Home গল্প হসপিটালে ষোলো দিন -নাহিদ জিবরান

হসপিটালে ষোলো দিন -নাহিদ জিবরান

হসপিটাল!
নাম শুনলেই কেমন আঁতকে উঠি।
এমনিতেই কারোর বিপদ হলে এক-দুই ঘণ্টার জন্য হসপিটালে যাওয়া পড়ে। কিন্তু আমি আধা ঘণ্টাও হসপিটালে থাকতে পারি না। আমার দম বন্ধ হয়ে আসে। অস্থির লাগে। কখন সেখান থেকে বের হবো সেই চিন্তা করি।
সেদিন আমি সারাদিন কম্পিউটারে বিভিন্ন কাজে ব্যস্ত ছিলাম। এভাবে কাজ করতে করতে কখন যে বিকেল হয়ে গেছে সেটা আমি বুঝতে পারিনি। তারপর কম্পিউটার অফ করে দুপুরের খাবার খেয়ে বাইরে গেলাম হাঁটার জন্য। প্রায় দেড় ঘণ্টা বাইরে হাঁটলাম। মাগরিবের নামাজ পড়ে বাসায় এলাম। তখনও শরীরে কোন প্রকার ক্লান্তি বা অসুস্থতাবোধ করছি না। বাসায় এসে হাতমুখ ধুয়ে আবার কম্পিউটারে বসলাম। দুই তিনটা মেইল চেক করতে না করতেই আমার মাথা চক্কর দিলো। আমি ভাবলাম এটাতো সব সময় হয়। কোন কিছু তোয়াক্কা না করে আবার কাজে মনোযোগ দিলাম। এক মিনিটও গেল না আবার প্রচন্ড মাথা ব্যথা শুরু হলো। কোনোভাবেই চোখ তুলতে পারছি না। একেবারে ছোট হয়ে গেছে। বাসায় আব্বু, আম্মু, বোন সবাই ছিলো। কিন্তু কাউকে ডাকিনি। ভাবলাম একটু রেস্ট নিলে ঠিক হয়ে যাবে। তাই তাড়াতাড়ি কম্পিউটার অফ করে শুয়ে পড়লাম। সাথে সাথে ঘুমও চলে এলো। ওদিকে আব্বু, আম্মু ডাকাডাকি শুরু করলো।
প্রায় দেড় ঘণ্টা পর ঘুম থেকে উঠলাম। তখন নিজের কাছে মনে হচ্ছে আজকে খারাপ কিছু হতে চলেছে আমার সাথে। আবার বলছি দুর কি চিন্তা করছি এগুলো! খাট থেকে উঠে টয়লেটের দিকে যাচ্ছিলাম। এক কদম, দুই কদম দিতে না দিতেই পড়ে গেলাম মেঝেতে। ছোট বোনটা দেখতে পেয়ে আব্বু, আম্মুকে ডাক দিলো। আব্বু, আম্মু দৌড়ায় এসে আমাকে ধরলেন। আমি উবুড় হয়ে শুয়ে ছিলাম। আমাকে সোজা করে দেখলেন আমার সারা শরীর অবশ হয়ে গেছে। হাত, পা নাড়াতে পারছি না। অনেকক্ষণ এভাবে তেল মালিশ করার পর যখন দেখলো আর হচ্ছে না তখন আব্বু আমার ফ্রেন্ড মুরাদকে ফোন দিলেন। মুরাদ, সনজু দ্রুত আমার বাসায় চলে এলো। চারতলা থেকে আমাকে কোলে করে নামালো। আব্বু, মুরাদ, সনজু আর শশী আমাকে শাহজাহানপুর ইসলামী হসপিটালে নিয়ে এলো।
আব্বুর নিজের শরীরের তোয়াক্কা না করে আমার সাথে চলে এলেন হসপিটালে। যদিও আব্বুর শরীরটা আমার থেকেও বেশি খারাপ। আল্লাহ পাক মনে হয় তখন আব্বুকে পুরোপুরি সুস্থ করে দিলেন। তখন আব্বু আমাকে নিয়ে বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। তখন আর নিজের শরীর নিয়ে ভাবলেন না!
