Home নিবন্ধ নাফের পানিতে ভাসছে মানবতা -ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ

নাফের পানিতে ভাসছে মানবতা -ড. মাহফুজুর রহমান আখন্দ

আয়লান। একজন শিশু, একটি ইতিহাস। জীবিত থেকে নয়, মরেই ইতিহাস গড়েছিল সে। ২০১৫ সালের পড়ন্ত বিকেলে। ভূমধ্যসাগরের তুরস্কের উপকূলে ভেসে আসে তার মৃতদেহ। যুদ্ধকবলিত সিরিয়া থেকে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ইউরোপের পথে পরিবারসহ যাচ্ছিল শিশুটি। পথে নৌকা ডুবে সলিলসমাধি ঘটে তার। এরপর সৈকতের বালুতে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা আয়লান হয়ে ওঠে বিশ্বমিডিয়ার চাঞ্চল্যকর খবর। ফেসবুক, টুইটারসহ ইলেকট্রনিক এবং প্রিন্টিং মিডিয়ায় ঝড় তোলে সে। সাহিত্যিক-সাংবাদিক কলমের কালি ছুড়তে থাকেন তার শোকে। শহর পেরিয়ে সে ঝড় বয়ে চলে গাঁও-গেরামের মোড়ে মোড়ে, ছোটখাটো দোকানের চায়ের কাপেও। জীবন্ত কোটি আয়লানের চেয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকা মৃত আয়লান হয়ে ওঠে অনেক বেশি শক্তিশালী। ইউরোপ শরণার্থী হিসেবে গ্রহণ করতে থাকে সিরিয়া সঙ্কটে পড়া হাজারো মানুষকে। ভূমধ্যসাগরের সৈকতে পড়ে থাকা আয়লান বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিয়েছিল, মানবতা আজ সাগরতীরেই ভাসছে।
আয়লান ভাসছে আজও। তবে একা নয়, শত শত আয়লান। হাজারো স্বপ্নচোখ। ভূমধ্যসাগরে নয়, নাফ নদীতে। প্রতিদিন জড়ো হচ্ছে আয়লানের শত শত বন্ধু, খেলার সাথী। ঝড় উঠছে আজও। মিডিয়াতেও চলছে প্রতিবাদ। সে ঝড়ের বাতাস এখনো হয়তো স্পর্শ করেনি সু চির নির্দয় প্রাণে, সামরিক জান্তার মানবনিধন মিশনে কিংবা মগ-বৌদ্ধদের গেরুয়া পোশাকে।
মিয়ানমার। আধুনিক সময়ের একটি রাষ্ট্র। ব্রহ্মদেশ থেকে বার্মা নাম নিয়েছিল বেশ আগেই। ১৯৮৯ সাল থেকে এখন মিয়ানমার। নিজেকে অনেক বেশি সুসভ্য দেখাতে চায়! শান্তিতে নোবেল পাওয়া নেত্রী তাদের। অনেক গর্বের ব্যাপার। বাংলাদেশের একান্ত কাছের প্রতিবেশী। কক্সবাজারের টেকনাফ অঞ্চলের নাফ নদীটিই সীমান্ত এলাকা। এপাড় থেকে দেখা যায় ওপাড়ের সব দৃশ্য। এ যেন কোন গাঁয়ের এ পাড়া ও পাড়ার বন্ধুত্ব। এ বন্ধুত্ব আজকের নয়, হাজার বছরের। কিংবা তার চেয়েও অনেক বেশি সময়ের।
সাতটি রাজ্যের সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে এ দেশটি। বাংলাদেশের কোল ঘেঁষে যে রাজ্য তার নাম ‘রাখাইন স্টেট’। ১৯৭৪ সালের আগে এটি আরাকান নামে পরিচিত ছিল। দীর্ঘদিন যাবৎ বাংলাদেশের চট্টগ্রামও ছিল আরাকানের সাথে। এ আরাকানের সাথে মিয়ানমারের যে সীমান্ত তার পুরোটা জুড়ে ইয়োমা পাহাড়। জল কিংবা স্থলপথে তাই আরাকানিরা মিয়ানমারে যেতে পারে না সহজে। ওরাও