Home প্রচ্ছদ রচনা শিল্পী পাখির বাসা -ড. রফিক রইচ

শিল্পী পাখির বাসা -ড. রফিক রইচ

আজকের পাঠক আগামীর বিজ্ঞ লেখক আমার প্রিয়ভাজন বন্ধুরা! তোমরা তো জান এবং মানো আমাদের এ দেশ বাংলাদেশে ছয়টি ঋতু আছে। ঋতুগুলো বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে যার যার মত আলাদা। একেক ঋতুর একেক রূপ। পরিবেশের রূপই বলে দেয় এটা কোন ঋতু। ঋতুগুলোর এমন চোখে পড়ার মতো বিচিত্রতা অন্য কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। সেদিক থেকে আমরা এগিয়ে বলতেই হবে। আগামীতে আমরা অন্যান্য দিক থেকেও এগিয়ে যাবো অন্যান্য দেশের চাইতে সে প্রত্যাশা মনমগজে নিয়ে ছয় ঋতুর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি ঋতু হেমন্ত ও পাশাপাশি বাবুই পাখির বাসা নিয়ে কিছু কথা লিখে আজকের লেখাটি শেষ করতে চাই। লেখাটিতে থাকবে খানিকটা বিচিত্রতা। আশা করি তাতে তোমাদের ভালোই লাগবে।
ছোট বন্ধুরা, তোমরা তো জান দুই মাস পর পর ঋতু বদল হয়। অর্থাৎ প্রত্যেক ঋতুর ভাগে পড়ে মাত্র দুটো মাস। হেমন্ত ঋতুও এর বাইরে নয়। কার্তিক এবং অগ্রহায়ণ মাস হলো হেমন্তকাল। হেমন্ত পিঠে করে বয়ে আনে শীত ও শিশির কণা, এজন্য হেমন্তকে শীতের পূর্বাভাস বলে অনেকেই। এ সময় গরমের দাপট নেই আবার শীতের ভয়ঙ্কর প্রকোপও নেই। নেই বৃষ্টির মাখামাখি। এক কথায় আরাম মত বসবাসের সময় হলো হেমন্তকাল। এ সময় শিশির পড়তে শুরু করে দূর্বাঘাসের শীর্ষে। মাঠ ঘাট পাকা ধানে ভরে সোনালি রঙে রঞ্জিত হয়। কৃষকেরা কাস্তের মাধ্যমে সোনালি ধান মাঠ থেকে কেটে নিয়ে প্রকৃতি রিক্ত করলেও সিক্ত হয় কৃষকের হাত। বাড়ির উঠোন ভরে যায় সোনালি ধানে। পায়েস পিঠা খাওয়ার ধুম পড়ে যায়। সোনালি স্বপ্ন বোনে কৃষক বেঁচে থাকার, টিকে থাকার। আগের দিনে বছর শুরু হতো হেমন্ত দিয়ে, সম্রাট আকবর অগ্রহায়ণ মাসকেই বছরের প্রথম মাস হিসাবে ধরে বছর শুরু করার প্রচলন করেন। এ মাসকে ঘোষণা করেন খাজনা তোলার মাস।
এ সময় প্রকৃতি রিক্ত হলেও ফোটে নানা ধরনের ফুল। এর মধ্যে মল্লিকা, গন্ধরাজ, শিউলি, হিমঝুরি, কামিনী, রাজ অশোক, ছাতিম, বকুলফুল, দেব কাঞ্চন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। হেমন্ত নিয়ে কবি-লেখকদের লেখার শেষ যেন নেই। রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, সুফিয়া কামাল, জসীমউদ্দীন, জীবনানন্দ দাশসহ অসংখ্য গুণী লেখকের কলমে উঠে এসেছে এই হেমন্ত। অন্য দিকে এ সময় বর্ষার বিদায়টা পরিপূর্ণভাবে হয়ে যায়। যদিও আষাঢ়-শ্রাবণ বর্ষাকাল কিন্তু এ সময়টা শরতের শেষ সময় অর্থাৎ আশ্বিন পর্যন্ত বা কখনো কখনো আরো দীর্ঘায়িত