Home সম্পূর্ণ কিশোর উপন্যাস মায়ের জন্য ভালোবাসা -মূল : ডন রাইট ভাষান্তর :...

মায়ের জন্য ভালোবাসা -মূল : ডন রাইট ভাষান্তর : হোসেন মাহমুদ

গ্রীষ্মের এক রোদ ঝলমলে দিন। সালটা ১৯৬৭। লিন্ডন বি জনসন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। তখন পুরোমাত্রায় চলছে ভিয়েতনাম যুদ্ধ। আমার নাম ল্যারি। বয়স উনিশ বছর। যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের এক ছোট শহরে আমাদের বাস। আমি, বাবা ও মা। আমাদের পরিবারটি খুব দরিদ্র। আমি তাদের একমাত্র সন্তান। আমার মনে হয়, আমার জন্মের পর তারা মনে করেছিলেন যে একটি ছেলেই যথেষ্ট। এ বিশ্বে তাদের আর কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই। তাই আর কোনো সন্তান নেননি তারা। তাতে যে ভালো কিছু হয়নি তাতে আমার সন্দেহ নেই। যাহোক, গত বছর আমি হাইস্কুল পাস করেছি। না বললেও চলে, তবু বলি যে আমি ক্লাসের সবচেয়ে স্মার্ট ছাত্র ছিলাম না। আমি কলেজে ভর্তি হতে চেয়েছিলাম। তবে দুটো সমস্যা ছিল তাতে। এক, পড়াশোনার খরচ চালানোর সামর্থ্য বাবার ছিল না। দুই, আমার ফলাফলের গ্রেডও আসলে তেমন ভালো ছিল না। কী করা যায় ভাবতে ভাবতে একটা মাঝারি ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে কাজ পেয়ে গেলাম। মালামালের হিসাব রাখা। এমন কিছু ভালো কাজ নয়, তবে কাজ করে পাওয়া টাকাগুলো সংসারের উপকারে লাগল। সারা জীবন এখানে কাজ করব, এ রকম কথা কখনো ভাবিনি। আপাতত চালিয়ে নেয়া আর কি। তোমাদের বলি, আমি সব সময়ই একজন চিত্রশিল্পী হতে চেয়েছি, কিন্তু আমার ভাগ্য তা চায়নি। আর সত্যি বলতে কি, জীবনে এ পর্যন্ত ভালো কিছু ঘটেনি। এ বয়সে সবাই উজ্জ্বল রঙিন স্বপ্ন দেখে। আমার সেসব স্বপ্ন দেখা হয়নি। জীবনে কোনো বৈচিত্র্যও ছিল না। কে জানে কী আছে আমার ভবিষ্যতে?
আমার স্কুলের পরিচিত অনেক ছেলেই স্বেচ্ছায় সামরিক বাহিনীতে যোগ দিয়েছিল। তাদের পাঠানো হচ্ছিল ভিয়েতনামে। সেনাবাহিনীতে যোগ দেবো কিনা তা নিয়ে এক সময় ভেবেছিলাম। আমি যদি উচ্চ শিক্ষা নিতে পারতাম ও একঘেয়েমি ভরা এ শহর থেকে বেরিয়ে যেতে পারতাম? তা যখন হচ্ছে না তাহলে সেনাবাহিনীতেই যাই। বাবা-মার সাথে এ নিয়ে কথা বললাম। মা সাথে সাথেই তা নাকচ করে দিল। সে সাথে কেন আমার এ শহর ছেড়ে অন্য কোথাও যাওয়া উচিত নয় তার পক্ষে যুক্তির বন্যা বইয়ে দিল মা। যেমন আমি তাদের একমাত্র সন্তান। অতএব বাবা-মাকে রেখে কোথাও যাওয়া আমার অনুচিত। তারপর আমি কাজ করে যে সামান্য টাকা দিচ্ছি তা দিয়ে সংসারের উপকার হচ্ছে। সুতরাং এটাই করা দরকার। কিন্তু আমার বুঝতে বাকি রইল না যে এটা আসল কারণ নয়। আসল কারণ অন্য। জিমি নামে আমার প্রতিবেশী এক তরুণ বছর খানেক আগে যোগ দিয়েছিল সেনাবাহিনীতে। তারপর তাকে পাঠানো হয় ভিয়েতনামে। ক’দিন আগে সে ফিরে এসেছে। দু’ পা হারিয়েছে সে। মা তাকে দেখেছে। আমি সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়ার কথা বলায় মায়ের চোখের সামনে দু’ পা হারানো জিমির চেহারা ভেসে উঠেছে হয়ত। আমার সে রকম কিছু বা তার চেয়েও খারাপ কিছু হতে পারে ভেবে ফেলেছে মা। মায়ের মন তো!
স্কুলে পড়ার শেষ দিকে একদিন এক ভদ্রলোক এসেছিলেন আমাদের স্কুলে। সেনাবাহিনীর জন্য লোক রিক্রুট করেন তিনি, যাকে বলে রিক্রুটার। সৈনিক জীবনের ভালো দিকগুলো সম্পর্কে বক্তৃতা করলেন তিনি। তা শুনে আমার এত ভালো লাগল যে আমি তার সাথে পরে কথা বলতে পারি কি না জিজ্ঞেস করলাম। তারপর তিনি আরো অনেক ভালো কথা শোনালেন আমাকে। তার কথামত সেনাবাহিনীতে ভর্তি আবেদনের একটি ফরম পূরণ করে তাকে দিয়েছি। সেসব কথা মা-বাবােেক বললাম। কিন্তু লাভ হলো না। মা এসব শুনতেই চাইলেন না সে যত ভালোই হোক। মায়ের ঘোর অমত দেখে আমিও একেবারে চুপসে গেলাম। কি করব বুঝতে পারছিলাম না। মা অখুশি হোক বা দুঃখ পাক তা চাইছিলাম না। আবার বর্তমান জীবনও আমার ভালো লাগছিল না। দরিদ্র পরিবার, একটি সাদামাটা ছোট শহর, ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের কাজ- আমার দিনগুলো আর কাটতে চাইছিল না কিছুতেই। আবার করারও কিছু নেই।
২.