আরাকানে আসতে পারে না ইচ্ছে করলেই। তাইতো চট্টগ্রাম এবং বাংলাদেশের সাথেই আরাকানের সখ্য। ইচ্ছে হলেই নাফ পাড়ি দিয়ে এপাড়ে চলে আসা। বাংলাদেশের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সাথে তাদেরও অনেক মিল। আরাকানের রাজ্যসভায় বসেই মহাকাব্য লিখেছেন মহাকবি আলাওল। কবি দৌলত কাজী, নসরুল্লাহ খন্দকারসহ মধ্যযুগের হাজারো কবি বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন আরাকান থেকেই।
শুধু যোগাযোগের সুবিধাই নয়। চট্টগ্রাম-আরাকান এক রাজ্য ছিল দীর্ঘকাল। তাইতো তাদের ভাষা ও সংস্কৃতিতেও এতো মিল। হাজার বছর আগে যখন চট্টগ্রামে ইসলামের প্রসার ঘটে তখনই ইসলামে আলোকিত হয় আরাকান। আরাকানি মুসলমানদের ইতিহাস তাই হাজার বছরেরও বেশি পুরনো। সেখানে মুসলিম শাসক ছিল, মন্ত্রী-প্রধানমন্ত্রী ছিল, বিচারক পদে কাজী ছিল, এমনকি সামরিক বিভাগের প্রধানও ছিল মুসলমান। মুসলিম ঐতিহ্যের সে আরাকান আজ জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ড। নির্বিচারে হত্যা করা হচ্ছে রোহিঙ্গাদের। পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে তাদের বসতবাড়ি। দখল করা হচ্ছে জমিজমাসহ সমস্ত সম্পত্তি। চোখের সামনেই নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে একটি জাতিসত্তা।
এ নির্মমতা আজ নতুন নয়। ব্রিটিশরা চলে যাওয়ার সময়ই ইতিহাস বিকৃতির বীজ বুনে যায়। সেই থেকে চলছে মানবতাবিরোধী এ কর্মকান্ড। শিশু-কিশোর, নারী, বৃদ্ধ কেউই রেহায় পাচ্ছে না তাদের জঘন্য থাবা থেকে। সবচেয়ে বেশি টার্গেট তরুণ-তরুণীরা। উঠতি বয়সের এ তারুণ্যকে মাটিতে মিশে দিয়ে যাচ্ছে সেখানকার সেনাবাহিনী, রাখাইন নামে পরিচয় দেয়া মগ এবং ধর্মের নামে গেরুয়া পোশাকে ঢাকা বৌদ্ধসমাজের প্রতিনিধিরা। তাদের ধর্মে জীব হত্যা মহাপাপ হলেও মুসলমান হত্যায় নাকি কোন পাপ নেই। এমন অমানবিক আচরণে গৌতম বুদ্ধও হয়তো লজ্জিত হচ্ছেন, হচ্ছেন রাগান্বিত।
সম্প্রতি মিয়ানমারের রাখাইন স্টেটে আবারো চলছে রোহিঙ্গা গণহত্যা। পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে বাড়িঘর, পুড়িয়ে মারা হচ্ছে মানুষ। নির্বিচারে গুলি করে হত্যা করছে সেনাবাহিনী। ধারালো অস্ত্র দিয়ে অমানবিকভাবে হত্যা করে চলেছে মগ-বৌদ্ধরা। নারী-পুরুষ, কিশোর-বৃদ্ধ থেকে শুরু করে এ নির্মম গণহত্যার শিকার হচ্ছে অবুঝ শিশুরাও। প্রাণ বাঁচাতে আয়লানদের মতোই নৌকায় চেপে সাগর ও নদী পাড়ি দিয়ে বাংলাদেশে আসছে রাখাইনের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী। পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের বেশির ভাগই নারী ও শিশু। জলপথের ঝুঁকির এ যাত্রায় প্রতিনিয়ত নৌকাডুবির ঘটনায় সাগরতীরে ভেসে আসছে একের পর এক রোহিঙ্গা শিশু। দেখা মিলেছে অসংখ্য রোহিঙ্গা শিশুর বেওয়ারিশ লাশ। সবাই মারা গেছে নৌকাডুবিতে। নাফের তীরে এসব ফুটফুটে চেহারার নিষ্পাপ শিশুর অপ্রত্যাশিত মৃতদেহ যেন স্থবির করে দিচ্ছে গোটা পৃথিবীকে।
মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের নৌকাডুবি ঘটেছে অসংখ্য। গত ৩০ আগস্ট রাত ১২টার দিকে শাহপরী দ্বীপের পাশে নৌকাডুবিতে ১৯ রোহিঙ্গা নারী-শিশুর লাশ ভেসে ওঠে। সেদিন গভীর রাতে সাগরের ঢেউয়ে ভেসে আসে ১০ শিশুর মৃতদেহ। একেবারে কোলের শিশু থেকে সাত-আট বছর বয়সী শিশুর মৃতদেহও ভেসে এসেছিল নদীর কিনারায়। মর্মান্তিক এ দৃশ্যে হতবাক পৃথিবী। এরপরও থামেনি সেই মৃত্যুর মিছিল। রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আসা থামেনি, নৌকাডুবিও ঘটছে প্রতিনিয়ত। প্রতিটি ভোরেই নাফ নদী অথবা সৈকতে মিলছে কোনো না কোনো রোহিঙ্গা শিশুর মৃতদেহ। প্রতিটি শিশুর লাশের দৃশ্য যেন পুরো দুনিয়ার আকাশ-বাতাস ভারী করে তুলছে। প্রতিনিয়ত বালুচরে মুখ থুবড়ে পড়ে থাকছে অসংখ্য আয়লান।
রোহিঙ্গা শিশুদের ভেসে আসা লাশ দেখে যে কারো হৃদয় কেঁপে উঠবে। নাফ নদীর এ পাড়ের মানুষগুলোর সঙ্গে রোহিঙ্গা শিশুরা অপরিচিত, অনাত্মীয়। তবু এই রোহিঙ্গা শিশুর লাশ দেখে এপাড়ের বহু মানুষের চোখের পানি গড়িয়ে মিশেছে নাফের ঢেউয়ে, সাগরের নোনা পানিতে। আরাকানের সোনালি ইতিহাসের নির্মাতা এসব মানুষ এখন রাষ্ট্রহীন, পরিচয়হীন। বিশ্ববাসীর কাছে এতোটাই মূল্যহীন এই শিশুরা! আজও বন্ধ হচ্ছে না গণহত্যা, বন্ধ হচ্ছে না লাশের মিছিল।
কয়েক দিন আগের কথা। একটি খাবার হোটেলের সামনে গলাগলি করে দাঁড়িয়ে আছে দু’টি শিশু। মোহাই এবং ইয়াজ। তারা দুই ভাই। বড় ভাইয়ের বয়স ১২ ও ছোট ভাইয়ের ৮ বছর। দৃষ্টি হোটেলের ভেতরে। তীব্র ক্ষুধার ছাপ চোখে মুখে। হোটেলটির সাইনবোর্ড না থাকলেও খাবারের খ্যাতি এলাকার সবার মুখে মুখে। তাই ভিড় লেগেই থাকে। খাবার কেনার টাকা নেই। তাই ওরা হোটেলে ঢোকার সাহস পাচ্ছে না। কারও কাছে চাইবে সেই সাহসও নেই। বড় ঘরের সন্তান। কখনো হাত পাতেনি কারো কাছে। লজ্জা আর পেটের ক্ষুধায় ¤্রয়িমাণ হয়ে যাচ্ছিল ওদের চেহারা। টেকনাফ শহরে এমন দৃশ্য এখন চোখ সওয়া। অনেক রোহিঙ্গা শিশু-কিশোর এখন টেকনাফের পথে পথে ঘুরছে। খাবারের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকছে। মোহাই-ইয়াজও সে রোহিঙ্গা দলের প্রতিনিধি। পেটে ক্ষুধার তীব্র জ্বালা থাকলেও চোখের লজ্জা আর হৃদয়ের সংকোচ তাদের বেঁধে রেখেছিল হোটেলের বাইরে।
