Home নিবন্ধ সহযোগিতার হাত বাড়াও রোহিঙ্গা শিশুদের বাঁচতে দাও -ড. এম...

সহযোগিতার হাত বাড়াও রোহিঙ্গা শিশুদের বাঁচতে দাও -ড. এম এ সবুর

প্রিয় বন্ধুরা! নিশ্চয়ই তোমরা মিয়ানমারের রোহিঙ্গা নির্যাতনের খবর পড়েছ এবং দেখেছ। কী নির্মম! কী হৃদয়বিদারক সেসব দৃশ্য! যা দেখলে গা শিউরে ওঠে, দু’চোখে পানি আসে। কী নির্দয়-নিষ্ঠুরভাবে বর্মিবাহিনী রোহিঙ্গাদেরকে হত্যা করেছে, তাদের ওপর জুলুম-নির্যাতন চালিয়েছে, ঘরবাড়িতে আগুন লাগিয়েছে। শুধু বড়দেরই নয় বরং রোহিঙ্গা শিশুদের ওপরও তারা নির্যাতন-নিপীড়ন চালিয়েছে। অনেক শিশুকে মায়ের বুক থেকে কেড়ে নিয়ে কুপিয়ে হত্যা করেছে! কাউকে আগুনে পুড়িয়ে মেরেছে! কাউকে আবার বন্দুক দিয়ে গুলি করে হত্যা করেছে! বর্মিবাহিনীর নির্যাতন থেকে রক্ষা পেতে অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশ, মালয়েশিয়াসহ অনেক দেশে আশ্রয় নিয়েছে। তবে পালিয়ে যাওয়ার পথে নৌকা ডুবে, না খেয়ে অনেকেই মারা গিয়েছে। আর বিদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা মানবেতর জীবন যাপন করছে। তাদের ঘর নেই, বাড়ি নেই! খাবারের নিশ্চয়তা নেই! রোগীদের যথাযথ চিকিৎসা ব্যবস্থা নেই! তাদেরকে তাঁবুতে থাকতে হয়। অনেকের তাঁবুও নেই, তারা রোদ-বৃষ্টিতে গাছের নিচে, পাহাড়ের ঢালে আশ্রয় নিয়েছে। এদের মধ্যে শিশুরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে। অনেক শিশু অনাহারে-অর্ধাহারের কারণে পুষ্টিহীনতা-বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়েছে। আক্রান্ত অনেক শিশু চিকিৎসার অভাবে মারাও গিয়েছে! জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ) এর তথ্য মতে, ‘বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া ২ লক্ষাধিক শিশু চরম ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থাতে আছে।’ রোহিঙ্গা শিশুদের পড়ালেখা বন্ধ হয়েছে, জীবন থেকে খেলাধুলা-বিনোদন হারিয়ে গেছে! চিন্তা কর, তারা কী দুঃখ-কষ্টে জীবন যাপন করছে! তাদের এসব দুঃখ-দুর্দশা দেখলে পাষাণের হৃদয়ও কেঁপে ওঠে। রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের খোঁজ-খবর নিতে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়্যেপ এরদোগানের স্ত্রী এমিনি এরদোগান এবং আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে গিয়েছিলেন। তারা রোহিঙ্গা নির্যাতনের দৃশ্য দেখে-শুনে মর্মাহত হয়েছেন, কেঁদেছেন। তাঁদের সাথে সাথে সারা বিশ্বের বিবেকবান মানুষও কেঁদেছেন। সারা বিশ্বের বিবেকবান মানুষেরা রোহিঙ্গা হত্যা-নির্যাতনের বিরুদ্ধে নিন্দা-প্রতিবাদ জানিয়েছেন।
