যে উড্ডয়নের ঘটনা পৃথিবীতে এটাই প্রথম পৃথিবী। বিশ্বখ্যাত সকল নিউজ মিডিয়ার সাংবাদিকরা হুমড়ি খেয়ে পড়ছেন বাংলাদেশে। তারা লাইভ প্রোগ্রাম সম্প্রচারের প্রস্তুতি নিয়ে এসেছেন। টান টান উত্তেজনা কখন রাত ১০টা বাজবে। ৯.৫৫-৫৬, ৫৭ … ১০টা। আল্লাহু আকবার ধ্বনি প্রতিধ্বনিত হচ্ছে চারদিকে। বামক-০০১ এর নির্দেশনা চেয়ারে বসে বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম বলে পদ্মা-০২ লেখা বাটনে চাপ দিলেন জাহিদ সায়েম। প্রচন্ড গতিতে চলছে পদ্মা-০২। আনন্দ উত্তেজনায় ভরা তরুণ গবেষক শাকিল কামাল আর সুলতান সালামের মন। কিন্তু মাথা একদম ঠান্ডা। সজাগ মন। একটুও অসতর্ক হওয়ার সুযোগ নেই। নিয়ন্ত্রণ কক্ষ বামক-০০১ এ বসে জাহিদ সায়েম প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিচ্ছেন। অক্ষরে অক্ষরে প্রতিটি নির্দেশ ফলো করছে শাকিল কামাল আর সুলতান সালাম। ওদের প্রথম গন্তব্য আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশন (আইএসএস) ১ ঘণ্টার মধ্যে পদ্মা-০২ আইএসএস এ নোঙর করবে। অথচ গত শতকেও এ পর্যন্ত আসতে নভোচারীদের সময় লাগতো প্রায় ১ দিন। মহাশূন্য স্টেশন (আইএসএস) এ এখন গবেষক বিজ্ঞানীদের প্রচন্ড ভিড়। প্রতিদিনই আসছে বিভিন্ন দেশের গবেষকরা। আগে থেকে বুকিং না দিয়ে এলে অবতরণের সুযোগ মেলে না, থাকা-খাওয়া তো দূরের কথা। পদ্মা-০২-এর অভিযাত্রীদের জন্য বুকিং করে রাখা হয়েছিল দু’টি ফাস্ট ক্লাস মহাবাস। নভোচারীদের থাকার স্যুট বা কক্ষকে মহাবাস বলা হয়। শাকিল কামাল আর সুলতান সালামের আগমনকে বিশেষ গুরুত্বের সাথে নিয়েছেন আইএসএসএ-এর পরিচালক মালয়েশিয়ান বিজ্ঞানী টুংকু সাদাত। পৃথিবীর সবচেয়ে কম বয়সী নভোচারীদের মহাকাশ স্টেশনে আগমন উপলক্ষে করা হয় বিশেষ সংবর্ধনার আয়োজন। এই সংবর্ধনা অনুষ্ঠানও লাইফ প্রচারের ব্যবস্থা করেছে বিটিভিসহ পৃথিবীর সকল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক।
(চলবে)

SHARE

Leave a Reply