শুক্রবার কাজ থেকে ফিরে এসে বেশ হালকা লাগছিল। সপ্তাহ শেষের দিন দু’টির মূল্য এখন আমার কাছে অনেক। বাড়ির টুকিটাকি কিছু কাজ থাকলে এ দু’দিনে সেরে ফেলি। কাল করার মত কিছু কাজ আছে। তা সারা হলে যাবো বল পার্কে। সেখানে একদল ছেলে বেসবল খেলে। ওদের সাথে খেলায় যোগ দিতে পারি। না খেললেও ওদের খেলা উপভোগও করতে পারি। বেশ মজা পাওয়া যায়। আচ্ছা, যে কথাটি এখনো বলা হয়নি সেটা বলে ফেলি। আমার তেমন কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধু নেই। আর মেয়ে বন্ধু? একটিও না। তাই নিঃসঙ্গ বলতে যা বোঝায়, আমি তাই। তাহলে সময় কাটে কি করে? আমার অবসর সময়ের বড় অংশ কাটে বই পড়ে। অ্যাডভেঞ্চার কাহিনী আমার ভীষণ প্রিয়। এ বিষয়ে কোনো বই পেলে আর আমাকে পায় কে! বইয়ের ভেতর একেবারে ডুবে যাই আমি। আর বিস্ময়কর ব্যাপার যে জৌলুসহীন আমাদের শহরটায় একটা পাঠাগার আছে। এত বই আর এত ভালো ভালো বই আছে সেখানে যে পাঠাগারটিকে অসাধারণ বললেও কম বলা হয়। বহু বছর ধরেই তার সদস্য আমি। গর্বের ব্যাপার কি না জানি না, আমার চেয়ে বেশি বই আর কেউ পড়েনি। পাঠাগার রেজিস্টার সে কথাই বলে।
কাজ থেকে বা ফেরার পর আমার প্রথম কাজ হচ্ছে কাপড় বদলে হাত-মুখ ধোয়া। ছোটবেলাতেই এ অভ্যেসটা তৈরি করে দিয়েছে মা। তারপর সোজা কিচেনে। এ সময় মা’র অনেক কাজ। সাপার তৈরি করায় ব্যস্ত থাকে ভীষণ। মা খুব ভালো রান্না করে। বাবারও বাড়ি ফেরার সময় এটা। আমি যদি সেনাবাহিনীতে চলে যাই তাহলে মা-বাবাকে খুব মিস করব তো বটেই, আরো মিস করব মায়ের রান্না। আমাদের অবস্থা ভালো নয় ঠিকই, তবে না খেয়ে থাকার মত নয়। বাবা নির্মাণকাজ করে। মা খাঁটি গৃহবধূ। তারা সুখী দম্পতি। দু’জনার মধ্যে কোনো ঝগড়া হতে কোনোদিন দেখিনি। নিজেদের মধ্যে ভালো বোঝাপড়া আছে তাদের। বাবা খুব উদার হৃদয়ের মানুষ। তার সাথে আমার সহজ সম্পর্ক। বহু বিষয় নিয়ে কথা বলি, আলোচনা করি আমরা। ভাবছি, ছুটির দু’দিনে এক সময় সেনাবাহিনীতে যাওয়ার ব্যাপারে বাবার সাথে ভালো করে কথা বলতে হবে। তাকে বোঝাতে হবে কেন আমি এটা করতে চাইছি। খবরে দেখেছি, সেনাবাহিনীতে যোগ দিলে ভিয়েতনাম যুদ্ধে যেতে হবে। সেখানে দেদার মার্কিন সৈন্য মারা পড়ছে। প্রাণ নিয়ে ফেরার আশা কম। এ অবস্থায় সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়ার ভয়ে অনেক ছেলে কানাডা পালিয়ে যাচ্ছে। আমি কখনোই এটা করব না। আমি মনে করি, সেনাবাহিনীতে যাবো না সেটা এক ব্যাপার। কিন্তু যুদ্ধে যাবার ভয়ে পালিয়ে আরেক দেশে চলে যাওয়ার মত ছেলে আমি অন্তত নই।
আমেরিকার বিভিন্ন নগর-শহরে ভিয়েতনাম যুদ্ধের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। টিভিতে ফলাও করে দেখানো হচ্ছে তা। খেতে খেতে সে কথা বললাম। বাবা বলে উঠলেন-
: বাদ দাও ওদের কথা। যত সব কাপুরুষের দল। তারা একটি স্বাধীন দেশ চেয়েছিল। কিন্তু চেয়েছিল যে রূপোর থালায় করে তাদের হাতে তুলে দেয়া হোক। তারা দেশের প্রতি কোনো দায়-দায়িত্ব পালন করতে চায় না।
বাবা দ্বিতীয় মহাযুদ্ধে সৈনিক ছিলেন। যুদ্ধের কথা উঠলেই তিনি আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। মা’র কাছে শুনেছি, যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর তিনি বাড়ি ফিরে আসেন। সংসারের দায়-দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন। ফলে মাকে আর কষ্ট করতে হয়নি। তবে মা এও বলেছে, বাবার মনোভাব দেখে তার মনে হয়েছে যে তিনি সেনাবাহিনীতে থাকতে পারলেই তার ভালো লাগত। ‘আমাকে ভুল বুঝো না। আমি বলতে চাইছি যে তিনি আমাকে ভালবাসতেন, তবে নিজের স্বাধীন মত চলতে চাইতেন তিনি। তার কিছু স্বপ্ন ছিল’- বলেছে মা।
এ সময় মা বলল-
: তোমরা এ আলোচনা কেন করছ আমি বুঝতে পারছি না। যারা যুদ্ধে গেছে তারা সবাই দরিদ্র পরিবারের ছেলে। যুদ্ধে তাদের কেউ কেউ মারা গেছে, কেউ কেউ অঙ্গহীন হয়ে ফিরে এসেছে। খুবই বাজে জিনিস এ যুদ্ধ। সুস্থ জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ যুদ্ধ করে না।
আমি ও বাবা মায়ের মনোভাব জানি। তবুও বাবা বললেন-
: ল্যারি যুদ্ধে যেতে চাইছে। আমার মনে হয় এতে ওর ভালোই হবে। তা ছাড়া ওর ইচ্ছায় আমাদের বাধা দেয়া ঠিক নয়। কারণ জীবনটা ওর। নিজের জীবনের ব্যাপারে তাকে সিদ্ধান্ত নিতে দেয়া উচিত।
মা পাথরের মত মুখ করে বাবার কথা শুনল, কোনো কথা বলল না। বাবাও বুঝতে পারলেন যে মাকে এসব কথা বলে লাভ হবে না। চুপ করে গেলেন তিনি।
খাওয়া শেষ হলে নিজের ঘরে চলে এলাম আমি। রেডিওটা ছেড়ে দিলাম। একঘেয়ে লাগছিল। তাই একটা অ্যাডভেঞ্চারের বই নিয়ে পড়তে শুরু করলাম। অল্পক্ষণের মধ্যে ডুবে গেলাম জমজমাট কাহিনীর মধ্যে। বেশ কিছুক্ষণ পর চোখের পাতা ভারি হয়ে এলো। আলো নিভিয়ে দিলাম। হঠাৎ খাবারের সময় বাবার সাথে আলোচনার কথা মনে হলো।
গোটা বিষয়টা ভাবতে বসলাম। আমি এখন অনেক বড় হয়ে গেছি। পড়াশোনা করা হচ্ছে না। যে লেখাপড়া করেছি তাতে ভালো কোনো চাকরির আশা করা যায় না। অতএব সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়া খুব একটা খারাপ হয় না। যে কোনো সময় আমি যোগ দিতে পারি। কিন্তু তাতে মা’র মন ভেঙে যাবে। মা আমাকে বলেছে, তুই তো চিরকাল ঘরে থাকতে পারবি না। নিজের জীবনটাকে গড়ার জন্য তোকে বাইরে যেতেই হবে। তারপর বিয়ে করবি, বাচ্চা-কাচ্চা হবে। নিজের সংসার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়বি। তোকে তখন আর পাবো না। যতদিন তা না যাস ততদিন কাছে থাক। মায়ের এ কথার পর আর কি কিছু বলার থাকে? জানি, আমার সাবেক সৈনিক বাবা আমি সেনাবাহিনীতে যোগ দিলে খুশিই হবেন। কী করব? না, থাক। আজ আর ভাবব না এ নিয়ে। ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছে।
সকালে ঘুম থেকে উঠে ফ্রেশ হয়ে কিচেনে গিয়ে দেখি বাবা-মা দু’জনই টেবিলে বসে। একটা কাপে জুস ঢেলে নিয়ে বসে পড়লাম আমিও। বাবা জিজ্ঞেস করলেন-
: ব্রেকফাস্ট করে বাড়ির পিছনের লনটায় ঘাসগুলো কি কাটতে পারবে? বেশ বড় হয়ে গেছে।
জবাব দিলাম, হ্যাঁ বাবা।
: তাহলে আমিও তোমাকে সাহায্য করব, কেমন?
বুঝতে পারলাম বাবা এ অজুহাতে আমার সাথে কিছু কথা বলতে চান।
মা বলল-
: লাঞ্চের আগেই তোমাদের কাজ সেরে ফেল। লাঞ্চ করে আমরা তিনজন শহরের কোনো সুপারশপে যাব। কিছু কেনাকাটা করার আছে। তা সারা হলে ম্যাটিনি শো’তে ভালো একটা ছবি দেখতে যেতে পারি আমরা।
আমার কিন্তু ছবি দেখার কোনো ইচ্ছে নেই। মা-বাবার সাথে ছবি দেখার বয়স কবে পেরিয়ে এসেছি। এখন কি করা যায়! মাকে বলতে বাধ্য হলাম-
: তোমার প্ল্যানটা ভালোই মনে হচ্ছে মা, কিন্তু…
আমি বিকেলে বেস বল খেলতে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি, তাই তোমাদের সাথে থাকতে পারছি না- এ কথাটা মাকে বলতে গিয়েও বলতে পারলাম না। মা দুঃখ পাবে। আর সেটা চাই না আমি।
বাবা বোধ হয় ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন। বললেন-
: তোমার কোনো বন্ধু নেই যাদের সাথে ছুটির দিনে বাইরে ঘুরতে যেতে পার?