নিশ্চয়ই তোমাদের জানতে ইচ্ছে করছে, রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর কেন পুড়িয়ে দেয়া হচ্ছে? কী অপরাধে তাদেরকে হত্যা করা হচ্ছে? শিশুদের কি কোনো অপরাধ থাকতে পারে? না, নিশ্চয়ই শিশুদের কোনো অপরাধ নেই। তবে তাদের অপরাধ তারা ‘রোহিঙ্গা শিশু’! মিয়ানমারের বর্মিরা সে দেশে রোহিঙ্গাদেরকে থাকতে দেবে না। এজন্যই তারা রোহিঙ্গাদের বাড়িঘর পুড়ে দিচ্ছে এবং শিশু-নারী-পুরুষ সবাইকে হত্যা করছে। তোমরা হয়তো জানো, মিয়ানমারে বর্মি জাতির লোকসংখ্যা বেশি এবং রোহিঙ্গারা সে দেশে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী। তবে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের ‘আরাকান’ রাজ্যের প্রাচীন অধিবাসী। আরাকানের পূর্ব নাম ‘রোসাং’ বা ‘রোসাঙ্গ দেশ’। রোসাং বা রোসাঙ্গ শব্দের বিকৃত উচ্চারণ ‘রোহিঙ্গা’। রোসাং বা আরাকান সমুদ্র উপকূলবর্তী হওয়ায় পূর্বকাল থেকেই বিদেশের সাথে দেশটির ভালো যোগাযোগ ছিল। আরব ব্যবসায়ীরা প্রাচীনকাল থেকেই জলপথে রোসাঙ্গে যাতায়াত করতেন। এতে আরবদের সাথে তাদের ব্যবসায়িক লেনদেনের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক সম্পর্কও স্থাপিত হয়। এতে ‘রোসাং’ অধিবাসীরা আরব ব্যবসায়ীদের মাধ্যমে ইসলামের সাম্য-সৌহার্দ্যে আকৃষ্ট হয় এবং ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। ফলে আরাকানে ধর্মান্তরিত মুসলিমের সংখ্যা বেড়ে যায়। লোককাহিনী থেকে জানা যায়, খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকের মাঝামাঝিতে মুহাম্মদ ইবনে হানাফিয়া নামক এক আরব মুসলিম সেনাপতি বিপুল সংখ্যক সৈন্য নিয়ে রোসাঙ্গে আসেন এবং সে দেশের রানী কৈয়াপুইকে বিয়ে করেন। পরে তিনি সৈন্য-সামন্ত নিয়ে রোসাঙ্গেই বসবাস করেন। তিনি যে পাহাড়ে বাস করতেন আজও তা ‘হানাফিয়া টঙ্কি’ এবং ‘কৈয়াপুই টঙ্কি’ নামে পরিচিত।
ইতিহাস থেকে জানা যায়, খ্রিস্টীয় পঞ্চদশ শতকের শুরুতে (১৪০৬ খ্রিস্টাব্দে) বার্মিজ রাজা আরাকানে আক্রমণ করেন। আক্রান্ত আরাকান রাজা নরমিখলা প্রতিবেশী চট্টগ্রামের রাজার মাধ্যমে তৎকালীন গৌড়েশ্বর (বাংলার শাসনকর্তা) সুলতান জালালুদ্দিন মুহাম্মদ শাহের কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করেন। গৌড়ের সুলতান আরাকান রাজাকে সহযোগিতা করতে ৫০ হাজার সৈন্য প্রেরণ করেন। এতে বার্মিজ রাজা পিছু হটতে বাধ্য হন এবং আরাকান রাজা পুনরায় ক্ষমতায় বসেন। আরাকান রাজা নরমিখলা তার ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে গৌড়ের (বাংলার) মুসলিম সৈন্যদের নিজ রাজ্যে বসবাসের সুযোগ দেন। এতে অনেক সৈনিক সেখানে বিয়ে করে স্থায়ীভাবে বসবাস করেন। এভাবে আরাকানের মুসলিম সংখ্যা আরও বেড়ে যায়। এতে আরাকান রাজশক্তির সাথে প্রতিবেশী চট্টগ্রাম ও বঙ্গদেশের মধ্যে সাংস্কৃতিক সম্পর্কেরও উন্নতি হয়। এ জন্য তৎকালীন বাঙালি কবি আলাওল, দৌলত কাজি, মীর মরদান, আইনুদ্দিন প্রমুখ মুসলিম কবিকে আরাকান রাজদরবারের সভাকবি নিয়োগ দেয়া হয়। এ ছাড়া আরাকান রাজ্যে আশরাফ খান, কোরেশি মাগন ঠাকুর প্রমুখ বাঙালি মন্ত্রীর নামও পাওয়া যায়। তবে ১৬৬০ সালে মোগল স¤্রাটপুত্র শাহ সুজার হত্যাকান্ডের মাধ্যমে বাংলার সাথে আরাকানের সম্পর্কের অবনতি হয়।