এই শুরু হলো আমার জীবনের সব থেকে বিপজ্জনক মুহূর্তগুলো। ইমারজেন্সিতে নিলো প্রথমে। ওখানে আমাকে দেখার পর ডাক্তার পরীক্ষার পর পরীক্ষা দিতে থাকলেন। এদিকে আমার শ^াসকষ্ট শুরু হয়ে গেল। অক্সিজেন দিয়ে দিল আমাকে।
বেডে শুয়ে আছি আমি। আমার মনের মধ্যে অন্যরকম গুরুতর অন্ধকার ছোটাছুটি করছে। আমি আল্লাহর কাছে দোয়া এবং সাহায্য চাচ্ছি। আমার চিন্তাধারা যাতে সঠিক হয়। আর ওদিকে আমার আরও দুইটা ফ্রেন্ড ফয়সাল আর রনি খবর শুনেই অফিস থেকে দ্রুত হসপিটালে ছুটে এসেছে। আমি কোন মতে ঘাড়টা ঘুরিয়ে আব্বুসহ সবার দিকে তাকালাম। তাদের চেহারার মধ্যে বীভৎস, হতাশা, আতঙ্ক সব কিছুই আমি দেখতে পাচ্ছি। কিন্তু আমি তাদেরকে বলতে পারছি না আমার কিছু হয়নি। আমি ভালো আছি। কথা বলার শক্তিটাও আমি হারিয়ে ফেলেছিলাম।
এবার শুরু হলো দৌড়ঝাঁপ করা। টেস্ট করার জন্য এক ভবন থেকে অন্য ভবন। এভাবে ঘণ্টাখানেক সময় লাগলো। কিছুক্ষণ পর দেখতে পেলাম আব্বুর প্রিয় ছোট ভাই খায়ের চাচু চলে এসেছেন। তিনি আসাতে আব্বু একটু স্বস্তি অনুভব করলেন। তখনও আমার অক্সিজেন চলছে।
শেষ পর্যন্ত রাত সাড়ে ১১টায় আমাকে এক নম্বর ভবনের ছয় তলায় বেডে দিল। বেড নম্বর ৯-স।
এখানে আসার পর আসল চিকিৎসা শুরু হলো আমার। স্যালাইনের পর স্যালাইন চলছে আমার হাতে। আর অন্য হাতে চলছে ব্লাড নেয়ার মহোৎসব। দুই দিনে আমার অবস্থা হালুয়া টাইট হয়ে গেল। শশী আমার সেবা করতে যেয়ে নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়েছে। কারণ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ১৬ ঘণ্টাই আমার সাথে ছিলো। আমার দেখাশোনা করা, ওষুধ খাওয়ানো, টয়লেটে নিয়ে যাওয়া সব কিছুই করেছে। এরকম বন্ধু পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার!
আমার শরীরের অবস্থা উন্নতি না হওয়ায় কাকরাইল সেন্ট্রাল হসপিটালে নিয়ে গেল। সেখানে গিয়েও একই অবস্থা। বেড নম্বর ছিলো ১২২৪। আরও অনেক রোগী ছিলো আমার আশপাশে। ডাক্তার দেখে নার্সকে স্যালাইন লাগিয়ে দিতে বললেন। আমার সারা শরীর জ¦রে পুড়ে যাচ্ছে। পাঁচটা কম্বল দিয়েও কুলাতে পারছে না। কত ধরনের ওষুধ দিলো তা বলে বোঝানো যাবে না। এখানেও নানান টেস্ট করতে দিলো আবার প্রথম থেকে। কিছুই করার নেই তাদের হাতে তো আমরা বন্দি। তারা যেটা বলবে সেটাই তো করতে হবে। দায় তো আমাদেরই।
এই বেডে দুই দিন থাকার পর ক্যাবিন নিলো আমার জন্য। তার পাশের রুমেই ১২১৪ তে। কিন্তু রুমে ঢুকে দেখি জেলখানার চাইতেও খারাপ অবস্থা। কোনো জানালা নেই। আব্বু প্রতিদিন আমার জন্য খাবার নিয়ে আসতেন। আমার জন্য অনেক বেশি কষ্ট করেছেন। যেটা আমার খেদমত করার কথা ছিলো সেটা উল্টো আমার পেছনেই করছেন। জানি না আল্লাহ কোন পরীক্ষার মধ্যে আমাকে ফেলেছিলেন। আব্বু হসপিটালে আমাকে নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতে যেয়ে নিজেই অসুস্থ হয়ে পড়লেন অনেক বেশি। আমি সেটা বুঝতে পারছিলাম।
এভাবে চারদিন চলে গেল। বিছানা থেকে উঠতেও পারি না। সাথে আমার ভাইয়ারাও ছিলো। প্রত্যেকদিন একজন বা এমনও দিন গেছে ৩-৪ জন ছিলো আমার কাছে। আমার দেখাশোনা করার জন্য।
সেদিন আবদুল হাদি ভাইকে রাতের বেলায় বললামÑ ভাইয়া আকাশটা খুব দেখতে মন চাচ্ছে আমাকে বারান্দায় নিয়ে যাবেন? ভাইয়া কিছুক্ষণ ভেবে বললো ঠিক আছে ভাইয়া চলেন আমার সাথে। ভাইয়া আমাকে বিছানা থেকে উঠালেন। আমি পা ফেলতে পারছিলাম না। তিনি আমাকে জড়িয়ে ধরে আস্তে আস্তে নিয়ে গেলেন। চেয়ারে বসে জানালার দিকে মুখটা আলতো করে দিলাম। ঠান্ডা বাতাসে আমার মনটা ভরে গেল। কিন্তু বেশিক্ষণ থাকতে পারলাম না। শরীরটা খুব খারাপ লাগছে। আবার সেই জেলখানার মধ্যে চলে গেলাম। ওখানে থেকে বোঝার উপায় নেই এখন সকাল না রাত। আব্বুকে ফোন করে বললাম আমি এই রুমে থাকবো না। আব্বুজান সাথে সাথে হসপিটাল কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বললেন এবং আধা ঘন্টার মধ্যে ডবল ক্যাবিন পেয়ে গেল। রাতেই নিয়ে গেল ৯০৫ নম্বর ক্যাবিনে।
এখানে জানালা আছে বেশ ভালো লাগলো আমার। আট দিন পর আমি বাইরের দৃশ্য দেখতে পারছি। এটাই তো অনেক। হাতে স্যালাইন চলছে আর আমি বিছানায় না শুয়ে জানালার পাশে যেয়ে বসে থাকতাম। আর ডাক্তার এসে বকা দিতেন। আমি বলতাম ২৪ ঘণ্টা কি শুয়ে থেকে পারা যায়!
