Home খেলার চমক আরেকটি হতাশার সিরিজ -আবু আবদুল্লাহ

আরেকটি হতাশার সিরিজ -আবু আবদুল্লাহ

সাফল্যের জোয়ারে ভাসতে থাকা বাংলাদেশ ক্রিকেট হঠাৎ করেই যেন পড়ে গেল হতাশার অন্ধকারে। সর্বশেষ দক্ষিণ আফ্রিকা সফরটি ছিলো ব্যর্থতার চাদরে মোড়া। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অনেক দিন ধরেই বেশ সাফল্য দেখিয়ে আসছিলো টাইগার বাহিনী। বিশেষ করে ২০১৪ সালে মাশরাফি বিন মর্তুজার কাঁধে সীমিত ওভারের অধিনায়কত্বের দায়িত্ব আসার পর যেন একটি স্বপ্নযাত্রার মধ্য দিয়ে চলছিলো এদেশের ক্রিকেট। বিশ^কাপের কোয়ার্টার ফাইনালে যাওয়া, দেশের মাটিতে একে একে পাকিস্তান, ভারত আর দক্ষিণ আফ্রিকা ও ইংল্যান্ডকে পরাস্ত করার ঘটনায় বিশ্বক্রিকেটে নতুন করে আলোচিত হতে থাকে বাংলাদেশের নাম।
এরপর নিউজিল্যান্ড সফরে কিছুটা ছন্দপতন হলেও আবার শ্রীলঙ্কা সফর ও অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে দেশের মাটিতে জয়ের ধারায় ফেরে দল। কিন্তু এবারের বাংলাদেশ দলকে দেখে মনে হয়েছে তারা যেন খেলতেই ভুলে গেছে। যে মাঠে অবলীলায় রান তুলেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটসম্যানরা, সেখানে ব্যাট করতে নেমেই একের পর এক উইকেট বিসর্জন দিয়েছে বাংলাদেশ। বোলিং করেছেন যাচ্ছেতাই।