আরাকান দীর্ঘকাল স্বাধীন রাজ্য ছিল। কিন্তু ১৭৮৪ সালে বার্মিজরা আরাকান রাজ্যটি দখল করে কয়েক হাজার আরাকানি রোহিঙ্গাকে হত্যা করে। এ সময় তারা আরাকানের অনেক মসজিদ-মন্দিরও ধ্বংস করে। বার্মিজদের অত্যাচারে তখন প্রায় দুই লক্ষ আরাকানবাসী চট্টগ্রামে আশ্রয় গ্রহণ করে। এরপর আরাকানে ১৮২৪ সাল পর্যন্ত বার্মিজ শাসন বজায় থাকে। তবে ১৮২৪ সালে ব্রিটিশরা ভারত পেরিয়ে বার্মায় আগ্রাসন চালায়। ফলে ১৮২৪-১৮২৬ খ্রি. পর্যন্ত ব্রিটিশদের সাথে বার্মিজদের যুদ্ধ হয়। ইতিহাসে এ যুদ্ধকে প্রথম অ্যাংলো-বার্মিজ যুদ্ধ বলা হয়। এ যুদ্ধে বার্মিজরা পরাজিত হয় এবং ১৮২৬ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আরাকান রাজ্যটি ব্রিটিশ-ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়। আবার ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের আওতায় ১৯৩৭ সালের ১ এপ্রিল বার্মাকে ব্রিটিশ-ভারত থেকে আলাদা করা হয়। এ সময় আরাকানের জনগণ (রোহিঙ্গারা) রাজ্যটির স্বায়ত্তশাসন চায়। কিন্তু জনগণের ইচ্ছার বিরুদ্ধে আরাকানকে বার্মার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এরই প্রেক্ষিতে ১৯৪২ সালে আরাকানে রাখাইন বৌদ্ধ ও রোহিঙ্গা মুসলিমের মধ্যে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা শুরু হয়। এ সময় কয়েক হাজার মুসলিম রোহিঙ্গাকে হত্যা করা হয় এবং রোহিঙ্গা মুসলিমদের প্রায় তিন শ’ গ্রাম জ্বালিয়ে দেয়া হয়। এতে হাজার হাজার আরাকানি রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু হয় এবং তারা আরাকান ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। তবে ১৯৪৮ সালে ব্রিটিশ থেকে বার্মার স্বাধীনতা লাভকালে রোহিঙ্গারা আরাকানের স্বাধীনতা চায়। কিন্তু তৎকালীন বার্মিজ সরকার আরাকানের স্বাধীনতা না দিয়ে বরং রোহিঙ্গাদের ওপর চরম নির্যাতন-নিপীড়ন চালায়। অধিকন্তু স্বাধীনতা আন্দোলনের অজুহাতে অনেক মুসলিমের ভূ-সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করে। এরপর ১৯৬২ সালে জেনারেল নে-উইনের সামরিক সরকার রোহিঙ্গা মুসলিমদের অবৈধ অভিবাসী আখ্যায়িত করে তাদেরকে দেশ থেকে বিতাড়নের চেষ্টা করে। আবার ১৯৭৪ সালে ‘ইমার্জেন্সি ইমিগ্রেশন অ্যাক্ট’ করে বার্মা সরকার রোহিঙ্গা মুসলিমদের জাতীয়তা কেড়ে নেয়। এরপর ১৯৮২ সালে ‘বার্মা সিটিজেনশিপ ল’ এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক আইনে স্বীকৃত রোহিঙ্গা মুসলিমদের বেশ কিছু মৌলিক অধিকার ছিনিয়ে নেয়। ১৯৮৯ সালে বার্মার সরকার আরাকান রাজ্যের নাম পরিবর্তন করে বৌদ্ধ জনগোষ্ঠীর জাতীয়তাভিত্তিক ‘রাখাইন’ রাজ্য নামকরণ করে। এতে রোহিঙ্গা মুসলিম জাতিসত্তা মুছে দিয়ে