বাসায় ফেরার জন্য মনটা লাফালাফি করছে। কিন্তু এদিকে সুস্থ হওয়ার কোনো বালাই নেই। একেকদিন একেক জন ভাইয়া আমার সাথে থাকছে গল্প করছে। কিন্তু এভাবে কি থাকা যায়। আমি মুক্ত বাতাসের পাখির মত ঘুরতে ভালোবাসি। আর এখানে আমার মোটেও ভালো লাগছে না।
আট দিন এখানে আমি থাকলাম। একেক দিন একেক বছরের চেয়েও অধিক সময় আমার কাছে মনে হচ্ছে। কী যে কষ্টের তা ভাষায় প্রকাশ করার মত না।
১৫ তারিখে শুনলাম আমার রিলিজ হয়ে গেছে ১৬ তারিখে আমি বাসায় যেতে পারবো। মনের মধ্যে সাতরঙা রঙধনুর মত দুলতে থাকলো। আনন্দের বন্যা বয়ে যাচ্ছে। সেই রাতে আমি ঘুমাতে পারিনি। সারারাত জানালার পাশে বসে ছিলাম। এদিকে ভাইয়া বললো এবার ঘুমিয়ে পড়েন। আমি বললাম, ভাইয়া ঘুম তো আসছে না। তারপর দুই ভাই রাত ৩টা পর্যন্ত গল্প করলাম। গল্প করতে করতে এক ফাঁকে ভাইয়া ঘুমিয়ে পড়লেন। আর আমি বিছানায় জানালার পাশেই বসে রইলাম। আকাশটা বেশ চকচক করছে।
বিছানায় আসতেই শুনতে পেলাম আজানের ধ্বনি ভেসে আসছে। শুয়ে না থেকে ফজরের নামাজটা আদায় করলাম। বিছানায় শুয়ে পড়লাম কিন্তু ঘুম আসছে না। ভাইয়া উঠে নামাজ আদায় করলেন। আমাকে বললেন, ভাইয়া আপনি ঘুমাননি! আমি উত্তর দিলাম না ভাইয়া!
এ দিকে আব্বুজান সকালে ভাইয়াকে ফোন দিলেন। ভাইয়া বলে দিলেন আমি ঘুমাইনি। ভাইয়াকে বলে দিলেন ওকে ঘুমানোর চেষ্টা করতে। আমাকে বলার পর আমি বললাম ঘুমাবো ভাইয়া আগে আমার কাপড়গুলো গুছিয়ে নেই।
আমি উঠে সব কিছু গুছিয়ে নিলাম। এবার ঘুমানোর পালা। ঘুম আসছে না। ভাইয়া আমার পাশে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। কখন যে ঘুমিয়ে পড়লাম টের পাইনি। উঠে দেখি আব্বুজান এসে গেছেন। কিছুক্ষণের মধ্যে আমি চলে যাবো। খুবই আনন্দ লাগছে। অ্যামবুল্যান্সে করে আমি বাসায় এলাম। বাসায় ঢুকতেই আমার মনে হলো আমি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গেছি। এখনও পুরোপুরি সুস্থ না হলেও মনের দিক থেকে পুরোপুরি সুস্থ আছি।
আল্লাহ পাক আমাকে সুস্থতা দান করেছেন। আল্লাহর কাছে হাজার শুকরিয়া জানিয়েছি। হসপিটালে আর যেন না যেতে হয় আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি। এখনও করে যাচ্ছি। যাই হোক আর আমি কখনই হসপিটালের দিকে পা বাড়াবো না!
শশী এবং যেসব ভাইয়ের জন্য এতো তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়েছি আল্লাহ তায়ালা তাদের সবাইকে সুস্থতা ও সফলতা দান করুন। বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করুন। আমিন।

SHARE

Leave a Reply