: না বাবা, তেমন কেউ আসলে নেই।
মৃদু হাসলেন বাবা। বললেন-
: এটা কোনো ব্যাপার নয়।
আসলেও তাই। কাউকে বন্ধু করতেই হবে- এ রকম আমার কখনো মনে হয়নি। জীবনটা তো আর বন্ধুরা গড়ে দেবে না। আমাকে শিগগিরই বাইরের পৃথিবীতে বেরিয়ে পড়তে হবে। তখন না হয় দেখা যাবে বন্ধুর ব্যাপারটা।
পরদিন সকালে ব্রেকফাস্টের পর বাবা তার নতুন কাজের জায়গাটা দেখে আসার জন্য ডাকল আমাকে। তার প্রতিষ্ঠান কিছু জায়গা পরিষ্কার করছে। সেখানে একটি সার্ভিস স্টেশন তৈরি করবে তারা।
বুঝলাম, বাবা আবারো কিছু বলতে চান। মানুষটি ভালোই বুঝতে পারেন আমাকে। আমি যে বড় রকম একটা টানাপড়েনের মধ্যে আছি তা চোখ এড়ায়নি তার। গাড়ি চালিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম তার কাজের জায়গাতে। একটি বড় গাছের নিচে একটি ব্যাকহো (নির্মাণ কাজে ব্যবহৃত বুলডোজারের মত যন্ত্র) রাখা। আমরা দরজা খুলে ট্রাকটার সিটে বসলাম। বাবা বললেন-
: আমার মনে হচ্ছে তুমি খোলাখুলি আমাকে কিছু বলতে চাও। সে জন্যই তোমার সাথে এ বাইরে আসা। এখন বল, কী বলতে চাও তুমি।
: বাবা! সেনাবাহিনীতে যোগ দেয়া নিয়ে কথা বলতে চাই আপনার সাথে।
হাসলেন বাবা। বললেন-
: হ্যাঁ, আমি এ রকমই অনুমান করেছিলাম। তা তুমি কি ভাবছ?
: আমি সেনাবাহিনীতে যেতে চাই। সেই যে রিক্রুটার ভদ্রলোকের সাথে কথা বলেছিলাম তিনি আমাকে বলেছিলেন, উন্নত ও সুন্দর জীবন চাইলে সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে হবে। কেউ চাইলে পড়াশোনাও করতে পারে সেখানে। আমার তো পড়াশোনা হলো না। এই ডিপার্টমেন্টাল স্টোরের চাকরি করে আমি জীবন কাটাতে পারব না। আমি বাইরে যেতে চাই, পৃথিবীটাকে দেখতে চাই, মানুুষকে জানতে চাই। আমার কিছু স্বপ্ন আছে। সেগুলো যতটা সম্ভব পূরণ করতে চাই। আমি কি তোমাকে ব্যাপারটা বোঝাতে পারছি বাবা!
: হ্যাঁ, বুঝতে পারছি। এক সময় আমিও এ রকমই ভাবতাম। যাহোক, তোমাকে নিয়ে তোমার মায়ের অনেক চিন্তা। তুমি তার কাছে এখনো ছোটই আছ।
: বাবা! আমার বয়স এখন উনিশ বছর। আমি আর ছোট নই।
: কিন্তু মায়ের কাছে তুমি এখনো শিশুর মত এবং সব সময়ই তাই থাকবে তোমার বয়স যতই হোক না কেন।
: তা না হয় হলো, কিন্তু আমাকে তো আমার জীবন নিয়ে ভাবতে হবে, তাই না? আমি আপনার বা মা’র মনে কোনোভাবেই কষ্ট দিতে চাই না। কিন্তু বাড়িতে বসে থাকলে তো আমার জীবন চলবে না। আমার কি মনে হয় জানেন? আমার মনে হয় যে আমি একটা খাঁচার মধ্যে আটকা পড়ে আছি, এখান থেকে কোনো দিন বের হতে পারব না।
বাবা বললেন-
: দেখ, আমি তোমার কথা বুঝতে পারছি। তোমার সাথে আমি একমত। আমি তোমাকে কিছু বলিনি, কারণ আমি চাই যে তুমি সুখী হও। তুমি যদি সত্যিই সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে চাও তা তুমি করতে পার। তবে মনে রেখ, সেটা কিন্তু ভিন্ন এক জীবন। তোমার বর্তমান জীবনের সাথে তার কোনোই মিল নেই। তুমি সৈনিক হলে তোমার বাবা হিসেবে তখন আমি গর্ববোধ করব। তুমি আমার ছেলে। তুমিই তো আমার আশা পূরণ করবে, তাই না? যাহোক, কোনো কিছুই চিরস্থায়ী নয়। তোমার সময় হয়েছে বেরিয়ে পড়ার। আমি মনে করি, তুমি বাইরের দুনিয়ায় পা রাখ, নিজের পথ খুঁজে নাও। দেখ, তোমার জন্য কী অপেক্ষা করছে।
বাবার কথায় কান্না পায় আমার। আমি জানতাম, তিনি আমার কোনো ব্যাপারে বাধা দেবেন না, কিন্তু এত সহজে যে তার অনুমতি পাব তা কখনো ভাবিনি। তিনি বললেন-
: তবে আমি তোমাকে অনুমতি দিলেও মায়ের অনুমতি সহজে পাবে বলে মনে হয় না। তাকে সহজে রাজি করানো যাবে না।
: আপনি মায়ের সাথে কথা বলে দেখুন না তিনি রাজি হন কিনা।
: না, সেটা হয় না। এখন তুমি বড় হয়ে গেছ। তোমার দায়িত্ব তোমাকেই নিতে হবে। নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে তোমাকে। তুমি যখন সেনাবাহিনীতে চলে যাবে তখন আমাকেই তার সাথে থাকতে হবে। তখন প্রতিদিন আমাকেই এ জন্য দায়ী করবে সে। অতএব আমার ঘাড়ে এ বোঝা চাপিও না। একটা কথা। তুমি যে সেনাবাহিনীতে যেতে চাইছ, পরিস্থিতি সম্পর্কে জান তো? ভিয়েতনামে প্রচন্ড যুদ্ধ চলছে। সে জন্য সৈন্য চাই। দেখা যাবে যে প্রশিক্ষণ শেষ হওয়ার পর তোমাকে সেখানে পাঠিয়ে দিয়েছে। সে কিন্তু ভয়ঙ্কর ব্যাপার হবে।
: বাবা, আপনি যখন পেরেছেন তখন আমিও পারব। মা আমাকে বলেছিল যে যুদ্ধ শেষ হলেও আপনি ফিরতে চাননি।
: হ্যাঁ, সে রকমই ছিল ব্যাপারটা। যাকগে, তোমার মা’র সাথে কখন কথা বলবে তুমি?
গলা ধরে আসে আমার। বলি-
: দেখি, সুবিধে মত এক সময় কথা বলব।
: ঠিক আছে, দেখ। আমি আছি তোমার সাথে।
: হ্যাঁ, জানি তা। আস্তে করে বললাম আমি।
সে রাতে ঘুম এলো না দু’চোখে। মাথার মধ্যে চিন্তা চলতে লাগল ঘন্টায় ১ শ’ মাইল গতিতে। কি করব এখন? সত্যি বলতে কি, আমি নিজেও জানতাম না। একেবারে ভোর বেলার দিকে চোখে ঘুম এলো ঠিকই, কিন্তু অল্প সময়ের জন্য। জেগে ওঠার পর খুব ক্লান্ত লাগল শরীর। আজ স্টোরের কাজে যেতে হবে। বুঝতে পারলাম, দিনটা ভালো যাবে না।
ব্রেকফাস্টের জন্য গেলাম। দেখি বাবা ও মা খেতে শুরু করেছে। মা আমার খাবার দিল। ততক্ষণে এক কাপ কফি ঢেলে নিয়েছি। সাধারণত ব্রেকফাস্টের আগে কফি খাই না। কিন্তু আজ কফির দরকার ছিল। আমার চেহারায় ঘুম না হওয়ার ছাপ পড়েছিল বোধ হয়। মা উদ্বিগ্ন হয়ে জানতে চাইল-
: কী ব্যাপার ল্যারি? শরীর ঠিক আছে তো?
: হ্যাঁ মা, রাতে আজ ভালো ঘুম হয়নি তো! তাই একটু ক্লান্তি লাগছে। চিন্তা করো না। ঠিক হয়ে যাবে।
বাবা আমার দিকে একবার তাকালেন, কিন্তু কিছু বললেন না।
অন্যান্য দিনের মতই স্টোরে কাজ করলাম। আমাদের ছোট শহরটায় এটাই সবচেয়ে বড় ডিপার্টমেন্টাল স্টোর। সবাই জিনিসপত্র কিনতে আসে এখানে। ফলে সারাদিনই প্রায় ভিড় লেগে থাকে। আর লোকজন সবাই পরস্পরের চেনা। তাই ক্রেতাদের সবার সাথেই হাই- হ্যালো করতে হয়। মা-বাবা কেমন আছে জানতে চায় অনেকেই। মাঝে মাঝেই খুব ক্লান্ত লাগে। মনে হয়, এমন কিছু যদি হতো যে এই একঘেয়েমি থেকে মুক্তি পাওয়া যেত!