রাখাইন বৌদ্ধ জাতিসত্তা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে। এভাবে ব্রিটিশ-বার্মায়, স্বাধীন বার্মায় ও আধুনিক মিয়ানমারে দীর্ঘ কয়েক দশক যাবৎ আরাকানের রোহিঙ্গা মুসলিমদের নিজ দেশে পরবাসীতে পরিণত করা হয়েছে। রোহিঙ্গা মুসলিমদেরকে জোর করে বৌদ্ধ ধর্ম পালনে বাধ্য করা হয় বলে মিয়ানমার সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ আছে। মুসলিম স্থাপনাসমূহ রাখাইন বৌদ্ধরা দখল করে নিচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গিয়েছে। এ ছাড়া মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গা মুসলিমদেরকে দিয়ে বিনাপারিশ্রমিকে সামরিক স্থাপনা, সেতু, প্যাগোডা, স্কুল, কলেজ হাসপাতাল নির্মাণ এবং পুকুর খননের কাজে নিয়োজিত রাখে। রোহিঙ্গা মুসলিম বিয়ের ক্ষেত্রে সরকার বিভিন্ন শর্ত ও করারোপ করে থাকে। অধিকন্তু রাখাইন বৌদ্ধরা অনেক মুসলিম মহিলা-তরুণীর ওপর নির্যাতন-নিপীড়নও চালিয়েছে! এভাবে গত কয়েক দশক যাবৎ মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গা মুসলিম নিধন অব্যাহত আছে। তবে ২০১২ সাল থেকে এর তীব্রতা আরও বাড়ছে। ২০১৬ সালের অক্টোবরে দেশটির সেনাবাহিনী প্রায় এক হাজার রোহিঙ্গা মুসলিমকে হত্যা করেছে এবং মুসলিম অধ্যুষিত কয়েকটি গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়েছে। এতে লক্ষাধিক রোহিঙ্গা মুসলিম গৃহহীন হয়ে পড়েছে। অতি সম্প্রতি (২৫ আগস্ট ২০১৭ থেকে) দেশটির মংডু, বুথিডং, রাথিডং এলাকায় বর্মিবাহিনী আক্রমণ চালিয়ে তিন হাজারেরও বেশি রোহিঙ্গাকে হত্যা করেছে এবং ১৭৬টি গ্রাম পুড়িয়ে দিয়েছে। এ আক্রমণের শিকার আহত-নিরাশ্রয়ী রোহিঙ্গারা মানবিক সঙ্কটে পড়েছেন। এ অবস্থায় তাদেরকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে হবে। এ পৃথিবীতে তাদেরও বাঁচার অধিকার আছে। তাদের শিক্ষা লাভ-বিনোদনের অধিকার আছে। আর তাদের অধিকার আদায়ে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। এ ব্যাপারে তোমাদের উদ্যোগ থাকতে হবে।
প্রকৃতপক্ষে রোহিঙ্গারা আরাকান বা রাখাইন রাজ্যের আদিবাসী। অথচ তাদেরকে মাতৃভূমি ত্যাগে বাধ্য করছে মিয়ানমারের বর্মিবাহিনী। তারা জীবন বাঁচাতে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আশ্রয় গ্রহণ করছে। তারা চরম নির্যাতন-নিপীড়নের মধ্যে অসহায় জীবনযাপন করছে। এহেন অবস্থায় রোহিঙ্গাদের রক্ষায় জাতিসংঘ, ওআইসি, আসিয়ানসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে এগিয়ে আসতে হবে। অধিকন্তু মিয়ানমার সরকারকে বিরত রাখতে বিশ্ব নেতৃবৃন্দকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া আমাদের প্রত্যেকের উচিত সামর্থ্য অনুসারে নির্যাতিত-নিপীড়িত ও আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সহযোগিতার হাত প্রসারিত করা।

SHARE

Leave a Reply