Home ফিচার কচুরিপানা শিল্পশোভন একটি ফুল -আবদুল হাই ইদ্রিছী

কচুরিপানা শিল্পশোভন একটি ফুল -আবদুল হাই ইদ্রিছী

বৃষ্টির দিন ফুরোলে আসে শরৎ। এর পর হেমন্তের কুয়াশা। এ সময়টাতেই গ্রাম বাংলার খাল-বিল, ছোট নদী বা মজাপুকুরে ফোটে কচুরিপানা ফুল। পুকুরভরা কচুরি ফুল, যেন প্রদীপ জ্বলছে, এমন সৌন্দর্য বাংলার গ্রাম ছাড়া আর কোথায় আছে! গ্রামের সহজ-সরল মানুষের মাটি-ঘনিষ্ঠ জীবনযাত্রার এক জীবন্ত ছবি। শিল্পায়নের কবলে হারিয়ে যাচ্ছে খাল-বিল, পুকুরসহ জলাশয়গুলো। পাড়াগাঁয়ে লেগেছে শহরের গন্ধ। কচুরিপানা ফুলের বেগুনি রঙের বিশাল বিছানার চিত্র হয়তো দেখার ভাগ্য হয়নি শহরের শিশুদের। জানা হয়নি বাংলা মায়ের রূপ বৈচিত্র্যের গল্প।

কচুরিপানার পরিচয়
ময়ূরের পালকের মত দেখতে ফুলটির নাম কচুরিপানা। ইংরেজিতে নাম- ঊরপযযড়ৎহরধ পৎধংংরঢ়বং। এটা মাদুরের মতো পানির ওপরে বিছিয়ে থাকে। কচুরিপানা সাতটি প্রজাতি আছে এবং এরা মিলে আইকরনিয়া গণটি গঠন করেছে। কচুরিপানা মুক্তভাবে ভাসমান বহুবর্ষজীবী জলজ উদ্ভিদ। এর আদি নিবাস দক্ষিণ আমেরিকা। পুরু, চকচকে এবং ডিম্বাকৃতির পাতাবিশিষ্ট কচুরিপানা পানির উপরিপৃষ্ঠের ওপর ১ মিটার পর্যন্ত বাড়তে পারে। এর কান্ড থেকে দীর্ঘ, তন্তুময়, বহুধাবিভক্ত মূল বের হয়, যার রঙ বেগুনি-কালো। একটি পুষ্পবৃন্ত থেকে ৮-১৫টি আকর্ষণীয় ৬ পাপড়ি বিশিষ্ট ফুলের থোকা তৈরি হয়। কচুরিপানা খুবই দ্রুত বংশবিস্তার করতে পারে। এটি প্রচুর পরিমাণে বীজ তৈরি করে যা ৩০ বছর পরও অঙ্কুরোদগম ঘটাতে পারে। কচুরিপানা রাতারাতি বংশবৃদ্ধি করে এবং প্রায় দু’সপ্তাহে দ্বিগুণ হয়ে যায়। কচুরিপানা দক্ষিণ পাকিস্তানের সিন্ধের প্রাদেশিক ফুল।

আঞ্চলিক নাম
দেশের প্রায় সকল অঞ্চলেই এটাকে পানা বা কচুরিপানা বলে। কিন্তু চাঁদপুর অঞ্চলে বলে কস্তুরি। যেমনÑ ‘ও সালেহা, গরুডার সামনে কয়ডা কস্তুরি দে। গরুডা বেয়ানথন না খাইয়া রইছে।’ এ অঞ্চলে ‘কস্তুরি’ নামকরণ কেন হলো বুঝতে পারছি না। আমি জানি, বিশেষ জাতের পুরুষ হরিণের তলপেটে জন্মানো থলের মধ্যে থাকা একধরনের সুগন্ধি দ্রব্যকেই কস্তুরি বলে। এই হরিণের নাম কস্তুরি মৃগ। সাধারণত পাহাড়ি এলাকার হরিণের মধ্যেই কস্তুরি পাওয়া যায়। পবিত্র কুরআনের সূরা মুতাফ্ফিফিনে কস্তুরির উল্লেখ রয়েছে। ‘কস্তুরি’ হচ্ছে মৃগনাভি যা প্রাচ্যে মহামূল্যবান সুগন্ধিরূপে পরিচিত। সেই কস্তুরির নামের সাথে সাযুজ্য রেখে চাঁদপুরে কচুরিপানার আঞ্চলিক নাম কস্তুরি রাখার যুক্তি খুঁজে পাচ্ছি না। তবে কি কচুরিপানার ফুলের সৌন্দর্যের সাথে মৃগনাভি বা কস্তুরির মিল খুঁজে পেয়েছেন এ অঞ্চলের পূর্বপুরুষরা?