৩.

বাড়ি ফিরে কল-বেল চাপতে দরজা খুলে দেয় মা। তার দিকে তাকিয়ে চমকে উঠি। মা’র চোখে পানি। মুখে কোনো কথা নেই। প্রতিদিন দরজা খুলেই হাসি মুখে মা বলে- আয় বাবা! কিন্তু আজ তার মুখে কোনো কথা নেই। উদ্বিগ্ন হয়ে জিজ্ঞেস করি-
: কী হয়েছে মা? কোনো খারাপ কিছু?
আমার হাতে একটা খাম তুলে দেয় মা। তার হাত কাঁপছিল। সেনাবাহিনীর ছাপমারা খাম। সেটা দেখামাত্র আমার বুকের ভিতরটায় উত্তেজনার পারদ ছুটোছুটি করতে থাকে। মা বলে-
: দুপুরে এটা এসেছে। চিঠিটা পেয়েই তোমার বাবাকে ফোন করেছিলাম। তিনি বললেন, খামটা না খুলে রেখে দিতে। বাড়ি ফেরার পর তুমি নিজেই খুলবে ওটা। তাই আমি খুলে দেখিনি।
কাঁদতে কাঁদতে কিচেনে চলে গেল মা। চুপ করে বসে আছি আমি। এ সময় আবার কল-বেল বাজে। বাবা এসেছে। দরজা খুলে দিলাম উঠে গিয়ে।
এক কাপ কফি তৈরি করে টেবিলে বসলেন বাবা। মা-ও এসে বসল। বাবা বললেন-
: এবার চিঠিটা খোল ল্যারি। কী লেখা আছে ওটাতে শুনি।
খামটা খুললাম। আমি নিশ্চিত যে এটা সেনাবাহিনীতে নিয়োগ সংক্রান্ত চিঠি। আসলে তাই। চিঠিতে আমাকে দশ দিনের মধ্যে স্থানীয় রিক্রুটারের সাথে যোগাযোগ করতে বলা হয়েছে। তিনি আমাকে ডালাসে সেনাবাহিনীর নিয়োগ কেন্দ্রে পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন। সেখানে সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। চিঠিতে কাগজ-পত্রসহ আমাকে কী কী নিয়ে যেতে হবে তা বলা হয়েছে। সে সাথে হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে যে চিঠির নির্দেশ অমান্য করলে শাস্তি পেতে হবে।
চিঠিটা পড়া শেষ হলো। এখন সিদ্ধান্ত আমার।
মায়ের চোখে অশ্রু। বাবা চুপ করে বসে আছেন। তবে মুখে মৃদু হাসি। আমার মনের অবস্থা যে কি তা বলে বোঝানো মুশকিল। আমি কিছুটা খুশি যে আমাকে আর সিদ্ধান্তহীনতার মধ্যে থাকতে হলো না। আর যা ঘটল তাতে মাকে বুঝিয়ে তার মত নেয়ার কঠিন কাজটা থেকে বেঁচে গেলাম। এখন বাকি থাকল মায়ের কষ্ট। এটা ঠিক, সেনাবাহিনীতে না গিয়ে যদি অন্য কোনো কাজ করি তাহলে আমার জন্য মায়ের দুশ্চিন্তা খানিকটা কম হতো। সবাই জানে যে ভিয়েতনামের যুদ্ধে আমেরিকা ভীষণভাবে জড়িয়ে পড়েছে। সেখানে মার্কিন সৈন্যরা বিপুল সংখ্যায় মারা যাচ্ছে। তারপরও আমেরিকা এ যুদ্ধ থেকে সরে আসতে পারছে না যুদ্ধবাজ লোকদের কারণে। প্রতিদিনই সৈন্য চাহিদা বাড়ছে। দেশের তরুণদের যুদ্ধে যাওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সব জায়গায় ঝুলিয়ে দেয়া হচ্ছে দেশপ্রেম ও দেশের প্রতি কর্তব্য পালনের পবিত্র দায়িত্বের বাণী। না গেলে শাস্তি। এমনকি বিখ্যাত মুষ্টিযোদ্ধা মোহাম্মদ আলীও যুদ্ধে যেতে অস্বীকার করায় তাকে শাস্তি দিয়েছে সরকার। মা কাঁদতে কাঁদতে বলে-
: বাবা, আমি চাইনি তুমি সেনাবাহিনীতে যাও। জানি, প্রশিক্ষণের পর ওরা তোমাকে ভিয়েতনাম যুদ্ধে পাঠাবে। তুমি যখন সেনাবাহিনীতে যাবেই, আমি আর কিছু বলব না তোমাকে। তবে একটাই অনুরোধ, প্রতিবেশী ছেলেটার মতো পঙ্গু হয়ে ফিরে এসো না। সহ্য করতে পারব না আমি। ছেলের এমন অসহায় অবস্থা দেখা কোনো মা’র পক্ষেই সম্ভব নয়।
মা উঠে নিজের ঘরে চলে গেল। বুঝতে পারলাম, তার বুকটা ভেঙে গেছে। বাবা চুপ করে বসে আছেন। তার চোখে শূন্য দৃষ্টি। আমি ভাবতাম, একটা চাকরি পেলে খুব ভালো হবে। কিন্তু এখন যা ঘটছে তাতে আর সেটা বলতে পারছি না। না ভালো না মন্দ- এ দু’য়ের মধ্যে দুলছি আমি।
কথা বললেন বাবা-
: আমার মনে হয় স্টোরের চাকরিটা কালকেই ছেড়ে দাও। এই দশটা দিন আমাদের সাথে থাক। বিশেষ করে তোমার মাকে সঙ্গ দাও। তাহলে তার মনের কষ্ট কিছুটা কমবে।
: কিন্তু এ টাকাগুলো না পেলে তো আপনাদের কষ্ট হবে, তাই না?
: বাদ দাও তো। অত ভাবলে কি চলে? আমি যা পাই তা দিয়ে আমাদের দিন কোনো রকমে কেটে যাবে। এখন তুমি তোমার কথা ভাব। সামনে নতুন এক জীবন আসছে। তার জন্য তৈরি হও।
বাবার কথাগুলো খুব খাঁটি। তিনি যা বললেন না আর আমিও যা ভাবতে চাইছি না তা হলো আমার সামনের জীবনটার সাথে মৃত্যু ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে।
রাতে শোয়ার সময় মাথায় নানা চিন্তা এসে ভিড় জমাল। সবচেয়ে বড় কথা, আমি কি সৈনিক হওয়ার যোগ্য? যুদ্ধে সাহস প্রয়োজন। আমি কি সাহসের পরিচয় দিতে পারব? যুদ্ধে মানুষ হত্যা স্বাভাবিক ব্যাপার। আমি কি মানুষ হত্যা করতে পারব?
