Home তোমাদের গল্প মতিন স্যার ও শিশুরা -সাদিকুল ইসলাম

মতিন স্যার ও শিশুরা -সাদিকুল ইসলাম

ফাতেমা!
– জে আম্মা।
– এই বাবুর্চি এখনো রান্না হয়নি, করিস কি?
– জে আম্মা হইয়া গ্যাছে দিতাছি।
– এই শোন, আরো সকাল সকাল ঘুম থেকে উঠবি, আমি অফিসে গেলাম।
এই ধরনের কথাবার্তা ও রোজ রোজই শোনে, কিন্তু কিছু বলবার বা করবার ক্ষমতা তার নেই। কারণ ওরা গরিব ওরা অসহায়।
মা, মা, ভাত দাও কামে যাওন লাগবো।
দিতাছি বাজান, আর হুন রাস্তাঘাটে ভালা কইরা চলিস। মায়ের কথাগুলো শুনতে শুনতে খেতে বসে রহিম।
আব্দুর রহিমের বয়স ১২ বছর। সে রিকশা চালায়। তার বাবা নেই। মাকে নিয়ে রাস্তার পাশের এক বস্তিতে থাকে। খাওয়ার পর রিকশা নিয়ে সে রাস্তায় বেরিয়ে পড়লো।
– এই রিকশা, যাবি?
– হ যামু, কই যাইবেন?
– গুলশান।
– আচ্ছা উঠেন।
– কিরে পোলা, জোরে চালাস না ক্যা?
– স্যার, এর বেশি জোরে চালাইতে পারমু না।
– পারস না তো রাস্তায় নামস ক্যা!
রহিম মুখ বুজে রইল। কিছুক্ষণ পর তারা গুলশান পৌঁছে গেল।
তারপর পেছন থেকে কে যেন রহিমকে ডাকল। এই রিকশা যাবে।
– কোন হানে?
– বাজারে যামু
– তুমি বাজারে যাবে? উঠ।
– আচ্ছা তুমি বাজার কর ক্যান, তোমার বাপ নাই?
– হ সব আছে, সংসারের অভাবের লাইগ্যা বাপ-মা আমারে মানুষের বাড়িত কাম করতে দিছে। তুমি বাসায় কাম কর! বাসায় কাম করা খুব কষ্টের তাই না?
– না, না আমার কোন কষ্ট নাই, মালিক খুব ভালা। ওই যা কথা বলতে বলতে তো তোমার পরিচয়টা জানাই হলো না। আমি ফাতেমা, তোমার নাম কী?
– আমি রহিম, শুধুমাত্র মা আর আমি দু’জন বস্তিতে থাকি। আর এই রিকশা চালাই। কথাগুলো বলতে গিয়ে ডুকরে কেঁদে ওঠে। রহিমের কান্না দেখে এবার ফাতেমাও কেঁদে ফেলল। রহিম তুমি আর কাইন্দ না, আমাগো মতো শিশুগোর পাশে দাঁড়াইবার মতো কেউ নাই। আলাপের ফাঁকে ইতোমধ্যে তারা বাজারে পৌঁছে গেছে। ফাতেমা নামার পর বিদায় জানিয়ে টাকা দিতে চাইলে রহিম নিতে রাজি হয় না। যাও কিছু খায়া নিও, ও আমারও কিছু বাজার করতে অইবো মা কইছিলো কিছু লাউয়ের শাক নিতে। আচ্ছা ফাতেমা তাইলে অহন যাই পরে আবার দেখা অইবো এই বলে রহিম তার রিকশা নিয়ে আবার ছুটতে থাকে।
এই ঝালমুড়ি, খেয়ে যান, মজা পান ছেলে, বুড়ো-বুড়ি এই ঝালমুড়ি, এভাবে ছন্দকথায় স্কুলের সামনে ঝালমুড়ি বিক্রি করে সজল। যার জীবনটা যেন অশ্রুজলে ভরা। একদিন সে স্কুলেরই এক শিক্ষক বিষয়টি লক্ষ করলো। ক্লাসের সময় হয়ে যাওয়ায় তিনি আর বেশিক্ষণ দাঁড়ালেন না। তবে চোখে দেখা এরূপ দৃশ্যটি তাঁর হৃদয়কে নাড়া দিল। তিনি সরাসরি ক্লাসে ঢুকে পড়লেন। ছাত্রছাত্রীরা সহসায় স্যারকে দেখে তাজ্জব। সবাই দাঁড়িয়ে স্যারকে সালাম জানায়। এ সময় কানাকানি শুরু করে দেয় কেউ কেউ।
