Home দেশ-মহাদেশ ভূমি বৈচিত্র্যের দেশ পাকিস্তান -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

ভূমি বৈচিত্র্যের দেশ পাকিস্তান -মুহাম্মদ আশরাফুল ইসলাম

পাকিস্তান দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশ এবং পশ্চিম এশিয়া, মধ্য এশিয়া ও পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে এর অবস্থান। পাকিস্তান ভারতীয় উপমহাদেশেরও একটি দেশ। পাকিস্তান জনসংখ্যার দিক দিয়ে বিশ্বের পঞ্চম জনবহুল এবং আয়তনের দিক দিয়ে ৩৩তম বৃহত্তম দেশ। পাকিস্তানের জনসংখ্যা ২০ কোটি ৭৭ লাখ ৭০ হাজার এবং আয়তন ৮ লাখ ৮১ হাজার ৯১৩ বর্গ কিলোমিটার (৩ লাখ ৪০ হাজার ৫০৯ বর্গ মাইল)। পাকিস্তানের মোট আয়তন ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের সম্মিলিত স্থল আয়তনের প্রায় সমান। পাকিস্তানের দক্ষিণে আরব সাগর ও এর ওমান উপসাগরের সাথে ১ হাজার ৭৬ কিলোমিটার উপকূল রেখা রয়েছে এবং পূর্বে ভারত, পশ্চিমে আফগানিস্তান, দক্ষিণ-পশ্চিমে ইরান এবং দূর উত্তর-পূর্বে চীনের সাথে সীমান্ত রয়েছে। উত্তর-পশ্চিমে আফগানিস্তানের ওয়াখান করিডোরের মাধ্যমে পাকিস্তান তাজিকিস্তান থেকে সামান্য ব্যবধানে পৃথক হয়ে আছে এবং ওমানের সাথে সমুদ্রসীমা রয়েছে।
ফার্সি, সিন্ধি ও উর্দু ভাষায় পাকিস্তান নামটির অর্থ পবিত্র দেশ। পাকিস্তানের তৎকালীন পশ্চিম অংশের পাঁচটি রাজ্যের নাম থেকে এই নামটি আসে : প-পাঞ্জাব, আ-আফগানিয়া (উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ, বর্তমান খাইবার পাখতুনখোয়া), ক-কাশ্মির, স-সিন্ধ ও তান-বেলুচিস্তান। এই আদ্যক্ষরগুলো মিলিয়েই পাকিস্তান নামটি তৈরি করা হয়। ১৯৩৩ সালে চৌধুরী রহমত আলী তাঁর “নাও অর নেভার” পুস্তিকায় এই নামটির প্রস্তাব করেন।
পাকিস্তানে জাতিগত গ্রুপের মধ্যে রয়েছে পাঞ্জাবি ৪৪.৬৮%, পশতুন বা পাঠান ১৫.৪২%, সিন্ধি ১৪.১০%, সারাইকি ৮.৩৮%, মুহাজির ৭.৫৭%, বালুচ ৩.৫৭% এবং অন্যান্য ৬.২৮%। পাকিস্তানের জনগণের ৯৬.৪% মুসলিম এবং অন্যান্য ৩.৬%। জনগণের শতকরা ৪০ ভাগ শহর এলাকায় এবং ৬০ ভাগ গ্রাম এলাকায় বাস করে।
পাকিস্তানের সরকারি ভাষা উর্দু ও ইংরেজি। এ ছাড়া উর্দু এদেশের জাতীয় ভাষা এবং মুসলিম পরিচিতি ও জাতীয় ঐক্যের প্রতীক। পাকিস্তানিদের শতকরা ৭৫ ভাগেরও বেশি এই ভাষা বোঝে। দেশে যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম উর্দু, কিন্তু পাকিস্তানের জনগণের মাত্র ৮ শতাংশের প্রাথমিক ভাষা উর্দু। পাকিস্তানে বেশ কয়েকটি প্রাদেশিক ভাষাসহ ৬০টিরও বেশি ভাষায় কথা বলা হয়ে থাকে। উল্লেখযোগ্য ভাষাগুলোর মধ্যে রয়েছে পাঞ্জাবি ৪৮ শতাংশ, সিন্ধি ১২ শতাংশ, সারাইকি ১০ শতাংশ, পশতু ৮ শতাংশ, উর্দু ৮ শতাংশ, বেলুচি ৩ শতাংশ এবং অন্যান্য ১১ শতাংশ।