কচুরিপানার নানা গুণ
কচুরিপানাকে অনেকেই তুচ্ছতাচ্ছিল্য করলেও এর নানা গুণ রয়েছে। আমাদের দেশে গোখাদ্য এবং ফসলি জমিতে জৈব সার হিসেবে ব্যবহার হলেও উন্নত বিশ্বে কচুরিপানার ফুল থেকে ওষুধ তৈরি করে থাকে। বাংলাদেশের বিজ্ঞানীরা কয়েক বছর ধরে কচুরিপানা থেকে কাগজ তৈরির জন্য পরীক্ষা-নিরীক্ষা চালিয়ে যাচ্ছেন। এ ছাড়াও কচুরিপানা থেকে ঘরের আসবাব, হ্যান্ডব্যাগ, দড়ি ও এক ধরনের কাগজ তৈরি করে থাকে। ঘ্রাণ না থাকলেও কচুরিপানার ফুল নান্দনিক ও শিল্পশোভন একটি ফুল। এই ফুলের সৌন্দর্য শিশু-বুড়ো সকলকে মুগ্ধ করে।

কচুরিপানার আসবাবপত্র
ফুজি নারীরা কচুরিপানা শুকিয়ে তা থেকে ব্যবহার উপযোগী ঝুড়ি, আসবাবপত্র তৈরি করে রফতানিও করে থাকে। এই ঝুড়ি ফিলিপাইন, ভারত, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া প্রভৃতি দেশে পর্যটনের কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। ইদানীং বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলেও কচুরিপানা থেকে তৈরি হচ্ছে উপহার সামগ্রীসহ নানা পণ্য। এগুলো বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। উগান্ডার মানুষ কচুরিপানা থেকে কাগজ ও কাগজের তৈরি ম্যাট ব্যবহার করছে। এ ছাড়া স্কেল ফাইবার বোর্ড, সুতা ও দড়ি তৈরির কাজেও কচুরিপানার ব্যবহার লক্ষ করা যায়।