– এই বাবু মতিন স্যার আজ এত তাড়াতাড়ি এলো ক্যানরে। পাশ থেকে বলে ওঠে দিলু। কি জানি? ঘুমবাবু রেগে গিয়ে জবাব দেয়।
মতিন স্যার সবাইকে বসতে বললেন, “শোন সবাই আজ আমি তোমাদেরকে কিছু কথা বলতে চাই!” সবাই স্যারের কথায় একমত হলে স্যার বলতে শুরু করেন, “শোন আজ আমি একটি ছেলেকে ঝালমুড়ি বিক্রি করতে দেখলাম।” পাশ থেকে মনি বলে ওঠে ওর নাম সজল স্যার।
– হ্যাঁ শুধু এই সজল নয়, এরকম হাজারো সজল পথে পথে ঝালমুড়ি ফেরি করে বেড়ায়। এছাড়াও তোমাদের মতো ছেলেমেয়েরা অন্যের বাসায় কাজ করে। শত দুঃখ যন্ত্রণা সহ্য করে ওরা অন্যের বাসায় কাজ করে। এ ছাড়া তোমরা নিজ চোখেই তো দেখছো চারপাশে কত শিশু কত কঠোর ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছে। প্যাডেল ঠাঁই পায় না এমন ছোট ছোট ছেলেরা রিকশা চালায়, কেউ ঠেলা গাড়ি ঠেলে বেড়ায়। কেউ কুলি আবার কেউ মজুরের কাজ করছে। প্রচন্ড ঝলসানো রোদে ইটের ওপর বসে ইট ভাঙার কাজ করছে হাজারো ছোট ছোট ছেলেমেয়ে। যন্ত্রের মতো ওদের কচি দু’হাত ওঠানামা করে, দাবদাহ আর গরম শ্বাস-প্রশ্বাসের সাথে ঐ ধুলোগুলো ঢোকে তাদের ফুসফুসে। ছোট ছোট বাচ্চাদের যে বয়সে হাতে থাকার কথা জাতির মেরুদন্ড গড়বার হাতিয়ার সেই কলম বা লেখনী, সে হাতে তাদের তুলে দেয়া হচ্ছে ইট-পাথর ভাঙার হাতিয়ার হাতুড়ি। ছোট ছোট হাতগুলোতে ফোসকা পড়ে যায়। কঠোর অর্থনৈতিক বাস্তবতা তাদের এই শৈশবকে করে নির্মম কশাঘাত। এ ছাড়াও পথের ধারে, ড্রেনের পাশে কত শিশু রয়েছে। যারা শত ঝড়বৃষ্টি, গরম শীতকে উপেক্ষা করে পথের ধারে রাত কাটায়। কখনো কখনো মাথা গোঁজার সেই জায়গাটুকুও পায় না। পায় না সুযোগ, একটু ভালো খাবার। কিন্তু তারপরও কিছুটা ক্ষীণ আলো ওদের মনে ভেসে বেড়ায়। তাদের চোখে ভাসে সুদূর ভবিষ্যতের কিছু স্বপ্ন অনাগত দিনের কিছু অনিশ্চিত প্রত্যাশা। তাদেরও স্বপ্ন দেখার অধিকার আছে, অধিকার আছে ভালোভাবে বাঁচার। আমরা আর থেমে থাকবো না। এসব বঞ্চিত শিশুদের অধিকার আদায়ের ব্যাপারে একযোগে কাজ করবো। কেননা শিশুরা আগামীর ভবিষ্যৎ। আর সবচেয়ে বড় কথা শিশুরা অধিকারবঞ্চিত হবে। জাতির স্বপ্ন-আশা দুরাশায় রূপ নিবে এটা স্বাধীন দেশ বা স্বাধীন দেশের মানুষের কাম্য নয়। সব ছাত্রছাত্রী মতিন স্যারের কথাগুলো খুব মনোযোগ সহকারে শুনল। আর মতিন স্যারের আহ্বানে সাড়া জাগাতে সকলে এক হয়ে কাজ করার শপথ নিলো। তারা একযোগে বলল, আমাদের মতো আর কোন শিশু এরকম কঠোর কাজে অংশ নেবে তা আর চলবে না। সবাই শ্লোগানে ক্লাস মুখরিত করল, “পথের শিশু পথের ধারে, ভালোবাসবো আমরা তারে।”

SHARE

Leave a Reply