বর্তমানে যে অঞ্চল নিয়ে পাকিস্তান গঠিত এখানে এককালে নব্যপ্রস্তর যুগের মেহেরগড়সহ বেশ কয়েকটি প্রাচীন সংস্কৃতি এবং ব্রোঞ্জ যুগের সিন্ধু উপত্যকা সভ্যতার উৎপত্তিস্থল ছিল এবং পরবর্তীকালে হিন্দু, ইন্দো-গ্রিক, মুসলিম, তুর্কো-মঙ্গল, আফগান ও শিখসহ বিভিন্ন ধর্ম ও সংস্কৃতির লোকদের দ্বারা শাসিত কয়েকটি রাজ্যের কেন্দ্রস্থল ছিল। এই অঞ্চলটি অসংখ্য সা¤্রাজ্য ও রাজবংশ শাসন করেছে। যেমনÑ পারস্যের আচিমেনীয় সা¤্রাজ্য, মেসিডনের আলেকজান্ডার তৃতীয়, ভারতীয় মৌর্য সা¤্রাজ্য, আরব উমাইয়া খেলাফত, দিল্লি সুলতানাত, মঙ্গল সা¤্রাজ্য, মুঘল সা¤্রাজ্য, আফগান দুররানি সা¤্রাজ্য, শিখ সা¤্রাজ্য (আংশিকভাবে) এবং অতি সাম্প্রতিক ব্রিটিশ সা¤্রাজ্য।
মুসলিম দেশগুলোর মধ্যে পাকিস্তান অনন্য, কেননা ইসলামের নামে গঠিত এটাই একমাত্র দেশ। কায়েদে আযম মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর পাকিস্তান আন্দোলন এবং উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ফলে ভারতীয় মুসলিমদের স্বাধীন আবাসভূমি হিসেবে ১৯৪৭ সালের ১৪ আগস্ট পাকিস্তান সৃষ্টি হয়। এটি জাতিগত ও ভাষাগতভাবে একটি বিচিত্র দেশ এবং অনুরূপভাবে ভৌগোলিক ও বন্যপ্রাণীর দিক দিয়েও বৈচিত্র্যময়। পাকিস্তান ১৯৫৬ সালে একটি সংবিধান গ্রহণের মাধ্যমে একটি ইসলামিক প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। ১৯৭১ সালে জাতিগত যুদ্ধের ফলে পূর্ব পাকিস্তান স্বাধীন হয়ে বাংলাদেশ নামে আত্মপ্রকাশ করে।
আঞ্চলিক ও মধ্যম ক্ষমতাধর দেশ পাকিস্তানের বিশে^র ষষ্ঠ বৃহত্তম সশস্ত্র বাহিনী রয়েছে। পাকিস্তান পারমাণবিক ক্ষমতাধর এবং ঘোষিত পারমাণবিক অস্ত্রধারী দেশ। পাকিস্তান দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় পারমাণবিক ক্ষমতাধর দেশ এবং মুসলিম বিশে^ এই মর্যাদার একমাত্র দেশ। পাকিস্তানের অর্থনীতি আধা শিল্পায়িত এবং এর একটি সুসমন্বিত কৃষিখাত রয়েছে। পাকিস্তান বিশ্বের উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর মধ্যে অন্যতম। পাকিস্তানের মুদ্রার নাম রুপি।
পাকিস্তানের স্বাধীনতা পরবর্তী ইতিহাসের ঘটনাবলির মধ্যে রয়েছে সামরিক শাসন, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা এবং প্রতিবেশী ভারতের সাথে যুদ্ধ। পাকিস্তান জাতিসংঘ, জোট নিরপেক্ষ আন্দোলন, ইসলামী সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি), কমনওয়েলথ দেশসমূহ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা সংস্থা, সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা, দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক), ডেভেলপিং এইট (ডি৮) এবং জি২০ উন্নয়নশীল দেশসমূহ, গ্রুপ অব ২৪, গ্রুপ অব ৭৭ ও ইকোসকের সদস্য।
পাকিস্তানের গিলগিট-বালতিস্তান ও আজাদ কাশ্মির প্রচন্ড ভূমিকম্পন প্রবণ এলাকা। হিমালয় অঞ্চলের মধ্যে এই অঞ্চলেই সর্বোচ্চ হারের ভূকম্পন ও বৃহত্তম ভূমিকম্প সংঘটিত হয়। দক্ষিণের উপকূলীয় এলাকা থেকে উত্তরের হিমাবৃত পর্বতগুলো পর্যন্ত ভূদৃশ্য সমভূমি থেকে মরুভূমি, বনভূমি, পাহাড়-পর্বত ও উপত্যকায় বৈচিত্র্যপূর্ণ। পাকিস্তান তিনটি প্রধান ভৌগোলিক এলাকায় বিভক্ত : উত্তরাঞ্চলীয় উচ্চভূমি, সিন্ধুনদ সমভূমি ও বেলুচিস্তান উপত্যকা।