মোহাই-ইয়াজ সকালেই নৌকায় করে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের মংগদু থেকে শাহপরীর দ্বীপে এসে নেমেছে। তারপর সেখান থেকে ট্রাকে করে এসেছে টেকনাফ শহরে। স্থানীয় কিছু স্বেচ্ছাসেবক ছোট ছোট ট্রাকে করে বিনা ভাড়ায় এপারে আসা রোহিঙ্গাদের শাহপরীর দ্বীপ থেকে টেকনাফ শহরে আনার ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু নাফ নদী পার হতে জনপ্রতি বাংলাদেশি মুদ্রায় দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা লাগে। মোহাই-ইয়াজও নাফ নদী পার হয়েছে। তবে বিনা ভাড়ায়। দুনিয়ায় ওদের আর কেউ নেই। নৌকায় তারা অন্যদের মালামাল ওঠা-নামায় সাহায্য করেছে। তাদের দুঃখের কথা শুনে ভাড়া নেয়নি নৌকার মাঝি।
মংগডুর মংনিপাড়া গ্রামের উত্তরপাড়ায় ছিল মোহাইদের বাড়ি। সেগুন কাঠে বানানো সুন্দর ছিমছাম ঘর। দাদার পাবিরাবিক সমৃদ্ধি আর ঐতিহ্যের স্মৃতি নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল বাড়িটি। সুখের সংসারে মা-বাবা এবং একটি বোনসহ ওরা দুই ভাই। ঈদের পরের দিন বিকেলে বাড়ির পাশের মাঠে প্রতিদিনের মতো খেলতে গিয়েছিল দুই ভাই। বাড়িতে ছিলেন মা-বাবা আর বোন। ঘরের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে আগুন লাগিয়ে দেয় মিয়ানমারের সেনাসদস্যরা। বসতবাড়ির সাথে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে তাদের বাবা-মা বোন। পুরো গ্রামটিই জ্বালিয়ে দিয়েছিল সেদিন। দুই ভাই ভয়ে পালিয়ে জীবন বাঁচায় পাহাড়ের জঙ্গলে। তিন দিন না খেয়ে অন্যদের সাথে পাহাড়িয়া পথে, খাল-বিলের কাদাপানি পেরিয়ে নৌকায় পা রাখে ওরা। সকালে শাহপরীর দ্বীপে এলে এক প্যাকেট বিস্কুট পেয়েছিল। সেটাই খেয়েছে দুই ভাই। মোহাই-ইয়াজের কান্না ছড়িয়ে পড়ে উপস্থিত সকলের চোখে-মুখে।
শুধুমাত্র মোহাই-ইয়াজ নয়। হাজার হাজার শিশু এখন অভিভাবকহীন। তারা বাংলাদেশে এসেছে বাবা-মা কিংবা আত্মীয়-স্বজন ছাড়াই। আপনজনকে হারিয়ে অন্য কোনো পরিবারের সাথেই বাংলাদেশে আসছে তারা। নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে এদের পরিবারের সকলকে। দুই লাখেরও বেশি শিশু-কিশোর এসেছে বাংলাদেশে। এদের অধিকাংশের বয়স দশ-বারো বছরের নিচে। তাদের প্রায় অর্ধেকের সাথেই বাবা কিংবা বড় ভাই নেই। মা কিংবা দাদির সাথে আসছে তারা। গণহত্যার ভয়াবহতার তেমন কোনো বিবরণই দিতে পারে না এসব শিশু। তাদের অভিভাবকদের ভাগ্যে কী ঘটেছে সেটি তারা প্রকাশ করতে পারে না। ভয়াবহতার স্মৃতি বুকে ধরে চেয়ে থাকে ফ্যাল্ফ্যাল করে। চোখের কোণায় ঝরে পড়ে কষ্টের নোনা জল। সে জলও শুকিয়ে গেছে অনেকের। মানসিক রোগ কিংবা ট্রমা থেকে তারা কি কখনো বেরিয়ে স্বাভাবিক হতে পারবে? হায়রে পৃথিবী! হায়রে সভ্যতা! নাফের পানিতে ভাসছে মানবতা!

SHARE

Leave a Reply