এ ধরনের আবোল তাবোল ভাবনা আমার কোনো কাজে আসবে না জানি, কিন্তু তা থেকে নিজেকে সরিয়েও রাখতে পারলাম না। না, এসব ভাবনা মন থেকে ঝেড়ে ফেলাই ভালো। যা ঘটবে তাকে মোকাবেলা করা ছাড়া উপায় নেই।
পরের দিন ক’টি যেন উড়ে গেল। সারা শহর ঘুরে বেড়ালাম এ ক’দিন। সবার সাথে কথা বললাম। প্রতিটি রাস্তা ও গলিতে হাঁটলাম। অনেক নতুন বাড়ি হয়েছে। কিছু গাছ মহীরুহ হয়ে উঠেছে। নতুন কিছু গাছ ডালপালা ছড়িয়ে আকাশ ছুঁতে চাইছে। জন্ম থেকে চেনা এ শহর। আবার নতুন করে চিনলাম। চেনা মুখগুলোর সাথে কথা বললাম। আসলে এভাবে আমার স্মৃতির ক্যানভাসে গোটা শহর ও সব মানুষের মুখ এঁকে নিলাম। কখনো ভুলব না। কেন যেন মনে হচ্ছে, আর কখনো ফেরা হবে না এ শহরে। যদি আর ফিরে না আসি, মা-বাবা ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়রা ছাড়া আমার কথা কেউ মনে রাখবে না। আচ্ছা, যদি ফিরে আসতে পারি তাহলে যেভাবে এ শহরকে দেখে যাচ্ছি এটা কি সে রকমই থাকবে? কোনো পরিবর্তন হবে না? আমি যে রকম আছি আজ, যখন ফিরে আসব তখনো কি সব কিছু এ রকমই থাকবে? আসলে শুধু সময়ই তা বলতে পারবে। বুকের ভেতর শূন্যতা অনুভব করলাম। বিশাল এক প্রান্তরে দাঁড়িয়ে থাকা এক নিঃসঙ্গ মানুষের বুকে যে শূন্যতা চেপে বসে থাকে, সে রকম।
এ দশ দিনে বাবা ও মাকে নতুন রূপে দেখলাম। না, গত উনিশ বছরে এ বাবা-মাকে দেখিনি কখনো। এত দরদ, এত ¯েœহ, এত ভালোবাসা কি আর কেউ পায়, জানি না। এ ক’দিনে একটি মুহূর্তের জন্যও মা’র মুখ ভার বা চোখের কোণে পানি দেখলাম না। খুব হাসি-খুশি রইল মা। কিভাবে আমাকে সন্তুষ্ট করবে, তার প্রতিযোগিতা চলল বাবা ও মায়ের মধ্যে। মনে হলো, মা শেষ পর্যন্ত আমার সেনাবাহিনীতে যাওয়ার ব্যাপারটা মেনে নিয়েছে। এদিকে বাবা প্রায়ই ফাঁকে-ফোকে তার সৈনিক জীবনের নানা ঘটনা বলে চললেন যাতে আমি মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে পারি।
যাওয়ার দিন এসে গেল। রিক্রুটার গাড়ি পাঠিয়েছেন। আমার ব্যাগ গাড়িতে তোলা হয়ে গেছে। মা-বাবাকে আলিঙ্গন করে বিদায় নিলাম তাদের কাছ থেকে। উঠে বসলাম গাড়িতে। মা বলল-
: নিজের দিকে খেয়াল রেখ বাবা। পৌঁছেই ফোন করো নয় চিঠি দিও। আর কিছু দরকার হলে জানিও।
কান্নায় ভেঙে পড়ল মা। তার পাশে দাঁড়িয়ে বাবা। হ্যাঁ, বাবাও কাঁদছেন। তার চোখে এই প্রথম পানি দেখলাম। তিনি বললেন-
: আমাদের ভুলে যেও না বাবা।
বুকের ভেতরটায় মোচড় দিয়ে উঠল। কাদের ছেড়ে যাচ্ছি আমি? তারা ছাড়া আর কে আছে আমার? আর আমি ছাড়া তাদেরও তো কেউ নেই! অনেক কষ্টে বললাম-
: আমার জন্য চিন্তা করবেন না বাবা। আমি সুযোগ পেলেই চিঠি লিখব।
গাড়ি ছাড়ল। বাবা-মা হাত নাড়ছে।
তিরিশ মিনিট লাগল রিক্রুটারের কাছে পৌঁছতে। পথে মনে হলো, আমি এক জিন্দানখানার দিকে যাচ্ছি। খুব খারাপ হয়ে গেল মনটা।
স্থানীয় রিক্রুটিং সেন্টারে ঢুকতেই দেখা গেল অনেক লোক। রিক্রুটের সংখ্যা প্রায় চল্লিশ। প্রত্যেকের বান্ধবী বা বাড়ির লোকজন এসেছে বিদায় জানাতে। ব্যাগ নিয়ে একটু এগোতেই ইউনিফরম পরিহিত দু’ ব্যক্তিকে দেখা গেল। একজন সার্জেন্ট ও আরেকজন কর্পোরাল। সার্জেন্ট চিৎকার করে বললেন-
: ছেলেরা! আর মাত্র দশ মিনিট সময় পাবে। এর মধ্যে বিদায় পর্ব সেরে ফেল। ঠিক দশ মিনিটের মাথায় লাইন দিয়ে দাঁড়াবে সবাই।
লাইনে দাঁড়িয়েছে সবাই। কর্পোরাল নাম পড়তে শুরু করলেন। যার নাম ডাকা হচ্ছে সে লাইন থেকে বেরিয়ে গিয়ে একটু দূরে রাখা একটি বাসে উঠছে। এক সময় আমার নাম ডাকা হলো। সোজা গিয়ে বাসে উঠলাম।
সারা বাস ভরা রিক্রুট। সবাই কথা বলছে। ফলে খোলা বাজারের শোরগোলের মত অবস্থা। এ সময় সার্জেন্ট উঠে এলেন বাসে। বাজখাঁই গলা শোনা গেল তারÑ
: তোমাদের কথা বলতে বলেছে কে? সব মুখ বন্ধ। এরপর অনুমতি ছাড়া কেউ কথা বলবে না। এখন শোনো, তোমরা সবাই ডালাসের ইনডাকশন সেন্টারে যাচ্ছ। সেখানে দিন তিনেক থাকতে হবে। সেনাবাহিনীর ভেতরের অবস্থা ও সেনাবাহিনীতে তোমাদের জীবন সম্পর্কে ওরিয়েন্টেশন কোর্স করতে হবে তোমাদের । এরপর পূর্ণাঙ্গ স্বাস্থ্য পরীক্ষা করা হবে। তারপর নেয়া হবে পরীক্ষা। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সব প্রশ্নের উত্তর দেবে। এ পরীক্ষার উপর নির্ভর করছে তোমাদের চাকরিটি কী ধরনের হবে। এ প্রক্রিয়া শেষ হওয়ার পর শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। তখন আনুষ্ঠানিকভাবে সেনাবাহিনীর সদস্য হবে তোমরা। তোমাদের তখন নিয়ে যাওয়া হবে মৌলিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে। এ মুহূর্ত থেকে তোমাদের কথা বলা নিষেধ। শুধু সেনাবাহিনীর লোক কিছু জিজ্ঞেস করলে তার উত্তর দেবে। আমার কথা বোঝা গেছে?
আমরা উঠে দাঁড়িয়ে সমস্বরে চিৎকার করে বললাম, ইয়েস সার্জেন্ট।
: ঠিক আছে, এখন সিটে বসে পড় সবাই। রিল্যাক্স। ও হ্যাঁ, বহুদিনের মধ্যে এটাই হতে যাচ্ছে তোমাদের শেষ আরাম।
আমার মধ্যে তখন মিশ্র অনুভূতির ঢেউ। একদিকে নতুন জীবনের আহবান, আরেক দিকে মৃত্যুর আশঙ্কা। এ পর্যন্ত যাদের দেখেছি তারা ভিন্ন ধরনের ও ভিন্ন ব্যক্তিত্বের মানুষ। আমি কি এদের সাথে খাপ খাওয়াতে পারব? বাবার কথা মনে পড়ল। তিনি ঠিকই বলেছিলেন- এটা কিন্তু ভিন্ন এক জীবন। আমি কি এখানে টিকতে পারব? অন্যদের সাথে কি আমার বনিবনা হবে? সময়ই বলবে কি হবে। তবে এটা সত্যি যে এখন নার্ভাস লাগছে। নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম- অ্যাডভেঞ্চার করতে চলেছি। ভয় কি?
পথে দু’বার থামল বাস। ছেলেদের একটু হাঁটা-চলা, বাথরুম সারা আর হালকা কিছু খেয়ে নেয়ার সুযোগ দেয়া হলো। কর্পোরাল আমাদের প্রত্যেককে একটি করে সি-রেশন বক্স দিল। এটা হলো ছোট বক্সের মধ্যে সেনাবাহিনীর খাবার। সাবধান করে দেয়া হলো, বাসের মধ্যে খাবারের একটি দানাও পড়া চলবে না। যদি সে রকম কিছু ঘটে তাহলে শাস্তি হলো যার কাছ থেকে খাবার পড়বে তাকে একটি টুথব্রাশ দিয়ে বাসের মেঝে পরিষ্কার করতে হবে।
হায় হায়! বলে কি! এ কোথায় এসে পড়লাম রে বাবা!

৪.