দায়িত্বহীন ব্যাটিং, ধারহীন বোলিং
ব্যাটিং, বোলিং এমনকি ফিল্ডিং- প্রতিটি সেক্টরে বাজে পারফরম্যান্স ছিলো বাংলাদেশের। দুই টেস্টেই খেলার ধরনে ছিলো না কোন পেশাদারিত্বের ছাপ। পচেফস্ট্রুমে প্রথম টেস্টের প্রথম ইনিংসে কিছুটা সম্মানজনক স্কোর করলেও (৩২০), দ্বিতীয় ইনিংসে অলআউট ৯০ রানে। ধৈর্যের পরিবর্তে ব্যাটসম্যানদের অত্যন্ত বাজেভাবে উইকেট বিলিয়ে দেয়া ছিলো চোখে লাগার মতো। অথচ এই টেস্টে প্রোটিয়ারা দুই ইনিংস ঘোষণা করেছে যথাক্রমে ৪৯৬/৩ ও ২৪৭/৬ রানে। প্রথম ইনিংসে তো বাংলাদেশী বোলাররা উইকেটের জন্য ‘মাথাকুটে মরেছে’। ব্লুমফন্টেইনে দ্বিতীয় টেস্টের চিত্রটা ছিলো আরো ভয়াবহ। এই টেস্টের কোন ইনিংসেই দুইশো পার হতে পারেনি বাংলাদেশ (১৪৭ ও ১৭২)। অথচ প্রথম ইনিংসেই দক্ষিণ আফ্রিকা ৪ উইকেটে ৫৭৩ রানের পাহাড় গড়ে ইনিংস ঘোষণা করে। অনেকদিন পর টেস্টের এক ইনিংসে চার ব্যাটসম্যানের সেঞ্চুরি দেখেছে এবার ক্রিকেটবিশ^। ফলাফল আরেকটি ফলোঅন ও ইনিংস পরাজয়ের লজ্জা। প্রথম টেস্টে ৩৩৩ রানে হারা বাংলাদেশ দ্বিতীয় টেস্টে হেরেছে এক ইনিংস ও ২৫৪ রানের বিশাল ব্যবধানে। দুই টেস্ট মিলিয়ে বাংলাদেশী বোলাররা উইকেট নিয়েছেন মাত্র ১৩টি। আর ব্যাটিংয়ে কোনো সেঞ্চুরি নেই, হাফ সেঞ্চুরিও মাত্র তিনটি।
ওয়ানডে সিরিজের চিত্রটা ছিলো আরো ভয়াবহ। বাংলাদেশী বোলারদের নিয়ে রীতিমত ছেলেখেলা করেছেন প্রোটিয়া ব্যাটসম্যানরা। কিম্বারলিতে প্রথম ওয়ানডেতে মুশফিকুর রহীমের সেঞ্চুরিতে (১১০) ভর করে ২৭৮ রান তুললেও তা পাত্তা পায়নি স্বাগতিকদের দুই ওপেনার কুইন্টন ডি কক ও হাশিম আমলার কাছে। ডি কক ১৬৮ ও আমলা ১১০ রানে অপরাজিত থেকে ম্যাচ জিতিয়েছেন ১০ উইকেটে। দ্বিতীয় ও তৃতীয় ওয়ানডেতে যথাক্রমে ১০৪ ও ২০০ রানের ব্যবধানে পরাজয়। এই দুই ম্যাচে আগে ব্যাট করে দক্ষিণ আফ্রিকা যথাক্রমে ৬ উইকেটে ৩৬৯ ও ৬ উইকেটে ৩৫৩ রান তোলে। ওয়ানডে সিরিজে তারা মোট রান করেছে ১০৩৭। ওয়ানডে ইতিহাসে যা আগে খুব কমই ঘটেছে।
একই মাঠ, একই উইকেট অথচ দুই দলের পারফরম্যান্সে কত পার্থক্য! যেন বাংলাদেশ দল ভুলেই গেছে কিভাবে ক্রিকেট খেলতে হয়। ব্যাটসম্যানরা যেমন দক্ষিণ আফ্রিকার পেসারদের বাউন্স আর সুইংয়ের সামনে মুখ থুবড়ে পড়েছেন, বোলাররা হারিয়ে ফেলেছেন লাইন লেন্থ। অতীতে বাংলাদেশের এত ধারহীন বোলিং কবে দেখা গেছে তা জানতে হলে পরিসংখ্যানের বই খুলে বসতে হবে। অথচ সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের উত্থানই ছিলো বোলারদের হাত ধরে। বিশেষ করে জিম্বাবুয়ের পেসার হিথ স্ট্রিক বোলিং কোচ হয়ে আসার পর বাংলাদেশের পেস আক্রমণ যেন ডানা মেলে উড়েছে পাখির মতো। মোস্তাফিজুর রহমান, তাসকিন আহমেদে, রুবেল হোসেনের সাথে অধিনায়ক মাশরাফির সমন্বয়ে পেস আক্রমণ ছিলো ঈর্ষণীয়। হিথ স্ট্রিকের বিদায়ের পর কোচ হয়ে এলেন আরেক কিংবদন্তি বোলার কোর্টনি ওয়ালশ; কিন্তু এবারের সিরিজে তার শীর্ষরা ছিলেন ‘নিধিরাম সর্দার’ হয়ে। দক্ষিণ আফ্রিকার বাউন্সি পিচে স্পিনারদের কাছ থেকে খুব একটা ভালো বোলিং আশা করা যায় না। তাই পেসাররাই ছিলেন ভরসা, কিন্তু তারা নামের প্রতি সুবিচার করতে পারেননি।
ডিয়ান এলগার টেস্ট সিরিজে সর্বোচ্চ রান করেছেন, ১১০ গড়ে ৩৩০। ওয়ানডেতে কুইন্টন ডি কক ১৪৩ গড়ে ২৮৭। টেস্টে সর্বোচ্চ ১৫ উইকেট নিয়েছেন কাগিসো রাবাদা, আর ওয়ানডেতে ইমরান তাহির ৬টি।