বাংলায় কচুরিপানার আগমনের ইতিহাস
ধারণা করা হয় কচুরিপানার অর্কিড-সদৃশ ফুলের সৌন্দর্যপ্রেমিক এক ব্রাজিলীয় পর্যটক ১৮ শ’ শতাব্দীর শেষভাগে বাংলায় কচুরিপানা নিয়ে আসেন। তারপর তা এত দ্রুত বাড়তে থাকে যে ১৯২০ সালের মধ্যে বাংলার প্রায় প্রতিটি জলাশয় কচুরিপানায় ভরে যায়। নদ-নদীতে চলাচল দুঃসাধ্য হয়ে পড়ে আর জলাভূমির ফসল আমন ধান আর পাটচাষ অসম্ভব হয়ে পড়ে, ফলে বাংলার অর্থনীতিতে স্থবিরতা দেখা দেয়।
এমত পরিস্থিতিতে সরকার কচুরিপানার দৌরাত্ম্য হ্রাসে বাংলার জলাভূমি আইন, বাংলার মিউনিসিপ্যালিটি আইন, বাংলার স্থানীয় সরকার আইন এবং বাংলার স্থানীয় গ্রাম সরকার আইন সংশোধন করে। ১৯৩৬ সালে কচুরিপানা আইন জারি করা হয়, যার মাধ্যমে বাড়ির আশপাশে কচুরিপানা রাখা নিষিদ্ধ ঘোষিত হয় এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত কচুরিপানা পরিষ্কার অভিযানে অংশ নেয়াকে নাগরিক কর্তব্য ঘোষণা করা হয়। আক্রান্ত এলাকার ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটরা তাদের নিজ নিজ এলাকায় স্বেচ্ছাসেবী নিয়ে কচুরিপানা দমনে কার্যকর অভিযান চালাতে আদিষ্ট হন।
জনতা এই কাজে উৎসাহের সাথে যোগ দেয়। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনে সবগুলো দলের নির্বাচনী ইশতেহারে বাংলাকে কচুরিপানার অভিশাপমুক্ত করার অঙ্গীকার ছিল। শেরেবাংলা এ কে ফজলুল হক নির্বাচনে বিজয় লাভ করে তার নির্বাচনী ওয়াদা পূরণে ঝাঁপিয়ে পড়েন এবং কচুরিপানার বিরুদ্ধে জোরদার অভিযান চালান।
কচুরিপানার বিরুদ্ধে পরিচালিত অভিযানের সাফল্য লাভের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল সার হিসেবে পচানো কচুরিপানার উৎকৃষ্টতা। এই গুণের কারণে ভূমিহীন কৃষকরা কচুরিপানা জমিয়ে ভাসমান কৃষিজমি তৈরি করতে শুরু করে। অবশেষে ১৯৪৭ এর মধ্যে বাংলার জলাশয়গুলো কচুরিপানা-বদ্ধতা থেকে মুক্তি লাভে সক্ষম হয়। তবে এখনও বাংলার জলাশয়ে কচুরিপানা বহাল তবিয়তেই আছে।
গবেষকদের দৃষ্টিতে কচুরিপানা
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মোহাম্মদ মহীউদ্দীন চৌধুরী দীর্ঘদিন কচুরিপানা নিয়ে গবেষণা করেন এবং কৃষকের জমিতে প্রয়োগ করে ব্যাপক ফলপ্রসূ হয়েছেন। তার গবেষণার কিছু বর্ণনা এখানে উল্লেখ করা হলোÑ
কচুরিপানা হলো ভাসমান এমন একটি প্রাকৃতিক জলজ উদ্ভিদ যার উৎপত্তিস্থল ব্রাজিল (আমাজন), এর ৭টি প্রজাতি রয়েছে। গ্রীষ্মম-লীয় এলাকায় এটি খুব দ্রুত বংশবিস্তার করে, এমনকি ৬ দিনেরও কম সময়ে সংখ্যা দ্বিগুণ হয়ে যায়। দ্রুত বংশবিস্তারের জন্য কচুরিপানার বিশেষ খ্যাতি রয়েছে। শাখা ও লতানো কান্ড এবং বীজের মাধ্যমে এর বংশবৃদ্ধি ঘটে, যা পাখির মাধ্যমে বিস্তার লাভ করে। অক্টোবরের প্রথমেই গাছে ফুল আসা শুরু হয় এবং সম্পূর্ণ গ্রীষ্মকাল চলতে থাকে। ফুল ফোটার ১-২ দিন পর শুকিয়ে যায়। সব ফুল শুকিয়ে যাওয়ার ১৮ দিন পর বীজগুলো বিমুক্ত হয়। গ্রীষ্মকালে অঙ্গজ বিস্তার খুব দ্রুত ঘটে। ৫০ দিনের মধ্যে প্রতিটি ফুল থেকে প্রায় ১ হাজার নতুন কচুরিপানার জন্ম হয়। একটি গাছ থেকে ৫ হাজারের অধিক বীজ উৎপন্ন হয়, এ বীজ ৩০ বছর পর্যন্ত সুপ্ত অবস্থায় থাকতে পারে।