ইনডাকশন স্টেশনে যখন পৌঁছলাম তখন দিনের আলো নিভে গেছে। অন্ধকার নেমে এসেছে চারপাশে। বাস থেকে নামার পর কর্পোরাল সবাইকে তিনটি প্লাটুনে ভাগ হয়ে দাঁড়াতে নির্দেশ দিলেন। সারাটা পথ কোনো কথা বলেননি তিনি। ইউনিফরমের আস্তিনে তার স্ট্রাইপগুলো ঢেকে রাখার চেষ্টা করছিলেন। তা দেখে আমার পেছনে বসা ছেলেটি ফিস ফিস করে বলেছিল- তিনি ড্রিল সার্জেন্ট ছিলেন। হঠাৎই মনটা খুব বিক্ষিপ্ত হয়ে উঠল।
আমাদের উদ্দেশে বক্তৃতা শুরু করলেন সার্জেন্ট-
: ছেলেরা! আমি মাস্টার সার্জেন্ট জেনকিনস। এখানে তোমরা যতদিন থাকবে, আমি থাকব তোমাদের ড্রিল মাস্টার। আমার কিছু নিয়ম-কানুন আছে যেগুলো তোমাদের মেনে চলতে হবে। তোমাদেরকে বিভিন্ন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শৃঙ্খলাবদ্ধ করাই আমার প্রথম কাজ। এ কাজটি সঠিকভাবে করার জন্য তোমাদের পূর্ণ আনুগত্য চাই। নির্দেশ পালনে ব্যর্থতা আমার জন্য খুব মন খারাপ করা ব্যাপার হবে। তোমরা নিশ্চয়ই তা চাও না! কর্পোরালের দিকে চাইলেন জেনকিনস-আপনি কি মনে করেন? তারা চায়?
: না মাস্টার সার্জেন্ট। কর্পোরাল তার মত প্রকাশ করেন।
: মনে রাখবে, তোমরা কেউ আমার কোনো আইন ভঙ্গ করলে তার পুশআপ হবে। আমি থামার নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত তা চলতেই থাকবে। আমি নিশ্চয়তা দিচ্ছি যে এ পোস্ট ছেড়ে যাওয়ার আগেই তোমরা পুশআপের অভিজ্ঞতা লাভ করবে। ঠিক আছে, কর্পোরাল! এখন রাতের খাবার খাওয়ার জন্য নিয়ে যান তাদের।
কর্পোরাল নেতৃত্ব দিয়ে মেস হলে নিয়ে এলেন আমাদের। লাইন দিয়ে দাঁড়ালাম আমরা খাবারের জন্য। খাবার দেখে মনে হল মান বেশ ভালো (তবে মা’র রান্নার মত নয় নিশ্চয়ই)।
আমার বিশ^াস এখানে যেসব ছেলে এসেছে তাদের সবারই দুনিয়া সম্পর্কে কোনো না কোনো ভাবে অভিজ্ঞতা লাভ করেছে। কিন্তু আমার তা নেই। আমি অনেকটাই খাঁচার জীবন কাটিয়েছি। তা সত্ত্বেও নতুন এ জীবনকে আমি চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিলাম।
কর্পোরালের নির্দেশ শোনা গেল: খাবারের পর তোমাদের থাকার জায়গা দেখানো হবে। প্রতি রুমে চারটি করে বাঙ্ক আছে। তার মানে চারজন করে থাকবে এক রুমে। পরবর্তী তিনদিন তোমরা এক সাথে থাকবে। সে ভাবে মানসিক প্রস্তুতি নাও। রাত ঠিক দশটায় আলো নিভিয়ে দেবে। কোনো আড্ডা চলবে না। রাতের বেলা আইন ভঙ্গ করার জন্য পুশআপ হতে না চাইলে আমাদের কথাগুলো মনে রেখ। কোনো জরুরি প্রয়োজন হলে আমার কাছে যাবে। আমার রুম হলের নিচে। তবে অকারণে বিরক্ত করবে না। মনে রাখবে, আমি তোমার বাবা বা মা বা বন্ধু নই। তোমরা ঠিক পাঁচটায় ব্রেকফাস্ট করবে। তার আগে যার যার বিছানা পরিপাটি করে গুছিয়ে রেখে যাবে। কারণ প্রতিটি বিছানা পরীক্ষা করা হবে। সেনাবাহিনীর সব কিছুই হচ্ছে টিমওয়ার্ক। যাদের রুম পরিদর্শনের রিপোর্ট ভালো হবে না শাস্তি হিসেবে তাদের অতিরিক্ত কাজ করতে হবে। ব্রেকফাস্টের পর তোমাদের শারীরিক পরীক্ষা। যখনি একটি বিষয় থেকে আরেকটি বিষয়ের দিকে যাবে তখন সুশৃঙ্খলভাবে যাবে। সব সময় মুখ বন্ধ রাখবে। সেনাবাহিনীতে তোমাদের স্বাগতম।
রুমে পৌঁছানোর পর আমি একেবারে চুপ করে বসে রইলাম। বুঝতে পারছিলাম না যে কী করব। এতক্ষণ পর্যন্ত সেনাবাহিনীর লোকজন আমাদের সাথে যে ব্যবহার করেছেন তা একেবারেই কঠোর। মায়া-মমতার কোনো স্পর্শ তাতে ছিল না। ভাবছিলাম, সবাই কি একই রকম? বুট ক্যাম্পে ( প্রশিক্ষণ শিবিরে) কি তা আরো খারাপ হবে? আমি কি এখানে খাপ খাওয়াতে পারব? যদি দিনে দিনে তাদের ব্যবহার আরো খারাপ হতে থাকে তাহলে কি করব? তাদের তো তখন পছন্দ করত পারব না! এ সব প্রশ্ন মনের মধ্যে শুধু ঘোরাফেরা করতে থাকায় মন ভীষণ খারাপ হয়ে গেল। আমার মনে হতে লাগল যে খুব খারাপ জায়গায় এসে পড়েছি আমি। আর এ জন্য আর কেউ নয়, দায়ী আমি নিজেই। ¯্রষ্টার উদ্দেশে মনে মনে বললাম- আমাকে সাহায্য কর।
যে রকম মনে করেছিলাম তার চেয়ে অনেক দ্রুত তিনটি দিন পেরিয়ে গেল। যেভাবেই হোক, টিকে গেছি। এখন আমাদের যেতে হবে ফোর্ট পোক-এ, সেখানে হবে মৌলিক প্রশিক্ষণ। অভিজ্ঞতার ভান্ডারে জমা হলো যে চাপের মধ্যে ছোট্ট একটু সময় কিভাবে মানুষের সমগ্র চিন্তাকে পরিবর্তন করে দিতে পারে। আমি যখন ডালাসে এলাম তখন শঙ্কিত ছিলাম, নানা কথা ভাবছিলাম আর উদ্বেগের মধ্যে ছিলাম। এখন আমি শুধু শঙ্কিত। বুট ক্যাম্পের গল্প আগেই শুনেছি। সেখানে জীবন ভীষণ কঠিন। আসলে বুট ক্যাম্প হচ্ছে সেই জায়গা যেখানে ছেলেদের গড়ে পিটে কাঁচা লোহা থেকে সৈন্য নামের অস্ত্র বানানো হয়। এখানকার মানুষদের আচার-ব্যবহার, চাল-চলন সব কিছুই আলাদা। আমি এসেছি সম্পূর্ণ আলাদা এক পরিবেশ থেকে। দুয়ের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। কিন্তু এখানকার পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে চলার লড়াইয়ে হার না মানার শপথ নিলাম।
ডালাসে থাকার সময় চুল কাটা হলো আমাদের। চুল কাটা তো নয়- ন্যাড়া মাথাই প্রায়। সামরিক বাহিনীতে যাকে বলা হয় বাটিছাঁট। সবাইকে সামরিক পোশাক দেয়া হলো। বন্ধ হয়ে গেল বেসামরিক পোশাক পরা। সামরিক পোশাকে সবাইকে একই রকম লাগে। আমার যে তাতে কেমন লাগছিল তা বলে বোঝাতে পারব না। তবে খুব শিগগিরই সামরিক পোশাকে অভ্যস্ত হয়ে উঠলাম আমরা। তবে বাড়ি আর মা-বাবার কথা খুব মনে পড়ত লাগল।