হয়। বর্ষায় ধুয়ে মুছে পরিষ্কার হয় প্রকৃতি। নতুন পলি বয়ে আনে বর্ষা। এতে মাঠ ঘাট ফসলি জমি উর্বর হয়। সবুজে শ্যামলে ভরে ওঠে প্রকৃতি। শুরু হয় শরৎ। শরৎ চোখে পড়ে আশ্বিনে প্রকটভাবে। এ সময় আকাশে সাদা মেঘের ঝাঁক ঘুরে বেড়ায় শৌখিনভাবে। পানিতে ভরাট নদীর দুই পাড় সাদা কাশফুলে ভরে যায়। বৃষ্টিভেজা নরম জমিতে রোপণ হয় আমন আউশের নতুন লকলকে চারা। বেড়ে ওঠে। শরৎজুড়ে হেমন্তের শুরুতে অর্থাৎ কার্তিকে শরতের সময় রোপণকৃত ধান পরিপক্বতার দিকে ধাবিত হয়। এ সময় দুধ ধানে ভরে যায় জমি মাঠ ঘাট, মাঠের প্রান্তর। আগামীর গল্পের বন্ধুরা তোমরা জান কিনা জানি না ফসলি জমির এ দুধ ধান বাবুই পাখির বাচ্চাদের বা ছানাদের খুবই প্রিয় ও পছন্দের খাবার। যে কারণে বলা যায় শরৎকাল থেকেই জোরেশোরে শুরু হয় বাবুই পাখিদের বাসা বুননের কাজ। দুই রকমের বাসা বোনে বাবুই। বাসা বুননের দিক থেকে সব পাখির মধ্যে সেরা হওয়ায় এ পাখিকে ডবধনবৎ নরৎফ বা তাঁতি পাখি বলে। বাবুই পাখির বাসাকে সকল পাখির বাসার রাজা বা রানি বললে ভুল বলা হবে না। এ বাসার কারুকাজ এত সুন্দর ও শিল্পে ভরা যা দুই চোখ দিয়ে না দেখলে বা মগজ দিয়ে ভালো মতন চিন্তা না করলে বোঝা যাবে না।
বাবুই পাখিরা বসতবাড়ির আশপাশ, নদী বা পুকুরের পাড়ে বা ফসলি জমির কাছাকাছি কোনো ভিটা যেখানে খাদ্যের ব্যাপক উৎস থাকে সেখানে খেজুর গাছ, নারিকেল, তালগাছ, সুপারি গাছ, বাবলা গাছ, মাদার গাছ, রেইনট্রিসহ আখের ক্ষেতে বাসা বাঁধে। যাতে করে নিজেদের খাবার ও নিজ ছানাদের বা বাচ্চাদের খাবার পেতে কোনো রকম অসুবিধা না হয়। আত্মরক্ষাও হয় ভালো মতন। এসব গাছে শিকারি প্রাণীদের আক্রমণ অনেক কম হয়। বাবুই পাখি কলোনি করে অর্থাৎ দলবদ্ধভাবে বাসা তৈরি করে। অর্থাৎ একই গাছে অনেক বাসা করে এরা। এদের বাসা হয় উল্টানো কলসির মত। প্রথমে দু’মুখ খোলা বাসা তৈরি করে পরে এক মুখ বন্ধ করে ডিম রাখার ব্যবস্থা করা হয়। অন্য মুখ বাসার প্রবেশ দরজা হিসেবে ব্যবহার হয়। এরা বিভিন্ন নকশার বাসা বানালেও প্রধানত দু’ধরনের বাসা বেশি চোখে পড়ে। একটিতে ডিম রাখার জায়গাসহ প্রবেশ দরজা থাকে। অন্যটি অনেকটা দোলনার মতো। বাসাটি যখন বাতাসে দোলে তখন এটিকে দোলনার মতোই মনে হয়। তবে এ দোলনায় চমৎকার ছাউনি থাকে। বাসা তৈরির উপকরণ হিসেবে এরা খড়, তালগাছের কচিপাতা, ঝাউ, কাশবনের লতাপাতা, নলখাগড়া ইত্যাদি ব্যবহার করে থাকে। বাসাটি প্রথম শুরু করে উল্লিখিত গাছগুলোর পাতার সরু অংশ থেকে। খুবই দক্ষতার সাথে প্রথমে বাঁধাইয়ের কাজটি করে। যাতে প্রবল ঝড়েও বাসাটি খুলে না যায়। বুননের শৈল্পিক ছোঁয়ায় বাসাটি কখনো ভেঙে পড়ে না বা ছিঁড়ে পড়ে না। তা ছাড়া এ বাসাকে টেনে ছেঁড়াও যায় না। এরা ঠোঁট দিয়ে ঘাসের আস্তর ছাড়ায় আর পেট দিয়ে ঘষে গোল অবয়ব মসৃণ করে। অর্থাৎ পালিশ করে বাসার উপকরণ তৈরি করে। এবং তা দিয়ে বাসা বুননের কাজ করে। বাসা বুননের সময় এরা বাসার ভেতর শরীর ঢুকিয়ে প্রশস্ত করার কাজটি করে।