উত্তরাঞ্চলীয় উচ্চভূমিতে রয়েছে কারাকোরাম, হিন্দুকুশ ও পামির পার্বত্য রেঞ্জ। এখানে বিশে^র বেশ কয়েকটি সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ রয়েছে। এখানে আট হাজার মিটার বা ২৬ হাজার ২৫০ ফুটের বেশি উচ্চতার যে ১৪টি পর্বত রয়েছে সেগুলোর মধ্যে পাঁচটি সারা বিশে^র অভিযাত্রিক ও পর্বতারোহীদের আকৃষ্ট করে। এগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্বত কেটু (উচ্চতা ৮,৬১১ মিটার বা ২৮,২৫১ ফুট) ও নবম সর্বোচ্চ পর্বত নাঙ্গা পর্বত (৮,১২৬ মিটার বা ২৬,৬৬০ ফুট)। বেলুচিস্তান উপত্যকা পশ্চিমে এবং থর মরুভূমি পূর্বে অবস্থিত। পাকিস্তানের কাতপানা মরুভূমি বিশে^র সবচেয়ে ঠান্ডা মরুভূমি। ১,৬০৯ কিলোমিটার বা এক হাজার মাইল লম্বা সিন্ধু নদ এবং তার শাখা-প্রশাখাগুলো কাশ্মির অঞ্চল থেকে আরব সাগরের দিকে বয়ে গেছে।
পাকিস্তানের আবহাওয়া গ্রীষ্মমন্ডলীয় ও নাতিশীতোষ্ণতার মধ্যে ওঠানামা করে। উপকূলীয় দক্ষিণে ঊষর পরিস্থিতি বিরাজ করে। বর্ষাকালে প্রবল বর্ষণের দরুন ঘনঘন বন্যা হয় এবং শুষ্ক মওসুমে তাৎপর্যপূর্ণভাবে কম অথবা মোটেই বৃষ্টিপাত হয় না। পাকিস্তানে চারটি প্রধান ঋতু বিদ্যমান : ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ঠান্ডা শুষ্ক শীতকাল; মার্চ থেকে মে পর্যন্ত গরম, শুষ্ক বসন্তকাল; জুন থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত গ্রীষ্ম বর্ষা মওসুম বা দক্ষিণ-পশ্চিমের বর্ষার প্রারম্ভকাল এবং অক্টোবর ও নভেম্বর বর্ষার শেষকাল।
পাকিস্তান একটি গণতান্ত্রিক সংসদীয় ফেডারেল প্রজাতন্ত্র। ইসলাম এদেশের রাষ্ট্রধর্ম। বর্তমানে দেশটিতে বহুদলীয় সংসদীয় ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত রয়েছে। সরকারের শাখাগুলোর মধ্যে ক্ষমতার সুস্পষ্ট বিভক্তি ও ভারসাম্য রয়েছে। পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক প্রধান, তিনি সংসদ সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত হন। সরকারের মূল ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে। পাকিস্তানের বর্তমান প্রেসিডেন্ট মামনুন হোসাইন এবং প্রধানমন্ত্রী শহীদ খাকান আব্বাসি। পাকিস্তানে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা রয়েছে: ১০০ সদস্যের সিনেট (উচ্চকক্ষ) এবং ৩৪২ সদস্যের জাতীয় পরিষদ (নিম্নকক্ষ)। জাতীয় পরিষদের সদস্যরা জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন এবং সিনেট সদস্যরা প্রাদেশিক পরিষদের সদস্যদের দ্বারা নির্বাচিত হন। সিনেটে সকল প্রদেশের সমান প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। পাকিস্তানের চারটি প্রদেশে একই রকমের সরকারব্যবস্থা রয়েছে। প্রত্যেক প্রদেশে আবার প্রধান নির্বাহী মুখ্যমন্ত্রী ছাড়াও প্রেসিডেন্টের নিযুক্ত একজন প্রাদেশিক গভর্নর থাকেন, যিনি প্রদেশটির আনুষ্ঠানিক প্রধান।
পাকিস্তান যে চারটি প্রদেশ ও চারটি কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল নিয়ে গঠিত সেগুলো হলো যথাক্রমে বেলুচিস্তান (রাজধানী কোয়েটা), পাঞ্জাব (লাহোর), সিন্ধু (করাচি) ও খাইবার পাখতুনখোয়া (পেশোয়ার) এবং গিলগিট-বালতিস্তান (গিলগিট), কেন্দ্র শাসিত তিব্বত এলাকা (এফএটিএ), আযাদ কাশ্মির (মুযাফ্ফরাবাদ) ও ইসলামাবাদ রাজধানী অঞ্চল (ইসলামাবাদ)।

SHARE

Leave a Reply