ফোর্ট পোক-এ পৌঁছলাম আমরা। বাস থেকেই দেখলাম সাতজন ড্রিল সার্জেন্ট এক লাইনে দাঁড়িয়ে। তাদের বজ্রগর্জন শোনা গেল : বাস থেকে নাম, লাইনে দাঁড়াও সবাই। সারাদেশ থেকে ২শ’ ছেলে এসেছিলাম। আমাদের প্লাটুনে ভাগ করা হলো। টেক্সাস থেকে আসা ছেলেদের মানে টেক্সানদের নিয়ে হল ৪ নং প্লাটুন। আমাদের ড্রিল সার্জেন্ট হলেন একজন বেঁটে মোটা ব্যক্তি, স্যান অ্যান্টোনিওর অধিবাসী। প্রথমেই সমস্যা সৃষ্টি হলো তাকে নিয়ে। ভীষণ জোরে কথা বলেন তিনি। কথা বললে মনে হয় মেঘ ডাকছে। তিনি সবার জিনিসপত্র পরীক্ষা করে দেখলেন যে আমাদের সাথে এমন কিছু আছে কি না যা থাকা উচিত নয়। এ কাজ করতে করতে সমানে মুখ চলল তার। আমাদের কি কি করা উচিত, কি কি করা উচিত নয় তা নিয়ে রানিং কমেন্ট্রি। কান ঝালাপালা হওয়ার অবস্থা।
পরের আট সপ্তাহ এক অবিশ্বাস্য সময় পাড়ি দিলাম আমরা। এমন কোনো ট্রেনিং নেই যা দেয়া হলো না। যেখানেই গেলাম, দৌড়ে যেতে হলো। এমনকি মেস হলে যেতেও দৌড়াতে হলো আমাদের। ভীষণ কঠিন ব্যাপার। আমাদের দিয়ে এ করার কোনো যুক্তি খুঁজে পেলাম না। তবে এ সবের ফল যা হলো তাকে ভালো বলতেই হয়। শরীর শক্তপোক্ত হয়ে উঠল। মন ও ইচ্ছার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন দেখা দিল। সবচেয়ে বড় যা হলো তা হচ্ছে অনেক বেড়ে গেল আত্মবিশ্বাস। আরো কথা, মন থেকে ভয় প্রায় বিদায় নিলো। আমি আর সেই ছোট্ট শহর থেকে আসা ভীত, নিঃসঙ্গ তরুণ নই যে কিনা বাড়িতে মা-বাবার কাছে ফিরে যেতে চায়। আমি এখন সাহসী, অ্যাডভেঞ্চারপ্রিয়, এগোতে চাই সামনের দিকে। বই নিয়ে ঘরের মধ্যে শুয়ে বা বসে পড়ার সে আমি আর নেই, কল্পনার রঙিন জগৎটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে, এখন জীবনজুড়ে আছে কঠোর সেনা প্রশিক্ষণের নির্মম বাস্তবতা। আমি এখন একজন দায়িত্বশীল মানুষ, এক সৈনিক।
মৌলিক প্রশিক্ষণ শেষ হয়েছে। এআইটি করতে হবে এবার। এআইটি হচ্ছে উন্নত ব্যক্তি প্রশিক্ষণ (অ্যাডভ্যান্স ইনডিভিজুয়াল ট্রেনিং)। তবে এর জন্য বেশি দূর যেতে হবে না। ফোর্ট পোকের আরেকদিকে এ প্রশিক্ষণ কেন্দ্র অবস্থিত। এর ছদ্মনাম খুদে ভিয়েতনাম। এ নামকরণের কারণ হচ্ছে কেন্দ্রটিকে ভিয়েতনামের রেপ্লিকা মনে করা হয়। আমাদের ড্রিল সার্জেন্টের মতে ব্যাপারটা একটা নিষ্ঠুর কাজ হতে চলেছে। কারণ, চার সপ্তাহ লাগবে এ প্রশিক্ষণে। তার মতে, সেখানে চার সপ্তাহ থাকা আর নরক বাস করা একই কথা। কিন্তু আমি কি এ জন্য প্রস্তুত? নিজেকে প্রশ্ন করি। হ্যাঁ, অবশ্যই- নিজেই জবাব দেই। আর কিছু না হলেও একঘেয়েমি থেকে তো মুক্তি মিলবে।
আমরা জেনে গেছি, ট্রেনিং শেষ হওয়ার পর আমাদের ভিয়েতনামে পাঠানো হবে। আমরা এও জানি আমাদের মধ্যে অনেকেই আর ফিরবে না। এ ব্যাপারটা আমার মনের নিভৃত অংশ জুড়ে আছে। আরো ভালো করে বললে বলতে হয়, মনের আকাশে কালো মেঘের মত ছায়া বিস্তার করে আছে। আমি কি তাদের একজন হবো যাদের বডি ব্যাগে ভরে দেশে পাঠানো হয়? ভিয়েতনাম থেকে প্রায় প্রতিদিনই বডি ব্যাগে করে এ রকম অনির্দিষ্ট সংখ্যক লাশ পৌঁছুচ্ছে দেশে। তখন বাবা-মা’র অবস্থা কী হবে? কথাটা ভাবতে পারি না।
বাস থেকে নামার জন্য তাগিদ দেয়া হচ্ছে। জায়গাটা একটু অন্য রকম, আগে এমন আর দেখিনি। একটা জঙ্গলের মধ্যে কিছু ছড়িয়ে থাকা কুটির। বাস্তব মনে হয় না, অনেকটা ছায়াছবির সেটের মত।
সারি বেঁধে দাঁড়াতে বলা হলো সবাইকে। এখানে ৬ জন সার্জেন্ট। সবাই ক্যামোফ্লেজ পোশাক পরা। প্রত্যেক সার্জেন্টের অধীনে একটি করে প্লাটুন। আমাদের সার্জেন্ট উইসকনসিনের। তার কমান্ডে থাকব আমরা পরবর্তী চার সপ্তাহ। নির্দেশ মত অ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়ালাম আমরা। আমাদের সামনে এসে দাঁড়ালেন একজন ক্যাপ্টেন। তিনি বললেন-
: ছেলেরা, এখন আরামে দাঁড়াও। এখানে তোমাদের যে জন্য আসা সে ব্যাপারে কিছু কথা বলতে চাই।
গত কয়েক সপ্তাহে এই প্রথম কোনো অফিসার আমাদের প্রতি সম্মান দেখিয়ে কথা বললেন। সবার কাছেই ভালো লাগল এটা।
তিনি কথা শুরু করলেন, পরের কয়েক সপ্তাহ ধরে তোমাদের যে প্রশিক্ষণ দেয়া হবে, ভিয়েতনামে গিয়ে সেই অভিজ্ঞতাই হবে তোমাদের। তোমাদের সার্জেন্টদের সম্মান করবে। তারা তোমাদের এ প্রশিক্ষণে সাহায্য করবেন। তাদের প্রত্যেকেই কমপক্ষে একবার ভিয়েতনামে কাটিয়েছেন। কেউ কেউ দু’বারও গেছেন। তারা জানেন কি করণীয়। আমরা যতটা সম্ভব একে বাস্তব রূপ দেয়ার চেষ্টা করেছি। তোমাদের জানা দরকার যে এখানে নানা রকম প্রশিক্ষণ দেয়া হবে। যেমন আমাদের কাছে কিছু দক্ষিণ ভিয়েতনামি সৈন্য আছে। তারা হবে ভিয়েতকন বা ভিসি। তারা শত্রু। তারা তোমাদের আটক বা হত্যা করার চেষ্টা করবে। না আসলে তা নয়, মহড়া এটা। এতে ব্যর্থ হলে শাস্তি পাবে তোমরা। শাস্তিটা কিন্তু আসল।
ছেলেরা! তোমরা যদি ডানদিকে তাকাও তাহলে ১০টি খাঁচা দেখতে পাবে। সেগুলোর অর্ধেকটা মাটির মধ্যে প্রোথিত। তুমি যদি আটক হও তাহলে ২৪ ঘন্টা একটি খাঁচায় আটক থাকবে। যদি তুমি মহড়ায় মারা যাও তাহলে তোমাকে ২৪ ঘন্টা অতিরিক্ত ডিউটি করতে হবে। তাই কি করবে তা চিন্তা করে দেখার পরামর্শ দিচ্ছি তোমাদের। সার্জেন্ট মেজর! আপনি এদের দায়িত্ব নিন।
ক্যাম্পে আমাদের আরেকবার ব্রিফ করা হলো। তারপর যার যার কুটির দেখিয়ে দিলেন সার্জেন্টরা। দিনের বাকি সময় বিশ্রাম দেয়া হলো। বলা হলো, পরদিন ভোর পাঁচটা থেকে প্রশিক্ষণ শুরু হবে।

৫.