এক মৌসুমে একটি বাবুই ছয়টি বাসা তৈরি করে। এদের একেকটি বাসা তৈরি করতে ১০-১২ দিন সময় লাগে। বাসা তৈরি হয়ে গেলে স্ত্রী বাবুই এতে ২-৪টি ডিম দেয়। ১৪-১৭ দিন পর ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। বাচ্চা হলে স্ত্রী বাবুই ধানক্ষেত থেকে দুধ ধান এনে ছানাদের খাওয়ায় ও বড় করে তোলে। বাবুই পাখিদের এ বাসা তৈরি ধান রোপণ থেকে পেকে যাওয়া পর্যন্ত বেশি চোখে পড়ে।
বিশ্বে বাবুইদের ১১৭টি প্রজাতি থাকলেও বাংলাদেশে রয়েছে মাত্র তিনটি প্রজাতি। এরা হলো যথাক্রমে বাংলা বাবুই, দাগি বাবুই এবং দেশী বাবুই। এর মধ্যে বাংলা এবং দাগি বাবুই বিলুপ্তির পথে রয়েছে। অর্থাৎ হারিয়ে যেতে বসেছে। যেসব বাসা এখন সচরাচর চোখে পড়ে সেগুলো দেশী বাবুইদের। আগের মতো আর বাবুইদের বাসা চোখে পড়ে না। মাত্র ৫-২০ বছর আগেও গ্রামের তালগাছ, সুপারি গাছ, নারিকেল গাছ, খেজুর গাছে প্রচুর পরিমাণে দেখা যেত বাবুই পাখির বাসা।
এ বাসাগুলো কমে যাওয়ার পেছনে
নানা কারণ জড়িত-
১. পরিবেশ বিপর্যয়ের কারণে বাবুইদের সংখ্যা দিন দিন কমে যাওয়া।
২. মানুষের আশপাশে বাসাগুলো নির্মিত হওয়ায় মানুষের দ্বারা বাসাগুলো নষ্ট হওয়া।
৩. গরির এক শ্রেণীর মানুষ এ বাসাগুলো সংগ্রহ করে ধনীদের নিকট বিক্রি করা।
৪. ড্রয়িং রুমে শৌখিন পণ্য হিসেবে ব্যবহার হওয়া।
৫. তালগাছ, নারিকেল গাছ, খেজুর গাছের সংখ্যা সাংঘাতিকভাবে কমে যাওয়া।
৬. জনবসতি বৃদ্ধি পাওয়া।
৭. শিকারিদের নির্বিচারে এসব পাখি শিকার করা ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

ছোট বন্ধুরা! আবার জলবায়ুর পরিবর্তনের কারণে কয়েক বছর হলো ছয় ঋতুর মধ্যে কেবল চারটি ঋতু প্রকটভাবে বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে। যেমন গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ ও শীত। হেমন্ত ও বসন্তকাল প্রকৃতি থেকে হারিয়ে যেতেই বসেছে। শরৎও এর মধ্যে পড়ে যাচ্ছে প্রায়।
আগামীর বিজ্ঞানী আমার বিশেষ বন্ধুরা, আমরা মানুষেরাই পারি বাবুই পাখিদের বাঁচিয়ে রাখতে, টিকিয়ে রাখতে। হেমন্তকে টিকিয়ে রাখতে। তাতে করে আমরাই সবার চাইতে বেশি উপকৃত হবো- যেটি পরিবেশের দিক থেকে, আনন্দ বিনোদনের দিক থেকে সর্বোপরি শিল্পীর বাঁচার দিক থেকে।

SHARE

Leave a Reply