সঙ্গী ছিলো দুর্ভাগ্যও
পারফরম্যান্সের দুর্বলতা ছাড়াও দক্ষিণ আফ্রিকা সিরিজে মাঠের বাইরের বেশ কিছু বিষয় প্রভাব ফেলেছে দলের ওপর। ব্যক্তিগত কারণে টেস্ট সিরিজের সময় বিশ্রাম নিয়েছিলেন বিশে^র অন্যতম সেরা অলরাউন্ডার সাকিব আল হাসান। ব্যাটে কিংবা বলে-সাকিব দলের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য। তাই তার না থাকার প্রভাব পড়েছে অবশ্যই। ড্যাশিং ওপেনার তামিম ইকবাল ও কাটার মাস্টার খ্যাত পেসার মোস্তাফিজুর রহমান ইনজুরিতে পড়েছেন সিরিজের মাঝপথে। যার ফলে সবগুলো ম্যাচ খেলতে পারেননি তারা। দল নির্বাচন, টসের সিদ্ধান্ত, কোচ-অধিনায়ক সম্পর্কের জটিলতা নিয়ে মুশফিকুর রহীম নিজেই সংবাদমাধ্যমের কাছে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাই এসব বিষয় পারফরম্যান্সে প্রভাব ফেলেছে হয়তো।
সফরকারীদের বধ্যভূমি
একটা তথ্য থেকে সান্ত¡না পেতে পারে বাংলাদেশ দল- দক্ষিণ আফ্রিকা সফরে গিয়ে নাকানি চুবানি খাওয়ার ইতিহাস নতুন নয়। দেশের মাটিতে প্রোটিয়ারা সব সময়ই শক্তিশালী দল। গত কয়েক বছরে বিশ^সেরা দলগুলোরও রেকর্ড আছে সেখান গিয়ে বাজেভাবে হারার। ২০১৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকা গিয়ে ওয়ানডে ও টি-টোয়েন্টি সিরিজ দুটোই হেরেছে ভারত। গত বছরই অস্ট্রেলিয়া ৫-০ ব্যবধানে ওয়ানডে সিরিজে হোয়াইটওয়াশ হয়েছে। একই বছর শ্রীলঙ্কাও হেরেছে একই ব্যবধানে। এর আগের বছর ওয়েস্ট ইন্ডিজ ওয়ানডে সিরিজ হেরেছে ৪-১ ব্যবধানে, ইংল্যান্ড ৩-২ ব্যবধানে। ইংল্যান্ড টি-টোয়েন্টি সিরিজও হেরেছে ২-০ ব্যবধানে।
সাকিবের অর্জন
অনেক হতাশার মাঝেও এই সিরিজে একটি মাইলফলক ছুঁয়েছেন সাকিব আল হাসান। সবচেয়ে কম ম্যাচ খেলে ওয়ানডে ক্রিকেটে দুইশো উইকেট ও পাঁচ হাজার রান করার কৃতিত্ব এখন তার। এই বিশ্বরেকর্ড গড়তে টাইগার অলরাউন্ডার ম্যাচ খেলেছেন ১৭৮টি। দুইশো উইকেট আগেই পেয়েছেন, এবার সিরিজের প্রথম ম্যাচে পূরণ করেন ব্যক্তিগত পাঁচ হাজার ওয়ানডে রান। এই মাইলফলকে পৌঁছতে জ্যাক ক্যালিসের লেগেছিল ২২১ ম্যাচ। সনথ জয়াসুরিয়ার ২৩৫ ও শহীদ আফ্রিদির ২৩৯ ও আব্দুল রাজ্জাকের ২৫৮ ম্যাচ। একই সাথে তামিম ইকবালের পর বাংলাদেশের দ্বিতীয় ব্যাটসম্যান হিসেবে সাকিব ছুঁলেন পাঁচ হাজার ওয়ানডে রান।

SHARE

Leave a Reply