রাতে লাইট নেভানোর আগে পর্যন্ত কয়েকটি ছেলের সাথে গল্প করলাম। তাদের সবারই মিশ্র অনুভূতি। দু’একটি ছেলে বেশ সাহসী। তারা প্রশিক্ষণ সম্পর্কে অনেক খবরাখবর রাখে দেখা গেল। বলল, তাদের পরিচিত সৈনিকদের কাছ থেকে তারা এ ব্যাপারে জেনেছে। তাদের কথার বেশির ভাগই চাপাবাজি মনে হলো আমার। তাদের মধ্যে পশ্চিম টেক্সাস থেকে আসা লাল চুলো একটি ছেলেও ছিল। এ ছেলেটিও আমার মতই ধন্দে পড়ে গেছে বলে মনে হয়। বেশ ভালোই মনে হলো ছেলেটিকে। ভাবলাম, সে আমার বন্ধু হতে পারে, আমরা একে অপরকে সাহায্য করতে পারি। ছেলেটির নাম মাইকেল। অবশেষে আলো নেভার সময় এলো। শুয়ে পড়লাম নিজের বাংকে এসে। কালকের দিনটি বেশ কঠিন হতে যাচ্ছে বলে ধারণা। বাড়ি থেকে আসার পর এ পর্যন্ত ঘটা সব কিছু মনে ভেসে উঠতে থাকল। আমি কি আসলেই পাল্টে গেছি নাকি বোকার স্বর্গে বাস করছি, কে জানে। বাবা ও মা’কে খুব মিস করি। এক সময় ঘুমিয়ে গেলাম।
সবাই ভোর ৩টায় উঠে পড়ে। রেডি হয়ে মেস হলে গেলাম। সেনাবাহিনীতে আসার আগে রাত তিনটায় কোনো মানুষ জেগে থাকে তা আমার জানা ছিল না। এ এক নতুন সাহসী জগৎ। ব্রেকফাস্টের পর শুরু হলো পিটি। আমার খুব পছন্দ। কারণ আমার শরীরটা এখন শেপে এসেছে এ পিটির জন্যই। পিটি শেষে আমাদের সার্জেন্ট সবাইকে এক জায়গায় জড়ো করলেন। বললেন, তারা আমাদের কাছ থেকে কি চান আর আমরা তাদের কাছ থেকে কি আশা করতে পারি। তার কথায় বোঝা গেল, সামনে একটি ব্যস্ত সময় পাড়ি দিতে হবে আমাদের। একদিক থেকে এটা ভালোই। তাহলে আমাদের সময়টা দ্রুত চলে যাবে।
তার পরের মাসটা যে আমাদের কিভাবে কাটল তা বলে বোঝাতে পারব না। যেসব বিষয়ে প্রশিক্ষণ পেলাম তার মধ্যে দু’টি হচ্ছে অনুসন্ধান ও ধ্বংস কৌশল, নিজের অবস্থান এলাকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। গোটা প্রশিক্ষণের সময় সার্জেন্ট ছিলেন খুবই আন্তরিক। তিনি প্রতিটি বিষয়ের খুঁটিনাটি আমাদের ব্যাখ্যা করলেন। ফলে কারো না বোঝার কোনো ব্যাপার থাকল না। যে কোনো প্রশিক্ষণেই এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। সত্যি বলতে কি, সেনাবাহিনীর প্রতিটি প্রশিক্ষণেই গুরুত্ব দেয়া হয় আত্মরক্ষা তথা নিজের বেঁচে থাকার ওপর। আমাদের সার্জেন্ট ভালোভাবেই তা শেখালেন আমাদের। এ প্রশিক্ষণ শুধু যে আমাদের শরীর ও মনকেই পরিবর্তিত করল তা নয়, আমাদের ব্যক্তিত্বও ধীরে ধীরে পাল্টে দিল। আগেই বলেছিলাম যে আমার মধ্যকার ভয় অনেকটাই দূর হয়েছে। প্রশিক্ষণের শেষ দিনগুলো পেরিয়ে আসার পর পরিবর্তনটা সুস্পষ্টভাবে বুঝতে পারলাম। আমি আর অখ্যাত ছোট শহরের সেই নিরিবিলি তরুণ নই। আমার ভেতরের সব ভয় দূর হয়ে গেছে, আমি এখন এক বেড়ে ওঠা মানুষ।
প্রশিক্ষণ শেষ। আমরা প্রত্যেকেই এখন সামরিক বাহিনীর স্নাতক। এখন আমাদের পোস্টিং অর্ডার জারি হবে এবং হয়ে গেল তা। আমরা সবাই ভিয়েতনামে যাচ্ছি। শুনতে পেলাম, আমাদের মধ্যে কিছু ছেলেকে চতুর্থ পদাতিক ডিভিশনে নিয়োগ করা হয়েছে। বাড়িতে ফোন করলাম। কথা বললাম বাবা ও মা’র সাথে। এখানে এতদিন যা হয়েছে, যা দেখেছি, শুনেছি, জেনেছি তার সব তাদের বলার ইচ্ছে হচ্ছিল। কিন্তু টেলিফোনে তা সম্ভব নয়। অতএব বাড়িতে গিয়ে বলব চিন্তা করলাম। ভিয়েতনামে যাওয়ার কথা শুনে কাঁদতে শুরু করলেন মা। তবে বাবা উৎসাহিত করলেন। সাহস দিলেন। এর দরকার ছিল আমার।
দক্ষিণ ভিয়েতনামের দা নাং-এ পৌঁছলাম আমরা। পত্রিকায় এ শহরটির কিছু খবর পড়েছিলাম। বিমান থেকে নামার পর দু’জন সার্জেন্ট অভ্যর্থনা জানালেন আমাদের। মার্চ করিয়ে নিয়ে গেলেন একটি মাঠের মধ্যে চারদিক ঘেরা একটি স্থানে। ভেতরে একদিকে মাইক্রোফোন সেট করা একটি মঞ্চ, তার বিপরীতে সারিবদ্ধ আসন। একজন মেজর মঞ্চে এলেন। আমরা উঠে দাঁড়ালাম। আমাদের তাকিয়ে দেখলেন তিনি। তারপর মাইক্রোফোনে সবাইকে নিজ নিজ আসনে বসতে বললেন। তার কথা শুরু হলো-
: ভিয়েতনামে তোমাদের স্বাগত জানাচ্ছি। আগামী কয়েক দিনের মধ্যেই তোমাদের ইউনিটগুলোর জন্য নির্দেশ জারি হবে। সারা দক্ষিণ ভিয়েতনাম জুড়ে আমাদের সেনা অভিযান চলছে। ইউনিটে যাওয়ার আগে পর্যন্ত বাসস্থান পাবে তোমরা। সেখানে গোসলের সুযোগ, খাবার সুব্যবস্থা আছে। অস্ত্রও দেয়া হবে তোমাদের। একজন সার্জেন্ট থাকবেন। তিনি তোমাদের যা যা প্রয়োজন তার সবকিছু নিশ্চিত করবেন। চিঠি লেখার কাগজ-কলম পাবে। আমরা চাই তোমরা তোমাদের বাড়িতে প্রিয়জনদের সবকিছু জানাও। কোনো বিধি-নিষেধ নেই। তোমাদের চিঠির খামে কোনো স্ট্যাম্প লাগাতে হবে না। চিঠিগুলো খামে ভরে মুখ আটকে ঠিকানা লিখে এখানকার যে কোনো লেটারবক্সে ফেলে দেবে। ব্যস। ঠিকানামত পৌঁছে যাবে সেগুলো। তবে নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত কেউ তার অস্ত্রে গুলি ভরবে না। ঠিক আছে! তোমাদের জন্য শুভকামনা।
এক সার্জেন্টের চিৎকার শোনা গেল: অ্যাটেনশন!
সবাই অ্যাটেনশন হয়ে দাঁড়ালাম। মেজর চলে গেলে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরল সবাই। এদিকে আমার মাথার মধ্যে ঘন্টায় নয় শ’ মাইল বেগে চিন্তা চলছে। কোন ধরনের ইউনিটে দেয়া হবে আমাকে? আমি কি সেখানে খাপ খাওয়াতে পারব? একটা অনিশ্চয়তাবোধ টের পাচ্ছি। ভয়ও হচ্ছে একটু। না, এ ভয় তাড়াতেই হবে। দুর্বল হলে আমার চলবে না। আমাকে শক্ত হতে হবে। আমি কিন্তু কোনো খারাপ স্বপ্ন দেখছি না। এটা বাস্তবতা। এআইটিতে যে সব ইতিবাচক চিন্তা করতে শিখেছিলাম তা আর এখন কাজ করছে না। মনে হচ্ছে, মেজর যখন অস্ত্র ও গুলির কথা বললেন তখনি সব গোলমাল হয়ে গেছে। যাদের সাথে আমার কোনোদিন দেখা হয়নি, যাদের আমি চিনি না, ত

SHARE

Leave a Reply