কচুরিপানা যে কোনো পরিবেশেই জন্মাতে পারে, এমনকি বিষাক্ত পানিতেও এরা জন্মায়। কচুরিপানা অতিমাত্রার দূষণ ও বিষাক্ততা সহ্য করতে পারে। মার্কারি ও লেডের মতো বিষাক্ত পদার্থ এরা শিকড়ের মাধ্যমে পানি থেকে শুষে নেয়। তাই পানির বিষাক্ততা ও দূষণ কমাতে কচুরিপানার চাষ অত্যন্ত উপকারী। পূর্ব এশিয়ার কিছু অংশে কচুরিপানা মানুষের খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। ভেষজ চিকিৎসার ক্ষেত্রেও এর বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। গবাদিপশুর খাদ্য ও বায়োগ্যাস উৎপাদনের জন্য এটি চমৎকার একটি উৎস। ক্ষেত্রবিশেষে কচুরিপানা থেকে গোবরের চেয়েও বেশি বায়োগ্যাস উৎপাদন করা যায়। পূর্ব এশিয়ায় শুকনো কচুরিপানা জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং এর ছাই কৃষকরা সার হিসেবে জমিতে ব্যবহার করে। সবুজ কচুরিপানা জৈব সার হিসেবেও জমিতে ব্যবহার করা যায় (সরাসরি অথবা মালচ্ হিসেবে)। বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কচুরিপানা থেকে কাগজ ও আসবাবপত্রও তৈরি করা যায়। কচুরিপানা কেঁচো উৎপাদন বৃদ্ধিতেও সহায়ক। কচুরিপানার বৃদ্ধি এতটাই তাৎক্ষণিক যে, কোনো জলাশয়ের ওপর কার্পোটের মতো স্তর তৈরি করা মাত্র এক দিনের ব্যাপার। হেক্টরপ্রতি প্রতিদিন এদের বৃদ্ধি প্রায় ১৭ টনের ওপরে এবং ১ সপ্তাহের মধ্যেই এ সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যায়। কচুরিপানায় খুব দ্রুত ও প্রচুর পরিমাণে ফুল ফোটে। তাই কচুরিপানা এখন কৃষির এক মহাসম্পদ। সম্প্রতি ভার্মিকম্পোস্ট (কেঁচো সার) তৈরিতে কচুরিপানা একটি উত্তম উপকরণ হিসেবে নানা দেশে প্রমাণিত হয়েছে। কচুরিপানা থেকে তৈরি জৈব সার ব্যবহার করে জমির উর্বরতা এবং ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধির সাফল্য পাওয়া গেছে। ১৮০ টন কাঁচা কচুরিপানা থেকে প্রায় ৬০ টন জৈব সার উৎপাদন হতে পারে। আমাদের দেশে দিন দিন গোবরের প্রাপ্যতা কমে আসছে, কারণ এখন আর কৃষকের গোয়ালে গরু নেই, আছে পাওয়ার টিলার।
কচুরিপানা প্রাকৃতিকভাবে পানি থেকে বেশ ভালোভাবেই নাইট্রোজেন, ফসফরাস ও পটাসিয়াম পুষ্টি উপাদান পরিশোষণ করতে পারে। ফলে কচুরিপানা পচিয়ে জৈব সার তৈরি করে জমিতে ব্যবহার করলে এসব উপাদান মাটিকে সমৃদ্ধ করে তোলে।
ভারতের তামিলনাড়ুর গবেষক সেলভারাজ এক পরীক্ষায় প্রমাণ পেয়েছেন, ভার্মিকম্পোস্টের জন্য যেখানে অন্যান্য কৃষিবর্জ্য থেকে জৈব সার তৈরিতে ৭০ দিন লাগে সে ক্ষেত্রে কচুরিপানা থেকে জৈব সার তৈরিতে লাগে মাত্র ৫৫ দিন। ওই বিজ্ঞানীর মতে, বিভিন্ন উদ্যান ফসল চাষের জন্য যেখানে হেক্টরপ্রতি ১০-১৫ টন জৈব সার লাগে সেখানে কচুরিপানা থেকে তৈরি করা জৈব সার লাগে মাত্র ২.৫-৩.০ টন। এ পরিমাণ জৈব সার ব্যবহার করেই ফলন ২০-২৫ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব।

কচুরিপানা চাষে ভাগ্যবদল
এই জলজ উদ্ভিদ কচুরিপানা চাষ এখন লাভজনক। যেমন বরিশালের অনুন্নত বিল এলাকা বিশারকান্দি। এখানে বারো মাসই পানিবদ্ধতা থাকে। জনযোগাযোগের মাধ্যম হচ্ছে নৌকা। জীবিকার মাধ্যম চাষাবাদ। এখানকার চাষাবাদ পদ্ধতি ব্যতিক্রমধর্মী। বেশির ভাগ লোকই তরিতরকারি বা সবজি চাষ করে থাকে। ধান চাষ খুব একটা হয় না। এখানকার লোকদের আধুনিক চাষাবাদের সঙ্গে তেমন যোগাযোগ নেই। নিজস্ব উদ্ভাবনীর মধ্যে দিয়েই এবং চিরায়ত ধ্যান-ধারণাকে আঁকড়ে এদের জীবন সংসার এবং পেশাগত কাজ-কর্ম। স্থানীয়ভাবে ওই এলাকার চাষাবাদের জন্য যে উপাদানের প্রয়োজন তা হচ্ছে কচুরিপানা। বেশি ফলন এবং জমির অভাবে অর্থাৎ জলমগ্ন থাকায় পানির ওপর ভাসমান ‘ঢুপ’-এর মাধ্যমে ফসল ফলায়। ঢুপ হচ্ছে ভাসমান বিভিন্ন আর্বজনা বিশেষ করে কচুরিপানার পচনকৃত স্তুপ। যা জৈব সারে পরিণত হয়। ভাসমান এ ঢুপের স্তুপের ওপরই মূলত এরা চাষাবাদ করে বিভিন্ন সবজির। ফলনও হয় খুব বেশি। পানিবদ্ধতা বিল এলাকায় কচুরিপানার চাষ করে প্রতিটি পরিবার। বাধ্য হয়েই এর চাষ করতে হয়। বারো মাসই এ কচুরিপানার প্রয়োজন হয়। শুধু চাষের জন্য নয়। জ্বালানি হিসেবে শুকনো কচুরিপানার প্রয়োজন হয়। শ্রাবণ, ভাদ্র মাসে কচুরিপানার বংশ বৃদ্ধি হয়। চাষের জন্য তেমন বিশেষ কিছু করতে হয় না। শুধুমাত্র পরিচর্যাই প্রধান। যে কোন সুবিধাজনক স্থানে স্থায়ীভাবে জীবিত কচুরিপানা বাঁশ দিয়ে বেড়া দিতে হয়। বাঁশ ছাড়াও অন্যান্যভাবেও শুধুমাত্র কচুরিপানাকে নড়াচড়া না করে এমনভাবে আবদ্ধ রাখা হয়।
ওই এলাকায় ৬-১০ হাত পানির গভীরতা থাকে। সে অনুযায়ী বাঁশ খাড়াভাবে পানির মধ্যেই পুঁতে রাখতে হয়। ওই বাঁশের সঙ্গে কিছু কচুরিপানা বেঁধে রাখে। এরপর থেকে ধীরে ধীরে ওই কচুরিপানা বৃদ্ধি পেতে থাকে। রক্ষণাবেক্ষণ করতে হয় যাতে কেউ নিয়ে না যায় বা গো-খাদ্যের জন্য কেটে না নেয়। রবিশস্যের মৌসুমে এ কচুরিপানা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে নিয়ে স্তূপ করা হয়। এক সপ্তাহ থেকে পনের দিনের মধ্যে এর পচন ধরে। তখন সামান্য মাটির আবারণ ক্ষাণিকটা কাঠের গুঁড়ি দিয়ে ওই কচুরিপানার স্তূপের (ঢুপ) ওপর বিভিন্ন সবজির চাষ করা হয়। ওই এলাকার লোকজন কচুরিপানার চাষ করে লাভবান হচ্ছেন। এ ছাড়া ও এলাকার লোকজন আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছে। যারা কচুরিপানা সংগ্রহ করেন না অথচ চাষের ব্যবসায়িক উৎপাদন করেন তারা ওই কচুরিপানা ভালো মূল্য দিয়ে ক্রয় করেন। যে কারণে লোকজন কচুরিপানা চাষের দিকে ঝুঁকছে।

শেষ কথা
পাল্টে গেছে মানুষের জীবনযাত্রা, ঘরবাড়ি, পরিবেশ ও রাস্তাঘাট। বেড়েই চলেছে ইট পাথরের দালন-কোঠা ও শিল্প কারখানা। হারিয়ে যাচ্ছে জীব ও বৈচিত্র্যের অপরূপ সৌন্দর্য। এর মাঝে বিভিন্ন জলাশয়ে দেখা মিলে কচুরিপানা ফুলের। খুবই হালকা বেগুনি সাতটি পাপড়ির একটাতেই কেবল এই ময়ূরের পালকের মত আকাশনীল রংয়ের ছোঁয়া। তার মাঝে হলুদ রঙের একটা তিলক। অসাধারণ ব্যাপার। প্রকৃতিপ্রেমিকদের এমন সৌন্দর্য কাছে টেনে নেয় অনায়াসে। চমৎকার বিষয় হলো গাছটি একটি ভাসমান ফুলের গাছ। বাড়ির পাশের বিল থেকে কচুরিপানার ফুল তুলে আনন্দে মেতে ওঠে শিশুরা।

SHARE

Leave a Reply